লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৮]

মহা-সকুলুদায়ি সূত্র

২৩৭. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান রাজগৃহে বেণুবন-কলন্দক নিবাপে বিহার করিতেছেন। সেই সময় কতিপয় প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ পরিব্রাজক মোর-নিবাপে পরিব্রাজক আরামে বাস করিতেন; যেমন : অন্নভার, ববধর আর সকুল-উদায়ি পরিব্রাজক তথা অপর অভিজ্ঞাত পরিব্রাজকগণ।

তখন ভগবান পূর্বাহ্ণ সময়ে (অন্তর্বাস) পরিধানপূর্বক পাত্র-চীবর ধারণ করিয়া রাজগৃহে ভিক্ষার্থ প্রবেশ করিলেন। ভগবানের মনে হইল : “রাজগৃহে পিণ্ডাচরণ করিতে এখনো অতি সকাল। সুতরাং যেখানে মোর-নিবাপ পরিব্রাজক-আরাম, যেখানে সকুল-উদায়ি পরিব্রাজক আসেন, তথায় গেলেই ভালো হয়।” তখন ভগবান যেখানে মোর-নিবাপ পরিব্রাজকারাম, তথায় গেলেন। সেই সময় সকুল-উদায়ি পরিব্রাজক… মহতী পরিব্রাজক পরিষদের সহিত উপবিষ্ট ছিলেন সকুল-উদায়ি পরিব্রাজক দূর হইতেই ভগবানকে আসিতে দেখিলেন, দেখিয়া স্বীয় পরিষদকে বলিলেন,… ভগবান সকুল-উদায়ি পরিব্রাজক সমীপে উপনীত হইলেন। সকুল-উদায়ি পরিব্রাজক ভগবানকে বলিলেন, “আসুন, ভন্তে, ভগবান। ভন্তে, ভগবানকে স্বাগতম। ভন্তে, ভগবান, চিরকাল পর এখানে আগমনের সুযোগ করিলেন। ভন্তে, ভগবান, বসুন, এই যে আসন সজ্জিত।”

২৩৮. ভগবান সজ্জিত আসনে বসিলেন। সকুল-উদায়ি পরিব্রাজকও এক নিচ আসন লইয়া একান্তে বসিলেন। একান্তে উপবিষ্ট সকুল-উদায়ি পরিব্রাজককে ভগবান বলিলেন, “উদায়ি, এখন তোমরা কী কথায় বসিয়াছিলে, তোমাদের মধ্যে কী কথা হইতেছিল?”

“রেখেদিন, ভন্তে, সে কথা, যে কথায় এখন আমরা বসিয়াছিলাম। ভন্তে, এ কথা পরেও শ্রবণ করা ভগবানের পক্ষে দুর্লভ হইবে না। ভন্তে, পূর্ব পূর্বতর দিনে কুতুহল শালায় উপবিষ্ট ও সম্মিলিত নানা তীর্থিক (সম্প্রদায়ের) শ্রমণ-ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই কথা প্রসঙ্গ উৎপন্ন হয় : ‘ওহে, অঙ্গ-মগধবাসীর একান্তই লাভ, অঙ্গ-মগধবাসীর মহালাভ সুলব্ধ হইল; যেহেতু রাজগৃহে এই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ সংঘপতি, গণী, গণাচার্য, জ্ঞাত, যশস্বী, বহুজনের সুসম্মানিত তীর্থঙ্কর (পন্থা-স্থাপক) বর্ষাবাসে প্রবৃত হইয়াছেন। এই যে পূরাণকাশ্যপ সংঘী, গণী, গণাচার্য, জ্ঞাত, যশস্বী, বহুজন সুসম্মানিত তীর্থঙ্কর হন, তিনিও রাজগৃহে বর্ষাবাসের নিমিত্ত আসিয়াছেন।… এই যে মক্খলি গোশাল…। অজিত কেশকম্বল…।… পকুধ কাত্যায়ন…।… সঞ্জয়বেলট্ঠিপুত্ত…।… নিগণ্ঠ নাতপুত্ত…। এই যে শ্রমণ গৌতমও সংঘী…। তিনিও রাজগৃহে বর্ষাবাসের নিমিত্ত উপস্থিত আছেন। এই সকল ভাগ্যবান… বহুজনের সুসম্মানিত শ্রমণ-ব্রাহ্মণের মধ্যে কে শ্রাবকদের দ্বারা সৎকৃত, গৌরবকৃত, সম্মানিত ও পূজিত হন? শ্রাবকগণ কাহাকে অধিকতর সম্মান ও গৌরব করিয়া আশ্রয়ে বিহার করেন?”

২৩৯. তথায় কেহ কেহ এইরূপ বলিলেন, “এই যে পূরণকাশ্যপ সংঘী… হন,… তিনি শ্রাবকদের সৎকৃত… পূজিত নহেন। পূরণ-কাশ্যপকে শ্রাবকগণ সৎকার, গৌরব, সম্মান, পূজা করিয়া আশ্রয়ে বিহার করেন না। অতীতে (এক সময়) পূরণকাশ্যপ অনেক শত পরিসায় (পরিষদে) ধর্মোপদেশ করিতেছিলেন। তথায় পূরণকাশ্যপের এক শ্রাবক শব্দ করিলেন, ‘মহাশয়গণ, পূরণকাশ্যপকে এই সম্বন্ধে (এতমত্থং) জিজ্ঞাসা করিবেন না। তিনি ইহা জানেন না। আমরা ইহা জানি। আমাদিগকে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করুন। আমরা ইহা আপনাদিগকে বর্ণনা করিব।’ সেই সময় পূরণকাশ্যপ বাহু জড়াইয়া চীৎকার করিতে থাকেন (কদন্তো)-মহাশয়গণ, চুপ করুন, আপনারা শব্দ করিবেন না। এ সকল লোক আপনাদিগকে কিছু জিজ্ঞাসা করেন নাই। আমাদিগকে ইঁহারা জিজ্ঞাসা করিতেছেন। সুতরাং আমরা ইহার উত্তর দিব।’ কিন্তু (চুপ করাইতে) পারিলেন না। পূরণকাশ্যপের বহু শ্রাবক বিবাদ বা দোষারোপ করিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিল, ‘তুমি এ ধর্মবিনয় জান না, আমি এ ধর্মবিনয় জানি। কিরূপে তুমি এ ধর্মবিনয় জানিবে? তুমি মিথ্যা প্রতিপন্ন হও, আমি সত্যারূঢ় (সম্যক প্রতিপন্ন) হই। আমার বচন (সার্থক), তোমার নিরর্থক হয়। পূর্বের বচনীয় তুমি পরে বল, পরের বচনীয় পূর্বে বল। অনভ্যস্থকে (অবিচীর্ণকে) তুমি বিপর্যস্থ করিতেছ। তোমার বাদে নিগ্রহ আরোপিত হইয়াছে। বাদ (দোষ) মোচনার্থ যত্ন করো, অথবা যদি সমর্থ হও তবে গ্রন্থি খোল।’ এ প্রকারে পূরণকাশ্যপ শ্রাবকদের দ্বারা সৎকৃত হন না এবং পূজিত হন না।… অধিকন্তু পূরণকাশ্যপ স্বাভাবিক আক্রোশে আক্রোশিত হইয়াছেন।”

[মক্খলি গোশাল, অজিত কেশকম্বলী, পকুধ কাত্যায়ন, সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্ত ও নিগণ্ঠ নাতপুত্ত সম্বন্ধেও এরূপ মন্তব্য।]

২৪০. কেহ কেহ বলিলেন, “এই শ্রমণ গৌতম… সংঘী… হন। আর তিনি শ্রাবকদের… পূজিত হন…। শ্রাবকগণ শ্রমণ গৌতমকে সৎকার, গৌরবসহকারে আশ্রয় লইয়া বিহার করেন। পূর্বে এক সময় শ্রমণ গৌতম অনেক শত সভাতে ধর্মোপদেশ করিতেছেন। তথায় শ্রমণ গৌতমের শ্রাবকদের একজন কাশিলেন। অপর সব্রহ্মচারী জানুতে স্পর্শ করিয়া সংক্ষেত করিলেন, ‘আয়ুষ্মান নীরব হউন, আয়ুষ্মান শব্দ করিবেন না। শাস্তা আমাদিগকে ধর্মোপদেশ করিতেছেন।’ যে সময়ে শ্রমণ গৌতম অনেক শত পরিষদে ধর্মোপদেশ করেন, সেই সময়ে শ্রমণ গৌতমের শ্রাবকদের হাঁচি বা কাশির শব্দ পর্যন্তও হয় না। তাঁহার প্রতি জনতা প্রত্যাশানুরূপে (মনোযোগসহকারে) প্রস্তুত থাকে যে ভগবান আমাদিগকে যে ধর্ম ভাষণ করিবেন তাহা আমরা শুনিব। যেমন কোনো ব্যক্তি চারি মহাপথের সংযোগ স্থলে ক্ষুদ্র মক্ষিকা-সঞ্চিত নির্দোষ মধু প্রদান করে, তাহাতে বৃহৎ জনতা প্রত্যাশানুরূপ উপস্থিত থাকে। সেইরূপ যখন শ্রমণ গৌতম অনেক শত পরিষদে ধর্মোপদেশ করেন, তখন বৃহৎ জনতা আশানুরূপ ধর্ম শ্রবণ করেন।”

“শ্রমণ গৌতমের যে সব শ্রাবক সব্রহ্মচারীদের সাথে সামান্য বিবাদ করিয়া (ভিক্ষু) শিক্ষা ত্যাগ করে ও হীন (গৃহস্থ) আশ্রমে ফিরিয়া যায়, তাহারাও শাস্তার প্রশংসক হয়, ধর্ম-প্রশংসক হয় এবং সংঘ-প্রশংসক হয়; পর নিন্দুক নহে, আত্ম নিন্দুকই হয় : ‘আমরাই এ ক্ষেত্রে হতভাগ্য, পুণ্যহীন যেহেতু এমন স্বাখ্যাত ধর্মবিনয়ে প্রব্রজিত হইয়াও আমরা যাবজ্জীবন পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য আচরণ করিতে সমর্থ হইলাম না।’ তাহারা আরামিক (আরাম-সেবক) কিংবা গৃহস্থ (উপাসক) হইয়া পঞ্চবিধ শিক্ষাপদ (নীতি) গ্রহণ ও পালন করিয়া জীবন যাপন করে। এ প্রকারে শ্রমণ গৌতম শ্রাবকদের… পূজিত হন। শ্রমণ গৌতমকে শ্রাবকগণ সৎকার, গৌরবসহকারে আশ্রয় লইয়া বিহার করেন।”

২৪১. “উদায়ি, তুমি আমাতে কত ধর্ম (গুণ) দেখিতেছ, যে কারণে শ্রাবকগণ আমাকে… পূজা করে… ?”

“ভন্তে, ভগবানে আমি পঞ্চধর্ম দেখিতেছি, যদ্ধেতু ভগবানকে শ্রাবকগণ… পূজা করেন…। সেই পঞ্চ কী? ভন্তে, ভগবান, (১) অল্পাহারী এবং অল্প আহারের প্রশংসাকারী, ভন্তে, ভগবান যে অল্পাহারী, অল্পাহারের প্রশংসক হন। ইহাই আমি ভন্তে, ভগবানে প্রথম ধর্ম দেখিতেছি, যে কারণে ভগবানের শ্রাবকগণ…।

(২) ভগবান ভালো-মন্দ চীবর দ্বারাই সন্তুষ্ট থাকেন এবং ইতরিতর চীবরে সন্তুষ্টতার প্রশংসক…।

(৩) যেমন : তেমন পিণ্ডপাত দ্বারা সন্তুষ্ট এবং… সন্তুষ্টতার প্রশংসক…।

(৪)… শয়নাসনের দ্বারা সন্তুষ্ট এবং… সন্তুষ্টতার প্রশংসক…।

(৫)… নির্জনবাসী এবং…নির্জন বাসের প্রশংসক…।

ভন্তে, ভগবানের নিকট এই পঞ্চধর্ম দেখিতেছি…।”

২৪২. “উদায়ি, ‘শ্রমণ গৌতম অল্পাহারী, অল্পাহার প্রশংসক হন’, ইহাতে যদি শ্রাবকগণ আমাকে… পূজা করে… আশ্রয় করিয়া বিহার করে; তবে উদায়ি, আমার শ্রাবকেরা কোষক (ভাজন) আহারী, অর্ধ কোষকাহারী, বেল পরিমাণ ভোজী এবং অর্ধবেল পরিমাণ ভোজীও আছে। উদায়ি, আমি কদাচিৎ এই পাত্রের সম পরিমাণও ভোজন করি, অধিকও ভোজন করি। যদি… ‘অল্পভোজী ও অল্পাহার প্রশংসক হন’ এই হেতু… পূজা করে…; তবে উদায়ি, আমার যে সব শ্রাবক… অর্ধবেল পরিমাণ ভোজী তাহারা এই ব্যবহারের (অল্পাহারতার) দরুন আমাকে সৎকার করিত না…।” (১)

“উদায়ি,… ‘যেমন : তেমন চীবর দ্বারা সন্তুষ্ট, সন্তুষ্টতার প্রশংসক হন’, ইহাতে যদি শ্রাবকগণ আমাকে পূজা করে…; তবে উদায়ি, আমার শ্রাবকেরা পাংশুকুলিক, লূখ (বিশ্রী) চীবরধারী আছে, তাহারা শ্মশান, আবর্জনাস্তূপ হইতে এবং বিপণির ছিন্ন অন্ত, (পার) হীন বস্ত্রখণ্ড সঞ্চয় করিয়া সংঘাটী তৈরি ও ধারণ করে, উদায়ি, আমি কখনো কখনো দৃঢ়, শস্ত্র-লুখ, অলাবু লোমবৎ সূক্ষ্ম, গৃহপতি প্রদত্ত চীবরও পরিধান করে…।” (২)

“উদায়ি,… ‘যেমন : তেমন পিণ্ডপাত দ্বারা সন্তুষ্ট, সন্তুষ্টতার প্রশংসক হন’, এই কারণে যদি আমাকে শ্রাবকেরা পূজা করে…; তবে উদায়ি, আমার শ্রাবকগণ পিণ্ডপাতিক (ভিক্ষাজীবী) সপদানচারী (ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে ভিক্ষাচরণকারী) উঞ্ছব্রতে রতও আছে, তাহারা গ্রামে প্রবিষ্ট অবস্থায় আসনে নিমন্ত্রিত হইলেও গ্রহণ করে না। আমি নাকি উদায়ি, কখনো কখনো নিমন্ত্রিত শালিধানের কালিমাহীন ভাত, অনেক সূপ, অনেক ব্যঞ্জনও ভোজন করি…।” (৩)

“উদায়ি, ‘যেমন-তেমন শয়নাসনে সন্তুষ্ট সন্তুষ্টতার প্রশংসক হন’, ইহাতে যদি আমাকে শ্রাবকেরা… পূজা করে…; তবে উদায়ি, আমার শ্রাবকেরা বৃক্ষমূলিক ও অব্ভোকাসিক (বৃক্ষের নিচে ও উন্মুক্ত স্থানে বাসের) ধূতাঙ্গ ব্রতধারীও আছে। তাহারা আট মাস (চীবর রক্ষার্থ বর্ষা চার মাস ব্যতীত) আচ্ছাদনের নিচে যায় না। আমি তো উদায়ি, কখনো কখনো উল্লিপ্ত-অবলিপ্ত বায়ুরহিত দরজা-জানালাবদ্ধ কূটাগারে (প্রাসাদোপরিও) বিহার করি…।” (৪)

“উদায়ি,… ‘নির্জনবাসী… নির্জন প্রশংসক হন’, ইহাতে যদি আমাকে শ্রাবকেরা পূজা করে…; তবে উদায়ি, আমার শ্রাবকেরা আরণ্যক (সতত অরণ্যবাসী) প্রান্তবর্তী শয়নাসন (গ্রাম হইতে দূরে) বিহারী আছে। (তাহারা) অরণ্যে বন-পন্থ প্রান্তবর্তী শয়নাসনে প্রবেশ করিয়া বিহার করে। তাহারা প্রত্যেক অর্ধমাসে প্রাতিমোক্ষ উদ্দেশের নিমিত্ত সংঘমধ্যে আসিয়া থাকে। অথচ উদায়ি, আমি কোনো কোনো সময় ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, উপাসক, উপাসিকা, রাজা, রাজ-মহামাত্য, তীর্থঙ্কর এবং তীর্থঙ্কর শ্রাবকের দ্বারা আকীর্ণ হইয়া বিহার করি…। এই প্রকারে উদায়ি, আমাকে শ্রাবকগণ এই পঞ্চধর্ম (গুণ) হেতু… পূজা করে…।” (৫)

২৪৩. “উদায়ি, অপর পাঁচধর্ম আছে, যদ্বারা শ্রাবকগণ আমাকে… পূজা করে…। সেই পাঁচ কী? এখানে উদায়ি, শ্রাবকগণ আমার অধিশীল (অনন্য সাধারণ চরিত্র) হেতু… সম্মান করে, ‘শ্রমণ গৌতম শীলবান হন, পরম শীলস্কন্ধ (সদাচারসমূহ) দ্বারা সংযুক্ত হন।’ উদায়ি, যে-সকল শ্রাবক আমার শীলে বিশ্বাস করে…; ইহাই উদায়ি, প্রথম ধর্ম, যে কারণে… শ্রাবকগণ আমাকে পূজা করে।” (১)

২৪৪. “পুনশ্চ উদায়ি, শ্রাবকগণ আমার অভিক্রান্ত-জ্ঞানদর্শনকেই (সর্বজ্ঞতা জ্ঞানকেই) সম্মানিত করে জানিয়াই শ্রমণ গৌতম বলেন, ‘আমি জানি’, দেখিয়াই শ্রমণ গৌতম বলেন, ‘আমি দেখি’। অভিজ্ঞাত হইয়াই শ্রমণ গৌতম ধর্মোপদেশ করেন, অভিজ্ঞাত না হইয়া নহে। সনিদান (কারণ সহিত) শ্রমণ গৌতম ধর্মোপদেশ করেন, অনিদান নহে। (দেশনাবিলাস) যুক্ত… ধর্মোপদেশ করেন, প্রতিহার্য রহিত নহে;…।” (২)

২৪৫. “পুনরায় উদায়ি, শ্রাবকেরা আমাকে অধিপ্রজ্ঞার (প্রত্যুৎপন্ন প্রজ্ঞার) দরুন সম্মানিত করে, ‘প্রজ্ঞাবান শ্রমণ গৌতম, পরম প্রজ্ঞাস্কন্ধ সমন্বিত হন।’ সে কারণে অনাগত বাদ-বিবাদমার্গ দেখা যায় না। (বর্তমানে) উৎপন্ন পর-প্রবাদ ন্যায় ধর্মানুসারে উত্তমরূপে নিগ্রহ (খণ্ডন) করিবে না, এমন সম্ভাবনা নাই। ইহা কী মনে করো, উদায়ি, কেমন শ্রাবকেরা এই প্রকারে জানিয়া, এই প্রকারে সত্যদর্শী হইয়া আমার উপদেশের সময় মাঝে মাঝে কথা বলিবে?”

“না, ভন্তে,”

“উদায়ি, আমি শ্রাবকদের নিকট অনুশাসন প্রত্যাশা করি না। পরন্তু শ্রাবকেরা আমারই উপদেশের প্রত্যাশা রাখে। (৩)

২৪৬. “পুনশ্চ উদায়ি, আমার শ্রাবকেরা যে দুঃখ দ্বারা দুঃখাবতীর্ণ, দুঃখ-নিমজ্জিত (অভিভূত) হয়, তাহারা আমার নিকট আসিয়া দুঃখ-আর্যসত্য সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। এরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া আমি তাহাদিগকে দুঃখ-আর্যসত্য বর্ণনা করি, প্রশ্নোত্তর দ্বারা আমি তাহাদের চিত্ত সন্তুষ্ট করি। তাহারা আসিয়া আমাকে দুঃখ-সমুদয় আর্যসত্য, দুঃখ-নিরোধ আর্যসত্য ও দুঃখ-নিরোধগামিনী-প্রতিপদা আর্যসত্য সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে…।” (৪)

২৪৭. “পুনশ্চ উদায়ি, আমি শ্রাবকদিগকে প্রতিপদা বা মার্গ বলিয়াছি যেভাবে প্রতিপন্ন হইয়া শ্রাবকগণ চতুর্বিধ স্মৃতি-উপস্থান ভাবনা করিতে পারে। এখানে বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞানী ও স্মৃতিমান ভিক্ষু লোকে (বিষয়ে) অভিধ্যা দৌর্মনস্যকে দমন করিয়া কায়ে কায়ানুদর্শী হইয়া বিহার করে; বেদনাসমূহে বেদনানুদর্শী…, চিত্তে চিত্তানুদর্শী… ও ধর্মে ধর্মানুদর্শী হইয়া বিহার করে। আর সেই বিষয়ে আমার বহু শ্রাবক অভিজ্ঞতার অবসান ও পরমোৎকর্ষত্ব (অর্হত্ত্ব) প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে।” (৫)

“পুনশ্চ উদায়ি, আমি শ্রাবকগণকে সেই প্রতিপদা বলিয়াছি যাহাতে প্রতিপন্ন হইয়া আমার শ্রাবকেরা চতুর্বিধ সম্যক প্রধান বৃদ্ধি করিতে পারে। উদায়ি, এখানে ভিক্ষু (১) অনুৎপন্ন পাপ-অকুশলধর্ম অনুৎপত্তির নিমিত্ত ছন্দ (রুচি) জন্মায়, প্রচেষ্টা করে, বীর্য-প্রবর্তন করে, চিত্ত নিয়োজিত করে, উপায় উদ্ভাবন করে। (২) উৎপন্ন পাপ-অকুশলধমের্র প্রহারের নিমিত্ত…। (৩) অনুৎপন্ন কুশলধর্মের উৎপত্তির নিমিত্ত…। (৪) উৎপন্ন কুশলধর্মের স্থিতি, (অসম্মোসায) অভিবৃদ্ধির বা বিপুলতার নিমিত্ত, ভাবনায় পরিপূর্ণতার নিমিত্ত ছন্দ উৎপন্ন করে,…। তথায়ও আমার বহু শ্রাবক অভিজ্ঞার অবসান, পরমোৎকর্ষ প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে।”

“পুনশ্চ উদায়ি, শ্রাবকদিগকে আমা দ্বারা সেই মার্গ কথিত হইয়াছে, যাহাতে প্রতিপন্ন হইয়া আমার শ্রাবকেরা চতুর্বিধ ঋদ্ধিপাদ ভাবনা করিতে পারে। উদায়ি, এখানে (১) ছন্দ-সমাধি প্রধান সংস্কারযুক্ত ঋদ্ধিপাদের ভাবনা করে। (২) বীর্য-সমাধি প্রধান সংস্কারযুক্ত ঋদ্ধিপাদের ভাবনা করে। (৩) চিত্ত-সমাধি…। (৪) বীমাংসা (পরীক্ষামূলক জ্ঞান) সমাধি…। তথায়ও আমার বহু শ্রাবক অর্হত্ত্ব প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে।”

“পুনরায় উদায়ি,… যাহাতে প্রতিপন্ন হইয়া আমার শ্রাবকেরা পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের ভাবনা করিতে পারে। উদায়ি, এখানে ভিক্ষু উপশমগামী ও সমাধিগামী (মার্গগামী) (১) শ্রদ্ধা-ইন্দ্রিয়ের ভাবনা করে। (২) বীর্য-ইন্দ্রিয়ের…। (৩) স্মৃতি-ইন্দ্রিয়ের…। (৪) সমাধি-ইন্দ্রিয়ের…। (৫) প্রজ্ঞা-ইন্দ্রিয়ের…।”

“পুনশ্চ উদায়ি,… পঞ্চ বলের ভাবনা করে।… (১) শ্রদ্ধাবলের…। (২) বীর্যবলের…। (৩) স্মৃতিবলের…। (৪) সমাধিবলের…। (৫) প্রজ্ঞাবলের…।”

“পুনশ্চ উদায়ি,… সপ্তবোধি-অঙ্গের ভাবনা করে। এখানে উদায়ি, ভিক্ষু বিবেক-আশ্রিত, বিরাগ-আশ্রিত, নিরোধ-আশ্রিত, বিসর্জন-পরিণামী (১) স্মৃতি-সম্বোধি অঙ্গ…। (২) ধর্মবিচয় সম্বোধি অঙ্গ…। (৩) বীর্য-সম্বোধি অঙ্গ…। (৪) প্রীতি-সম্বোধি অঙ্গ…। (৫) প্রশান্তি-সম্বোধি অঙ্গ…। (৬) সমাধি-সম্বোধি অঙ্গ…। (৭) উপেক্ষা-সম্বোধি অঙ্গ…।”

“পুনশ্চ উদায়ি,… আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের ভাবনা করে। উদায়ি, এখানে ভিক্ষু সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্মান্ত, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি ভাবনা করে।…।”

২৪৮. “পুনরায় উদায়ি,…আট বিমোক্ষের ভাবনা করে (১) রূপী (স্বীয় কেশাদি নিমিত্তে উৎপন্ন রূপধ্যানী ধ্যানচক্ষু দ্বারা) রূপসমূহ (বাহ্যিক নীল কৃৎস্নাদি) দর্শন করে, ইহা প্রথম বিমোক্ষ। (২) অধ্যাত্ম অরূপ-সংজ্ঞী (স্বীয় কেশাদিতে অনুৎপাদিত রূপধ্যানী) বাহ্যিক রূপসমূহ (নীলাদি আরম্মণ) দর্শন করে, ইহা দ্বিতীয় বিমোক্ষ। (৩) শুভরূপেই বিশ্বাস (অধিমুক্তি) হয় (নীলাদি বর্ণ কৃৎস্ন বিশুদ্ধ হইলে ধ্যানও বিশুদ্ধ হয়), ইহা তৃতীয় বিমোক্ষ। (৪) সর্বথা রূপ-সংজ্ঞার সমতিক্রম করিয়া প্রতিঘ-সংজ্ঞার অস্তগমন-হেতু নানাত্ব সংজ্ঞার অমনসিকার-হেতু ‘আকাশ অনন্ত’ এই আকাশ-অনন্ত-আয়তন প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে, ইহা চতুর্থ বিমোক্ষ। (৫) সর্বতোভাবে আকাশ-অনন্ত-আয়তন অতিক্রম করিয়া ‘বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে,…। (৬) সর্বথা বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তনকে অতিক্রম করিয়া ‘কিছু নাই’ এই আকিঞ্চনায়তন প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে,…। (৭) সর্বথা আকিঞ্চনায়তনকে অতিক্রম করিয়া নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন (যে সমাধির অবস্থাকে চেতন কিংবা অচেতন বলা যায় না) প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে,…। (৮) সর্বথা নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তনকে অতিক্রম করিয়া সংজ্ঞা বেদয়িত (বেদনা) নিরোধ (যাবতীয় চেতনের নিরোধ) প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে, ইহা অষ্টম বিমোক্ষ। ইহাতেও আমার বহু শ্রাবক… অর্হত্ত্ব প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে।”

২৪৯. “পুনশ্চ, উদায়ি,… আট অভিভূ-আয়তন ভাবনা করিয়া থাকে। (১) যোগাবচর শরীর অভ্যন্তরে (অধ্যাত্ম) রূপ-সংজ্ঞী (রূপ আলম্বন করিয়া ধ্যানলাভী)-বাহিরে সুবর্ণ-দুর্বর্ণ সামান্য রূপরাশি দর্শন করে, তাহাদিগকে অভিভূত করিয়া ‘জানি, দেখি’ এরূপ সংজ্ঞা বা ধারণা পোষণকারী হয়, ইহা প্রথম অভিভূ-আয়তন। (২) কেহ আধ্যাত্মিক রূপ-সংজ্ঞী-বাহিরে সুবর্ণ দুর্বর্ণ অপ্রমাণ-(বহু পরিমাণ) রূপরাশি র্দশন করে, সেই সমুদয় অভিভূত করিয়া ‘জানি, দেখি’ এরূপ সংজ্ঞা সম্পন্ন হয়,…। (৩) কেহ আধ্যাত্মিক অরূপ-সংজ্ঞী-বাহিরে সামান্য সুবর্ণ-দুর্বর্ণ দর্শন করে, সেই সমুদয় অভিভূত করিয়া ‘জানি, দেখি’ এরূপ সংজ্ঞাবলম্বী হয়,…। (৪) কেহ আধ্যাত্মিক অরূপ-সংজ্ঞী-বাহ্যিক সুবর্ণ-দুর্বর্ণ অপ্রমাণ রূপকে দর্শন করে,…। (৫) কেহ আধ্যাত্মিক অরূপ-সংজ্ঞী-বাহ্যিক নীল, নীলবর্ণ, নীল-নিদর্শন, নীল-নিভাস রূপরাশি দর্শন করে। যেমন ঊমাপুষ্প (অপরাজিতা?) নীল, নীলবর্ণ, নীল-নিদর্শন, নীল-নিভাস; অথবা যেমন উভয়দিক হইতে বিমৃষ্ট (কোমল, মসৃণ,) নীল… বারাণসীজাত বস্ত্র, এই প্রকারেই কেহ আধ্যাত্মিক অরূপ-সংজ্ঞী বাহ্যিক নীল… রূপকে দর্শন করে, উহাদিগকে অভিভূত করিয়া ‘জানি, দেখি’ এই সংজ্ঞী হয়।…। (৬) আধ্যাত্মিক অরূপ-সংজ্ঞী-বাহ্যিক রূপ পীত, পীতবর্ণ, পীত-নিদর্শন, পীত-নিভাস রূপসমূহ দর্শন করে। যেমন পীত… কর্ণিকার সদৃশ… পীত বারাণসীজাত বস্ত্র…। (৭) আধ্যাত্মিক অরূপ-সংজ্ঞী-কেহ বাহ্যিক লোহিত, লোহিত বর্ণ, লোহিত-নিদর্শন, লোহিত-নিভাসসম্পন্ন রূপরাশি দর্শন করে। যেমন…বন্ধুজীবক পুষ্প, অথবা যেমন লাল বারাণসীজাত বস্ত্র…। (৮) আধ্যাত্মিক অরূপ-সংজ্ঞী-কেহ বাহ্যিক অবদাত (শ্বেত), অবদাত বর্ণ… অবদাত রূপকে দর্শন করে। যেমন অবদাত শুকতারা (ঔষধিতারা), অথবা যেমন বারাণসীজাত শ্বেতবস্ত্র…। এই অষ্টবিধ অভিভূ আয়তনের বশীভাব প্রাপ্ত বহু শ্রাবক আছে,…।”

২৫০. “পুনশ্চ, উদায়ি, দশ কৃৎস্ন-আয়তনের (কাসিনায়তনের) ভাবনা করিয়া থাকে। (১) কেহ ঊর্ধ্ব, অধ চতুর্দিকে অদ্বিতীয় অপ্রমাণ পৃথিবীকৃৎস্ন (সমস্ত পৃথিবীকে) জানে। (২) আপকৃৎস্ন (সমস্ত জলকে) জানে। (৩) তেজকৃৎস্ন (সমস্ত তাপকে) জানে। (৪) বায়ুকৃৎস্ন (সমস্ত বায়ুকে) জানে। (৫) নীলকৃৎস্ন (সমস্ত নীল রংকে) জানে। (৬) পীতকৃৎস্ন (সমস্ত পীত রংকে) জানে। (৭) লোহিতকৃৎস্ন (সমস্ত লাল রংকে) জানে। (৮) অবদাতকৃৎস্ন (সমস্ত শ্বেত রংকে জানে। (৯) আকাশকৃৎস্ন (সমস্ত আকাশকে) জানে। (১০) বিজ্ঞানকৃৎস্ন (সমস্ত চেতনাময় চিন্মাত্রকে) জানে।”

২৫১. “পুনশ্চ উদায়ি,… চতুর্বিধ ধ্যান ভাবনা করিয়া থাকে। উদায়ি, ভিক্ষু কাম হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া, অকুশলধর্ম হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া বিতর্ক-বিচার সহিত বিবেকজ প্রীতি-সুখ সমন্বিত প্রথম ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে। সে এই শরীরকেই বিবেকজ প্রীতি-সুখ দ্বারা প্লাবিত, (চতুর্দিক) পরিপ্লাবিত করে, পরিপূর্ণ ও পরিস্ফুরিত করে। তাঁহার সর্ব শরীরের কোনো অংশ বিবেকজ প্রীতি-সুখ দ্বারা অস্ফুট থাকে না। যেমন উদায়ি, দক্ষ (চতুর) স্নাপক (নহাপিত) কিংবা স্নাপকের অন্তেবাসী কাঁসের থালায় স্নানীয়-চূর্ণ নিক্ষেপ করিয়া জল সিঞ্চনপূর্বক মর্দন ও পিণ্ড করে, সেই স্নানীয়-পিণ্ড শুভ (স্বচ্ছতা) অনুগত, শুভ-পরিগত ও অন্তর-বাহির সমভাবে শুভ দ্বারা স্পর্শিত ও সিক্ত হয়। সেইরূপ উদায়ি, এই দেহ বিবেকজ প্রীতি-সুখ দ্বারা প্লাবিত, পরিপ্লাবিত করে, পরিপূর্ণ ও পরিস্ফুরিত করে…।”

“পুনরায় উদায়ি, ভিক্ষু বিতর্ক-বিচারের উপশমহেতু… দ্বিতীয় ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে। সে এই শরীরকে সমাধিজ প্রীতি-সুখ দ্বারা প্লাবিত, পরিপ্লাবিত করে, পরিপূর্ণ ও পরিস্ফুরিত করে। তাহার সর্বব্যাপী কায়ের কোনো অংশ সমাধিজ প্রীতি-সুখ দ্বারা অস্ফুট থাকে না। যেমন উদায়ি, উদকোৎস স্ফীত উদক-হ্রদ, উহার পূর্বদিকে জল আগমনের মার্গ নাই, পশ্চিমদিকে জল আগমনের মার্গ নাই, দক্ষিণদিকে জল আগমনের মার্গ নাই এবং উত্তরদিকেও জল আগমনের মার্গ নাই। সময়ে সময়ে মেঘও বৃষ্টিধারা বর্ষণ করে না। তথাপি সেই উদক-হ্রদ হইতে সুশীতল বারিধারা উচ্ছ্বসিত হইয়া সে উদক-হৃদকে শীতল জল দ্বারা প্লাবিত ও সর্বথা প্লাবিত করে, পরিপূর্ণ ও পরিস্ফুরিত করে। এই সর্বব্যাপী উদক-হ্রদের কোনো অংশ শীতল জলে অস্ফুট থাকে না। এইরূপই উদায়ি, এই শরীরে সর্বত্র সমাধিজ প্রীতি-সুখ দ্বারা…।”

“পুনরায় উদায়ি, ভিক্ষু প্রীতির বিরাগহেতু তৃতীয় ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে। সে এই শরীর প্রীতিহীন সুখ দ্বারা প্লাবিত পরিপ্লাবিত করে…। যেমন উদায়ি, উৎপল, পদ্ম, পুণ্ডরীকিণীর মধ্যে কোনো কোনো উৎপল, পদ্ম ও পুণ্ডরীক জলে উৎপন্ন, উদকে সংবর্ধিত উদকানুদ্গত (উপরে অনুত্থিত) অভ্যন্তরে নিমগ্ন ও পোষিত, মূল হইতে অগ্র পর্যন্ত শীতল জল দ্বারা প্লাবিত, নিমর্জিত… থাকে। সেইরূপ উদায়ি, ভিক্ষু এই কায়কে নিষ্প্রীতিক সুখ দ্বারা…।”

“পুনরায় উদায়ি, ভিক্ষু সুখ ও দুঃখের প্রহানহেতু, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্যের অস্তগমনহেতু অদুঃখ-অসুখ উপেক্ষা স্মৃতি-পারিশুদ্ধি চতুর্থ ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া বিহার করে। সে এই শরীরকে পরিশুদ্ধ (উপক্লেশ রহিত) পর্যাবদাত (প্রভাস্বর) চিত্ত দ্বারা বিস্তারিত করিয়া বিহার করে। যেমন উদায়ি, কোনো পুরুষ শ্বেতবস্ত্র দ্বারা সকীর্ষ আচ্ছাদন করিয়া বসিয়া থাকে। সেইরূপেই উদায়ি, ভিক্ষু এই শরীর…। তথায়ও আমার বহু শ্রাবক অভিজ্ঞার অবসান প্রাপ্ত (অর্হত্ত্বমার্গ প্রাপ্ত) ও অভিজ্ঞার পারমী প্রাপ্ত (অর্হত্ত্বফল প্রাপ্ত) হইয়া বিহার করে।”

২৫২. “পুনশ্চ, উদায়ি, আমি শ্রাবকদিগকে সেই মার্গ বলিয়াছি, যথা প্রতিপন্ন আমার শ্রাবকগণ এরূপ জানিতে পারে, ‘আমার এই শরীর রূপবান, চাতুর্মহাভৌতিক, মাতৃপিতৃসম্ভূত, অন্ন-ব্যঞ্জন সঞ্চয়, অনিত্য-উৎসাদন, পরিমর্দন-ভেদন-বিধ্বংসন স্বভাব; আর আমার এই বিজ্ঞান (চেতনাংশ) ইহাতে (চাতুর্মহাভৌতিক দেহে) আশ্রিত, ইহাতে প্রতিবদ্ধ।’ যেমন উদায়ি, সুন্দর উত্তম জাতীয় অষ্টাংশ, সুমসৃণ, স্বচ্ছ, বিপ্রসন্ন, সর্ব আকারযুক্ত বৈদুর্যমণি (হীরা), তাহাতে নীল, পীত, লোহিত, অবদাতসূত্র বা পাণ্ডুসূত্র গ্রথিত হয়, উহাকে চক্ষুষ্মান পুরুষ হস্তে, লইয়া প্রত্যবেক্ষণ করে; ‘ইহা সুন্দর… বৈদূর্যমণি,… সূত্র-গ্রথিত।’ এইরূপেই উদায়ি, আমি… বলিয়া দিয়াছি…। তাহাতেও আমার বহু শ্রাবক…।”

২৫৩. “পুনশ্চ, উদায়ি,… সেই মার্গ বলা হইয়াছে, যাহাতে প্রতিপন্ন হইয়া আমার শ্রাবকগণ এই দেহ হইতে মনোময়, সর্বাঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমন্বিত, অবিকল-ইন্দ্রিয়, অন্য জরদেহ নির্মাণ করিতে পারে। যেমন উদায়ি, মুঞ্জতৃণ হইতে ঈষীকা (শীর্ষ) উৎপাটন করা হয়। উহার এই ধারণা হয় : ‘ইহা মুঞ্জ, ইহা শীর্ষ। মুঞ্জ অন্য, শীর্ষ অন্য। মুঞ্জ হইতেই শীর্ষ উৎপাটিত।’ যেমন উদায়ি, কোনো পুরুষ কোষ হইতে অসি বাহির করে, তাহার এই ধারণা হয় : ‘এই অসি, এই কোষ। অসি স্বতন্ত্র, কোষ স্বতন্ত্র। কোষ হইতেই অসি বাহির করা হইয়াছে।’ যেমন উদায়ি, করণ্ড হইতে সর্প বাহির করা হয়।…। এইরূপেই উদায়ি,… মার্গ বলা হইয়াছে।”

২৫৪. “পুনশ্চ উদায়ি,… সেই মার্গ বলা হইয়াছে যেই মার্গারূঢ় হইয়া আমার শ্রাবকগণ অনেক প্রকারের ঋদ্ধিবিধ (যোগ-বিভূতি) অনুভব করে; ‘এক হইয়াও বহুবিধ হয়, বহুবিধ হইয়াও এক হয়, আবির্ভাব ও তিরোভাব (করে), যেমন দেওয়ালের বাহিরে, প্রাকারের বাহিরে, পর্বতের বাহিরে আকাশের ন্যায় অসংলগ্নভাবে পার হইয়া যায়; জলের ন্যায় মাটিতেও ডুব দেয়, ভাসিয়া উঠে; মাটির ন্যায় জলেও অনার্দ্রভাবে গমন করে; পক্ষী-শকুনের ন্যায় আসনাবদ্ধভাবে আকাশেও সঞ্চরণ করে; এমন মহাঋদ্ধি মহানুভবসম্পন্ন এই চন্দ্র-সূর্যকেও হস্ত দ্বারা স্পর্শ করে, পরিমর্দন করে এবং যাবৎ ব্রহ্মলোক পর্যন্ত কায় দ্বারা বশে রাখে।’ যেমন উদায়ি, দক্ষ কুম্ভকার বা কুম্ভকারান্তেবাসী সুমর্দিত মৃত্তিকা দ্বারা যে যে ভাজন বিকৃতি (বিশেষ) আকাঙ্ক্ষা করে তাহা তাহাই নির্মাণ করে, নিষ্পাদন করে। অথবা যেমন উদায়ি, দন্তকার (হস্তীদন্তের শিল্পী) বা দন্তকারের শিষ্য সুমসৃণ দন্ত হইতে যে যে দন্ত-বিকৃতি (দন্ত নির্মিত বস্তু) ইচ্ছা করে তাহাই নির্মাণ করে, নিষ্পাদন করে। অথবা যেমন উদায়ি, দক্ষ স্বর্ণকার বা স্বর্ণকারের শিষ্য সংশোধিত সুবর্ণ হইতে যে যে স্বর্ণ-বিকৃতি ইচ্ছা করে তাহাই নির্মাণ করে…। এইরূপেই উদায়ি,…।”

২৫৫. “পুনশ্চ উদায়ি,… যে মার্গে প্রতিপন্ন হইয়া আমার শ্রাবকগণ বিশুদ্ধ অ-মানুষ, দিব্য-শ্রোত্রধাতু (কর্ণ) দ্বারা দিব্য ও মনুষ্য, দূরবর্তী ও সমীপবর্তী উভয়বিধ শব্দ শ্রবণ করে। যেমন উদায়ি, বলবান শঙ্খ-ধমক (শাঁখ বাদক) অল্প প্রয়াসেই (অনায়াসেই) চতুর্দিকে বিজ্ঞাপন করিয়া থাকে সেইরূপই উদায়ি,…।”

২৫৬. “পুনশ্চ উদায়ি,… যথামার্গ প্রতিপন্ন হইয়া আমার শ্রাবকগণ অপর সত্ত্ব, অপর পুদ্গলের চিত্ত স্ব-চিত্ত দ্বারা সর্বথা জানিতে পারে; সরাগ চিত্তকে সরাগ চিত্তরূপে জানিতে পারে; বীতরাগ চিত্তকে বীতরাগ চিত্তরূপে জানিতে পারে; সদ্বেষ চিত্তকে সদ্বেষ চিত্তরূপে, বীতদ্বেষ চিত্তকে বীতদ্বেষ চিত্তরূপে জানিতে পারে; সমোহ চিত্তকে…; বীতমোহ চিত্তকে…; সংক্ষিপ্ত চিত্তকে…; বিক্ষিপ্ত চিত্তকে…; মহদ্গত (বিশাল) চিত্তকে…; অমহদ্গত চিত্তকে…; স-উত্তর (যাহা হইতে বড়ও আছে) চিত্তকে…; অনুত্তর চিত্তকে…; সমাহিত চিত্তকে…; অসমাহিত চিত্তকে…; বিমুক্ত চিত্তকে…; অবিমুক্ত চিত্তকে…। যেমন উদায়ি, কোনো বিলাসী স্ত্রী কিংবা পুরুষ, তরুণ, যুবক পরিশুদ্ধ-পর্যবদাত দর্পণে বা স্বচ্ছ জলপূর্ণ পাত্রে মুখ নিমিত্ত (মুখাবয়ব) দেখিতে গিয়া সকণিক (ব্রণদুষ্ট) অঙ্গকে সকণিক অঙ্গরূপে জানিতে পারে; অকণিকাঙ্গকে অকণিকাঙ্গরূপে জানিতে পারে। এইরূপেই উদায়ি,…!”

২৫৭. “পুনশ্চ উদায়ি,…যে মার্গে আরূঢ় হইয়া আমার শ্রাবকেরা অনেক প্রকারে পূর্বনিবাসকে (পূর্বজন্মকে) জানিতে পারে। যেমন উদায়ি, এক জাতি (জন্ম), দুই, তিন, চার, পাঁচ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, শত, সহস্র জাতি ও অনেক সংবর্তকল্প (মহাপ্রলয়), অনেক বিবর্তকল্প (সৃষ্টি), অনেক সংবর্ত-বিবর্তকল্পকেও জানিতে পারে, ‘আমি তথায় এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহারী ছিলাম; এরূপ সুখ-দুঃখ অনুভবকারী, এত আয়ু পর্যন্ত ছিলাম; সেই আমি তথা হইতে চ্যুত হইয়া অমুকস্থানে উৎপন্ন হইয়াছি; তথায়ও এত আয়ু পর্যন্ত ছিলাম। সেই আমি তথা হইতে চ্যুত হইয়া এখানে উৎপন্ন হইয়াছি।’ এ প্রকারে স-আকার (আকৃতি সহিত) স-উদ্দেশ (নাম সহিত) অনেক প্রকার পূর্বনিবাস অনুস্মরণ করিয়া থাকে। যেমন উদায়ি, কোনো লোক নিজের গ্রাম হইতে অন্য গ্রামে গমন করে, সে গ্রাম হইতেও অন্য গ্রামে যায়, সে গ্রাম হইতে স্বগ্রামে পুনঃ প্রত্যাবর্তন করে। তাহার এরূপ হয় : ‘আমি স্বীয় গ্রাম হইতে অমুক গ্রামে গিয়াছিলাম, তথায় এরূপে দাঁড়াইয়াছি, এরূপে বসিয়াছি, এরূপ ভাষণ করিয়াছি, এরূপ মৌন ছিলাম। সে গ্রাম হইতে অমুক গ্রামে গিয়াছি, তথায়ও এরূপে দাঁড়াইয়াছি,…।”

২৫৮. “পুনশ্চ, উদায়ি,…যথামার্গে প্রতিপন্ন হইয়া আমার শ্রাবকগণ বিশুদ্ধ অমানুষ, দিব্যচক্ষু দ্বারা হীন-প্রণীত, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগত-দুর্গত সত্ত্বকে চ্যুতির সময় ও উৎপত্তির সময় দেখিতে পারে। কর্মানুসারে গতি প্রাপ্ত সত্ত্বগণকে জানিতে পারে, ‘এই সত্ত্ব কায়-দুশ্চরিত যুক্ত, বাক্‌-দুশ্চরিত্র যুক্ত, মনো-দুশ্চরিত্র যুক্ত, আর্যদের নিন্দুক, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন, মিথ্যাদৃষ্টি কর্ম সম্পাদনকারী ছিল; সে দেহত্যাগে মৃত্যুর পর অপায়-দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হইয়াছে। আর এই সকল সত্ত্ব কায়-সুচরিত, বাক্‌-সুচরিত… আর্যদের অনুপবাদক (অনিন্দুক), সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন, সম্যক দৃষ্টিকর্ম সম্পাদনকারী ছিল; তাহারা দেহত্যাগে মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছে। এই প্রকারে… দিব্যচক্ষু দ্বারা দর্শন করে।’ যেমন উদায়ি, সমান দ্বার বিশিষ্ট দুইখানি ঘর, তথায় চক্ষুষ্মান পুরুষ মধ্যস্থানে দাঁড়াইয়া মানুষদিগকে ঘরে প্রবেশ করিতেও, বাহির হইতেও, সঞ্চরণ করিতেও, বিচরণ করিতেও দেখিতে পায়। সেইরূপেই উদায়ি,…।

২৫৯. “পুনশ্চ উদায়ি,… যে মার্গে আরূঢ় হইয়া আমার শ্রাবকেরা আসব রাশির ক্ষয় করিয়া অনাসব চিত্ত-বিমুক্তি, প্রজ্ঞা-বিমুক্তি, ইহজীবনে স্বয়ং প্রত্যক্ষ করিয়া, সাক্ষাৎকার করিয়া, লাভ করিয়া বিহার করে। যেমন উদায়ি, পর্বতশীর্ষে স্বচ্ছ, বিপ্রসন্ন, অনাবিল জলাশয় থাকে; চক্ষুষ্মান পুরুষ তীরে স্থিত হইয়া তথায় শুক্তি (?) শামুক, কাঁকর-পাথর, চলনে ও দাঁড়ান অবস্থায় মৎস্যগুম্বকে দেখিতে পায়। সেইরূপই উদায়ি,…।”

“উদায়ি, ইহারাই সেই পঞ্চবিধ ধর্ম, যে কারণে শ্রাবকগণ আমাকে সৎকার করে, গৌরব করে, সম্মান করে ও পূজা করে; সৎকার ও গৌরব করিয়া আমার আশ্রয়ে বাস করে।”

ভগবান ইহা বলিলেন, সন্তুষ্ট চিত্তে সকুলদায়ি পরিব্রাজক ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করিলেন।

মহা-সকুলদায়ি সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]