(কল্যাণ-মার্গ)
৩০৮. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান মিথিলায় মঘদেব আম্রবনে বিহার করিতেছিলেন।
ভগবান একস্থানে মৃদু হাসিলেন। তখন আয়ুষ্মান আনন্দের এরূপ চিন্তা হইল : ‘ভগবানের মৃদু হাসি প্রকাশের কী হেতু, কী কারণ? তথাগত কারণ বিনা মৃদু হাসি প্রকাশ করেন না।’ তখন আয়ুষ্মান আনন্দ চীবর একাংশ করিয়া যেদিকে ভগবান,… সেই দিকে অঞ্জলিবদ্ধ করিয়া ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, ভগবানের স্মিতহাস্য প্রকাশের কারণ কী… ?”
“আনন্দ, অতীতকালে এই মিথিলাতে মঘদেব নামক ধার্মিক ধর্মরাজা ছিলেন। (তিনি) ধর্মে (দশ কুশল কর্মপথে) স্থিত মহারাজা, ব্রাহ্মণ গৃহপতিদের প্রতি, নিগমবাসীদের প্রতি এবং জনপদবাসীদের প্রতিও সম-আচরণ করিতেন। চতুর্দশী (অমাবস্যা), পঞ্চদশী (পূর্ণিমা) এবং পক্ষের অষ্টমী তিথিতে উপোসথ (উপবাস ব্রত) পালন করিতেন।
তখন আনন্দ, রাজা মঘদেব বহু বর্ষের… পর নাপিতকে বলিলেন, ‘সৌম্য কল্পক, যখন আমার মস্তকে পক্বকেশ দেখিবে তখন আমাকে বলিবে।’
তখন আনন্দ, বহু বর্ষের… পর নাপিত তাহা দেখিল এবং রাজাকে বলিল।
‘তাহা হইলে সৌম্য নাপিত, সাঁড়াশী দ্বারা সযত্নে তুলিয়া পক্বকেশগুলি আমার হাতে দাও।’
নাপিত তাহা… রাজার হস্তে, দিল।
৩০৯. তখন আনন্দ, রাজা মঘদেব নাপিতকে শ্রেষ্ঠ গ্রাম উপহার দিয়া জ্যেষ্ঠপুত্র কুমারকে… ডাকাইয়া ইহা বলিলেন, “তাত কুমার, আমার দেব (মৃত্যু) দূত প্রাদুর্ভূত হইয়াছে, শিরে পক্ককেশ দেখা দিয়াছে। আমার মনুষ্য-কাম ভোগ হইয়াছে, এখন দিব্য-কাম অন্বেষণের সময়। এসো, তাত কুমার, তুমি এই রাজ্যভার গ্রহণ করো। আমি কেশশ্মশ্রু মুণ্ডন করিয়া, কাষায়বস্ত্র পরিহিত হইয়া আগার হইতে অনাগারিক প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিব। তাত, তুমিও যখন শিরে পক্ককেশ দেখিতে পাও তখন নাপিতকে উপহার দিয়া জ্যেষ্ঠপুত্র কুমারকে… রাজ্যভার অর্পণ করিয়া…প্রব্রজিত হইও। আমার স্থাপিত এই কল্যাণব্রত অনুবর্তন করিও তুমি কখনো অন্তিম পুরুষ হইও না। একবংশ সম্ভূত যেই পুরুষের বিদ্যমানে এতাদৃশ কল্যাণব্রতের সমুচ্ছেদ হয়, সে-ই তাহাদের অন্তিম পুরুষ। তাত কুমার, তোমাকে তাহা হইতে বলি না…।’
অতঃপর আনন্দ, রাজা মঘদেব নাপিতকে এক উত্তম গ্রাম উপহার দিয়া, জ্যেষ্ঠপুত্র কুমারকে সুন্দরভাবে রাজত্বের অনুশাসন করিলেন এবং এই মঘদেব আম্রবনে…প্রব্রজিত হইলেন। তিনি তথায় মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা-সহগত চিত্ত দ্বারা সকলদিক বিস্ফারিত করিয়া বাস করিতেন।… তিনি চতুর্বিধ ব্রহ্মবিহার ভাবনা করিয়া ব্রহ্মলোকে উৎপন্ন হইলেন।
৩১০-৩১১. আনন্দ, রাজা মঘদেবের পুত্র নেমী…, রাজা মঘদেবের পরম্পরাতে পুত্র-পৌত্রাদি এই মঘদেব… আম্রবনে কেশশ্মশ্রু মুণ্ডন করিয়া… প্রব্রজিত ও ব্রহ্মলোকপরায়ণ হইয়াছেন।
৩১২. আনন্দ, পুরাকালে সুধর্মা নামক সভাতে সম্মিলিত দেবগণের মধ্যে এই প্রসঙ্গ উৎপন্ন হইল, ‘আহা, বিদেহবাসীদের একান্তই লাভ, যাহাদের নেমীর ন্যায় ধার্মিক ধর্মরাজা, ধর্মেস্থিত। মহারাজা আছেন;…।’
আনন্দ, দেবেন্দ্র শক্র তাবত্রিংশবাসী দেবতাদিগকে আহ্বান করিলেন, ‘মারিসগণ, তোমরা রাজা নেমীকে দেখিতে চাও কি?… আজ রাজা পঞ্চদশীর উপোসথ গ্রহণ করিয়া প্রাসাদোপরে উপবিষ্ট আছেন।…।’ তখন দেবরাজ শক্র রাজা নেমীর নিকট উপস্থিত হইলেন।… ‘মহারাজ, তাবস্ত্রিংশ স্বর্গবাসী দেবগণ আপনাকে দেখিতে ইচ্ছুক। মহারাজ, আপনার জন্য আমি সহস্র অশ্বযুক্ত শ্রেষ্ঠ রথ পাাইয়া দিব। আপনি অকম্পিত হৃদয়ে আরোহণ করিবেন।’ নেমীরাজের স্বীকৃতি অবগত হইয়া দেবরাজ দেবলীলায় তাবত্রিংশ দেবলোকে চলিয়া গেলেন।
৩১৩. তৎপর দেবেন্দ্র শক্র সেবক মাতলীকে বলিলেন, ‘সৌম্য মাতলি, রথ লইয়া রাজা নেমীকে লইয়া আস।’ ‘হ্যাঁ, দেব!’ বলিয়া মাতলী… নেমী রাজার নিকট গিয়া বলিলেন, ‘মহারাজ, আপনাকে কোনো পথে নিব? পাপীর পাপফল ভোগের পথে কিংবা পুণ্যাত্মার পুণ্যফল ভোগের পথে?’
‘মাতলি, উভয়দিক দেখাইয়া আমাকে নিয়া যান।’
…, আনন্দ, মাতলী নেমীরাজকে সুধর্মা সভায় পৌঁছাইলেন। দেবরাজ তাঁহাকে স্বাগত সম্ভাষণ জানাইলেন।… ‘মহারাজ, দেবগণের সঙ্গে দেবানুভাবে আপনি অভিরমিত হউন।
৩১৪. ‘না, মারিস, আমাকে মিথিলাতেই পুনঃ পাইয়া দেন।’… নেমীরাজকে মিথিলাতেই পাানো হইল।
৩১৫. আনন্দ, নেমীও এই মঘদেব আম্রবনে প্রব্রজিত হইয়াছিলেন। আনন্দ, রাজা নেমীর কলার-জনক নামক পুত্র ছিলেন। তিনি প্রব্রজিত হন নাই, কল্যাণব্রত সমুচ্ছেদ করিলেন এবং তিনিই ছিলেন তাঁহাদের অন্তিম পুরুষ…।
৩১৬. আনন্দ, হয়তো তোমার মনে হইতে পারে সেই সময় অপর কেহ রাজা মঘদেব ছিলেন, যিনি এই কল্যাণব্রত প্রতিষ্ঠা করেন। আনন্দ, তাহা তদ্রূপ মনে করিও না, আমিই তখন মঘদেব রাজা ছিলাম, আর কল্যাণব্রত প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলাম। আমার প্রতিষ্ঠিত কল্যাণব্রতের পশ্চিম জনতা অনুবর্তন করিয়াছে। কিন্তু আনন্দ, সেই কল্যাণব্রত নির্বেদ, বিরাগ, নিরোধ, উপশম, অভিজ্ঞা, সম্বোধি কিংবা নির্বাণের নিমিত্ত সংবর্তিত হয় নাই, তাহা কেবল ব্রহ্মলোকে উৎপত্তির উপায়।
আনন্দ, এই সময় আমি যে কল্যাণব্রত প্রতিষ্ঠা করিয়াছি, তাহা একান্ত নির্বেদ… নির্বাণার্থ সংবর্তিত হয়। আনন্দ, বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠিত কল্যাণব্রত কি যাহা… নির্বাণের উপায় হয়? এই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই; যথা : সম্যক দৃষ্টি, সংকল্প, বাক্য, কর্ম, আজীব, বীর্য, স্মৃতি ও সমাধি, ইহাই আনন্দ, কল্যাণব্রত যাহা আমি স্থাপন করিয়াছি। আনন্দ, তোমাদিগকে আমি নিশ্চিত বলিতেছি, আমার প্রতিষ্ঠিত এই কল্যাণব্রতের অনুবর্তন করো। তোমরা আমার অন্তিম পুরুষ হইও না।”
ভগবান ইহা বলিলেন। আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করিলেন।
মঘদেব সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ