(বর্ণ-ব্যবস্থার খণ্ডন)
৩১৭. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন (উত্তর) মধুরায় (মথুরায়) গুন্দাবনে বিহার করিতেছেন।
মাথুররাজ অবন্তিপুত্র শুনিলেন যে শ্রমণ কাত্যায়ন মথুরায় গুন্দাবনে বিহার করিতেছেন। সেই মাননীয় কাত্যায়নের এরূপ কল্যাণকীর্তি-শব্দ উদ্গত হইয়াছে, ‘তিনি পণ্ডিত, ব্যক্ত, মেধাবী, বহুশ্রুত, বিচিত্রকথী, কল্যাণ-প্রতিভাবান, বৃদ্ধ আর অর্হৎ হন। তথাবিধ অর্হৎদের দর্শন সাধু হয়।’
তখন রাজামাথুর অবন্তিপুত্র উত্তমোত্তম যান সজ্জিত করিয়া… আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নকে দর্শনার্থ মথুরা হইতে বাহির হইলেন। যে পর্যন্ত যানের রাস্তা ছিল, সে পর্যন্ত যানে গিয়া (পুন) যান হইতে অবতরণ করিয়া পদব্রজেই যেখানে আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন ছিলেন, তথায়… যাইয়া আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নের সহিত… সম্মোদন করিয়া একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে বসিয়া রাজা অবন্তিপুত্র আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নকে বলিলেন, “ভো কাত্যায়ন, ব্রাহ্মণেরা বলিয়া থাকেন, ‘ব্রাহ্মণই উত্তমবর্ণ, অপরবর্ণ হীন; ব্রাহ্মণই শুক্লবর্ণ, অপরবর্ণ কৃষ্ণ; ব্রাহ্মণই শুদ্ধ হয়, অব্রাহ্মণেরা নহে; ব্রাহ্মণেরাই ব্রহ্মার ঔরস-পুত্র, মুখ-জাত, ব্রহ্মজ, ব্রহ্ম-নির্মিত ও ব্রহ্মের দায়াদ হন।’ এ সম্বন্ধে মাননীয় কাত্যায়ন কী বলেন?”
“মহারাজ, ইহা জগতে ঘোষণা (ব্যবহার) মাত্র…। তাহাও মহারাজ, পর্যায়ানুসারে জানিতে হইবে যে জগতে যে কিংবদন্তি আছে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ অন্যবর্ণ হীন…।
৩১৮. তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, যদি ক্ষত্রিয় ধন, ধান্য, স্বর্ণ কিংবা রৌপ্য দ্বারা সমৃদ্ধ হয়; তবে তাহার পূর্বে উত্থানশীল, পশ্চাতশায়ী (মালিকের পূর্বে উত্থানশীল ও পশ্চাতে শয়নকারী), কিংকর্তব্য-জিজ্ঞাসু, মনাপচারী (মনের মতো আচরণকারী), প্রিয়ভাষী অপর ক্ষত্রিয়ও চাকর হইবে নহে কি? ব্রাহ্মণও… ? বৈশ্যও… ? শূদ্রও… ?”
“হে কাত্যায়ন, যদি ক্ষত্রিয়ও…সমৃদ্ধ হয়, তবে অপর ক্ষত্রিয়ও তাঁহার… প্রিয়বাদী ও বাধ্য হইবে; ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্রও হইবে।”
“তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, ব্রাহ্মণ যদি ধন… দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, তবে ব্রাহ্মণও তাঁহার মত… প্রিয়বাদী হইবে নহে কি? বৈশ্য, শূদ্র, ক্ষত্রিয়ও… হইবে নহে কি?”
“হে কাত্যায়ন, যদি ব্রাহ্মণও… সমৃদ্ধ হয়, তবে অপর ব্রাহ্মণও তাঁহার… প্রিয়বাদী হইবে। বৈশ্য, শূদ্র, ক্ষত্রিয়ও…।”
“মহারাজ, বৈশ্য যদি… সমৃদ্ধ হয়… ?”
“হে কাত্যায়ন, যদি বৈশ্যও…সমৃদ্ধ হয়, তবে অপর বৈশ্যও তাঁহার… প্রিয়বাদী হইবে। শূদ্র, ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণও…।”
“মহারাজ, শূদ্র যদি… সমৃদ্ধ হয়…?”
“হে কাত্যায়ন, যদি শূদ্রও… সমৃদ্ধ হয়, তবে অপর শূদ্রও তাঁহার… প্রিয়বাদী হইবে। ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, বৈশ্যও হইবে।”
“তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, যদি এরূপ হয়, তবে এই চারি বর্ণ সম-সম হয় অথবা নহে? এ সম্বন্ধে আপনার কী অভিমত?”
“নিশ্চয় হে কাত্যায়ন, এরূপ হইলে এই চারি বর্ণ সম-সম। আমি ইহাতে কোনো প্রভেদ দেখিতেছি না।”
“মহারাজ, এই কারণেই আপনার জানা উচিত : ‘ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, অন্যবর্ণ হীন… দায়াদ, ইহা জগতে প্রবাদ মাত্র।”
৩১৯. “তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, এখানে ক্ষত্রিয় প্রাণিহিংসুক, চোর, ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী, পিশুনভাষী, কর্কশভাষী, সম্প্রলাপী অভিধ্যালু, বিদ্বেষ-চিত্ত ও মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন হয়, তবে দেহত্যাগে মৃত্যুর পর… নরকে উৎপন্ন হইবে কিংবা না হইবে?” ইহাতে আপনার কী অভিমত?”
“হে কাত্যায়ন, ক্ষত্রিয়ও যদি প্রাণিহিংসুক হয়, তবে সে… নরকে উৎপন্ন হইবে। ইহা আমার অভিমত, অথচ ইহা আমি অর্হৎদের নিকটও শুনিয়াছি।”
“সাধু, সাধু, (ঠিক) মহারাজ, এ সম্বন্ধে আপনার অভিমত ঠিক, আর আপনি অর্হৎগণ হইতে ঠিকই শুনিয়াছেন।”
তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, এখানে ব্রাহ্মণ প্রাণিহিংসুক…। বৈশ্য প্রাণিহিংসুক…। শূদ্র প্রাণিহিংসুক…হয়, তবে সে নরকে উৎপন্ন হইবে কিংবা হইবে না? ইহাতে আপনার কী অভিমত?”
“হে কাত্যায়ন!… শূদ্রও যদি প্রাণিহিংসুক হয়, তবে সে নরকে উৎপন্ন হইবে; ইহাই আমার অভিমত, অর্হৎদের কাছেও আমি এরূপ শুনিয়াছি।”
“সাধু, সাধু, মহারাজ, ঠিকই আপনার অভিমত, আর অর্হৎদের কাছেও ইহা ঠিকই শুনিয়াছেন।”
“কী মনে করেন, মহারাজ, এরূপ হইলে এখানে চারি বর্ণ সম-সম হয় কি না হয়? এ সম্বন্ধে আপনার মত কী?”
“নিশ্চয়, হে কাত্যায়ন, এরূপ হইলে এক্ষেত্রে চারি বর্ণ সম-সম, এখানে আমি কোনো প্রভেদ দেখি না।”
“এ কারণেও মহারাজ, আপনার বুঝা উচিত যে ইহা প্রবাদ মাত্র, ‘ব্রাহ্মণই শ্রেষ্ঠবর্ণ… ব্রহ্মার দায়াদ।’”
৩২০. “তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, এখানে কোনো ক্ষত্রিয় প্রাণিহিংসা হইতে বিরত হয়, চুরি হইতে, কাম মিথ্যাচার হইতে, মিথ্যাবাদ হইতে, পিশুন, কর্কশ, সম্প্রলাপ হইতে বিরত হয়; অলোভ, অদ্বেষ ও সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন (সত্য-মতাবলম্বী) হয়, তবে (সে) দেহত্যাগে মৃত্যুরপর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইবে কিংবা হইবে না? ইহাতে আপনার কী মত?”
“হে কাত্যায়ন, ক্ষত্রিয়ও যদি প্রাণিহিংসা হইতে বিরত হয়… সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন হয়, তবে স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইবে। ইহাই আমার মত, অর্হৎদের নিকটও আমি ইহা শুনিয়াছি।”
“সাধু, সাধু, মহারাজ!… আপনি অর্হৎদের নিকট ঠিকই শুনিয়াছেন।
তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, এখানে কোনো ব্রাহ্মণ…, বৈশ্য…, শূদ্র… প্রাণিহিংসা হইতে বিরত হয়… সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন হয়, তবে স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইবে কি না হইবে?”
“… উৎপন্ন হইবে…।”
“মহারাজ, এরূপ হইলে চারি বর্ণ সম-সম কি নহে?… ?”
“নিশ্চয়, ভো কাত্যায়ন!”
“এই কারণেও মহারাজ, আপনার বুঝা উচিত যে জগতে ইহা প্রবাদ মাত্র, ‘ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠবর্ণ… ব্রহ্মার দায়াদ।’”
৩২১. “তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, কোনো ক্ষত্রিয় সন্ধিচ্ছেদ করে (সিঁধ কাটে), গ্রাম লুণ্ঠন করে, ডাকাতি করে, দস্যুবৃত্তি করে, পরস্ত্রী-গমন করে। রাজপুরুষেরা তাহাকে ধরিয়া আপনাকে দেখায়, ‘দেব, এই ব্যক্তিই আপনার অপরাধী চোর, ইহার সমুচিত দণ্ড বিধান করুন।’ তখন আপনি উহার কী করিবেন?”
“হে কাত্যায়ন, আমি উহাকে প্রাণদণ্ড, বন্ধনাগার কিংবা নির্বাসন দণ্ড বিধান করিব অথবা যথাপরাধ শাস্তি ঘোষণা করিব। ইহার কারণ কী? হে কাত্যায়ন, পূর্বে তাহার যে ক্ষত্রিয় সংজ্ঞা ছিল, উহা এখন অন্তর্হিত হইয়াছে। এখন চোরই তাহার সংজ্ঞা।”
“কী মনে করেন, মহারাজ, কোনো ব্রাহ্মণ…, বৈশ্য…, শূদ্র… সন্ধিচ্ছেদ করে… তবে আপনি তাহাকে কী করিবেন?”
“হে কাত্যায়ন, আমি তাহাকে দণ্ড দিব,… চোরই তাহার নাম।”
“কী মনে করেন, মহারাজ, এরূপ হইলে চারি বর্ণ সম-সম হয় কিংবা হয় না?”
“নিশ্চয়, হে কাত্যায়ন, সম-সম হয়।”
“এই কারণেই মহারাজ, আপনার বুঝা উচিত যে জগতে ইহা প্রবাদ মাত্র, ‘ব্রাহ্মণই শ্রেষ্ঠবর্ণ… ব্রহ্মার দায়াদ।’”
৩২২. “তাহা কী মনে করেন, মহারাজ, এখানে কোনো ক্ষত্রিয় কেশশ্মশ্রু মুণ্ডন করিয়া কাষায় বসন পরিধানপূর্বক আগার হইতে অনাগারিকভাবে প্রব্রজিত হয়। সে প্রাণিহিংসা হইতে বিরত, অদত্তদান… মৃষাবাদ হইতে বিরত হয়, একাহারী, ব্রহ্মচারী, শীলবান (সদাচারী), কল্যাণধর্মা হয়, তবে তাহার সাথে আপনি কী ব্যবহার করিবেন?”
“হে কাত্যায়ন, অভিবাদন, প্রত্যুত্থান করিব; আসন দ্বারা নিমন্ত্রণ করিব, চীবর-পিণ্ডপাত (ভিক্ষা), শয়ন-আসন, গিলান-প্রত্যয় (রোগে পথ্য ও ভৈষজ্য) প্রদান করিব, তাঁহার ধার্মিক রক্ষাবরণ-গুপ্তির সংবিধান করিব। কারণ কী? হে কাত্যায়ন, পূর্বে যে উহার ক্ষত্রিয় সংজ্ঞা ছিল এখন তাহা অন্তর্হিত হইয়াছে। এখন শ্রমণই তাঁহার সংজ্ঞা।”
“মহারাজ, কোনো ব্রাহ্মণ…, বৈশ্য…, শূদ্র কেশশ্মশ্রু মুণ্ডন করিয়া…প্রব্রজিত হয়,… কল্যাণধর্মা (পুণ্যাত্মা) হয়, তবে তাহাকে কী করিবেন?”
“হে কাত্যায়ন, অভিবাদন… করিব, তাঁহাদের ধার্মিক রক্ষা… সম্পাদন করিব। কারণ কী? হে কাত্যায়ন, পূর্বে তাঁহাদের যে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র সংজ্ঞা ছিল, উহা এখন অন্তর্হিত হইয়াছে। আজ শ্রমণই তাঁহাদের সংজ্ঞা।”
“কী মনে করেন, মহারাজ, এরূপ হইলে চারি বর্ণ সম-সম হয় কিংবা নহে?… ?”
“নিশ্চয়, হে কাত্যায়ন,”
“এই প্রকারেও মহারাজ, আপনার বুঝা উচিত যে জগতে ইহা প্রবাদ মাত্র, ‘ব্রাহ্মণই শ্রেষ্ঠবর্ণ… ব্রহ্মার দায়াদ।’”
৩২৩. এইরূপ উক্ত হইলে… রাজা অবন্তিপুত্র আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নকে বলিলেন, “আশ্চর্য, হে কাত্যায়ন, অতি চমৎকার, হে কাত্যায়ন, যেমন অধঃমুখকে ঊর্ধ্ব করিলেন… এই প্রকারেই মাননীয় কাত্যায়ন, অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশ করিলেন, এই আমি মাননীয় কাত্যায়নের শরণ লইলাম, ধর্ম ও ভিক্ষুসংঘেরও। মাননীয় কাত্যায়ন, আজ হইতে আমাকে অঞ্জলিবদ্ধ শরণাগত উপাসকরূপে স্বীকার করুন।”
“মহারাজ, আপনি আমার শরণ গ্রহণ করিবেন না। আপনি সেই ভগবানেরই শরণ গ্রহণ করুন, যাঁহার শরণ আমিও গ্রহণ করিয়াছি।”
“হে কাত্যায়ন, সেই ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ বর্তমানে কোথায় বাস করিতেছেন?”
“মহারাজ, সেই অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ বর্তমানে পরিনির্বাপিত।”
“হে কাত্যায়ন, যদি আমরা শুনিতাম সেই ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ দশ যোজন দূরে আছেন, তবে আমরা সেই ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের দর্শনার্থ দশ যোজনও যাইতাম, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, শতযোজনও… যাইতাম। যেহেতু হে কাত্যায়ন, সেই ভগবান মহাপরিনির্বাপিত হইয়াছে, তথাপি আমরা নির্বাণ প্রাপ্ত সেই ভগবানের শরণ লইলাম, ধর্ম ও ভিক্ষুসংঘেরও। আজ হইতে মাননীয় কাত্যায়ন!… আমাকে আজীবন শরণাগত উপাসকরূপে ধারণা করুন।”
মধুর সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ