১৩৪. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অনাথপিণ্ডিকের জেতবন আরামে বাস করিতেছিলেন। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, “ভিক্ষুগণ,” “ভদন্ত” (বলিয়া) সেই ভিক্ষুগণ ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন।
ভগবান বলিলেন, “ভিক্ষুগণ, আমি একাসন-ভোজন আহার করি। ভিক্ষুগণ, আমি একাসন-ভোজন গ্রহণ করিয়া নিরোগতা, নিরাতঙ্ক, শরীরের লঘুভাব, বল ও সুখবিহার অনুভব করি। এস, ভিক্ষুগণ, তোমরাও একাসন-ভোজন আহার করো। একাসন-ভোজন আহার করিয়া তোমরাও নিরোগতা, নিরাতঙ্ক, শরীরের লঘুভাব… সুখবিহার অনুভব করো।”
এইরূপ বলিলে আয়ুষ্মান ভদ্দালি ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, আমি একাসন-ভোজন আহার করিতে উৎসাহ বোধ করি না। কারণ একাসন-ভোজন আহার করিলে আমার সংশয় ও বিপ্রতিসার হইতে পারে।”
“তাহা হইলে ভদ্দালি, তুমি যেখানে নিমন্ত্রিত হও তথায় (খাদ্যের) একাংশ ভোজন করিয়া অপরাংশ নিয়া আসিয়া দ্বিতীয়বার ভোজন করিতে পার। এই প্রকারে ভোজন করিয়াও ভদ্দালি, তুমি জীবন যাপন করিতে পারিবে।”
“ভন্তে, এই প্রকারেও আমার সংশয় ও বিপ্রতিসার জন্মিতে পারে।”
তখন ভগবান শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপিত করিলেন, ভিক্ষুসংঘ সেই শিক্ষাপদ গ্রহণ ও পালন করিলেও আয়ুষ্মান ভদ্দালি তৎপ্রতি উৎসাহ বোধ করিলেন না। তখন আয়ুষ্মান ভদ্দালি সেই সারা তিন মাস লজ্জাবশত ভগবানকে প্রত্যক্ষ দর্শন দিলেন না। কেননা, তিনি গুরুর উপদেশ ও শিক্ষার পরিপূর্ণ পালনকারী ছিলেন না।
১৩৫. সেই সময় বহুভিক্ষু ভগবানের চীবর (সেলাই) কার্য করিতেছিলেন। কারণ চীবর প্রস্তুত হইলে তিন মাস পর ভগবান ধর্ম প্রচারার্থ পর্যটনে বাহির হইবেন। তখন আয়ুষ্মান ভদ্দালি সেই ভিক্ষুদের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া সেই ভিক্ষুদের সহিত প্রীতি-সংলাপ করিলেন। সম্মোদজনক ও স্মরণীয় কথা শেষ করিয়া একপ্রান্তে বসিলেন। একান্তে উপবিষ্ট আয়ুষ্মান ভদ্দালিকে সেই ভিক্ষুগণ বলিলেন, “আবুসো ভদ্দালি, এখন ভগবানের চীবর প্রস্তুত করা হইতেছে। চীবর প্রস্তুত হইলে তিন মাস পর ভগবান পর্যটনে বাহির হইবেন। ভালো, বন্ধু ভদ্দালি, এই আপত্তি (অপরাধ) সম্বন্ধে আপনি উত্তমরূপে অবহিত হউন, অবশেষে উহা আরও দুষ্করতর বা প্রতিকারের অযোগ্য না হউক।”
“হ্যাঁ বন্ধুগণ,” (বলিয়া) ভিক্ষুদের কাছে প্রতিশ্রুতি হইয়া আয়ুষ্মান ভদ্দালি ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট আয়ুষ্মান ভদ্দালি ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, বাল, মূঢ় ও অনভিজ্ঞ জনোচিত আমার অপরাধ সীমা লঙ্ঘন করিয়াছে, যেহেতু ভগবান কর্তৃক শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপিত হইলে এবং ভিক্ষুসংঘ সেই শিক্ষাপদ পালন করিলেও আমি তাহাতে নিরুৎসাহ প্রকাশ করিয়াছি। ভন্তে ভগবান, ভবিষ্যতে সংবরের জন্য আমার সে অপরাধ ক্ষমা করুন।”
“একান্তই ভদ্দালি, বাল, মূঢ় ও অনভিজ্ঞের ন্যায় তোমার অপরাধ হইয়াছে যে আমাকর্তৃক শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপিত হইলেও এবং ভিক্ষুসংঘ সেই শিক্ষাপদ গ্রহণ করিলেও তুমি তাহাতে নিরুৎসাহ প্রকাশ করিয়াছ। ভদ্দালি, তখন তোমার সুযোগ (সময়) অবিদিত ছিল যে ভগবান শ্রাবস্তীতে বাস করিতেছেন। সুতরাং ভগবানও আমাকে জানিবেন, ‘ভদ্দালি নামক ভিক্ষু শাস্তার উপদেশে শিক্ষার পরিপূরণকারী নহে।’ এই কারণও ভদ্দালি, তখন তুমি বুঝিতে পার নাই। ভদ্দালি, তোমার এই কারণও অজ্ঞাত ছিল যে বহু ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী শ্রাবস্তীতে বর্ষাবাস করিতেছেন, তাঁহারাও আমাকে জানিবেন, ‘ভদ্দালি নামক ভিক্ষু শাস্তার শাসনে শিক্ষার পরিপূরণকারী নহে’। এই কারণও ভদ্দালি, তোমার অজ্ঞাত ছিল। ভদ্দালি, এই কারণও তোমার প্রতিভাত হইল না যে বহু উপাসক-উপাসিকা শ্রাবস্তীতে বাস করেন, তাঁহারাও আমাকে জানিবেন, ‘ভদ্দালি নামক ভিক্ষু শাস্তার উপদেশ পালনকারী নহেন’…। ভদ্দালি, এই কারণও তোমার অজ্ঞাত ছিল যে নানা মতাবলম্বী বহু শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এই শ্রাবস্তীতে বর্ষাবাস করিতেছেন, তাঁহারাও আমাকে জানিবেন-শ্রমণ গৌতমের শ্রাবক, থেরদের (বৃদ্ধদের) অন্যতর ভদ্দালি নামক ভিক্ষু শাস্তার উপদেশ শিক্ষায় পরিপূর্ণকারী নহেন’। এই কারণও ভদ্দালি, তখন তুমি বুঝিতে পার নাই।”
“ভন্তে,… অজ্ঞজনোচিত আমার অপরাধ ভবিষ্যৎ সংবরের জন্য ক্ষমা করুন।”
১৩৬. “তাহা কী মনে করো, ভদ্দালি, এখানে কোনো ভিক্ষু উভতো-ভাগ বিমুক্ত (অর্হৎ) ও হয়, তাহাকে আমি বলি যে, ‘এসো, ভিক্ষু, তুমি পঙ্কে সংক্রম (সেতু) হও।’ সে সেতু না হইতে বা অন্যদিকে শরীর বঙ্ক করিতে কিংবা ‘না’ বলিতে পারিবে কি?”
“কখনোই না, ভন্তে,”
“তবে কী মনে করো, ভদ্দালি, এখানে কোনো ভিক্ষু প্রজ্ঞাবিমুক্তি…। কায়সাক্ষী…, দৃষ্টিপ্রাপ্ত…। শ্রদ্ধাবিমুক্ত…, ধর্মানুসারী…, শ্রদ্ধানুসারী… হয়; সে ‘না’ বলিতে পারে কি?”
“না, ভন্তে,”
“তাহা কী মনে করো, ভদ্দালি, সেই সময় তুমি উভতো-ভাগবিমুক্ত প্রজ্ঞাবিমুক্ত…, অথবা শ্রদ্ধানুসারী ছিলে কি?”
“না, ভন্তে, তাহা ছিলাম না।”
“ভদ্দালি, সেই সময় তুমি রিক্ত, তুচ্ছ। সুতরাং অপরাধী নহে কি?”
“হ্যাঁ, ভন্তে,… ভবিষ্যৎ সংবরের নিমিত্ত আমার অপরাধ ক্ষমা করুন।”
“ভালো কথা, ভদ্দালি,… যেহেতু তুমি অপরাধকে অপরাধ হিসেবে দেখিয়া ধর্মানুসারে প্রতিকার করিতেছ। সে কারণে আমরা তোমাকে ক্ষমা করিলাম। ভদ্দালি, যিনি (স্বীয়) অপরাধকে অপরাধ হিসেবে দেখিয়া যথাধর্ম প্রতিকার করেন, ভবিষ্যতে সংযম অবলম্বন করেন; আর্যবিনয়ে ইহাই তাঁহার পক্ষে অভিবৃদ্ধি।”
১৩৭. “ভদ্দালি, এখানে কোনো ভিক্ষু শাস্তার শাসনে শিক্ষার পরিপূর্ণকারী নহে, তাহার এই চিন্তা হয় : ‘বেশ, আমি নির্জন শয্যাসন আশ্রয় করি-অরণ্য, বৃক্ষমূল, পর্বত, কন্দর, গিরিগুহা, শ্মশান, বনপন্থ, খোলাস্থান কিংবা পলাল (তৃণ) পুঞ্জ; নিশ্চয় আমি মনুষ্যোত্তর ধর্ম, উত্তম আর্য-জ্ঞানদর্শন (লোকোত্তরমার্গ) বিশেষ প্রত্যক্ষ করিব।’ সে নির্জন শয্যাসন আশ্রয় করে-অরণ্য…। তথা পৃথক অবস্থানকারীকে শাস্তাও নিন্দা করেন, বিজ্ঞ সব্রহ্মচারীগণও বিচার করিয়া নিন্দা করেন, দেবতারাও অপবাদ করেন, সে নিজেও নিজকে ধিক্কার দেয়। সে শাস্তা, বিজ্ঞ-সব্রহ্মচারী, দেবতা ও নিজ দ্বারা নিন্দিত ও ধিকৃত হইয়া মনুষ্যধর্ম উত্তরিতর (মানব স্বভাবের উপরে) উত্তম আর্য-জ্ঞানদর্শন বিশেষ প্রত্যক্ষ করিতে পারে না। ইহার কারণ কী? ভদ্দালি, শাস্তার শাসনে শিক্ষার পরিপূর্ণ পালনকারী না হইলে তাহার পক্ষে এইরূপই হইয়া থাকে।”
১৩৮. “কিন্তু ভদ্দালি, কোন ভিক্ষু শাস্তার উপদেশে শিক্ষার পূর্ণ পালনকারী হন, তাঁহার এই চিন্তা হয় : ‘ভালো, আমি নির্জন শয্যাসন আশ্রয় গ্রহণ করিব…। এই নির্জন শয্যাসন সেবনকারীকে শাস্তাও অপবাদ করেন না,… উত্তম আর্য-জ্ঞানদর্শন বিশেষ তিনি প্রত্যক্ষ করেন। তিনি কাম হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া, অকুশল ধর্ম হইতে পৃথক হইয়া সবিতর্ক-সবিচার বিবেকজ প্রীতি-সুখ সমন্বিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া বাস করেন। ইহার কারণ কী? ভদ্দালি, যিনি শাস্তার উপদেশে শিক্ষার পূর্ণরূপে পালনকারী হন, তাঁহার এইরূপ হইয়াই থাকে।”
১৩৯. “পুনঃ ভদ্দালি, সে ভিক্ষু বিতর্ক-বিচারের উপশম করিয়া দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করেন। পুনঃ ভদ্দালি, সে ভিক্ষু প্রীতির বিরাগ-হেতু উপেক্ষক হইয়া বাস করেন, আর স্মৃতিমান ও সংপ্রজ্ঞাত হইয়া মানসিক সুখানুভব করেন, যাহাকে আর্যগণ উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী বলেন সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বাস করেন।”
“পুনরায় ভদ্দালি, সে ভিক্ষু সুখ-দুঃখের প্রহান-হেতু পূর্বেই সৌমনস্য ও দৌর্মনস্যের অস্তগমন-হেতু সুখ-দুঃখাতীত উপেক্ষা স্মৃতি-পরিশুদ্ধি নামক চতুর্থ ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া অবস্থান করেন।…।”
“তিনি এইরূপে সমাহিত চিত্তে পূর্বনিবাস অনুস্মরণ করেন। তিনি এইরূপে সমাহিত চিত্তে দিব্যচক্ষু দ্বারা সত্ত্বগণের চ্যুতি-উৎপত্তি দর্শন করেন। তিনি এইরূপে সমাহিত চিত্তে আসবসমূহের ক্ষয়ের নিমিত্ত চিত্ত, অভিনমিত করেন।…। এখন ইহার নিমিত্ত কিছু অবশিষ্ট নাই, জানিতে পারেন। তাহার কারণ কী? ভদ্দালি, শাস্তার শাসনে শিক্ষার পূর্ণ পালনকারী এই প্রকারই হইয়া থাকে।”
১৪০. ইহা উক্ত হইলে আয়ুষ্মান ভদ্দালি ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, ইহার হেতু কী? প্রত্যয় কী? যাহাতে এখানে কোনো কোনো ভিক্ষুকে বার বার নিগ্রহ করিয়া শিক্ষা দিতে হয়? আবার, ভন্তে, কী হেতু? কী প্রত্যয়? যদ্বারা এখানে কোনো কোনো ভিক্ষুকে তদ্রূপ বার বার নিগ্রহ করিয়া শিক্ষা দিতে হয় না?”
“ভদ্দালি, এখানে কোনো কোনো ভিক্ষু নিরন্তর আপত্তি (অপরাধ) করে এবং আপত্তিবহুল হয়। সে ভিক্ষুদের দ্বারা উপদিষ্ট হইলে এক কথা দ্বারা অন্য কথা চাপা দেয়; আলোচ্য বিষয়কে প্রসঙ্গের বাহিরে অপসারিত করে, কোপ, দ্বেষ ও অপ্রত্যয় (অবিশ্বাস) প্রকট করে, (বুদ্ধ উপদেশ) ঠিকভাবে পালন করে না, অনুলোম ব্রত আচরণ করে না, অপরাধ হইতে নিস্তার বা মুক্তি চায় না, যাহাতে সংঘ সন্তুষ্ট হয় ‘তাহা আমি করি’ ইহা বলে না। ইহাতে, ভদ্দালি, ভিক্ষুদের এই চিন্তা হয় : ‘আবুসো, এই ভিক্ষু নিরন্তর আপত্তিকারী ও আপত্তিবহুল হয়। সে ভিক্ষুদের দ্বারা উপদিষ্ট হইলে… ‘তাহা আমি করি’ বলে না। সাধু, বন্ধুগণ, এই ভিক্ষুকে সেইভাবেই উপপরীক্ষা (বিচার) করুন, যেন তাহার এই অধিকরণ শীঘ্র উপশম না হয়।’ ভদ্দালি, ভিক্ষুগণ তদ্রূপই উপপরীক্ষা করেন ও দীর্ঘসূত্রী হন, যাহাতে তাহার এই অধিকরণ সত্ত্বর উপশম না হয়।”
১৪১. “এখানে ভদ্দালি, কোনো ভিক্ষু নিরন্তর আপত্তি করে ও আপত্তিবহুল হয়। (কিন্তু) সে ভিক্ষুদের দ্বারা কথিত হইলে কথায় কথা চাপা দেয় না।…। যাহাতে সংঘ সন্তুষ্ট হয় ‘আমি তাহা করিব’ বলিয়া থাকে।…। ভদ্দালি, ভিক্ষুগণ তদ্রূপ উপপরীক্ষা করে, যাহাতে তাহার অধিকরণ সত্ত্বর উপশম হয়।”
১৪২. “ভদ্দালি, কোনো ভিক্ষু কদাচিৎ আপত্তি করে, আপত্তিবহুল হয় না। ভিক্ষুদের দ্বারা কথিত হইলে সে অন্যথা ভাষণ করে।…। তাহার এই অধিকরণ সত্ত্বর উপশম হয় না।”
১৪৩. “ভদ্দালি, এখানে কোনো ভিক্ষু কদাচিৎ আপত্তি করে, অনাপত্তিবহুল হয়। সে ভিক্ষু দ্বারা কথিত হইলে অন্যথা আচরণ করে না, বহির্দিকে কথা অপসারিত করে না, কোপ, দ্বেষ ও অপ্রত্যয় প্রকাশ করে না।…। তাহার সে অধিকরণ সত্ত্বর মীমাংসা হয়।”
১৪৪. “ভদ্দালি, এখানে কোনো ভিক্ষু আচার্য ও উপাধ্যায়ের প্রতি কেবল শ্রদ্ধা ও প্রেমবশত যাপন করে। এই ক্ষেত্রে ভিক্ষুদের এ ধারণা জন্মে-বন্ধুগণ, এই ভিক্ষু সামান্য শ্রদ্ধা ও প্রেমবশে যাপন করে। যদি আমরা এই ভিক্ষুকে বার বার নিগ্রহ করিয়া শিক্ষাদান করি তবে তাহার যেই শ্রদ্ধা ও প্রেমমাত্র আছে তাহা হইতে সে পরিহীণ হইতেও পারে, তাহা না হউক।’ যেমন ভদ্দালি, কোনো পুরুষের এক চক্ষুমাত্র আছে, তাহার মিত্র-অমাত্য ও জ্ঞাতি-সলোহিতগণ তাহার একমাত্র চক্ষুকে রক্ষা করে, ‘যেই একমাত্র চক্ষু আছে, তাহার সেই চক্ষু বিনষ্ট না হউক।’ সেইরূপ ভদ্দালি, কোনো ভিক্ষু শ্রদ্ধা ও প্রেমমাত্রে যাপন করে।…। উহাও তাহার কোনো প্রকারে নষ্ট না হউক।”
“ভদ্দালি, ইহাই হেতু, ইহাই প্রত্যয় যাহাতে কোনো কোনো ভিক্ষুকে বার বার নিগ্রহ করিয়া কারণ দেখাইতে হয়। আর ভদ্দালি, ইহাও হেতু, ইহাও প্রত্যয় যাহাতে কোনো কোনো ভিক্ষুকে বার বার নিগ্রহ করিয়া কারণ প্রদর্শন করিতে হয় না।”
১৪৫. “ভন্তে, ইহার হেতু ও প্রত্যয় কী যে পূর্বে শিক্ষাপদসমূহ স্বল্পসংখ্যক ছিল, অথচ বহুসংখ্যক ভিক্ষু অর্হত্ত্বে (অঞ্ঞায়) প্রতিষ্ঠিত ছিলেন? ভন্তে, ইহারই বা হেতু ও প্রত্যয় কী? বর্তমানে বহুসংখ্যক শিক্ষাপদ, তথাপি স্বল্পসংখ্যক ভিক্ষু অর্হত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হইতেছেন?”
“ভদ্দালি, এইরূপই হইয়া থাকে, যখন সত্ত্বগণ প্রতিপত্তি (আচার) হীন হয়, তখন প্রতিবেধমূলক সদ্ধর্মেরও অন্তর্ধান ঘটে। এমতাবস্থায় শিক্ষাপদ বহুসংখ্যক হইলেও স্বল্পসংখ্যক ভিক্ষু অর্হত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভদ্দালি, শাস্তা (গুরু) ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রাবকগণের নিমিত্ত শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপ্ত (বিধান) করেন না যতক্ষণ এখানে সংঘের মধ্যে কোনো আসবস্থানীয় ধর্ম প্রাদুর্ভূত না হয়। যে সময় হইতে ভদ্দালি, সংঘে আসবস্থানীয় আচার প্রকটিত হয়, তখন সেই আসবস্থানীয় ধর্মের নিবারণার্থ শাস্তা শ্রাবকদের জন্য শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপ্ত করেন।”
“ভদ্দালি, ততদিন পর্যন্ত কোনো আসবস্থানীয় ধর্ম সংঘমধ্যে প্রকটিত হয় না যতদিন সংঘ মহত্ব (সংখ্যাধিক্য) প্রাপ্ত হয় না। যখন সংঘ মহত্ব প্রাপ্ত হয়, তখন সংঘে আসবস্থানীয় ধর্ম উৎপন্ন হয়। অতঃপর শাস্তা সেই আসবস্থানীয় ধর্মসমূহের নিবারণার্থ শ্রাবকদের নিমিত্ত শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপ্ত করেন। ভদ্দালি, ততদিন সংঘে কোনো আসবস্থানীয় ধর্ম প্রকটিত হয় না, যতদিন সংঘ লাভাগ্র প্রাপ্ত না হয়,… যশাগ্র্র প্রাপ্ত না হয়, বহুশ্রুতত্ব প্রাপ্ত না হয়, রাত্রজ্ঞভাব (চিরকাল অবস্থিতি) প্রাপ্ত না হয়,…। ভদ্দালি, যখন সংঘ রাত্রজ্ঞভাব প্রাপ্ত হয় তখন সংঘে আসবস্থানীয় ধর্ম উৎপন্ন হয়, তখন শাস্তা আসবস্থানীয় ধর্ম নিবারণার্থ শ্রাবকগণের জন্য শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপ্ত করেন।”
১৪৬. “ভদ্দালি, তোমরা সেই সময় অল্পসংখ্যক (ভিক্ষু) উপস্থিত ছিলে যখন আমি তোমাদিগকে আজানীয় শিশূপম (উত্তম জাতীয় তরুণাশ্বোপম) ধর্মপর্যায় (সূত্র) উপদেশ দিয়াছিলাম।”
“ভদ্দালি, তোমার স্মরণ আছে কি?”
“না, ভন্তে,”
“ভদ্দালি, এই বিস্মৃতির কারণ কী বিশ্বাস করো?”
“ভন্তে, দীর্ঘকাল আমি শাস্তার শাসনে শিক্ষার পূর্ণকারী ছিলাম না।”
“ভদ্দালি, শুধু ইহাই হেতু, ইহাই একমাত্র প্রত্যয় নহে। অথচ ভদ্দালি, দীর্ঘকাল হইতে আমি চিত্ত দ্বারা তোমার চিত্তভাব বিচার করিয়া অবগত হইয়াছি, এই মোঘপুরুষ আমার ধর্মোপদেশের সময় স্থিরভাবে মনোনিবেশ করিয়া, সরুচিত্ত একাগ্র করিয়া অভহিতশ্রোত্রে ধর্ম শ্রবণ করে না। তথাপি ভদ্দালি, তোমাকে আমি আজানীয় তরুণাশ্ব-উপম ধর্মপর্যায় উপদেশ করিব। তাহা শুনো, উত্তমরূপে মনে রাখো, বর্ণনা করিব।”
“হ্যাঁ, ভন্তে,” আয়ুষ্মান ভদ্দালি ভগবানকে প্রতিশ্রুতি দিলেন।
১৪৭. ভগবান ইহা বলিলেন, “যেমন ভদ্দালি, দক্ষ অশ্বচালক ভদ্র আজানীয়াশ্ব লাভ করিয়া (১) প্রথমেই মুখাধানে (বণ্ডা বন্ধানাদি) কারণ শিক্ষা দেয়। প্রথমত তাহার মুখাধানে শিক্ষা দিবার জন্য অকৃতপূর্ব সেই কারণ করিবার সময় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, উল্লম্ফনাদি উপদ্রব করিয়া থাকে; নিরন্তর ও ক্রমান্বয়ে শিক্ষার ফলে সেই বিষয়ে সে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়। (২) ভদ্দালি, নিরন্তর ও ক্রমশ শিক্ষা দ্বারা সেই ভদ্র আজানীয়াশ্ব সেই স্থানে যখন উপশান্ত হয়, তখন অশ্বচালক তৎপরবর্তী যুগাধানে (যুগধারণে) শিক্ষা দেয়। অকৃতপূর্ব শিক্ষা প্রথম শিখিবার সময়…। (৩)… যখন উহা শিক্ষাপ্রাপ্ত হয় তখন অশ্বচালক তৎপরবর্তী শিক্ষা হিসেবে ক্রমান্বয়ে মণ্ডল (৪) খুরকাস (৫) ধাবন (৬) রবত্ব (৭) রাজগুণ (৮) রাজবংশ (৯) উত্তম জব (গতি), উত্তম হয় (অশ্ব) উত্তম সাখল্য শিক্ষা দেয়। শিক্ষা করিবার সময়… তথায় শান্ত ও শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়। তাহাকে অশ্বচালক তৎপরবর্তী (১০) বর্ণিয় ও বলিয় গতিতে প্রবেশ করায়। ভদ্দালি, এই দশবিধ অঙ্গসমন্বিত ভদ্র অশ্বাজানীয় রাজার যোগ্য ও রাজভোগ্য হয়। উহাকে রাজার অঙ্গই বলা যায়। সেইরূপ ভদ্দালি, দশবিধ গুণ সমন্ত্বিত ভিক্ষু আহ্বানীয়, পাহুনীয় (প্রাহ্বানীয়), দাক্ষিণেয়্য, অঞ্জলিকরণীয় এবং লোকের অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র নামে অভিহিত। সেই দশগুণ কী কী? ভদ্দালি, এখানে ভিক্ষু অশৈক্ষ্য (শিক্ষা সমাপ্ত) সম্যক দৃষ্টি দ্বারা যুক্ত হয়, অশৈক্ষ্য সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক ব্যায়াম (চেষ্টা), সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি, সম্যক জ্ঞান ও সম্যক বিমুক্তিসমন্বিত হয়। ভদ্দালি, এই দশবিধ গুণযুক্ত ভিক্ষু… জগতের অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র হয়।”
ভগবান ইহা বলিলেন। আয়ুষ্মান ভদ্দালি ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করিলেন।
ভদ্দালি সূত্র সমাপ্ত।।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ