২০৭. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান কুরুজনপদের কম্মাস্সদম্ম নামক কুরুবাসীদের নগরে ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণের অগ্নি-আগারে (যজ্ঞশালায়) তৃণ বিছানায় বিহার করিতেছেন।
তখন ভগবান পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিধান করিয়া পাত্র-চীবর লইয়া কম্মাস্সদম্মে (কল্মাষদম্মে) ভিক্ষার নিমিত্ত প্রবেশ করিলেন। কম্মাস্সদম্মে পিণ্ডাচরণ করিয়া ভোজনের পর ভিক্ষা হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া দিবাবিহারের নিমিত্ত তিনি যেখানে অন্যতর বনগহন তথায় উপস্থিত হইলেন। সেই গভীর বনে প্রবিষ্ট হইয়া এক বৃক্ষমূলে দিবাবিহারে উপবেশন করিলেন।
তখন মাগন্দিয় পরিব্রাজক জংঘা বিহার বা পদব্রজে ভ্রমণ ও বিচরণ (পরিক্রমা) করিতে করিতে ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণের যজ্ঞশালায় উপনীত হইলেন। মাগন্দিয় পরিব্রাজক ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণের যজ্ঞশালায় তৃণ বিছানা প্রজ্ঞাপ্ত দেখিলেন, দেখিয়া ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণকে বলিলেন, “মাননীয় ভারদ্বাজের অগ্নিশালায় কাহার তৃণ-আসন সজ্জিত আছে, শ্রমণযোগ্য শয্যাই মনে হইতেছে?”
“ভো মাগন্দিয়, শাক্যপুত্র, শাক্যকুল হইতে প্রব্রজিত শ্রমণ-গৌতম আছেন, সেই ভগবান গৌতমের এরূপ কল্যাণ-কীর্তি শব্দ উদ্গত হইয়াছে : ‘সেই ভগবান এই কারণে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ, দম্য পুরুষ দমনে অনুত্তর সারথি, দেব-মনুষ্যদের শাস্তা, বুদ্ধ ও ভগবান হন’, সেই মাননীয় গৌতমের শয্যাই সজ্জিত আছে।”
“ভো ভারদ্বাজ, আমরা দুদৃশ্য দর্শন করিলাম, যেহেতু আমরা সেই ভূণহুর (অপুষ্ট ইন্দ্রিয়ের) শয্যা দেখিলাম।”
“মাগন্দিয়, এই কথা রাখিয়া দাও, মাগন্দিয়, এই বাক্য সংযত করো। সেই মাননীয় গৌতমের প্রতি বহু সংখ্যক ক্ষত্রিয় পণ্ডিত, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, গৃহপতি পণ্ডিত ও শ্রমণ পণ্ডিত সুপ্রসন্ন এবং আর্য (পরিশুদ্ধ) ন্যায় কুশল (নির্দোষ) ধর্মে বিনীত হইয়াছেন।”
“ভো ভারদ্বাজ, যদি আমরা সেই মাননীয় গৌতমকে সম্মুখে দেখি, তবে সম্মুখেও তাঁহাকে বলিতাম, ‘শ্রমণ গৌতম ভূণহু’। ইহার কারণ কী? যেহেতু আমাদের সূত্রে (বেদে) এইরূপই আসিয়াছে।”
“যদি মাননীয় মাগন্দিয়ের গুরুভার মনে না হয় তবে আমরা শ্রমণ গৌতমকে ইহা বলিতে পারি।”
“ভারদ্বাজ, নিরুদ্বেগ চিত্তে আপনি তাঁহাকে আমার কথাই বলিতে পারেন।”
২০৮. ভগবান মনুষ্যাতীত, বিশুদ্ধ, দিব্যকর্ণ দ্বারা মাগন্দিয় পরিব্রাজকের সহিত ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণের এই বাক্যালাপ শুনিতে পাইলেন। তখন ভগবান সায়ংকালীন ফল সমাপত্তি হইতে উঠিয়া যেখানে ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণের অগ্নিশালা তথায় উপনীত হইলেন, উপস্থিত হইয়া আস্তৃত তৃণ শয্যাতেই বসিলেন। তখন ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণ ভগবান সমীপে উপস্থিত হইলেন, ভগবানের সহিত সম্মোদন করিলেন, সম্মোদনীয় কথা শেষ করিয়া একান্তে বসিলেন; একান্তে উপবিষ্ট ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণকে ভগবান বলিলেন, “ভারদ্বাজ, এই তৃণ-আসন সম্বন্ধে তোমার ও মাগন্দিয় পরিব্রাজকের মধ্যে কোনো বাক্যালাপ হইয়াছে?”
এরূপ উক্ত হইলে ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণ সংবিগ্ন (প্রীতি-উৎফুল্ল) লোমহর্ষ হইয়া ভগবানকে বলিলেন, “ইহাই আমরা মাননীয় গৌতমকে বলিতে ইচ্ছুক, অথচ মাননীয় গৌতম ইহাই অনাখ্যান করিলেন, বলিতে দিলেন না।”
২০৯. ভারদ্বাজগোত্র ব্রাহ্মণের সহিত ভগবানের এই কথাই চলিতেছিল। তখন মাগন্দিয় পরিব্রাজক পদব্রজে ভ্রমণ ও বিচরণ করিতে করিতে যথায় ভারদ্বাজের অগ্নিশালা এবং ভগবান আছেন তথায় পৌঁছিলেন, পৌঁছিয়া ভগবানের সহিত প্রীতি-সম্মোদন ও স্মরণীয় কথা শেষ করিয়া একান্তে বসিলেন, একান্তে উপবিষ্ট মাগন্দিয় পরিব্রাজককে ভগবান বলিলেন, “মাগন্দিয়, চক্ষু রূপারাম, (রূপ ইহার আরাম বা বাসস্থান) রূপে রত, রূপ-সম্মোদিত হয়, তথাগতের সে চক্ষু দান্ত, গুপ্ত, রক্ষিত, সংবৃত এবং সংযমের নিমিত্ত তিনি ধর্মদেশনা করেন। মাগন্দিয়, এই উদ্দেশ্যে তুমি বলিয়াছ নহে কি শ্রমণ গৌতম ভূণহু হন?”
“ভো গৌতম, এই উদ্দেশ্যেই আমাকর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে : ‘শ্রমণ গৌতম ভূণহু হন। তাহার কারণ আমাদের সূত্রে এরূপই আসিয়াছে।”
“মাগন্দিয়, শ্রোত্র শব্দারাম…। ঘ্রাণ গন্ধারাম…। জিহ্বা রসারাম…। কায়া স্পৃষ্টব্যারাম…। মন ধর্মারাম…।”
২১০. “তাহা কী মনে করো, মাগন্দিয়, এক্ষেত্রে কোনো (পুরুষ) পূর্বে চক্ষু-বিজ্ঞেয় ইষ্ট, কান্ত, মনোরম, প্রিয়-স্বভাব, কাম-সংযুক্ত ও রমণীয় রূপের দ্বারা অভিরমিত হইয়াছে; সে অপর সময়ে সেই রূপেরই সমুদয় অস্তগমন, আস্বাদ, আদীনব (দৈন্য) ও নিঃসরণ (নির্গমনোপায়) যথাভূত অবগত হইয়া, রূপ তৃষ্ণা প্রহান করিয়া, রূপ-পরিদাহ বিনোদন করিয়া, বিগত-পিপাসা ও আধ্যাত্মিক উপশান্ত চিত্ত হইয়া বাস করে। তাহার সম্বন্ধে তোমার কি বক্তব্য আছে?”
“কিছু নাই, ভো গৌতম,”
“ইহা কী মনে করো, মাগন্দিয়,… শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় শব্দভোগে অভিরমিত…।… ঘ্রাণ-বিজ্ঞেয় গন্ধভোগে অভিরমিত…।… জিহ্বা-বিজ্ঞেয় রসভোগে অভিরমিত…।… কায়-বিজ্ঞেয় স্পৃষ্টব্যভোগে অভিরমিত… অপর সময়ে সে যথাভূত জ্ঞাত হইয়া বিহার করে।… তৎসম্বন্ধে তোমার বক্তব্য কী?”
“কিছু নাই, ভো গৌতম!”
২১১. “মাগন্দিয়, পূর্বে গৃহী অবস্থায় আমি পঞ্চকামগুণে সমর্পিত সমঙ্গীভূত হইয়া চক্ষু-বিজ্ঞেয় ইষ্ট, কান্ত, মনোরম, প্রিয়স্বভাব, কামসংযুক্ত ও রমনীয় রূপ দ্বারা পরিচিত হইয়াছি। শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় শব্দ দ্বারা…, ঘ্রাণ বিজ্ঞেয় গন্ধ দ্বারা…, জিহ্বা-বিজ্ঞেয় রস দ্বারা…, কায়-বিজ্ঞেয় স্পৃষ্টব্য দ্বারা…। মাগন্দিয়, তখন আমার তিনখানি প্রাসাদ ছিল-এক বর্ষাকালিক, এক হৈমন্তিক এবং এক গ্রীষ্মকালীন। আমি বর্ষাঋতুর চারি মাস বর্ষাকালিক প্রাসাদে পুরুষহীন (স্ত্রী) তূর্য দ্বারা পরিচারিত (সেবিত) হইয়া নিম্ন প্রাসাদে অবতরণ করি নাই। সেই আমি অপর সময়ে কামসমূহেরই (বিষয়ভোগের) সমুদয়, অস্তগমন, আস্বাদ, আদীনব ও নিঃসরণ যথাভূত অবগত হইয়া, কামতৃষ্ণা ত্যাগ করিয়া, কাম-পরিদাহ দমন করিয়া, কাম-পিপাসা রহিত ও আধ্যাত্মিক উপশান্ত চিত্ত হইয়া বিহার করি। (যখন) আমি অপর সত্ত্বগণকে কামে অবীতরাগ, কামতৃষ্ণা দ্বারা উপদ্রুত, কামানলে প্রজ্বলিত হইয়াও কাম পরিভোগ করিতে দর্শন করি, তখন আমি তাহাদিগকে স্পৃহা করি না, তাহাতে অভিরমিত হই না। তাহার কারণ কী? মাগন্দিয়, বিষয়ভোগ হইতে স্বতন্ত্র, অকুশল ধর্ম হইতে পৃথক্তএই যে (ধ্যান ও ফল সমাপত্তিজনিত) রতি বিদ্যমান, তাহা দিব্যসুখকে অধিগ্রহিত বা পরাভূত করিয়া স্থিত আছে। সেই রতিতে রমিত হইয়া আমি হীন রতিকে আর স্পৃহা করি না, উহাতে অভিরমিত হই না।”
২১২. “যেমন মাগন্দিয়, কোনো আঢ্য, মহাধনী, মহাভোগসম্পন্ন গৃহপতি বা গৃহপতি পুত্র পঞ্চকামগুণ-চক্ষু দ্বারা জ্ঞেয় ইষ্ট, কান্ত, মনোরম, প্রিয়, কমনীয় ও রঞ্জনীয় রূপ… শব্দ… গন্ধ… রস… স্পৃষ্টব্য দ্বারা সমর্পিত, সমঙ্গীভূত (সংযুক্ত) হইয়া বিহার করেন। তিনি কায় দ্বারা সুচরিত আচরণ করিয়া, বাক্য দ্বারা সুচরিত আচরণ করিয়া এবং মনো দ্বারা সুচরিত আচরণ করিয়া দেহত্যাগে মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে ত্রয়োস্ত্রিংশবাসী দেবগণের সারূপ্যে উৎপন্ন হন। তিনি তথায় নন্দনবনে অপ্সরাসমূহ দ্বারা পরিবৃত হইয়া দিব্য পঞ্চকামগুণ দ্বারা সমর্পিত সমঙ্গীভূত হইয়া পরিভোগ করেন। তিনি কোনো গৃহপতি বা গৃহপতিপুত্রকে পঞ্চকামগুণে সমর্পিত ও সমঙ্গীভূত হইয়া ভোগ করিতে দেখেন। তাহা কী মনে করো, মাগন্দিয়, কেমন নন্দনবনে অপ্সরাসমূহ পরিবৃত হইয়া পঞ্চ দিব্য কামগুণ দ্বারা সমর্পিত ও সমঙ্গীভূত হইয়া কামভোগের সময় সে দেবপুত্র কি অমুক গৃহপতি বা গৃহপতি পুত্রের কিংবা মানুষের ভোগ্য পঞ্চ কামগুণের স্পৃহা করিবেন? অথবা মনুষ্য কামের প্রতি পুনরাগমন করিবেন? প্রলুব্ধ হইবেন?”
“ইহা কখনো সম্ভব নহে, ভো গৌতম।”
“ইহার কারণ কী?”
“ভো গৌতম, মনুষ্য কাম হইতে দিব্য কামরাশি অতিক্রান্ত, (উচ্চ) তর, উৎকৃষ্টতর।”
“এরূপই মাগন্দিয়, পূর্বে গৃহী অবস্থায় আমি…। মাগন্দিয়, যে রতি দিব্যসুখকে পরাভূত করিয়া স্থিত আছে, সেই রতি দ্বারা রমিত হইবার সময় আর হীন রতির প্রতি স্পৃহা করি নাই, তাহাতে অভিরমিত হই নাই।”
২১৩. “যেমন মাগন্দিয়, কোনো কুষ্ঠ রোগী পুরুষ ক্ষত শরীর, পক্ব (গলিত) দেহ, ক্রিমি দ্বারা ভক্ষিত অবস্থায়-নখে কণ্ডুয়ণ করিতে করিতে ব্রণমুখ (ঘা) ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়া অঙ্গারগর্তে শরীর উত্তপ্ত করিতে থাকে। তাহার মিত্র-অমাত্য, জ্ঞাতি-সলোহিতগণ একজন শল্যকর্তা ভিষককে উপস্থিত করিল। সেই শল্যকর্তা ভিষক তাহাকে ওষুধ প্রয়োগ করে, সে সেই ভৈষজ্য প্রভাবে কুষ্ঠরোগ হইতে মুক্ত, নীরোগ, সুখী, স্বাধীন, স্বয়ংবশী ও যথেচ্ছা গমনশীল হইল। এমন সময় সে অপর… ক্ষতশরীর… জ্বলন্ত, অঙ্গারগর্তে শরীর তপ্ত করিতে এক কুষ্ঠরোগীকে দেখিল। ইহা কী মনে করো, মাগন্দিয়, সেই নীরোগ ব্যক্তি কি অমুক কুষ্ঠরোগীর, অঙ্গারগর্তের কিংবা ওষুধ প্রয়োগের স্পৃহা করিবে?”
“নিশ্চয় না, ভো গৌতম।”
“ইহার কারণ কী?”
“ভো গৌতম, রোগ থাকিলেই’ তো ওষুধের প্রয়োজন, রোগ না থাকিলে ওষুধের প্রয়োজন আর থাকে না।”
“এইরূপই মাগন্দিয়, পূর্বে গৃহী অবস্থায় আমি… এখন তাহাতে অভিরমিত হই না।”
২১৪. “যেমন মাগন্দিয়, ক্ষতশরীর… কুষ্ঠরোগী… চিকিৎসা দ্বারা কুষ্ঠ হইতে মুক্ত হইয়া যায়। (তখন) বলবান দুই পুরুষ…দুই বাহু ধরিয়া তাহাকে অঙ্গারগর্তের দিকে সজোরে আকর্ষণ করে, তাহা কী মনে করো মাগন্দিয়, সে ব্যক্তি (না যাইবার জন্য) ইতস্তত শরীর নমিত করিবে নহে কি?”
“নিশ্চয়, ভো গৌতম।”
“তার কারণ কী?”
“ভো গৌতম, সেই অগ্নি মহাতাপ, ভীষণ-দাহ ও দুঃখ-সংস্পর্শ।”
“ইহা কী মনে করো, মাগন্দিয়, এখনই কি সে অগ্নি মহাতাপ, ভীষণ-দাহ ও দুঃখ-সংস্পর্শ? অথবা পূর্বে (রোগের সময়ে)ও সে অগ্নি… দুঃখ-সংস্পর্শ ছিল?”
“ভো গৌতম, এখনো সে অগ্নি… দুঃখ-সংস্পর্শ, আর পূর্বেও… দুঃখ-সংস্পর্শই ছিল। কিন্তু ভো গৌতম, পূর্বে সে ক্ষতশরীর… উপহতেন্দ্রিয় (বিক্ষত-চর্ম) কুষ্ঠ রোগী অগ্নির দুঃখ-সংস্পর্শতেই ‘সুখে আছে’ এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করিয়াছিল।”
এইরূপই মাগন্দিয়, কাম (বিষয়-ভোগ) অতীতকালেও মহাতাপ, ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক ও দুঃখ-সংস্পর্শই ছিল; ভবিষ্যৎকালেও বর্তমান সময়েও তাহা মহাতাপ, ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক ও দুঃখ-সংস্পর্শজনক। মাগন্দিয়, যাহারা কামে অবীতরাগ, কামতৃষ্ণা দ্বারা উপদ্রুত, কাম পরিদাহে দগ্ধ অবস্থায় ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ে সেই প্রাণীগণ এই দুঃখ-সংস্পর্শ কামেতে ‘সুখ আছে’ এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করিয়া থাকে।”
২১৫. “যেমন মাগন্দিয়, ক্ষতশরীর… কুষ্ঠ রোগী অঙ্গারগর্তে শরীর তপ্ত করে। মাগন্দিয়, যে যেভাবে কোনো কুষ্ঠ রোগী… কৃমি উপদ্রুত শরীরকে চুলাকাইবে, তপ্ত করিবে; সেই সেই পরিমাণেই সে ক্ষত-মুখে অধিকতর অশুচি, অধিকতর দুর্গন্ধ ও অধিকতর পূঁয আসিবে। ব্রণমুখ কণ্ডুয়ণ-হেতু ক্ষণকালের তরে সামান্য রস, সামান্য আস্বাদ মনে হইয়া থাকে। এই প্রকারেই মাগন্দিয়, কামভোগে অবীত-রাগ-হেতু, কামতৃষ্ণা দ্বারা উপদ্রুত অবস্থায়, কামানলে প্রজ্বলিত অবস্থায় প্রাণীগণ কামসমূহ সেবন করিয়া থাকে। মাগন্দিয়, কাম-বিষয়ে অবীতরাগ… প্রাণীগণ যেই পরিমাণ কাম সেবন করিবে, সেই পরিমাণেই সেই প্রাণীদের কামতৃষ্ণা বৃদ্ধি পাইবে, কামানল প্রজ্বলিত হইবে; পঞ্চকামগুণ সেবায় ক্ষণিকের তরে তাহাদের সামান্য রস-বোধ ও আস্বাদের ভাণ হইতে পারে।”
“মাগন্দিয়, তাহা কী মনে করো, তুমি কোথাও দেখিয়াছ কিংবা শুনিয়াছ কি যে পঞ্চবিধ কামগুণে সমর্পিত ও সংযুক্ত হইয়া কোনো রাজা কিংবা রাজার প্রধানমন্ত্রী-কামতৃষ্ণা পরিত্যাগ না করিয়া, কামানল না নিভাইয়া, পিপাসামুক্ত ও আধ্যাত্মিক উপশান্ত চিত্ত হইয়া বাস করিয়াছেন, বাস করেন বা বাস করিবেন?”
“কখনোই না, হে গৌতম।”
“সাধু, মাগন্দিয়, আমিও তাহা দেখি নাই শুনিও নাই যে… কোনো রাজা বা রাজ মহামাত্য-কামতৃষ্ণা পরিত্যাগ না করিয়া… বাস করিবেন। কিন্তু মাগন্দিয়, যে-সকল শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ কামপিপাসা রহিত হইয়াছেন, আপনার মধ্যে উপশান্ত চিত্ত হইয়া বিহার করিয়াছেন, করিতেছেন কিংবা করিবেন; তাঁহারা সকলে সমস্ত কামেরই সমুদয়, অস্তগমন, আস্বাদ, আদীনব ও নিঃসরণ যথাভূত বিদিত হইয়া, কামতৃষ্ণা ত্যাগ করিয়া, কাম-পরিদাহ বিনোদন করিয়া, কামপিপাসা রহিত হইয়া, আপনার ভিতরে উপশান্ত চিত্ত হইয়া বিহার করিয়াছেন, করিতেছেন বা করিবেন।”
অতঃপর ভগবান সেই সময় এই উদান উচ্চারণ করিলেন :
“আরোগ্য পরম লাভ, নির্বাণ পরম সুখ,
অমৃতগামীর মার্গ, অষ্টাঙ্গ পরম ক্ষেম।”
২১৬. এইরূপ উক্ত হইলে মাগন্দিয় পরিব্রাজক ভগবানকে বলিলেন, “আশ্চর্য, ভো গৗতম, অদ্ভুত, ভো গৌতম, মাননীয় গৌতম দ্বারা কেমন সুভাষিত হইল : ‘আরোগ্য পরম লাভ, নির্বাণ পরম সুখ।’ আমিও, হে গৌতম, আমার পূর্ব পরিব্রাজক আচার্য-প্রাচার্যদের ভাষণে শুনিয়াছি : ‘আরোগ্য পরম লাভ, নির্বাণ পরম সুখ’। উহার সহিত ইহা বেশ সামঞ্জস্য হইতেছে।”
“মাগন্দিয়, তুমি যে পূর্ব পরিব্রাজক আচার্য-প্রাচার্যদের ভাষণ শুনিয়াছ : ‘আরোগ্য… পরম সুখ’, উহাতে আরোগ্য কী প্রকার, আর নির্বাণই বা কী প্রকার?”
এইরূপই উক্ত হইলে মাগন্দিয় পরিব্রাজক কেবল স্বীয় দেহ হস্ত দ্বারা মার্জনা করিতে করিতে (বলিলেন), “ভো গৌতম, ইহাই আরোগ্য, ইহাই নির্বাণ, আমি এখন নিরোগ ও সুখী হই; কারণ আমার কোনো ব্যাধি নাই।”
২১৭. “যেমন মাগন্দিয়, জন্মান্ধ পুরুষ, সে না দেখে কাল-সাদা রূপ (দৃশ্য), না দেখে নীল রূপ, না দেখে পীত রূপ, না দেখে লোহিত রূপ, না দেখে মঞ্জিষ্ঠ রং এর রূপ, না দেখে সম-বিষম ভূমি, না দেখে (আকাশের) নক্ষত্ররাজি এবং না দেখে চন্দ্র-সূর্যকে। সে চক্ষুষ্মানের ভাষণে শুনিতে পায় যে, শ্বেতবস্ত্রই অতি স্বচ্ছ (উত্তম), সুন্দর, নির্মল ও শুচি। সে শ্বেতের সন্ধানে চলিল। তাহাকে কোনো পুরুষ তৈল-মসীসিক্ত গাঢ় কাল বস্ত্র দ্বারা বঞ্চিত করিল, ‘হে পুরুষ, ইহাই তোমার অভিপ্রেত শ্বেতবস্ত্র-সুন্দর, নির্মল ও শুচি।’ সে তাহাই গ্রহণ করে, গ্রহণ করিয়া পরিধান করে, পরিধান করিয়া সন্তুষ্ট চিত্তে সন্তোষকর বাক্য উচ্চারণ করে, ‘অহো, শ্বেতবস্ত্র কেমন স্বচ্ছ, সুন্দর, নির্মল ও শুচি!’ তাহা কী মনে করো, মাগন্দিয়, কেমন সে জন্মান্ধ পুরুষ জানিয়া, দেখিয়া তৈল-মসীকৃত ঘন-কাল কাপড় গ্রহণ করে, পরিধান করে;… পরিধান করিয়া… সন্তোষকর বাক্য উচ্চারণ করে, ‘অহো, শ্বেতবস্ত্র…, অথবা চক্ষুষ্মানের প্রতি শ্রদ্ধাবশত?”
“ভো গৌতম, সে জন্মান্ধ পুরুষ না জানিয়া না দেখিয়াই সেই তৈল-মসীলিপ্ত… গ্রহণ করে, চক্ষুষ্মানের প্রতি শ্রদ্ধাবশত।
“এইরূপই মাগন্দিয়, অন্ধ নেত্রহীন অন্যতৈর্থিক (ভিন্ন মতালম্বী) পরিব্রাজকগণ আরোগ্য জানে নাই, নির্বাণ দেখে নাই, তথাপি এই গাথা বলিয়া থাকে : ‘আরোগ্য পরম লাভ, নির্বাণ পরম সুখ।’ মাগন্দিয়, পূর্বের অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধগণ এই গাথা ভাষণ করিয়াছেন :
‘পার্থিব লাভের মাঝে সুস্থতা প্রধান,
উপশান্ত সুখ হয় পরম নির্বাণ;
মার্গ মধ্যে অষ্টাঙ্গিক সবার উত্তম,
অমৃতগামীর তরে ক্ষেম অনুপম।’”
২১৮. “সে গাথা (অংশ) বর্তমানে ধীরে ধীরে প্রাকৃতজনের মধ্যে প্রচলিত হইয়া রহিয়াছে। মাগন্দিয়, এই শরীর রোগময়, গণ্ডময়, শল্যময়, অঘময় ও ব্যাধিমন্দির। তুমিই এই রোগময়… ব্যাধিমন্দির দেহকে বলিতেছ : ‘ভো গৌতম, ইহাই আরোগ্য, ইহাই নির্বাণ।’ সুতরাং মাগন্দিয়, তোমার সেই আর্যচক্ষু (পরিশুদ্ধ বিদর্শনজ্ঞান ও মার্গজ্ঞান) নাই, যেই আর্যচক্ষু (পরিশুদ্ধ বিদর্শনজ্ঞান ও মার্গজ্ঞান) নাই, যেই আর্যচক্ষু দ্বারা তুমি আরোগ্য জানিতে পার ও নির্বাণ দেখিতে পার।”
“মাননীয় গৌতমের প্রতি আমি এমনই শ্রদ্ধা রাখি যে তিনি আমাকে তদ্রূপ ধর্মোপদেশ করিতে সমর্থ হইবেন, যে প্রকারে আমি আরোগ্য জানিতে পারি এবং নির্বাণ দেখিতে সক্ষম হই।”
২১৯. “যেমন মাগন্দিয়, কোনো জন্মান্ধ পুরুষ শ্বেত-কাল, নীল-পীত, লোহিত-মঞ্জিষ্ঠ রূপ (বর্ণ) দেখে না; সম-বিষম দেখে না; নক্ষত্র-রূপ দেখে না ও চন্দ্র ও সূর্যকে দেখে না। তাহার মিত্রামাত্য, জ্ঞাতি সলোহিতগণ একজন শল্যকর্তা ভিষককে আহ্বান করিল। সেই শল্যকর্তা ভিষক তাহাকে ওষুধ প্রয়োগ (চিকিৎসা) করেন। সেই ভৈষজ্য প্রয়োগে তাহার চক্ষু উৎপাদন করিতে সমর্থ হইল না, চক্ষু বিশুদ্ধ হইল না। ইহা কী মনে করো, মাগন্দিয়, কেমন সে চিকিৎসক কেবল ক্লান্তি ও বিঘাত বা দুঃখের ভাগী হইবে নহে কি?”
“হ্যাঁ, ভো গৌতম,”
“এইরূপ মাগন্দিয়, যদি আমি তোমাকে ধর্মোপদেশ করি যে ‘ইহা আরোগ্য, ইহা নির্বাণ,’ আর তুমি সেই আরোগ্য জানিতে না পার, নির্বাণ দেখিতে অসমর্থ হও; তবে তাহা হইবে আমার ক্লান্তি, তাহা হইবে আমার বিঘাত।”
“মাননীয় গৌতমের প্রতি আমি এরূপ প্রসন্ন যে মাননীয় গৌতম আমাকে তথাবিধ ধর্মোপদেশ করিতে সমর্থ… যাহাতে আমি নির্বাণ দর্শনে সক্ষম হই।”
২২০. “যেমন মাগন্দিয়, জন্মান্ধ পুরুষ… চন্দ্র সূর্যকে দেখে না, অথচ সে চক্ষুষ্মানের ভাষণে শুনিতে পায়,…। সে তাহা গ্রহণ করে… পরিধান করে। অপর সময় তাহার মিত্রামাত্য ও জ্ঞাতি সলোহিতগণ কোনো শল্যকর্তা ভিষককে আহ্বান করে। তিনি… চিকিৎসার্থ ঊর্ধ্ব বিরেচন, অধ বিরেচন, অঞ্জন, প্রত্যঞ্জন, নস্যকর্ম (নাকে ভৈষজ্য প্রদান) করেন। তিনি ভৈষজ্য প্রদান করিয়া চক্ষু উৎপাদন করেন, চক্ষুদ্বার বিশোধন করেন। তাহার চক্ষু উৎপাদনের সাথে সাথেই সেই তৈল-মসীকৃত, কাল-ঘন বস্ত্রের (কাল ভেড়ার লোম নির্মিত বস্ত্রের) প্রতি তাহার যে ছন্দ-রাগ ছিল, উহা পরিত্যক্ত হয়। আর সে সেই বঞ্চক পুরুষকে অমিত্র মনে করে, প্রত্যর্থি বা শত্রু বলিয়া ধারণা করে। অথচ তাহার জীবন-নাশের প্রয়োজনও অনুভব করে, আহা, দীর্ঘদিন যাবৎ এই পুরুষ কর্তৃক তৈল-মসীলিপ্ত কাল-ঘন বস্ত্র দ্বারা আমি প্রতারিত, বঞ্চিত হইয়াছি যে, ‘হে পুরুষ ইহা তোমার অভিপ্রেত, অতিস্বচ্ছ, সুন্দর, নির্মল ও শুচি শ্বেতবস্ত্র।’”
“এইরূপই মাগন্দিয়, আমি যদি তোমাকে ধর্মোপদেশ করি; ‘ইহা আরোগ্য, ইহা নির্বাণ’, আর তুমি আরোগ্য জানিতে পার, নির্বাণ দেখিতে পার; তবে তোমার চক্ষু উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গেই পঞ্চ উপাদান স্কন্ধের প্রতি তোমার যে ছন্দ-রাগ আছে, তাহা প্রহীন হইবে। তোমার এ ধারণা জন্মিবে ‘আহা, দীর্ঘকাল যাবৎ এই (সংসারাবর্ত অনুগত) চিত্তই আমাকে বঞ্চিত, বিকৃত ও প্রতারিত করিয়াছে। আমি রূপকেই (আপন বলিয়া) গ্রহণ (উপাদান) করিয়াছি, বেদনা…, সংজ্ঞা…, সংস্কার…, বিজ্ঞানকে (আপন বলিয়া) গ্রহণ করিয়াছি। আমার সেই উপাদান প্রত্যয় হইতে ভব (কর্ম), ভব-প্রত্যয় হইতে জাতি (জন্ম), জাতি-প্রত্যয় হইতে জরা-মরণ-শোক-পরিদেবন (ক্রন্দন)-দুঃখ-দৌর্মনস্য উপায়াস (মনস্তাপ) উৎপন্ন হইয়াছে।’ এইরূপে কেবল অশেষ দুঃখস্কন্ধের (পুঞ্জের) সমুদয় (উৎপত্তি) হইতেছে।”
“আমি মান্য গৌতমের প্রতি এরূপ শ্রদ্ধা রাখিয়া গৌতমের অধিকার আছে যে আমাকে এ প্রকার ধর্মোপদেশ করিবেন যাহাতে আমি এই আসনেই জ্ঞানচক্ষু লাভ করিয়া উঠিতে পারি।”
২২১. “তবে মাগন্দিয়, তুমি সৎপুরুষদিগকে সেবা করিও। যখন তুমি সৎপুরুষদের ভজন করিবে তখন তুমি সদ্ধর্ম শুনিতে পাইবে। যখন তুমি সদ্ধর্ম শুনিবে তখন হইতে তুমি ধর্মানুসারে আচরণ করিবে। যখন তুমি ধর্মানুকুল আচরণ করিবে তখন হইতে স্বয়ংই জানিবে-ইহারা (পঞ্চোপাদান স্কন্ধ) রোগ, গণ্ড, শল্য; এ অবস্থায় যাবতীয় রোগ, গণ্ড, শল্য নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয় (পঞ্চস্কন্ধের স্বরূপ ও পরিণাম অবগত হইলে তৎপ্রতি উপাদান বা গ্রহণেচ্ছা কমিয়া যায়)। তখন তোমার উপাদান নিরোধ-হেতু ভব নিরোধ হইবে, ভব নিরোধ-হেতু জাতি নিরোধ হইবে, জাতি বা জন্ম নিরোধ-হেতু জরা-মরণ-শোক-রোদন-দুঃখ-দৌর্মনস্য-উপায়াস প্রভৃতি নিরুদ্ধ হইবে; এ প্রকারে কেবল এই দুঃখপুঞ্জের নিরোধ সংঘটিত হইয়া থাকে।”
২২২. এ প্রকার উপদিষ্ট হইলে মাগন্দিয় পরিব্রাজক ভগবানকে বলিলেন, “আশ্চর্য, ভো গৌতম, অতি উত্তম, ভো গৌতম, যেমন অধঃমুখকে ঊর্ধ্বমুখ করিলেন…। আমি ভগবান গৌতমের শরণ লইলাম ধর্ম এবং ভিক্ষুসংঘেরও। ভন্তে, ভগবৎ সমীপে আমি প্রব্রজ্যা লাভ করিতে চাই, উপসম্পদা প্রার্থনা করি।”
“মাগন্দিয়, যেকোনো ভূতপূর্ব অন্যতৈর্থিক এই ধর্মবিনয়ে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা প্রত্যাশা করে তাহাকে চারি মাস যাবৎ পরিবাস করিতে হয়।”
“যদি ভন্তে,… পরিবাস করিতে (প্রয়োজন) হয়,… তবে আমি চারি বৎসরও পরিবাস করিব।”
মাগন্দিয় পরিব্রাজক ভগবানের সমীপে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা লাভ করিলেন।
উপসম্পদা লাভের অচিরকাল পরে আয়ুষ্মান মাগন্দিয় একাকী নির্জনবিহারী… আত্মসংযমী হইয়া বিহার করিতে করিতে অনতিবিলম্বেই… অনুত্তর ব্রহ্মচর্যের অন্তিম (অর্হত্ত্ব) ফল ইহজীবনে উপলব্ধি করিয়া বিহার করিতে লাগিলেন।… আয়ুষ্মান মাগন্দিয় অর্হৎদের অন্যতর হইলেন।
মাগন্দিয় সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ