২৭৮. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অনাথপিণ্ডিকের আরামে জেতবনে বিহার করিতেছেন।
তখন বেখণস পরিব্রাজক যেখানে ভগবান ছিলেন তথায় গেলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানের সহিত সম্মোদন করিলেন। সম্মোদনীয় কথা সমাপ্ত করিয়া একপ্রান্তে দাঁড়াইলেন, একান্তে দাঁড়াইয়া বেখণস পরিব্রাজক ভগবানের নিকট এই উদান (আনন্দোল্লাসে উচ্চারিত বাক্যাবলি) গান করিলেন, ‘ইহাই পরম বর্ণ’…।”
২৭৯. “সেই পরম বর্ণ কী প্রকার?”
“ভো গৌতম, যে বর্ণ অপেক্ষা অন্য উত্তরিতর বা প্রণীততর বর্ণ নাই, তাহাই পরম বর্ণ।”
“কাত্যায়ন, তাহা কী প্রকার বর্ণ, যে বর্ণ অপেক্ষা উত্তরিতর বা প্রণীততর বর্ণ নাই?”
“ভো গৌতম, যে বর্ণ অপেক্ষা অন্য উত্তরিতর বা প্রণীততর বর্ণ নাই, তাহাই পরম বর্ণ।”
“কাত্যায়ন, তোমার এই বাক্য দীর্ঘ-বিস্তার হইতেছে, ‘ভো গৌতম, যে বর্ণ অপেক্ষা… তাহাই পরম বর্ণ।’ কিন্তু তোমার সে বাক্যকে প্রতিপাদন করিতেছ না। যেমন কাত্যায়ন, কোনো পুরুষ এরূপ বলে, ‘এই জনপদে যে জনপদকল্যাণী (দেশে সুন্দরীদের রাণী) আছে আমি তাহাকে চাই, তাহাকেই কামনা করি।’ তাহাকে যদি (লোকে) এরূপ জিজ্ঞাসা করে, ‘হে পুরুষ, যে জনপদকল্যাণীকে তুমি চাইতেছ, কামনা করিতেছ, তাহাকে জান কি সে ক্ষত্রিয়ানী, ব্রাহ্মণী, বৈশ্যানী কিংবা শূদ্রানী হয়?’ ইহা জিজ্ঞাসা করিলে ‘না’ বলে। তখন তাহাকে যদি জিজ্ঞাসা করে, ‘হে পুরুষ, তুমি যে জনপদকল্যাণীকে চাহিতেছ (সে) কোনো নামের, কোনো গোত্রের হয়? দীর্ঘ, হ্রস্ব বা মধ্যমাকার হয়? কাল, শ্যামা বা মংগুর (রক্ত) বর্ণের হয়? কোনো গ্রাম, নিগম বা নগরে থাকে?’ এরূপ জিজ্ঞাসা করিলে ‘জানি না’ বলে। তখন তাহাকে যদি ইহা জিজ্ঞাসা করে, ‘হে পুরুষ, যাহাকে তুমি জান না, যাহাকে তুমি দেখ নাই, তাহাকে তুমি চাহিতেছ, তাহাকে তুমি কামনা করিতেছ?’ এরূপ জিজ্ঞাসা করিলে ‘হ্যাঁ’ বলে। তাহা কী মনে করো কাত্যায়ন, এইরূপ বলিলে সে পুরুষের বাক্য অর্থহীন হয় নহে কি?”
“নিশ্চয় ভো গৌতম, এরূপ বলিলে সে পুরুষের বাক্য অর্থহীন হইয়া থাকে।”
“কাত্যায়ন, তুমি তদ্রূপই বলিতেছ, ‘ভো গৌতম, যে বর্ণ অপেক্ষা… উহা পরম বর্ণ।’ কিন্তু সে বর্ণকে প্রতিপাদন করিতেছ না।”
“যেমন হে গৌতম, শুভ্র, উত্তমজাতীয়, অষ্টাংশ, মসৃণকৃত, বৈদুর্যমণি (হীরা)… ।”
“… অথচ কাত্যায়ন, তুমি যাহা জোনাকীপোকার চেয়ে হীনতর, নিকৃষ্টতর বর্ণ, উহাকেই পরম বর্ণ বলিতেছ; কিন্তু সে বর্ণ প্রমাণ করিতেছ না।”
২৮০. কাত্যায়ন, এই পঞ্চ কামগুণ (বিষয় ভোগ)। কোন পঞ্চ? (১) ইষ্ট, কান্ত,… চক্ষু দ্বারা বিজ্ঞেয় রূপ, (২)… শ্রোত্র বিজ্ঞেয় শব্দ, (৩)… ঘ্রাণ বিজ্ঞেয় গন্ধ, (৪)… জিহ্বা বিজ্ঞেয় রস, (৫)… কায় বিজ্ঞেয় স্পৃষ্টব্য। কাত্যায়ন, এই পঞ্চ কামগুণ। এই পঞ্চ কামগুণ সংস্রবে যে সুখ-সৌমনস্য উৎপন্ন হয়, উহাকে কামসুখ বলে। এই প্রকারে কাম হইতে কামসুখ, কামসুখ হইতে কামাগ্র-সুখই এখানে শ্রেষ্ঠ বলা যায়।”
এরূপ উক্ত হইলে বেখণস পরিব্রাজক ভগবানকে বলিলেন, “আশ্চর্য ভো গৌতম, অদ্ভুত ভো গৌতম, মাননীয় গৌতমের কেমন সুভাষিত বাক্য, ‘কাম হইতে কামসুখ আর কামসুখ হইতে কামাগ্র-সুখ শ্রেষ্ঠ বলা যায়।’”
“কাত্যায়ন, তোমার ন্যায় অন্য দৃষ্টিক (অন্য মতাবলম্বী), অন্য ক্ষান্তিক, অন্য রুচিক, অন্যত্রযোগী, অন্যথা আচার্যক (ভিন্ন জ্ঞানীর) পক্ষে কাম, কাম-সুখ কামাগ্র-সুখ, ইহা জানা দুষ্কর। কাত্যায়ন, যে-সকল ভিক্ষু অর্হৎ, ক্ষীণাসব, পরিপূর্ণ ব্রহ্মচারী, কৃতকৃত্য, ভারমুক্ত, অনুপ্রাপ্ত সদর্থ, পরিক্ষীণ ভব সংযোজন, সম্যকজ্ঞান দ্বারা বিমুক্ত তাহারাই ইহা কাম, কাম-সুখ এবং কামাগ্র-সুখ বলিয়া জানিতে সমর্থ।”
২৮১. এইরূপ উক্ত হইলে বেখণস পরব্রিাজক কোপিত অসন্তুষ্ট চিত্ত হইয়া ভগবানকেই ভর্ৎসনা মানসে ভগবানের প্রতি আক্রোশবশত ভগবানকেই বলিবার ইচ্ছায় ‘শ্রমণ গৌতমই (অজ্ঞতা) প্রাপ্ত হইবে’ (ভাবিয়া) ভগবানকে ইহা বলিলেন, “এই প্রকারই এক্ষেত্রে কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্ত (আরম্ভ) না জানিয়া, অপরান্ত (শেষ) না দেখিয়াই এই প্রকার অঙ্গীকার (দাবি) করে, ‘জন্ম ক্ষীণ হইয়াছে, ব্রহ্মচর্যবাস সমাপ্ত হইয়াছে, কর্তব্য করা হইয়াছে, ইহার জন্য আর কর্তব্য নাই, ইহা আমরা জানি।’ তাহাদের এই ভাষণ হর্ষকরই (হাস্যজনক) প্রতিপন্ন হয়, নিরর্থক, রিক্ত ও তুচ্ছই প্রতিপন্ন হয়।”
“কাত্যায়ন, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্ত, না জানিয়া, অপরান্ত না দেখিয়া এই অস্বীকার করে যে, ‘জন্ম ক্ষীণ হইয়াছে… ইহা আমরা জানি।’ উহাদের ইহা ধার্মিক নিগ্রহ হইয়া থাকে। কাত্যায়ন, থাক পূর্বান্ত, (পূর্বনিবাসানুস্মৃতি), থাক অপরান্ত (দিব্যচক্ষু), অশঠ, অমায়াবী, কোনো সরল বিজ্ঞপুরুষ আসুক; আমি তাহাকে অনুশাসন করি, ধর্মোপদেশ করি। (আমার) অনুশাসনানুরূপ আচরণ করিলে অচিরেই নিজে উপলব্ধি করিবে, স্বয়ং প্রত্যক্ষ করিবে : ‘অবিদ্যা বন্ধন হইতে এই প্রকারেই সম্যক বন্ধনমুক্ত হইয়া থাকে।’ যেমন কাত্যায়ন, উত্তানশায়ী অবোধ অল্পবয়স্ক শিশুর (দুই হস্ত, দুই পাদ) আর পঞ্চম স্থানীয় কণ্ঠে সূত্র-বন্ধনে আবদ্ধ থাকে, উহার বয়ঃবৃদ্ধির পর ইন্দ্রিয় (জ্ঞান) পরিপক্ব হইলে সেই বন্ধনসমূহ ছিন্ন হয়। সে ‘মুক্ত হইয়াছি, বন্ধন আর নাই’ ইহা জানিতে পারে। এই প্রকারেই কাত্যায়ন!… কোনো বিজ্ঞপুরুষ আসুক… স্বয়ং প্রত্যক্ষ করিবে, এই প্রকারে অবিদ্যা বন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া থাকে।”
এরূপ উক্ত হইলে বেখণস পরিব্রাজক ভগবানকে ইহা বলিলেন, “আশ্চর্য ভো গৌতম, অতি চমৎকার ভো গৌতম!… মাননীয় গৌতম, আজ হইতে আমাকে আজীবন শরণাগত উপাসকরূপে ধারণা করুন।”
বেখণস সূত্র সমাপ্ত।
তৃতীয় পরিব্রাজক বর্গ সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ