লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [৩৪]

চূলমালুঙ্ক্য সূত্র

১২২. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অনাথপিণ্ডিকের জেতবন আরামে বাস করিতেছেন। তখন নির্জনে চিন্তামগ্ন (প্রতিসংলীন) অবস্থায় আয়ুষ্মান মালুঙ্ক্যপুত্রের চিত্তে এইরূপ পরিবিতর্ক উদয় হইল : “ভগবান যে-সকল দৃষ্টিগত (মতবাদ) অব্যাকৃত (অব্যাখ্যাত), স্থাপিত ও প্রতিক্ষিপ্ত রাখিয়াছেন; যথা :

(১) লোক শাশ্বত?

(২) লোক অশাশ্বত?

(৩) লোক অন্তবান?

(৪) লোক অনন্তবান?

(৫) যেই জীব সেই শরীর?

(৬) জীব অন্য শরীর অন্য?

(৭) মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব) থাকে?

(৮) মৃত্যুর পর তথাগত থাকে না?

(৯) মৃত্যুর পর তথাগত থাকে, নাও থাকে? এবং

(১০) মৃত্যুর পর তথাগত থাকেও না-না থাকেও না।

এই সকল (মতবাদ) ভগবান আমাকে বর্ণনা করেন না। ভগবান আমাকে যাহা বর্ণনা করেন না তাহা আমার রুচিকর নহে, তাহা আমার পছন্দও নহে। সুতরাং আমি ভগবৎ সমীপে উপস্থিত হইয়া এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিব। যদি ভগবান আমাকে বলেন, (১) ‘লোক শাশ্বত,… অথবা (১০) মরণের পর তথাগত থাকেও না, না থাকেও না; তাহা হইলে আমি ভগবানের নিকট ব্রহ্মচর্য আচরণ করিব’। যদি ভগবান তাহা আমাকে না বলেন, (১) ‘… (১০); তবে আমি শিক্ষা (ভিক্ষুত্ব) প্রত্যাখ্যান করিয়া হীনাবস্থায় (গৃহস্থ আশ্রমে) ফিরিয়া যাইব।’”

১২৩. তখন আয়ুষ্মান মালুঙ্ক্যপুত্র সায়ংকালীন নিভৃত চিন্তা হইতে উঠিয়া ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে বসিয়া আয়ুষ্মান মালুঙ্ক্যপুত্র ভগবানকে ইহা বলিলেন :

১২৪. “ভন্তে, এখানে… আমার চিত্ত এরূপ পরিবিতর্ক উৎপন্ন হইয়াছে : ‘ভগবান কর্তৃক যে-সকল দৃষ্টি (মতবাদ) অব্যাকৃত, স্থাপিত ও পরিত্যক্ত হইয়াছে,… তবে আমি শিক্ষা পরিত্যাগ করিয়া হীনাবস্থায় ফিরিয়া যাইব।’ যদি ভগবান জানেন যে (১) ‘লোক শাশ্বত’ তবে ভগবান আমাকে বলুন লোক শাশ্বত’ (২) যদি ভগবান জানেন যে ‘লোক অশাশ্বত’ তবে ভগবান আমাকে বলুন ‘লোক অশাশ্বত’… যদি ভগবান না জানেন… অশাশ্বত, তবে অনভিজ্ঞ ও অদর্শকের (অজ্ঞানীর) পক্ষে ইহাই সোজা উত্তর হয়, তিনি স্পষ্ট বলিয়া দিবেন, ‘উহা আমি জানি না, উহা আমার অজ্ঞাত।’”

“… যদি ভগবান জানেন (৯) ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকে, নাও থাকে’ তবে ভগবান আমাকে বলুন, ‘মৃত্যুর পর…।’ যদি ভগবান জানে (১০) ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেও না-না থাকেও না’ তবে ভগবান আমাকে বলুন… না থাকেও না। যদি ভগবান না জানেন, ‘থাকেও, না থাকেও’ অথবা ‘না থাকেও, না থাকেও না’ তবে অনভিজ্ঞ ও অদর্শকের পক্ষে ইহাই-সোজা উত্তর যে-তিনি স্পষ্ট বলিয়া দিবেন, ‘আমি উহা জানি না, উহা আমার অপরিজ্ঞাত।’”

১২৫. “কেন, মালুঙ্ক্যপুত্র, আমি কি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়াছি, ‘এসো মালুঙ্ক্যপুত্র, আমার সাথে ব্রহ্মচর্য আচরণ করো, আমি তোমাকে বর্ণনা করিব যে (১) লোক শাশ্বত… (১০) মরণের পর তথাগত থাকে না, না থাকেও না’?”

“একান্তই না, ভন্তে,”

“তুমিও কি আমাকে এরূপ বলিয়াছ? তবেই আমি ভগবানের নিকট ব্রহ্মচর্য আচরণ করিব, যদি ভগবান আমাকে বলেন যে, (১) লোক শাশ্বত… (১০) মরণের পর তথাগত থাকে না, না থাকেও না?”

“না ভন্তে,”

“এই প্রকারে মালুঙ্ক্যপুত্র, আমিও তোমাকে পূর্বে বলি নাই… (১০) মরণের পর তথাগত থাকে না, না থাকেও না। তুমিও আমাকে পূর্বে বল নাই, ‘ভন্তে, (১)… (১০)…।’ তাহা হইলে মোঘ (ব্যর্থ) পুরুষ, তুমি কোনো অবস্থায় কাহাকে পুনঃ অভিযোগ করিতেছ?”

১২৬. “মালুঙ্ক্যপুত্র, যে ব্যক্তি এইরূপ বলে : ‘আমি তাবৎ ভগবানের নিকট ব্রহ্মচর্য আচরণ করিব না যাবৎ ভগবান আমাকে তাহা বর্ণনা না করেন যে (১) লোক শাশ্বত,… (১০) না থাকে, না থাকেও না’। মালুঙ্ক্যপুত্র, উহা তথাগতের অব্যাকৃতই থাকিবে। আর ইতিমধ্যে সে ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটিতে পারে।”

“যেমন মালুঙ্ক্যপুত্র, কোনো ব্যক্তি গাঢ়লিপ্ত বিষযুক্ত শল্য (বানফলা) দ্বারা বিদ্ধ হইল। তাহার মিত্র-সুহৃদ-জ্ঞাতি-সলোহিতগণ কোনো বিজ্ঞ শল্যকর্তা ভিষককে উপস্থিত করিল। তখন সেই আহত ব্যক্তি বলে যে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এই শল্য উৎপাটন করিতে দিব না, যদ্বারা শল্যবিদ্ধ হইয়াছি সে ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য কিংবা শূদ্র? তাহাকে না জানা পর্যন্ত আমার শল্য উৎপাটন করিতে দিব না।… আমি তখন পর্যন্ত এই শল্য উৎপাটন করিতে দিব না,… যতক্ষণ না জানি যে, সে পুরুষ অমুক নামের, অমুক গোত্রের?… সে পুরুষ দীর্ঘ, হ্রস্ব কিংবা মধ্যম?… সে পুরুষ কাল, শ্যাম অথবা মঞ্জুরবর্ণ বিশিষ্ট?… সে পুরুষ কোনো গ্রামে, নিগমে, থানায় বা নগরে বাস করে?… আমি ততক্ষণ এই শল্য উৎপাটন করিতে দিব না যতক্ষণ পর্যন্ত সেই বেধক ধনু না জানি যে উহা চাপ কিংবা কোদণ্ড?… ধনুর গুণ না জানি-উহা কি অর্কের, বল্কলের, সণ্ঠের (বংশলতার?), স্নায়ুর, মরুবার (লতায়) কিংবা ক্ষীরপর্ণির (লতাবিশেষ)?… যে কাণ্ড বা শর দ্বারা বিদ্ধ হইয়াছি, তাহা না জানি যে উহা কচ্ছের (পর্বতগাত্রে বা জলাশয়ের তটে স্বয়ং জাত তুঁদ বৃক্ষের) অথবা রোপিত (কৃষিজাত) তুঁদের?… তীর না জানা পর্যন্ত, যাহার পালক দ্বারা নির্মিত-যদি গৃধের (পালক), কঙ্ক, কুলাল, ময়ূর কিংবা শিথিলহনু পক্ষীবিশেষের পালক?… যদ্বারা আমি বিদ্ধ হইয়াছি যদি সেই তীর না জানি যে উহা কাহার স্নায়ু দ্বারা পরিক্ষিপ্ত, তাহা কি গাভীর, মহিষের, কৃষ্ণসার-মৃগবিশেষের অথবা বানরের?… যে শল্যে বিদ্ধ হইয়াছি তাহা না জানা পর্যন্ত, উহা কি শল্য ক্ষুরপ্র (ক্ষুরের ন্যায় ধারাল), বেকণ্ডে, নারাচে, বৎস দন্ত (বাচ্চার দাঁতের ন্যায়), অথবা করবী পত্র সদৃশ তীর্ণ?”

“(তাহা হইলে) মালুঙ্ক্যপুত্র, সে ব্যক্তির উহা অজ্ঞাতই থাকিবে। আর ইত্যবসরে তাহার মৃত্যুও ঘটিতে পারে। সেইরূপ মালুঙ্ক্যপুত্র, যে এই কথা বলে : ‘ততক্ষণ আমি ভগবানের নিকট ব্রহ্মচর্য আচরণ করিব না যতক্ষণ ভগবান আমাকে ব্যাখ্যা না করিবেন যে (১) লোক কি শাশ্বত, কি অশাশ্বত?… (১০) তথাগত মৃত্যুর পর না থাকে, না থাকেও না’?”

“মালুঙ্ক্যপুত্র, তাহা তথাগতের অব্যাকৃতই থাকিয়া যাইবে, অথচ ইতিমধ্যে সে ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটিতে পারে।”

১২৭. “মালুঙ্ক্যপুত্র, (১-২) ‘লোক শাশ্বত’ এই দৃষ্টি থাকিলে ব্রহ্মচর্য বাস হইবে, ইহা নহে। ‘লোক অশাশ্বত’ এই দৃষ্টি থাকিলেও ব্রহ্মচর্য বাস হইবে, ইহাও নহে। কিন্তু মালুঙ্ক্যপুত্র, ‘লোক শাশ্বত’ এই দৃষ্টি থাকিলে কিংবা ‘লোক অশাশ্বত’ এই দৃষ্টি না থাকিলেও জন্ম আছেই, জরা-মরণ আছেই, শোক-রোদন-দুঃখ-দৌর্মনস্য ও উপায়াস বিদ্যমান থাকিবেই; আমি ইহ-জীবনে যাহাদের বিনাশোপায় প্রজ্ঞাপন করিতেছি…।”

“মালুঙ্ক্যপুত্র, (৯-১০) ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকিবেও, না থাকিবেও’ এই দৃষ্টি থাকিলে… কিংবা… ‘না থাকিবে, না থাকিবেও না’ এই দৃষ্টি থাকিলেও জন্ম আছেই, আছে জরা-মরণ-শোক-রোদন দুঃখ-দৌর্মনস্য উপায়াস; ইহ-জন্মেই যাহাদের বিনাশের উপায় আমি ঘোষণা করি। (আমার শিষ্যগণ এই সব বাহ্য বিষয়ে নিমগ্ন না হইয়া এই জীবনেই নির্বাণ প্রাপ্ত হউক, ইহাই অভিপ্রেত।)”

১২৮. “এই কারণে মালুঙ্ক্যপুত্র, আমার অব্যাকৃতকে অব্যাকৃত হিসেবেই ধারণ কর এবং আমার ব্যাকৃতকে ব্যাকৃত হিসেবেই ধারণ করো।”

“মালুঙ্ক্যপুত্র, আমার অব্যাকৃত কী? (১) ‘লোক শাশ্বত’ ইহা আমার অব্যাকৃত,… (১০) ‘না থাকে, না থাকেও না’ ইহা আমার অব্যাকৃত। মালুঙ্ক্যপুত্র, কী কারণে ইহাদিগকে অব্যাকৃত বলিয়াছি? মালুঙ্ক্যপুত্র, ইহা (এই দৃষ্টি ও ইহাদের ব্যাকরণ) অর্থ সংহিত নহে, আদি ব্রহ্মচর্যের (শীল সংযমের) উপকারী নহে, আর ইহা (সংসারাবর্তে) নির্বেদের, বৈরাগ্যের, নিরোধের, ক্লেশ উপশমের, অভিজ্ঞতার, (চারি লোকোত্তর মার্গরূপ) সম্বোধির ও অসংখত নির্বাণধাতু সাক্ষাৎকারের নিমিত্ত সংবর্তিত হয় না; এই কারণেই আমি ইহাদিগকে অব্যাকৃত রাখিয়াছি।”

“মালুঙ্ক্যপুত্র, আমার ব্যাকৃত কী? (১) ইহা দুঃখ, ইহাকে আমি ব্যাকৃত করিয়াছি। (২) ইহা দুঃখসমুদয় (দুঃখের কারণ), ইহাকে আমি ব্যাকৃত করিয়াছি। (৩) ইহা দুঃখনিরোধ ও (৪) ইহা দুঃখ নিরোধগামিনী প্রতিপদা এই চারি আর্যসত্যকে আমি ব্যাকৃত করিয়াছি। মালুঙ্ক্যপুত্র, কেন আমি এই আর্যসত্য ব্যাকৃত করিয়াছি? মালুঙ্ক্যপুত্র, ইহা অর্থ সংহিত, ইহা ব্রহ্মচর্যের আদিভূত নিদান; (আর) ইহা নির্বেদ, বিরাগ… নির্বাণের নিমিত্ত আবশ্যকীয়। এই কারণে আমি আর্যসত্য সর্বতোভাবে ব্যাকৃত করিয়াছি। তজ্জন্য মালুঙ্ক্যপুত্র, আমার অব্যাকৃতকে অব্যাকৃত হিসেবে ধারণ করো, আর আমার ব্যাকৃতকে ব্যাকৃত হিসেবে ধারণ করো।”

ভগবান ইহা বলিলেন। সন্তুষ্টচিত্তে আয়ুষ্মান মালুঙ্ক্যপুত্র ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করিলেন।

চূলমালুঙ্ক্য সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]