লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৬]

মহামালুঙ্ক্য সূত্র

১২৯. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অনাথপিণ্ডিকের জেতবন আরামে বাস করিতেছিলেন, তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, “ভিক্ষুগণ,” “ভদন্ত!” বলিয়া সেই ভিক্ষুগণ ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন। ভগবান বলিলেন, “ভিক্ষুগণ, আমার উপদিষ্ট পঞ্চ অধোভাগীয় সংযোজনগুলি তোমরা ধারণ করো কি?”

এইরূপ উক্ত হইলে আয়ুষ্মান মালুঙ্ক্যপুত্র ভগবানকে ইহা বলিলেন, “ভন্তে, ভগবান কর্তৃক উপদিষ্ট পঞ্চ অধোভাগীয় সংযোজন আমি ধারণ করি।”

“মালুঙ্ক্যপুত্র, আমার উপদিষ্ট পঞ্চ অধোভাগীয় সংযোজন তুমি কী প্রকারে ধারণ করো?”

“ভন্তে, (১) স্বকায়দৃষ্টিকে (নিত্য আত্মবাদকে) ভগবানের উপদিষ্ট অধোভাগীয় সংযোজনরূপে আমি ধারণ করি। (২) বিচিকিৎসাকে (সংশয়কে)…। (৩) শীলব্রত-পরামর্শকে (শীল ও ব্রতকে দৃঢ়রূপে গ্রহণকে)…। (৪) কামচ্ছন্দকে (ভোগানুরাগকে)…। (৫) ব্যাপাদকে (বিদ্বেষকে)…।”

“মালুঙ্ক্যপুত্র, এই প্রকার পঞ্চ অধোভাগীয় সংযোজন আমি কাহাকে উপদেশ দিতে তুমি শুনিয়াছ? মালুঙ্ক্যপুত্র, অন্য মতাবলম্বী (অঞ্‌ঞতিত্থিযা) পরিব্রাজকগণ এই তরুণোপমায় উপহাস (উপারম্ভ) করিবে, নহে কি? মালুঙ্ক্যপুত্র, উত্থানশায়ী অবোধ অল্পবয়স্ক শিশুর ‘ইহা স্বকায় (আত্মবাদ)’ এই ধারণাই জন্মে না, তবে কোথা হইতে তাহার স্বকায়দৃষ্টি উৎপন্ন হইবে? (অবশ্য অপ্রহীন-হেতু)) স্বকায়দৃষ্টি উহার (চিত্ত সন্ততিতে) অনুশায়িত বা সুপ্ত থাকে।…। অল্পবয়স্ক শিশুর ‘ইহা ধর্ম (মানস বিচার্য বিষয়)’… । কোথা হইতে তাহার ধর্ম সম্বন্ধে সংশয় উৎপন্ন হইবে? (অবশ্য) সংশয়ানুশয় উহার মনে অনুশায়িত থাকে।… অল্পবয়স্ক শিশুর ‘ইহা শীল (সদাচার)’ এই ধারণা জন্মে না। কোথা হইতে উহার শীলে শীলব্রত-পরামর্শ হইবে? শীলব্রত-পরামর্শ অনুশয়রূপে থাকিয়াই থাকে…।… অল্পবয়স্ক শিশুর ‘ইহা কাম’ এ ধারণা জন্মে না, কোথা হইতে তাহার কাম্য বস্তুর প্রতি কামচ্ছন্দ উৎপন্ন হইবে?… অবোধ শিশুর ‘সত্ত্ব (প্রাণী)’ ধারণাও জন্মে না, কোথা হইতে তাহার ব্যাপাদ (সত্ত্ব পীড়নেচ্ছা) উৎপন্ন হইবে? (অবশ্য) ব্যাপাদ উহার চিত্তমধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকিয়া যায়, (পরে প্রত্যয় পাইলে ইহারা জাগ্রত হয়)। মালুঙ্ক্যপুত্র, অন্য মতাবলম্বী পরিব্রাজকগণ এই বালকোপমায় উপহাস করিবে, নহে কি?”

এইরূপ উক্ত হইলে আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানকে বলিলেন, “ভগবান, ইহার কাল হইয়াছে, সুগত, ইহার সময় হইয়াছে যে ভগবান পাঁচ অধোভাগীয় সংযোজন সম্বন্ধে উপদেশ করুন। ভগবানের নিকট শুনিয়া ভিক্ষুগণ ধারণ করিবেন।”

“তাহা হইলে শুন আনন্দ, উত্তমরূপে মনে রাখ, আমি ভাষণ করিতেছি।”

“হ্যাঁ, ভন্তে,” (বলিয়া) আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানকে উত্তর দিলেন। ভগবান ইহা বলিলেন :

১৩০. “এখানে আনন্দ, জ্ঞাননেত্রে আর্যগণের অদর্শনকারী স্মৃত্যুপস্থানাদি আর্যধর্মে অনভিজ্ঞ, আর্যধর্মে অবিনীত, যাহারা সৎপুরুষগণের অদর্শনকারী, সৎপুরুষধর্মে অনভিজ্ঞ, সৎপুরুষধর্মে অবিনীত, অশ্রুতবান, পৃথকজন (প্রাকৃতজন) স্বকায়দৃষ্টি অভিভূত, স্বকায়দৃষ্টি পরিব্যাপ্ত চিত্তে অবস্থান করে এবং সে উৎপন্ন স্বকায়দৃষ্টি পরিব্যাপ্ত চিত্তে অবস্থান করে এবং সে উৎপন্ন স্বকায়দৃষ্টি হইতে নিঃসরণের উপায় যথাভূত জানে না, তাহার সেই অনপসারিত, দৃঢ়তা প্রাপ্ত স্বকায়দৃষ্টিই অধোভাগীয় সংযোজন। সে বিচিকিৎসাভিভূত, বিচিকিৎসা পরিবৃত চিত্তে বাস করে এবং সে উৎপন্ন বিচিকিৎসা হইতে নিঃসরণ উপায় যথাভূত জানে না, তাহার সেই অনপসারিত দৃঢ়তা প্রাপ্ত বিচিকিৎসাই অধোভাগীয় সংযোজন। (শীলব্রত-পরামর্শ, কামরাগ ও ব্যাপাদ বারেও উক্তরূপে বিস্তার করিবে)।”

১৩১. “অপর পক্ষে আনন্দ, জ্ঞাননেত্রে আর্যদের দর্শনকারী স্মৃত্যপস্থানাদি আর্যধর্মে অভিজ্ঞ, আর্যধর্মে সুবিনীত (সুশিক্ষিত); সৎপুরুষদের দর্শনকারী, সৎপুরুষধর্মে অভিজ্ঞ, সৎপুরুষধর্মে সুদক্ষ, সৎপুরুষধর্মে সুবিনীত, শ্রুতবান আর্যশ্রাবক স্বকায়দৃষ্টি অভিভূত ও স্বকায়দৃষ্টি পরিবৃত চিত্ত না হইয়া অবস্থান করেন। তিনি উৎপন্ন স্বকায়দৃষ্টি হইতে নিঃসরণ যথাভূত জানেন; (সে কারণে) তাঁহার অনুশয় শক্তি-সমন্বিত সৎকায়দৃষ্টি সংযোজন প্রহীন হইবে। (বিচিকিৎসা শীলব্রত-পরামর্শ, কামচ্ছন্দ ও ব্যাপাদ সম্বন্ধেও এরূপ)।”

১৩২. “আনন্দ, পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজন প্রহাণের নিমিত্ত যেই মার্গ ও যেই প্রতিপদা বিদ্যমান সেই মার্গ ও সেই প্রতিপদা অবলম্বন ব্যতীত পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজনকে জানিবে, বিচার করিবে ও পরিত্যাগ করিবে; ইহা কখনো সম্ভব নহে। যেমন আনন্দ, স্থির সারবান মহাবৃক্ষের ত্বক ছেদন না করিয়া, বাকল ছেদন না করিয়া, সারচ্ছেদ করিতে সমর্থ হইবে, ইহার কোনো হেতু নাই। সেইরূপ আনন্দ, পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজন প্রহাণের নিমিত্ত যেই মার্গ, যেই প্রতিপদা বিদ্যমান তাহা অবলম্বন না করিয়া পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজন জানিবে, বিচার করিবে বা পরিহার করিবে; ইহার কোনো হেতু বিদ্যমান নাই।”

“অপর পক্ষে আনন্দ, যেই মার্গ ও যেই প্রতিপদা পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজন প্রহাণের নিমিত্ত বিদ্যমান সে মার্গ ও সেই প্রতিপদা অবলম্বন করিয়াই পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজন জানিবে, বিচার করিবে, পরিহার করিবে; ইহার হেতু বিদ্যমান আছে। যেমন আনন্দ, দণ্ডায়মান সারবান মহাবৃক্ষের ত্বক ও বাকল ছেদন করিয়া সারচ্ছেদ সম্ভব, ইহার হেতু বিদ্যমান।”

“সেইরূপ আনন্দ,…। যেমন আনন্দ, গঙ্গানদী কানায় কানায় জলপূর্ণ কাকপেয়্য (তীরে বসিয়া কাকের পানের যোগ্য) হয়, তখন কোনো দুর্বল পুরুষ (ইহা বলিতে) আসে-আমি সেই গঙ্গানদীর প্রবাহকে বাহু দ্বারা তির্যকভাবে (কাটিয়া) স্বস্তিতে পরপারে যাইব।’ সে গঙ্গানদীর… পরপারে যাইতে সমর্থ হইবে না। সেইরূপই আনন্দ, স্বকায় নিরোধের জন ধর্ম-উপদেশ করিবার সময় যাহার চিত্ত উৎসাহিত হয় না, প্রসন্ন হয় না, স্থির হয় না, বিমুক্ত হয় না, তাহাকে দুর্বল পুরুষের ন্যায় জানা উচিত। যেমন আনন্দ, গঙ্গানদী তীরসম জলপূর্ণ ও কাকপেয়্য হয়, তখন কোনো বলবান পুরুষ (এই বলিতে) আসে, ‘আমি এই গঙ্গানদীর স্রোত বাহু দ্বারা তির্যক কাটিয়া স্বস্তিতে পরপারে গমন করিব।’ সে গঙ্গানদীর স্রোত বাহু দ্বারা তির্যক কাটিয়া স্বস্তির সহিত পরপারে যাইতে সমর্থ হইবে। সেইরূপ আনন্দ, কাহাকেও স্বকায়দৃষ্টি নিরোধের নিমিত্ত ধর্ম-উপদেশ করিবার সময় যাহার চিত্ত উৎসাহিত হয়, প্রসন্ন হয়, স্থির হয়, বিমুক্ত হয়,… তাহাকে বলবান পুরুষের ন্যায় বিবেচনা করিবে।”

১৩৩. “আনন্দ, পঞ্চ অধোভাগীয় সংযোজন প্রহাণের নিমিত্ত মার্গ কী? প্রতিপদা কী? এখানে আনন্দ, ভিক্ষু উপাধিবিবেক বা পঞ্চ কামগুণে আসক্তি ত্যাগ দ্বারা, অকুশল নীবরণধর্ম প্রহান দ্বারা সর্বতোভাবে তন্দ্রালস্য প্রভৃতি কায়িক দৌর্বল্য প্রশান্ত, করিয়া, কাম হইতে পৃথক এবং অকুশল ধর্ম হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া সবিতর্ক সবিচার বিবেকজাত প্রীতি-সুখ সমন্বিত প্রথম ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া অবস্থান করেন। তথায় সমাপত্তিক্ষণে তিনি যে-সকল রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানস্কন্ধ জাতীয় ধর্ম (পদার্থ) আছে, তিনি সেই সকল ধর্মকে অনিত্য; দুঃখ, রোগ, গণ্ড, শল্য, অঘময়, আবাধ; পরস্ব, বিনাশশীল, শূন্য ও অনাত্মা হিসেবে (অনিত্য-দুঃখ-অনাত্ম এই ত্রিলক্ষণ আরোপ করিয়া) সম্যকরূপে দর্শন করেন। তিনি এবংবিধ লক্ষণযুক্ত স্কন্ধ ধর্মসমূহ হইতে (বিষ্কম্ভনভাবে) অপসারিত করেন। তিনি সেই ধর্মসমূহ হইতে চিত্তকে অপনীত করিয়া সর্বসংস্কারের সাম্যাবস্থা, সর্বোপাধি বর্জিত, তৃষ্ণাক্ষয়, বিরাগ ও নিরোধস্বরূপ যে নির্বাণ আছে, ইহা শান্ত, ইহা উত্তম-বিদর্শন জ্ঞানে বুঝিয়া চিত্তকে সেই অমৃতধাতুর অভিমুখী করেন তিনি সেই বিদর্শনে স্থিত হইয়া (চতুর্বিধ মার্গানুক্রমে) আসবসমূহের ক্ষয় সাধন করেন। যদি তিনি আসবসমূহের সম্পূর্ণ ক্ষয় সাধন করিতে না পারেন, তবে সেই শমথ-বিদর্শন ধর্মানুরক্তি ও সেই ধর্মানন্দ দ্বারা পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজন সম্পূর্ণ ক্ষয় করিয়া তিনি ঔপপাতিক (অযোনি সম্ভব) হন। তিনি তথায় শুদ্ধাবাস ব্রহ্মলোকে পরিনির্বাণ লাভ করেন, সেই লোক হইতে তাঁহাকে আর পুনরাবর্তন করিতে হয় না। আনন্দ, ইহাই মার্গ আর ইহাই পন্থা, পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজনের প্রহাণের নিমিত্ত।”

“পুনরায় আনন্দ, ভিক্ষু…।” (দ্বিতীয় ধ্যান, তৃতীয় ধ্যান ও চতুর্থ ধ্যান সম্বন্ধেও তদ্রূপ বিস্তার করিতে হইবে।)

“পুনরায় আনন্দ, ভিক্ষু সর্বতোভাবে রূপসংজ্ঞা অতিক্রম ও প্রতিঘসংজ্ঞা অস্তগমন দ্বারা, নানাত্ব সংজ্ঞার অমনোনিবেশ-হেতু অনন্ত, আকাশরূপে আকাশ-অনন্ত-আয়তন ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন। তদবস্থায় যে বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানস্কন্ধ ধর্ম উৎপন্ন হয়…।” (বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন, আকিঞ্চনায়তন ও নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন ধ্যান সম্বন্ধেও তদ্রূপ বিস্তার করিতে হইবে।)

“ভন্তে, যদি পঞ্চবিধ অধোভাগীয় সংযোজন প্রহাণের নিমিত্ত ইহাই মার্গ, ইহাই পন্থা হয়, তবে কেন ইহাতে কোনো কোনো ভিক্ষু চিত্তবিমুক্ত এবং কোনো কোনো ভিক্ষু প্রজ্ঞাবিমুক্ত হন?”

“আনন্দ, আমি তাঁহাদের ইন্দ্রিয়-নানাত্বই ইহার কারণ বলিয়া বলি।”

ভগবান ইহা বলিলেন। আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করিলেন।

মহামালুঙ্ক্যপুত্র সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৫]