লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [৩০]

দীঘনখ সূত্র

২০১. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান রাজগৃহে গৃধ্রকূট পর্বতের উপর শূকর খতায় (খণিত-গুহায়) বাস করিতেছেন। তখন দীঘনখ পরিব্রাজক যেখানে ভগবান ছিলেন তথায় গেলেন, গিয়া ভগবানের সাথে সম্মোদন করিলেন, সম্মোদন ও স্মরণীয় কর্তব্য সমাপ্ত করিয়া একপ্রান্তে দাঁড়াইলেন, একপ্রান্তে স্থিত দীঘনখ পরিব্রাজক ভগবানকে ইহা বলিলেন, “ভো গৌতম, আমি এই দৃষ্টিসম্পন্ন ও এই মতবাদী হই্ত : ‘সর্ববিধ (পুনর্বৎপত্তি) আমার পছন্দ বা মনোনীত নহে।’”

“অগ্গিবেশ্মন, এই যে তোমার দৃষ্টি ‘সর্ব আমার মনোনীত নহে’, তোমার এই দৃষ্টিও কি অমনোনীত?”

“ভো গৌতম, যদি এই দৃষ্টি আমার পছন্দ হয়, তবে তাহাও তাদৃশ হইবে-তাহাও হইবে তথৈবচ।”

“এই কারণেই, অগ্গিবেশ্মন, জগতে ইহাদের (মত ত্যাগী) অপেক্ষা তাহাদের সংখ্যাই বহু হইতে বহুতর হয়, যাহারা এরূপ বলে : ‘তাহাও তদ্রূপ হইবে, তাহাও হইবে তথৈবচ।’ কিন্তু তাহারা সেই পূর্বদৃষ্টিও ত্যাগ করে না, বরং অপর নূতন মতবাদও গ্রহণ করিয়া বসে। অগ্গিবেশ্মন, ইহাদের (অত্যাগী) অপেক্ষা এরূপ লোকেরাই জগতে অল্প হইতে স্বল্পতর; যাহারা বলে, ‘তাহাও তাদৃশই হয়, তাহাও হয় তথৈবচ।’ কিন্তু তাহারা সেই মূলদৃষ্টিও ত্যাগ করে না এবং অন্য নবদৃষ্টিও গ্রহণ করে না। অগ্গিবেশ্মন, কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এই মতবাদী ও এই দৃষ্টিসম্পন্ন, (১) ‘সর্ব আমার পছন্দ হয়।’… কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ… দৃষ্টিসম্পন্ন আছে, যাহারা বলে (২) ‘সমস্ত আমার পছন্দ নহে।’ অগ্গিবেশ্মন, কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এই মতবাদী ও এই দৃষ্টিসম্পন্ন আছে। (৩) ‘কিছু আমার পছন্দ আর কিছু অপছন্দ।’”

“অগ্গিবেশ্মন, তথায় যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এই মতবাদী ও এই দৃষ্টিসম্পন্ন ‘সর্বমত আমার পছন্দ হয়’ তাহাদের এই দৃষ্টি (ধর্ম-বিশ্বাস) সরাগাবস্থার (রাগবশে সংসারাবর্তে অনুরক্ত হইবার) সমীপে, সংযোগের সমীপে, অভিনন্দনের সমীপে, অধ্যবসান বা প্রার্থনার সমীপে, উপাদান বা দৃঢ়-গ্রহণের সমীপে অগ্রসর হয়। তাহাতে অগ্গিবেশ্মন, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ… এই দৃষ্টি মান্য করে, ‘সর্বমত আমার মনঃপূত নহে,’ তাহাদের এই দৃষ্টি অ-সরাগ, অসংযোগ, অনভিনন্দন, অনধ্যবসান ও অনুপাদানের সমীপবর্তী হয়।”

২০২. এইরূপ উক্ত হইলে দীঘনখ পরিব্রাজক ভগবানকে বলিলেন, “মাননীয় গৌতম আমার দৃষ্টিকে (মতবাদকে) উৎকর্ষণ (প্রশংসা) ও সমুৎকর্ষণ করিতেছেন।”

“অগ্গিবেশ্মন, তাহাতে যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছে এরূপবাদী ও দৃষ্টিসম্পন্ন ‘সমস্ত আমার পছন্দ হয়।’ এ সম্বন্ধে বিজ্ঞ-পুরুষ এই প্রকার বিচার করেন, এই যে আমার দৃষ্টি ‘সমস্ত আমার পছন্দ হয়’, এই দৃষ্টিকে যদি আমি শক্তভাবে পরামর্ষণ করিয়া (জড়িত হইয়া) আগ্রহ সহকারে ব্যবহার করি, ‘ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা’, তবে দুই মতবাদীর সহিত আমার বিগ্রহ (কলহ) হইবে-(১) যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এই মতবাদী ও দৃষ্টিসম্পন্ন ‘সমস্ত আমার পছন্দ নহে।’ আর (২) যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এই মতবাদী ও দৃষ্টিসম্পন্ন ‘একাংশ আমার পছন্দ, একাংশ অপছন্দ হয়।’ এই দুইজনের সাথে আমার বিগ্রহ হইবে। বিগ্রহ হইলে বিবাদ হইবে, বিবাদ হইলে বিঘাত (মনকষ্ট) হইবে, বিঘাত হইলে বিদ্বেষ হইবে। এই কারণে সে নিজের মধ্যে বিগ্রহ, বিবাদ, বিঘাত ও বিদ্বেষের সম্ভাবনা দর্শন করিয়া সেই প্রাক্তন দৃষ্টিকেই পরিত্যাগ করে এবং অন্য নূতন দৃষ্টিও গ্রহণ করে না। এ প্রকারে এই সকল দৃষ্টির পরিত্যাগ হয়।”

২০৩. “অগ্গিবেশ্মন, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ… দৃষ্টিসম্পন্ন ‘সমস্ত আমার মনঃপূত নহে’, তৎসম্বন্ধে বিজ্ঞব্যক্তি এরূপ বিচার করেন, এই যে আমার দৃষ্টি, ‘আমার সমস্ত পছন্দ নহে’, যদি আমি সাগ্রহে এই দৃষ্টি ব্যবহার করি, তবে দুইজনের সাথে আমার বিগ্রহ হইবে-(১) যে এই দৃষ্টি মানে, ‘আমার সমস্ত পছন্দ হয়’, তাহার সহিত; (২) আর যে এই দৃষ্টি মানে, ‘আমার কিছু পছন্দ, কিছু অপছন্দ হয়, তাহার সাথে এই দুইজনের সাথে আমার বিগ্রহ হইবে…। এ প্রকারে এই সকল দৃষ্টির পরিত্যাগ হয়।”

২০৪. “অগ্গিবেশ্মন, এই বিষয়ে যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ… এই দৃষ্টি মান্য করে-আমার কিছু পছন্দ, কিছু অপছন্দ।’ এসম্বন্ধে বিজ্ঞব্যক্তি এই বিবেচনা করেন, এই যে আমার দৃষ্টি ‘আমার কিছু পছন্দ, কিছু অপছন্দ…। তবে দুইজনের সাথে আমার বিগ্রহ হইবে-(১)… ‘আমার সমস্ত পছন্দ হয়’, আর (২)… ‘আমার সমস্ত পছন্দ নহে।’ এই দুইজনের সাথে আমার বিগ্রহ হইবে…। এই প্রকারে এ সকল দৃষ্টির পরিত্যাগ হয়।”

২০৫. “অগ্গিবেশ্মন, এই দেহ রূপীয় (জড়) চারি মহাভূতময়, মাতৃপিতৃসম্ভূত (মাতাপিতা হইতে উৎপন্ন), অন্ন-ব্যঞ্জন বর্ধিত, অনিত্য-উৎসাদন (বিনাশন)-ভেদন-বিধ্বংসন স্বভাব; ইহাকে অনিত্যভাবে দুঃখ, রোগ, গণ্ড, শল্য, অঘ (পাপ), ব্যাধি, পরকীয়, শূন্য ও অনাত্মভাবে সন্দর্শন করা উচিত। এই দেহকে অনিত্যভাবে… ও অনাত্মভাবে সন্দর্শনকারী ব্যক্তির দেহের প্রতি যে দেহানুরাগ, দৈহিক স্নেহ, দেহান্বয়তা (সম্বন্ধভাব) তাহা প্রহীন হয়।”

“অগ্গিবেশ্মন, এই ত্রিবিধ বেদনা (অনুভূতি) : (১) সুখ-বেদনা, (২) দুঃখ-বেদনা ও (৩) অদুঃখ-অসুখ বেদনা। অগ্গিবেশ্মন, যখন জীবের সুখ-বেদনা অনুভূত হয় তখন দুঃখ-বেদনা ও অদুঃখ-অসুখ বেদনা অনুভূত হয় না। সেই সময় কেবল সুখ-বেদনাই অনুভূত হইয়া থাকে। অগ্গিবেশ্মন, (জীব) যে সময় দুঃখ-বেদনা অনুভব করে…। যে সময় অদুঃখ-অসুখ বেদনা অনুভব করে, সে সময় তাহার অপর (দুই) বেদনা অনুভূত হয় না। সুতরাং অগ্গিবেশ্মন, সুখ-বেদনাও অনিত্য, সংস্কৃত, প্রতীত্য-সমুৎপন্ন (কারণ-জাত), ক্ষয়ধর্মী, ব্যয়ধর্মী বিরাগধর্মী, নিরোধধর্মী হয়। দুঃখ-বেদনা এবং অদুঃখ-অসুখ বেদনাও তদ্রূপ অনিত্য… ও নিরোধধর্মী হয়।”

“অগ্গিবেশ্মন, এ প্রকারে দর্শন করিয়া শ্রুতবান আর্যশ্রাবক সুখ-বেদনার প্রতিও নির্বেদ প্রাপ্ত (উদাসীন) হয়, দুঃখ-বেদনার প্রতিও…। অদুঃখ-অসুখ বেদনার প্রতিও নির্বেদ প্রাপ্ত হয়। নির্বেদ প্রাপ্ত হইয়া বিরক্ত হয়, বিরাগ-হেতু বিমুক্ত হয়, বিমুক্ত হইলে (আমি) ‘বিমুক্ত’ এই জ্ঞানোদয় হয়, জন্মক্ষয় হয়, ব্রহ্মচর্য পূর্ণ হয়, করণীয় কৃত হয়, এখন ইহার (মুক্তির) নিমিত্ত অপর কর্তব্য নাই জানিতে পারে। অগ্গিবেশ্মন, এ প্রকারে বিমুক্তচিত্ত ভিক্ষু কাহারও সহিত সংবাদ করে না, কাহারও সহিত বিবাদ করে না; জগতে যাহা কথিত হয়, অপরামর্ষ (নিরাসক্ত) ভাবে শুধু তদ্বারাই সে ভিক্ষু ব্যবহার করে।”

২০৬. সেই সময় আয়ুষ্মান সারিপুত্র ভগবানকে পাখা করিতে করিতে ভগবানের পশ্চাতে স্থিত ছিলেন। তখন আয়ুষ্মান সারিপুত্রের ইহা মনে হইল : ‘ভগবান আমাদিগকে অভিজ্ঞা দ্বারা সেই সেই (আসব) ধর্মের ত্যাগ বলিলেন, সুগত আমাদিগকে অভিজ্ঞা দ্বারা জ্ঞাত হইয়া সেই সেই আসব ধর্মের প্রহান বলিলেন।’ এ প্রকারে ইহা প্রত্যবেক্ষণ করিতে করিতে আয়ুষ্মান সারিপুত্রের চিত্ত উপাদানহীন (অনুৎপাদ নিরোধে নিরুদ্ধ) হইয়া আসবরাশি হইতে মুক্ত হইল। আর তথায় দীঘনখ পরিব্রাজকের বিরজ, বিমল ধর্মচক্ষু (স্রোতাপত্তি জ্ঞান) উৎপন্ন হইল : ‘যাহা কিছু সমুদয় ধর্ম, তৎসমস্ত নিরোধ স্বভাব হয়’।

অতঃপর দীঘনখ পরিব্রাজক দৃষ্ট-ধর্ম, প্রাপ্ত-ধর্ম, বিদিত-ধর্ম, অবগাহিত ধর্ম, উত্তীর্ণ-সংশয়, বিগত-সন্দেহ, বৈশারদ্য-প্রাপ্ত, শাস্তার শাসনে পর-প্রত্যয়হীন (প্রত্যক্ষদর্শী) হইয়া ভগবানকে ইহা বলিলেন, “আশ্চর্য, ভো গৌতম, অতি চমৎকার, ভো গৌতম, যেমন হে গৌতম, অধঃমুখকে ঊর্ধ্বমুখ করে… চক্ষুষ্মানেরা রূপ দর্শনের নিমিত্ত তৈলপ্রদীপ ধারণ করে, সেইরূপ মাননীয় গৌতম দ্বারা অনেক পর্যায়ে ধর্ম প্রকাশিত হইয়াছে। আমি মাননীয় গৌতমের শরণ গ্রহণ করিতেছি, ধর্মেরও সংঘেরও…। আজ হইতে মাননীয় গৌতম আমাকে আজীবন শরণাগত উপাসকরূপে ধারণা করুন।”

দীঘনখ সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]