বুদ্ধ-জীবনী (গৃহত্যাগ হইতে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি পর্যন্ত)
৩২৪. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান ভর্গদেশে সুংসুমারগিরির ভেস-কলাবন মৃগদাবে বিহার করিতেছেন।
সেই সময় বোধি রাজকুমারের কোকনদ নামক প্রাসাদ অচিরে নির্মিত হইয়াছে, এখনো কোনো শ্রমণ, ব্রাহ্মণ কিংবা কোনো মনুষ্যজাতির অব্যবহৃত। তখন বোধি রাজকুমার সঞ্জিকাপুত্র মাণককে আহ্বান করিলেন, “এস তুমি, সৌম্য সঞ্জিকাপুত্র, যেখানে ভগবান আছেন, তথায় যাও; গিয়া আমার বচনে ভগবানের পায়ে নতশিরে বন্দনা করো। আরোগ্য, অনাতঙ্ক, লঘুস্থান (শারীরিক কার্যক্ষমতা), বল ও সুখ-বিহার জিজ্ঞাসা করো, ‘ভন্তে, রাজকুমার বোধি ভগবানের চরণে নতশিরে বন্দনা করিয়া আরোগ্য… জিজ্ঞাসা করিয়াছেন।’”
“হ্যাঁ, প্রভু,” বলিয়া প্রতিশ্রুত হইয়া সঞ্জিকাপুত্র মানবক যেখানে ভগবান আছেন, তথায় গেলেন; গিয়া ভগবানের সহিত সম্মোদন করিলেন… (কুশল প্রশ্ন)… জিজ্ঞাসা করিয়া একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট সঞ্জিকাপুত্র মানবক ভগবানকে বলিলেন, “ভো গৌতম, বোধি রাজকুমার আপনার চরণে…। বোধি রাজকুমারের গৃহে আগামী কল্যের ভোজন স্বীকার করুন।”
ভগবান মৌনভাবে স্বীকার করিলেন।
তখন সঞ্জিকাপুত্র মানবক ভগবানের স্বীকৃতি অবগত হইয়া আসন হইতে উঠিয়া যেখানে বোধি রাজকুমার ছিলেন তথায় গেলেন, গিয়া বোধি রাজকুমারকে বলিলেন, “আপনার বাক্যানুসারে আমি সেই ভগবান গৌতমকে বলিয়াছি, ‘ভো গৌতম, বোধি রাজকুমার আপনার পাদপদ্মে প্রণাম করিয়াছেন…।’ শ্রমণ গৌতম নিমন্ত্রণ স্বীকার করিয়াছেন।”
৩২৫. তখন বোধি রাজকুমার সেই রাত্রি গত হইলে স্বীয় প্রাসাদে উত্তম খাদ্য-ভোজ্য প্রস্তুত করাইয়া কোকনদ প্রাসাদকে সিঁড়ির নিচে পর্যন্ত বস্ত্রাচ্ছাদিত করাইয়া সঞ্জিকাপুত্র মানবককে আহ্বান করিলেন, “এস, সৌম্য সঞ্জিকাপুত্র, ভগবানের নিকট উপস্থিত হও, গিয়া ভগবানকে সময় জ্ঞাপন কর- ‘ভন্তে, সময় হইয়াছে, ভাত প্রস্তুত আছে।’”
“হ্যাঁ, প্রভু,”… সময় জ্ঞাপন করিলেন…।
তখন ভগবান পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিধান করিয়া পাত্র-চীবর ধারণ করিয়া যেখানে বোধি রাজকুমারের নিবাস তথায় উপস্থিত হইলেন। সেই সময় বোধি রাজকুমার ভগবানের আগমন প্রতীক্ষা করিয়া বহির্দ্বার কোষ্ঠকে (নহবৎ খানার বাহিরে) দাঁড়াইলেন। বোধি রাজকুমার দূর হইতে ভগবানকে আসিতে দেখিলেন, দেখিয়া প্রত্যুৎগমন করিলেন, ভগবানকে অভিবাদন করিলেন, এবং ভগবানকে সম্মুখে রাখিয়া যেখানে কোকনদ প্রসাদ তথায় লইয়া গেলেন। তখন ভগবান নিচে সিঁড়ির পার্শ্বে দাঁড়াইলেন। তখন বোধি রাজকুমার ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, ভগবান, বস্ত্রে আরোহণ করুন। সুগত, বস্ত্রের উপর দিয়া চলুন। তাহা আমার দীর্ঘকাল হিতসুখের কারণ হউক।”
এরূপ বলিলে ভগবান নীরব রহিলেন।
দ্বিতীয়বার তৃতীয়বারও বোধি রাজকুমার অনুরোধ করিলেন।
৩২৬. অতঃপর ভগবান আয়ুষ্মান আনন্দের দিকে চাহিলেন। আয়ুষ্মান আনন্দ বোধি রাজকুমারকে বলিলেন, “রাজকুমার, বস্ত্রসমূহ তুলিয়া লউন। ভগবান বস্ত্রখণ্ডের (চেলপতিং) উপর দিয়া যাইবেন না। তথাগত পরবর্তী জনতার প্রতি লক্ষ করিতেছেন।”
তখন বোধি রাজকুমার কাপড়সমূহ অপসারণ করাইয়া কোকনদ প্রাসাদের উপর আসন সজ্জিত করাইলেন। ভগবান কোকনদ প্রাসাদে আরোহণ করিয়া ভিক্ষুসংঘের সহিত সজ্জিত আসনে উপবেশন করিলেন। তখন বোধি রাজকুমার বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষুসংঘকে উত্তম খাদ্য-ভোজ্য দ্বারা সহস্তে, সন্তর্পিত করিলেন, সন্তুষ্ট করিলেন। ভোজনের পর ভগবান পাত্র হইতে হস্ত উত্তোলন করিলে বোধি রাজকুমার এক নিচ আসন লইয়া একপ্রান্তে বসিলেন, একপ্রান্তে উপবিষ্ট বোধি রাজকুমার ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, আমার এ ধারণা হয় যে ‘সুখ দ্বারা সুখ লাভ হয় না, দুঃখ দ্বারা সুখ লাভ হয়।’”
৩২৭. “রাজকুমার, সম্বোধি লাভের পূর্বে অনভিসম্বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্ব অবস্থায় আমারও এই ধারণাই ছিল, ‘সুখে সুখ অধিগম্য নহে, দুঃখে সুখ অধিগম হয়।’ এই কারণে রাজকুমার, সেই সময় আমি দহর (তরুণ) অবস্থায়ই গাঢ় কালকেশ ভদ্র যৌবনসম্পন্ন প্রথম বয়সে অশ্রুমুখে রোদনপরায়ণ মাতাপিতার অনিচ্ছা সত্বে কেশশ্মশ্রু মুণ্ডন করিয়া কাষায় বস্ত্র আচ্ছাদিত হইয়া আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হইয়াছি। এই প্রকারে প্রব্রজিত হইয়া ‘কুশল কী?’ তাহার অন্বেষণে এবং অনুত্তর বর শান্তিপদ (নির্বাণ) অনুসন্ধান মানসে আলাড়কালামের নিকট উপস্থিত হই, উপস্থিত হইয়া আলাড়কালামকে বলিলাম, ‘বন্ধু কালাম, আপনার এই ধর্মবিনয়ে আমি ব্রহ্মচর্যবাস করিতে ইচ্ছা করি।’ এরূপ বলিলে রাজকুমার, আলাড়কালাম আমাকে বলিলেন, ‘বিহার করুন আয়ুষ্মান। তাদৃশ এই ধর্মতত্ত্ব, যাহাতে বিজ্ঞপুরুষ অচিরেই স্বীয় আচার্যত্বকে অভিজ্ঞা দ্বারা স্বয়ং সাক্ষাৎকার ও লাভ করিয়া বিহার করিতে পারেন।’
রাজকুমার, অচিরেই, অতি সত্ত্বরই আমি সেই ধর্মবিনয় আয়ত্ত করি। রাজকুমার, তখন আমি ওষ্ঠপ্রহত মাত্রেই ও লপিতালাপন মাত্রেই (ভাষিত ভাষণ মাত্রেই) তৎক্ষণাৎই সেই জ্ঞানবাদ ও স্থবিরবাদ (বৃদ্ধদেব সিদ্ধান্ত) বলিতে পারি। জানিতে পারি, দেখিতে পারি… বলিয়া আমি জ্ঞাপন করিলাম, অপরেও তাহা পারে।
রাজকুমার, আমার মনে (এই চিন্তা) হইল, ‘আলাড়কালাম এই ধর্মকে কেবল বিশ্বাসের উপর নহে, স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া, অধিগত হইয়া, বিহার করিতেছি, বলিয়া প্রকাশ করেন। নিশ্চয় আলাড়কালাম এই ধর্ম জানিয়া, দেখিয়া উহাতে বিহার করিতেছেন।’ অনন্তর আমি যেখানে আলাড়কালাম ছিলেন তথায়, দেখিয়া উহাতে বিহার করিতেছেন।’ অনন্তর আমি যেখানে আলাড়কালাম ছিলেন তথায় উপনীত হই, উপনীত হইয়া আলাড়কালামকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আবুস কালাম, আপনি সাধনার কোনো স্তর পর্যন্ত (কিত্তাবতা) এই ধর্ম স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া প্রকাশ করিতেছেন?’ ইহা জিজ্ঞাসিত হইলে, রাজকুমার, আলাড়কালাম ‘আকিঞ্চনায়তন (স্তর)’ প্রকাশ করিলেন।
রাজকুমার, তখন আমার এ ধারণা জন্মিল, ‘কেবল আলাড়কালামের শ্রদ্ধা, বীর্য, স্মৃতি, সমাধি ও প্রজ্ঞা আছে এমন নহে; আমারও আছে। সুতরাং যে ধর্ম আলাড়কালাম স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া বিহার করিতেছেন বলিয়া প্রকাশ করেন সেই ধর্মের সাক্ষাৎকারের নিমিত্ত আমিও উদ্যম করিব।’ রাজকুমার, আমি অচিরে, অতি সত্ত্বর স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া অবস্থান করিলাম। রাজকুমার, তখন আমি আলাড়কালামের নিকট গিয়া তাঁহাকে বলিলাম, ‘আবুস কালাম, এপর্যন্ত নহে কি, আপনি এই ধর্ম স্বয়ং জানিয়া, প্রাপ্ত হইয়া অবস্থান করেন বলিয়া প্রকাশ করিতেছেন?’
‘হ্যাঁ, আবুস, আমি এপর্যন্ত এই ধর্ম স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা প্রত্যক্ষ করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া উপদেশ করি।’
‘আবুস, এপর্যন্ত তো আমিও এই ধর্মকে স্বয়ং জানিয়া, উপলব্ধি করিয়া অবস্থান করিতে পারি।’
‘আবুস, আমাদের লাভ, আমাদের সুলাভ হইয়াছে। যেহেতু আমরা আপনার ন্যায় আয়ুষ্মানকে সব্রহ্মচারী (গুরুভাই) রূপে দেখিতে পাইলাম। যে ধর্ম আমি স্বয়ং… জ্ঞাত হইয়া… উপদেশ করি, আপনিও সে ধর্ম স্বয়ং… জ্ঞাত হইয়া… বিহার করিতেছেন; আপনি যে ধর্মকে স্বয়ং জ্ঞাত হইয়াছেন…, আমিও সে ধর্মকে… জ্ঞাত হইয়া… উপদেশ করি। এই প্রকারে আমি যে ধর্ম জানি সে ধর্ম আপনিও জানেন। যে ধর্ম আপনি জানেন ঠিক সে ধর্ম আমিও জানি। এইরূপে যাদৃশ আমি তাদৃশ আপনি, যাদৃশ আপনি তাদৃশ আমি। অতএব আসুন, বন্ধু, এখন হইতে আমরা উভয়ে একসঙ্গে এই শিষ্যগণকে পরিচালনা করি।’ রাজকুমার, এই প্রকারে আলাড়কালাম আমার আচার্য (শিক্ষাগুরু) হইয়াও অন্তেবাসী আমাকে তাঁহার সমস্থানে স্থাপন করিলেন, উদার পূজায় আমাকে সম্মান করিলেন। তখন আমার এই ধারণা জন্মিল, ‘এই ধর্ম নির্বেদের (উদাসীনতার) জন্য, বৈরাগ্যের জন্য, নিরোধের নিমিত্ত, উপশমের (শান্তির) নিমিত্ত নহে; অভিজ্ঞার (দিব্য শক্তির) নিমিত্ত, সম্বোধির জন্য, নির্বাণার্থও সংবর্তিত হয় না; মাত্র আকিঞ্চনায়তন উৎপত্তি পর্যন্তই।’ রাজকুমার, তখন আমি সেই ধর্মকে পর্যাপ্ত মনে না করিয়া নিরপেক্ষভাবে তথা হইতে প্রস্থান করি।
৩২৮. রাজকুমার, তখন আমি ‘কুশল কী?’ ইহা অন্বেষণে সর্বোত্তম শান্তিপদ অনুসন্ধান করিতে করিতে যেখানে উদ্দক-রামপুত্র ছিলেন তথায় উপনীত হই। তথায় উপস্থিত হইয়া উদ্দক-রামপুত্রকে বলিলাম, ‘আবুস, আমি আপনার ধর্মবিনয়ে ব্রহ্মচর্য আচরণ করিতে ইচ্ছা করি।’ এরূপ উক্ত হইলে, রাজকুমার, উদ্দক-রামপুত্র আমাকে বলিলেন, ‘এখানে বিহার করুন, আয়ুষ্মান, ইহা তাদৃশ ধর্ম, যাহাতে বিজ্ঞপুরুষ অচিরেই স্বীয় আচার্যত্বকে স্বয়ং জানিয়া সাক্ষাৎকার করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া বিহার করিতে পারেন।’ রাজকুমার, সেই আমি অচিরেই, অতিশীঘ্রই সেই ধর্মকে পরিপূর্ণ আয়ত্ত করিলাম। তখন আমি ওষ্ঠসঞ্চালন মাত্রই, ভাষিত ভাষণ মাত্রেই তৎক্ষণাৎ সেই জ্ঞানবাদ আর স্থবিরবাদ বলিতে পারি, জানিতে পারি, দেখিতে পারি বলিয়া জ্ঞাপন করিলাম। আর অপরেও তাহা করিল।
তখন আমার মনে এই চিন্তার উদয় হইল, ‘রামপুত্র কেবল শ্রদ্ধার উপর নির্ভর করিয়া নহে, এই ধর্ম স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া বিহার করিতেছি বলিয়া প্রকাশ করেন। নিশ্চয় রামপুত্র এই ধর্ম স্বয়ং জানিয়া দেখিয়া উহাতে বিহার করেন।’ তৎপর হে রাজকুমার, যেখানে উদ্দক-রামপুত্র আছেন আমি তথায় উপস্থিত হইলাম, উপনীত হইয়া তাঁহাকে ইহা বলিলাম, ‘আবুস রামপুত্র, আপনি এই ধর্ম কি পরিমাণ স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া উপদেশ করিতেছেন?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হইলে উদ্দক-রামপুত্র ‘নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন’ নামক অরূপ ব্রহ্মধ্যান পর্যন্ত ঘোষণা করিলেন।
তখন রাজকুমার, আমার মনে এই চিন্তা হইল : ‘কেবল যে রামপুত্রের শ্রদ্ধা আছে এমন নহে, আমার নিকটও শ্রদ্ধা আছে; কেবল যে রামপুত্রের বীর্য, স্মৃতি, সমাধি ও প্রজ্ঞা আছে এমন নহে, আমারও তাহা আছে। অতএব যে ধর্ম রামপুত্র-স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎ করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া বিহার করিতেছি বলিয়া ঘোষণা করিতেছেন আমি সে ধর্ম প্রত্যক্ষ করিবার নিমিত্ত উদ্যোগ করিব।’
রাজকুমার, তখন আমি অচিরে, অতি সত্ত্বরই সে ধর্ম স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া, প্রাপ্ত হইয়া বিহার করিলাম।…। এইরূপে আমার আচার্য হইয়াও উদ্দক-রামপুত্র অন্তেবাসী আমাকে তাঁহার সমস্থানে স্থাপন করিলেন…। সে কারণে আমি নিরপেক্ষভাবে সে ধর্ম হইতে চলিয়া আসিলাম।
৩২৯. রাজকুমার, ‘কুশল কী?’ ইহার গবেষণাকারীরূপে অনুত্তর বর শান্তিপদের সন্ধান মানসে আমি মগধ প্রদেশে ক্রমান্বয়ে বিচরণ করিতে করিতে যেখানে উরুবেলা সেনানী নিগম তদভিমুখে অগ্রসর হইলাম। তথায় আমি দেখিতে পাইলাম এক রমণীয় ভূমিভাগ, মনোহর বনস- (গভীরবন) ও অদূরে স্বচ্ছসলিলা সুতীর্থযুক্তা নদী প্রবাহমানা এবং চতুর্দিকে রমণীয় গোচরগ্রাম। তখন আমার মনে এই চিন্তার উদয় হইল, আহা, একান্তই রমণীয় ভূভাগ… প্রসাদজনক বনসণ্ড স্বচ্ছসলিলা শ্বেত সুতীর্থযুক্তা রমণীয়া নদী প্রবাহিতা; চতুর্দিকে গোচরগ্রাম। সাধনাপ্রয়াসী কুলপুত্রের পক্ষে সাধনার নিমিত্ত ইহাই তো উপযুক্ত স্থান।’ রাজকুমার, ইহাই সাধনার উপযুক্ত মনে করিয়া আমি সে-স্থানেই ধ্যানে নিবিষ্ট হইলাম।
রাজকুমার, তখন আমার নিকট তিনটি অশ্রুতপূর্ব অত্যাশ্চর্য উপমা প্রতিভাত হয়; (১) যেমন ক্ষীরযুক্ত (সস্নেহ) আর্দ্রকাষ্ঠ জলে নিক্ষিপ্ত হইল। তৎপর কোনো পুরুষ ‘অগ্নি প্রজ্বলিত করিব, তেজ প্রাদুর্ভূত করিব’ এই চিন্তা করিয়া যদি উত্তরারণি লইয়া তথায় আসে-রাজকুমার, কী মনে করেন, সেই ব্যক্তি স্নেহযুক্ত জলে নিক্ষিপ্ত সেই আর্দ্রকাষ্ঠকে উত্তরারণি লইয়া মন্থন করিলে অগ্নি উৎপাদন করিতে, তেজ প্রাদুর্ভূত করিতে পারিবে কি?”
“না ভন্তে, তাহা কখনো সম্ভব নহে।”
“ইহার কারণ কী? যেহেতু সেই কাষ্ঠ স্নেহযুক্ত ও আর্দ্র, তদুপরি তাহা জলে নিক্ষিপ্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি তাহাতে কেবল শ্রম-ক্লান্তি ও মনঃকষ্টেরই ভাগী হইবে।
সেইরূপ হে রাজকুমার, যেকোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ দৈহিক কামভোগে নিবৃত্ত না হইয়া অবস্থান করেন তাঁহাদের মধ্যে যাঁহারা কামভোগের প্রতি যে কামচ্ছন্দ, কামরুচি, কামমূর্ছা, কামপিপাসা ও কামপরিদাহ বিদ্যমান, উহা যদি ভিতর থেকে সুপ্রহীন না হয়, সু-উপশান্ত না হয় তবে উপক্রমকারী সেই সকল মাননীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণেরা তীব্র কঠের দুঃখ-বেদনা অনুভব করেন। তাঁহাদের পক্ষে অনুত্তর জ্ঞান-দর্শন ও সম্বোধি (লোকোত্তর মার্গ) লাভ অসম্ভব। যদিও সে সকল মাননীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ উপক্রমজনিত তীব্র কঠের দুঃখ-বেদনা অনুভব না করেন, তথাপি তাঁহারা অনুত্তর জ্ঞানদর্শন ও সম্বোধি লাভের অযোগ্যই। রাজকুমার, ইহাই আমার অশ্রুতপূর্ব অত্যাশ্চর্য প্রথম উপমা প্রতিভাত হইয়াছিল।
৩৩০. (২) রাজকুমার, অপরও এক অশ্রুতপূর্ব অত্যাশ্চর্য দ্বিতীয় উপমা আমার নিকট প্রতিভাত হইয়াছিল। যেমন রাজকুমার, স্নেহযুক্ত আর্দ্রকাষ্ঠ জল হইতে দূরে স্থলে নিক্ষিপ্ত হইল। কোনো ব্যক্তি ‘অগ্নি প্রজ্বলিত করিব, তেজ উৎপাদন করিব’ এই উদ্দেশ্যে উত্তরারণি লইয়া তথায় আসিল। তাহা কী মনে করেন, রাজকুমার, তবে সেই ব্যক্তি অগ্নি প্রজ্বলিত করিতে, তেজ উৎপাদন করিতে সমর্থ হইবে কি?”
“না ভন্তে, কখন ও সম্ভব নহে।”
“ইহার কারণ কী?”
“যেহেতু ভন্তে, যদিও সেই কাষ্ঠ… জল হইতে দূরে স্থলে নিক্ষিপ্ত তবুও তাহা আর্দ্র ও স্নেহযুক্ত। সে ব্যক্তি শুধু শ্রম-ক্লান্তি, ও বিঘাতের ভাগী হইবে।”
“সেইরূপই রাজকুমার, যেকোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ দৈহিক কামভোগে লিপ্ত থাকে… কামের প্রতি তাঁহাদের যে কামচ্ছন্দ, কামলালসা… বিদ্যমান,… তাহা সু-উপশান্ত না হয়, তাঁহারা… অযোগ্যই। রাজকুমার, এই অশ্রুতপূর্ব অত্যাশ্চর্য দ্বিতীয় উপমাও আমার নিকট প্রতিভাত হইয়াছিল।
৩৩১. (৩) রাজকুমার, অপর এক অশ্রুতপূর্ব অত্যাশ্চর্য তৃতীয় উপমাও আমার নিকট প্রতিভাত হইয়াছিল। যেমন রাজকুমার, নীরস শুষ্ককাষ্ঠ জল হইতে দূরে স্থলে নিক্ষিপ্ত হয়। অনন্তর কোনো ব্যক্তি অগ্নি উৎপাদন করিব, তেজ প্রজ্বলিত করিব’ এই উদ্দেশ্য করিয়া উত্তরারণি লইয়া আসিল। তবে… সে ব্যক্তি নীরস শুষ্ক, জল হইতে দূরে স্থলে নিক্ষিপ্ত কাষ্ঠকে উত্তরারণিতে ঘর্ষণ করিয়া অগ্নি উৎপাদন করিতে, তেজ প্রকাশ করিতে সমর্থ হইবে কি?
“হ্যাঁ, ভন্তে, নিশ্চয় সমর্থ হইবে।”
“ইহার কারণ কী?”
যেহেতু ভন্তে, সেই শুষ্ককাষ্ঠ নীরস, আর জল হইতে দূরে স্থলে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে।”
“এইরূপই রাজকুমার, যেকোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ কায় দ্বারা ভোগবাসনা হইতে নির্লিপ্ত হইয়া অবস্থান করেন এবং কাম্যবস্তুর প্রতি তাঁহাদের যে কামচ্ছন্দ… কাম পরিদাহ আছে, তাহা অধ্যাত্মে সুপ্রহীন ও সু-উপশমিত হয়। তবে সেই পরাক্রমশালী মহানুভব শ্রমণ-ব্রাহ্মণেরা তীব্র কঠের দুঃখ-বেদনা অনুভব করিলেও তাঁহাদের পক্ষে অনুত্তর জ্ঞানদর্শন ও সম্বোধিলাভ সম্ভব হয়। যদি সেই মহানুভব শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ উপক্রমজনিত তীব্র কঠের দুঃখ-বেদনা ভোগ নাও করেন, তথাপি তাঁহারা অনুত্তর জ্ঞানদর্শন ও সম্বোধি লাভের যোগ্য পাত্রই হন। রাজকুমার এই অশ্রুতপূর্ব অত্যাশ্চর্য তৃতীয় উপমা তখন আমার প্রতিভাত হইয়াছিল।
৩৩২. রাজকুমার, তখন আমার এই চিন্তা হইয়াছিল, ‘দন্তের উপর দন্ত, স্থাপন করিয়া, জিহ্বা দ্বারা তালু চাপিয়া, কুশলচিত্ত দ্বারা অকুশলচিত্তকে অভিনিগৃহীত করিয়া অভিনিপীড়িত ও অভিসন্তপ্ত করি।’… তাহা করিবার সময় আমার কক্ষ (বগল) হইতে ঘর্ম নির্গত হয়।… যেমন কোনো বলবান পুরুষ অপর দুর্বল পুরুষকে শিরে কিংবা ঘারে ধরিয়া অভিনিগৃহীত, অভিনিপাড়িত ও অভিসন্তপ্ত করে, তেমন রাজকুমার, আমার দন্ত দ্বারা দন্ত চাপিয়া, জিহ্বা দ্বারা তালু স্পর্শ করিয়া চিত্ত দ্বারা চিত্তকে অভিনিগৃহীত, অভিনিপীড়িত ও অভিসন্তপ্ত করিবার সময় আমার কক্ষ হইতে স্বেদ নির্গত হয়। আমার অশিথিল বীর্য আরব্ধ হয়, নির্ভুল স্মৃতি উপস্থাপিত থাকে, আর সেই কঠের সাধনা-উদ্যোগ দ্বারাই প্রধানাহত (উদ্যোগ প্রপীড়িত) অবস্থাতেও আমার দেহ ক্লান্ত হইয়াছে, প্রকৃত পক্ষে উপশান্ত হয় নাই।
৩৩৩. রাজকুমার, তখন আমার মনে এই চিন্তার উদয় হয়, ‘এখন আমি অপ্রাণক (নিশ্বাসরহিত) ধ্যান সাধনা করিয়া দেখি।’ সে সময় আমি মুখ ও নাসিকায় আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ করি। রাজকুমার, আমার মুখ ও নাসিকায় আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ হইলে কর্ণছিদ্র দিয়া নিষ্ক্রান্ত বায়ুর অধিকমাত্রায় শব্দ হইতে থাকে। কর্মকারের ভস্ত্রা হইতে বায়ু নির্গত হইবার সময় যেমন অধিক শব্দ হয়, তেমন আমার মুখ ও নাসিকায় আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ হইলে কর্ণছিদ্র দিয়া নিষ্ক্রান্ত, বায়ুর অধিক মাত্রায় শব্দ হইতে লাগিল। রাজকুমার, তথাপি আমার অদম্য উৎসাহ আরব্ধ হইল, অভ্রান্ত স্মৃতি উপস্থাপিত হইল; সেই কঠের ধ্যানোদ্যগের দ্বারা উদ্যোগাহত হওয়া অবস্থাতে আমার দেহ ক্লান্ত হইয়াছে, কিন্তু প্রকৃত উপশান্ত হয় নাই।
রাজকুমার, তখন আমার এই চিন্তা হইল, ‘এখন আমি শুধু আশ্বাস-প্রশ্বাস নিরোধের ধ্যানই সাধনা করি।’ তখন আমি মুখে, নাসিকায় ও কর্ণে আশ্বাস-প্রশ্বাস নিরুদ্ধ করিলাম। রাজকুমার, মুখে, নাসিকায় ও কর্ণে আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ করিলে বায়ু অধিক মাত্রায় মাথায় আঘাত করিতে থাকে। যেমন বলবান পুরুষ তীর্ণ শিখর দ্বারা শিরে আঘাত করে তেমন রাজকুমার, আমার…।
তখন রাজকুমার, আমার চিন্তা হইল, ‘এখন আমি কেবল অপ্রাণক ধ্যানই অভ্যাস করি।’ আমি নাকে, মুখে ও কর্ণে আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ করিলাম।… আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ করিলে আমার শিরে অধিক মাত্রায় শির বেদনা উৎপন্ন হয়।…।
রাজকুমার, তখন আমার মনে হইল, ‘এখন আমি অপ্রাণক পুনরায় ধ্যানই সাধনা করি।’ অনন্তর আমি মুখে, নাকে ও কর্ণে আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ করিলাম।… আমার আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ হইলে বায়ু অধিক মাত্রায় আমার কুক্ষি কর্তন করিতে থাকে। যেমন কোনো গো-ঘাতক ছুরিকা দ্বারা গর্বর-কুক্ষি পরিকর্তন করে, সেইরূপ… আমার অদম্য উৎসাহ আরব্ধ হয়… দেহ ক্লান্ত হইয়াছে, কিন্তু উপশান্ত হয় নাই।
রাজকুমার, তখন আমার মনে হইল, ‘এখন আমি অপ্রাণক ধ্যান অনুশীলন করিব।’ তখন আমি মুখে, নাসিকায় ও কর্ণে আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ করিলাম। তাহা রুদ্ধ করিলে অধিক মাত্রায় দেহে দাহ উৎপন্ন হয়। যেমন দুইজন বলবান পুরুষ কোনো দুর্বলতর পুরুষের উভয় বাহুতে ধরিয়া জ্বলন্ত অঙ্গারগর্তে সন্তপ্ত করে, সম্পরিতপ্ত করে, তেমনভাবেই… আশ্বাস-প্রশ্বাস রুদ্ধ হইলে অধিক মাত্রায় আমার দেহে দাহ উৎপন্ন হয়। রাজকুমার, তখন আমার অদম্য উৎসাহ আরব্ধ হয়, অসংমূঢ় স্মৃতি উপস্থাপিত হয়, সেই দুঃখজনক উদ্যোগ দ্বারা উদ্যোগাহত হইয়া আমার দেহ ক্লান্ত হইয়াছে, কিন্তু উপশান্ত হয় নাই।
রাজকুমার, কোনো কোনো (অধিষ্ঠাত্রী) দেবতা (এ অবস্থায়) আমাকে দেখিয়া বলিয়া উঠিল, ‘শ্রমণ গৌতম বুঝি কালগত হইয়াছেন। কোনো কোনো… দেবতা বলিলেন, ‘শ্রমণ গৌতম মরেন নাই, অথচ মরণোম্মুখ হইয়াছেন।’ কোনো কোনো… দেবতা বলিলেন, ‘শ্রমণ গৌতম মরেন নাই, মরণোম্মুখও নহেন। তিনি যে অর্হৎ, অর্হৎগণের ধ্যান-বিহার এরূপই হইয়া থাকে।’
৩৩৪. তখন আমার এই চিন্তা হইল, ‘এখন আমি সর্বতোভাবে আহার-উপচ্ছেদ (অনশন) ব্রত অবলম্বন করি।’ তখন দেবতারা আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, ‘মারিস, আপনি সর্বাংশে আহার-উপচ্ছেদার্থ অগ্রসর হইবেন না। আমরা আপনার লোমকূপ দিয়া দিব্য ওজ প্রবেশ করাইয়া দিব, যাহাতে আপনি যাপন করিবেন।’… তখন আমার চিন্তা হইল, ‘যদি আমি সর্বতোভাবে অনশন ব্রত গ্রহণ করি এবং এই সকল দেবতা আমার লোমকূপ দিয়া দিব্য ওজ প্রবেশ করাইয়া দেন যদ্বারা আমি যাপন করিতে পারি; তাহা হইলে আমার সে ব্রত মিথ্যা প্রতিপন্ন হইবে।’ আমি দেবতাদিগকে বলিলাম, ‘তোমরা এরূপ করিও না।’
রাজকুমার, তখন আমার মনে হইল, ‘এখন আমি অল্প অল্প প্রসৃতি (করকোষ) পরিমাণ আহার গ্রহণ করিব, তাহা মুগের যূষই হউক, কুলত্থের যূষই হউক, কলাইয়ের যূষই হউক অথবা অরহরের যূষই হউক।’ তখন হইতে আমি… প্রসূতি পরিমাণ আহার করিতে আরম্ভ করি…। তাহা করিতে গিয়া আমার শরীর অধিক মাত্রায় কৃশতার চরম সীমায় পৌঁছিল। অসিতিক বা কাল-লতার গ্রন্থির সন্ধিস্থানে ম্লান হইয়া মধ্যে উন্নতাবনত হয়। সেই স্বল্পাহারের দরুন আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উন্নতাবনত হয়, সেই স্বল্পাহারের হেতু আমার গুহ্যদ্বার উষ্ট্রপাদের ন্যায় মধ্যে গভীর হইয়াছিল। সেই স্বল্পাহারত্বের হেতু আমার পৃষ্ঠকণ্টক রজ্জুবুনার আবর্তাবলীর ন্যায় উন্নতাবনত হইয়াছিল। যেমন জীর্ণ গৃহের বর্গাগুলি (গোপানসী) অবলগ্ন-বিলগ্ন (এলোমেলো) হয় তেমন সেই অল্পাহার-হেতু আমার বক্ষপঞ্জরগুলি অবলগ্ন-বিলগ্ন হইয়াছিল। যেমন গভীর জলকূপে (উদপানে) উদকতারা (জলচন্দ্র) গভীরে বহুদূরে প্রবিষ্ট দেখা যায়, সেই প্রকার… আমার অক্ষিকূপে অক্ষিতারা বহু গভীরে অনুপ্রবিষ্ট দেখা যাইত। যেমন তিক্ত অলাবু কঁচি অবস্থায় ছিন্ন হইলে বাতাতপ সম্পৃক্ত হইয়া শুষ্ক ও ম্লান হয়, সেইরূপ অল্পাহার-হেতু আমার শিরঃচর্ম শুষ্ক ও সংম্লান হইয়াছে।
রাজকুমার, তখন সেই অল্পাহারজনিত দুষ্কর চর্যা এত কঠের হইয়া আমার উদরচর্ম পৃষ্ঠকণ্টকে সংলগ্ন হইয়াছিল যে আমি উদরচর্ম স্পর্শ করিতে গিয়া তৎসঙ্গে পৃষ্ঠকণ্টক ধরিতাম; পৃষ্ঠকণ্টক স্পর্শ করিতে গিয়া সঙ্গে সঙ্গে উদরচর্মই ধরিতাম।… পায়খানা প্রস্রাব করিতে গিয়া সে-স্থানেই কুব্জ হইয়া ভূপতিত হইতাম।
আমি শরীর আশ্বস্তু করিবার মানসে হস্ত দ্বারা এইদেহ পরিমার্জনা করি…। তখন আমার দেহ পরিমার্জনা করিবার সময় সেই অল্পাহার-হেতু পূতিমূল লোমরাশি অঙ্গ হইতে স্খলিত হইয়া পড়ে। রাজকুমার, তখন লোকেরা আমাকে দেখিয়া বলিত, ‘শ্রমণ গৌতম কালো হইয়া গিয়াছেন।’ কেহ কেহ বলিত, ‘শ্রমণ গৌতম কাল হন নাই, তিনি শ্যামবর্ণ হইয়াছেন।’ কেহ কেহ বলিত, ‘শ্রমণ গৌতম কালো কিংবা শ্যামবর্ণ হন নাই, তাঁহার চর্মরং মঙ্গুলবর্ণ (মঞ্জুলবর্ণ?) হইয়াছে।’ রাজকুমার, আমার এমন পরিশুদ্ধ পরিষ্কৃত চেহারা সেই অল্পাহার-হেতু এতই বিনষ্ট হইয়াছিল।
৩৩৫. রাজকুমার, তখন আমার মনে হইল, ‘অতীতকালে যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ সাধনোদ্যোগজনিত তীব্র কঠের দুঃখ-বেদনা সহ্য করিয়াছিলেন তাহা এই পরিমাণ, ইহার অধিক নহে। অনাগত ও বর্তমানকালেও… ইহার অধিক নহে। কিন্তু হে রাজকুমার, আমি কঠের দুষ্কর ক্রিয়া দ্বারা উত্তর-মনুষ্যধর্ম ও সর্বোত্তম (অসম) আর্য-জ্ঞানদর্শন-বিশেষ অধিগত হইতে পারি নাই। (চিন্তা হইল) তবে কি বোধিলাভের নিমিত্ত অন্য কোনো উপায় আছে?
রাজকুমার, তখন আমার মনে এই চিন্তা হইল, ‘আমি বেশ জানি পিতা শুদ্ধোদন শাক্যের কৃষিক্ষেত্রে হলকর্ষণোৎসবে জম্বুবৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় কাম ও অকুশল ধর্ম হইতে বিবিক্ত হইয়া… প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া উহাতে অবস্থান করি। তবে কি ইহা (এই আনাপান প্রথম ধ্যান) বোধিলাভের মার্গ হইবে?’ রাজকুমার, তখন আমার এই স্মৃতি অনুগামী জ্ঞান উৎপন্ন হইল, ‘ইহাই সত্যোপলব্ধির মার্গ।’ তখন আমার মনে এই চিন্তার উদয় হইল, ‘যেই ধ্যান-সুখ কাম ও অকুশল ধর্ম হইতে স্বতন্ত্র আমি কি সেই সুখকে ভয় করি?’ আমার মনে হইল, ‘… আমি সেই ধ্যান-সুখকে ভয় করি না।’
রাজকুমার, তখন আমার মনে হইল, ‘এইরূপ অধিকমাত্রায় জীর্ণশীর্ণ দেহে সেই সুখ অর্জন করা সুকর নহে। অতএব আমি স্থূল আহার অন্ন-ব্যঞ্জন ভোজন করি।’ রাজকুমার, এই ভাবিয়া আমি স্থূল আহার ভাত-তরকারি ভোজন করিতে আরম্ভ করিলাম।
সেই সময় যেই পঞ্চভিক্ষু আমার সেবায় নিযুক্ত ছিলেন (তাঁহাদের আশা) শ্রমণ গৌতম যে ধর্ম আবিষ্কার (অধিগম) করিবেন তাহা তিনি আমাদিগকে উপদেশ করিবেন। কিন্তু যখন আমি স্থূল আহার অন্ন-ব্যঞ্জন ভোজন করিতে আরম্ভ করিলাম তখন সেই পঞ্চভিক্ষু ‘প্রত্যয়বহুল ও সাধনা-বিমুখ শ্রমণ গৌতম বাহুল্যে প্রত্যাবৃত হইয়াছেন,’ (ভাবিয়া) উদাসীনভাবে প্রস্থান করিলেন।
৩৩৬. রাজকুমার, আমি স্থূল আহার গ্রহণে বল সঞ্চয়পূর্বক কামভোগে নির্লিপ্ত হইয়া, অকুশল ধর্ম হইতে পৃথক হইয়া… প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া উহাতে অবস্থান করি। বিতর্ক-বিচারের উপশম-হেতু… দ্বিতীয় ধ্যান, তৃতীয় ধ্যান, চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিহার করি।
(১) এই প্রকারে পরিশুদ্ধ, পর্যাবদাত, অঙ্গনরহিত, উপক্লেশ মুক্ত, মৃদুভূত, কর্মক্ষম, স্থির ও অচঞ্চল অবস্থায় আমার চিত্ত সমাহিত (ধ্যান নিবিষ্ট) হইলে জাতিস্মর জ্ঞানাভিমুখে চিত্তকে অভিনমিত করি। তখন আমি বহুবিধ পূর্বনির্বাস (জন্ম) অনুস্মরণ করি; যথা : এক জন্মও, দুই জন্মও…। এইরূপে আকার উদ্দেশ সহিত (স্বরূপ ও গতিসহ) অনেক প্রকার পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করি। রাজকুমার, অপ্রমত্ত, বীর্যবান, সাধনায় দেহ-প্রাণ সমর্পিত যোগীর ন্যায় রাত্রির প্রথম যামে আমার এই প্রথম বিদ্যা (জাতিস্মরজ্ঞান) অধিগত; (জন্মান্তর প্রতিচ্ছাদক) অবিদ্যা বিহত, বিদ্যা উৎপন্ন; তমঃ বিহত, আলোক উৎপন্ন হয়।
(২) এই প্রকারে… আমার চিত্ত অচঞ্চল অবস্থায় সমাহিত হইলে অপর সত্ত্বগণের চ্যুতি-উৎপত্তি জ্ঞানের (জন্ম-মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনের) নিমিত্ত আমার চিত্তকে নিয়োজিত করি। তখন বিশুদ্ধ, মনুষ্য-চক্ষুর বহির্ভূত দিব্যচক্ষু দ্বারা আমি হীনোৎকৃষ্ট, উত্তম-অধমবর্ণের স্ব স্ব কর্মানুসারে সুগতি প্রাপ্ত, দুর্গতি প্রাপ্ত সত্ত্বগণকে চ্যুতি ও উৎপত্তির সময় দেখিতে পাই; যেমন কর্ম তেমন গতিপ্রাপ্ত সত্ত্বগণকে প্রকৃষ্টরূপে জানিতে পারি। রাজকুমার, রাত্রির মধ্যম যামে অপ্রমত্ত, আতাপী, সাধনায় দেহ-প্রাণ সমর্পিত আমার এই দ্বিতীয় বিদ্যা অধিগত হয়; (সত্ত্বগণের চ্যুতি-প্রতিসন্ধি আচ্ছাদক) অবিদ্যা বিহত, বিদ্যা (দিব্যচক্ষু) উৎপন্ন; অন্ধকার বিহত, আলোক উৎপন্ন হয়।
(৩) এই প্রকারে… আসবরাশির ক্ষয় (অর্হৎ মার্গ) জ্ঞানের নিমিত্ত (বিদর্শনে) আমার চিত্ত নিয়োজিত করি। তখন আমি ‘ইহা দুঃখ আর্যসত্য’ প্রকৃষ্টরূপে জানিতে পারি, ‘ইহা দুঃখসমুদয় (উৎপত্তির কারণ) আর্যসত্য’ যথার্থরূপে জানিতে পারি, ‘ইহা দুঃখনিরোধ আর্যসত্য’ যথার্থরূপে জানিতে পারি, ‘ইহা দুঃখনিরোধগামিনী প্রতিপদা আর্যসত্য’ ইহা যথাভূত অভিজ্ঞাত হই। ‘এ সকল আসব, ইহা আসব সমুদয়, ইহা আসব নিরোধ, ইহা আসব নিরোধের প্রতিপদা বা উপায়’ যথাভূত অভিজ্ঞাত হই। এই প্রকারে জানিবার ও দেখিবার (মার্গকৃত্যের) ফলে আমার চিত্ত কামাসব হইতে বিমুক্ত হইল, ভবাসব হইতে বিমুক্ত হইল এবং অবিদ্যা আসব হইতে বিমুক্ত হইল। ‘বিমুক্তিতে বিমুক্ত’ এই জ্ঞানের উদয় হইল। তদ্বারা অভিজ্ঞাত হইলাম- ‘জন্ম ক্ষীণ হইয়াছে’ ব্রহ্মচর্য ব্রত উদ্যাপিত হইয়াছে, কর্তব্য কৃত হইয়াছে। এখন এতদ্ভাবের জন্য অপর করণীয় নাই।’ রাজকুমার, রাত্রির পশ্চিম যামে ইহাই অপ্রমত্ত, আতাপী দেহ-প্রাণ সমর্পিত করিয়া অবস্থানকারী আমার তৃতীয় বিদ্যা অধিগত হইল; অবিদ্যা বিহত, বিদ্যা উৎপন্ন হইল; তমঃ বিহত, আলোক উৎপন্ন হইল।
৩৩৭. তখন (বুদ্ধত্ব লাভের অষ্টম সপ্তাহের কথা) রাজকুমার, আমার এই চিন্তা হইল, ‘আমার গভীর, দুর্দর্শ, দুরানুবোধ্য, শান্ত, উত্তম, অতর্কাবচর (-গম্য), নিপুণ (সূক্ষ্ম), পণ্ডিত বেদনীয় এই ধর্ম (আর্যসত্য) অধিগত হইয়াছে। এই জনসাধারণ আলয়ারাম (কামতৃষ্ণায় রমিত), আলয়ে রত (পঞ্চকামভোগে লিপ্ত), আলয়ে প্রমোদিত। আলয়ারাম, আলয়রত, আলয় প্রমোদিত জনসাধারণের এই তত্ত্ব্ব যেমন এই কার্য-কারণ ভাব সমন্বিত প্রতীত্যসমুৎপাদ দর্শন করা দুষ্কর, তাহাদের পক্ষে এই তত্ত্বও তেমন সর্বসংস্কার শমথ, সর্ব উপাধি বর্জিত, তৃষ্ণাক্ষয়, বিরাগ, নিরোধরূপ নির্বাণ প্রত্যক্ষ করাও দুষ্কর। যদি আমি এই ধর্ম উপদেশ করি এবং অপরে ইহা বুঝিতে না পারে, তবে তাহা আমার পক্ষে ক্লান্তি ও কষ্টের কারণ হইবে।’
রাজকুমার, তখন আমার এই অশ্রুতপূর্ব, অত্যাশ্চর্য গাথাবলী প্রতিভাত হইল :
‘বহু কষ্টে অধিগত এ ধর্ম আমার,
এখন প্রকাশে কারো নাই উপকার।
রাগ-দ্বেষে অভিভূত ভ্রান্ত জনগণ,
বুঝিবে না যথাযথ ধর্ম সনাতন।
প্রতি-স্রোতগামী ধর্ম নিবৃত্তি-প্রবণ,
গভীর দুর্দর্শ অণু, স্বচ্ছ সুমহান।
তমোস্কন্ধে আবরিত রাগাসক্ত জন,
প্রকৃত সদ্ধর্ম রূপ দেখে না তখন।’
রাজকুমার, এই চিন্তার দরুন অনুৎসুক্যের দিকে আমার চিত্ত নমিত হইল, ধর্মদেশনার প্রতি নহে।
৩৩৮. অনন্তর রাজকুমার, আমার মনোভাব অবগত হইয়া সোহংপতি ব্রহ্মার এই চিন্তা হইল, ‘আহা, জগৎ নষ্ট হইল, জগৎ বিনষ্ট হইল। যেহেতু তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের চিত্ত ধর্ম প্রচারের প্রতি নমিত না হইয়া অনুৎসুক্যের দিকে নমিত হইল।’ রাজকুমার, তখন বলবান পুরুষ যেমন (অনায়াসে) সঙ্কুচিত বাহু প্রসারিত করে, প্রসারিত বাহু সঙ্কুচিত করে তেমনভাবেই সোহংপতি ব্রহ্মা ব্রহ্মলোকে অন্তর্হিত হইয়া আমার সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। তিনি একাংসে উত্তরাসঙ্গ (উত্তরীয়) স্থাপন করিয়া আমার প্রতি কমলাঞ্জলি প্রণত হইয়া আমাকে বলিলেন, ‘প্রভো ভগবান, ধর্ম উপদেশ করুন, সুগত, আপনি ধর্ম প্রচার করুন। স্বল্প রজঃজাতীয় সত্ত্বেরা আছে, যাহারা ধর্মের অশ্রবণতা-হেতু পরিহীণ হইবে। ধর্মের যথার্থ জ্ঞাতা অবশ্যই হইবে।’ ইহা বলিয়া অতঃপর গাথায় স্তুতি করিয়া বলিলেন :
‘মগধ প্রদেশে পূর্বে ছিল প্রতিষ্ঠিত,
অবিশুদ্ধ ধর্ম যাহা সমল-কল্পিত।
অমৃতের দ্বার এবে কর উদ্ঘাটন,
বিমল-প্রত্যক্ষ ধর্ম শুনুন সুজন। (১)
শৈলস্থিত কোনো লোক পর্বত শিখরে,
নিম্নে যথা চারিদিকে দেখে জনতারে।
সেইরূপ হে সুমেধ, করি আরোহণ,
ধর্মময় প্রাসাদেতে সামন্ত নয়ন!
বীতশোক, চেয়ে দেখো, শোকাকুল জনে,
জন্ম-জরা প্রপীড়িতে প্রজ্ঞার নয়নে। (২)
উঠো বীর, ঋণমুক্ত, বিজিত সমর,
সার্থবাহ সর্বলোকে বিচরণ করো।
সদ্ধর্ম প্রচার করো করুণা নিধান!
নিশ্চয় মিলিবে শ্রোতা বহু জ্ঞানবান।’ (৩)
৩৩৯. তখন আমি মহাব্রহ্মা সোহংপতির আরাধনা বিদিত হইয়া জীবগণের প্রতি করুণাবশত বুদ্ধচক্ষু দ্বারা জীব-জগৎ বিলোকন করি। বুদ্ধ-দৃষ্টিতে বিশ্ব বিলোকন করিয়া আমি স্বল্পরজ মহারজ তীৰ্নিন্দ্রিয়, মৃদু ইন্দ্রিয়, সু-আকারবান, সুবোধ এবং পরলোক ও দোষের প্রতি ভয়দর্শী হইয়া অবস্থানকারী কোনো কোনো সত্ত্বগণকে দেখিতে পাইলাম। যেমন উৎপল (নীলকমল), পদ্ম (রক্তকমল) অথবা পুণ্ডরীক (শ্বেতকমল)সমূহের মধ্যে কোনো কোনো উৎপল, পদ্ম কিংবা পুণ্ডরীক জলে সঞ্জাত, জলে সংবর্ধিত, জলাভ্যন্তরগত, জলাভ্যন্তরে পোষিত হয়; অপর কোনো কোনো উৎপল, পদ্ম অথবা পুণ্ডরীক জলে উৎপন্ন, জলে সংবর্ধিত ও জলসম স্থিত থাকে; আবার কোনো কোনোটি উদকে জাত, উদকে সংবর্ধিত, জল হইতে উচ্চে উত্থিত হইয়া, জল দ্বারা উপলিপ্ত না হইয়া দাঁড়াইয়া থাকে; তেমনভাবেই হে রাজকুমার, আমি বুদ্ধচক্ষুতে বিশ্ব বিলোকন করিতে গিয়া অল্পরজ, মহারজ তীৰ্নিন্দ্রিয়, মৃদু ইন্দ্রিয়, সু-আকারবিশিষ্ট, সুবোধ, আর পরলোক ও পাপের প্রতি ভয়দর্শী হইয়া অবস্থানকারী কোনো কোনো সত্ত্বগণকে দেখিতে পাইলাম। অনন্তর রাজকুমার, আমি গাথাযোগে সোহংপতি মহাব্রহ্মাকে প্রত্যুত্তর প্রদান করি :
‘উন্মুক্ত তাদের তরে অমৃতের পুরদ্বার,
স্রোতা যারা প্রসারিয়া শ্রদ্ধা হোক আগুসার।
পণ্ডশ্রম ভাবি মনে আমি করিনি প্রচার,
উত্তম সুজ্ঞাত ধর্ম ব্রহ্মে, মানব মাঝার।’
৩৪০. রাজকুমার, অনন্তর সোহংপতি ব্রহ্মা ‘ভগবান ধর্মপ্রচারার্থ অবসর করিলেন’ বুঝিয়া আমাকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া তথায় অন্তর্হিত হইলেন।
অতঃপর আমার এই (ধর্মদেশনা-সংক্রান্ত) চিন্তা উদয় হইল, ‘কাহাকে আমি প্রথম ধর্মোপদেশ করিব? কে এই ধর্ম সত্ত্বর বুঝিতে পারিবে?’ তখন আমার স্মরণ হইল, আলাড়কালামই সুপণ্ডিত, দক্ষ, মেধাবী এবং দীর্ঘকাল (সমাপত্তি বিষ্কম্ভিত হেতু) অল্পরজ-জাতীয় পুরুষ। যদি আলাড়কালামকে প্রথম ধর্মোপদেশ করি, তবে তিনি এই ধর্ম শীঘ্রই উপলব্ধি করিবেন। তখন জনৈক দেবতা আমার নিকট আসিয়া জানাইল, ‘ভন্তে, সপ্তাহকাল পূর্বে আলাড়কালাম দেহ-ত্যাগ করিয়াছেন।’ আমারও জ্ঞানদর্শন উৎপন্ন হইল, ‘সপ্তাহকাল পূর্বে আলাড়কালাম কালগত হইয়াছে।’ তখন আমার চিন্তা হইল, ‘মহা ক্ষতিগ্রস্থ (জানিয়) আলাড়কালাম। যদি তিনি এই ধর্মোপদেশ শুনিতেন, তবে শীঘ্রই উপলব্ধি করিতেন।’
রাজকুমার, তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগিল, ‘কাহাকে আমি প্রথম ধর্ম উপদেশ করি? কে এই ধর্ম সত্ত্বর জানিতে পারিবে?’ আমার মনে হইল, এই উদ্দক-রামপুত্র পণ্ডিত, চতুর, মেধাবী চিরকাল অমলিন চিত্ত, যদি আমি তাঁহাকে প্রথম ধর্মোপদেশ করি তবে তিনি শীঘ্রই বুঝিতে পারিবেন।’ তখন দেবতা আসিয়া বলিল, ‘ভন্তে, অভিদোষে (গত রাত্রির অর্ধ সময়ে) উদ্দক-রামপুত্র কালগত হইয়াছেন।’ আমারও জ্ঞানদর্শন উৎপন্ন হইল…।
৩৪১…. রাজকুমার, পুনশ্চ, আমার মনে হইল, ‘পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষু আমার বহু উপকারী, যাঁহারা দেহ-প্রাণ সমর্পণ করিয়া কঠের সাধনা করিবার সময় আমাকে সেবা করিয়াছেন। অতএব আমি সেই পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদিগকে প্রথম ধর্মদেশনা করিব।’ তখন আমার চিন্তা হইল, ‘পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুগণ এখন কোথায় অবস্থান করেন?’ আমি বিশুদ্ধ অমানুষ দিব্য-চক্ষু দ্বারা দেখিলাম, পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুগণ বারাণসীর সমীপে ঋষিপতনে মৃগদায়ে অবস্থান করিতেছেন। অনন্তর রাজকুমার, উরুবেলায় যথারুচি বাস করিয়া আমি বারাণসী অভিমুখে যাত্রা করি।
রাজকুমার, উপক নামক আজীবক আমাকে দেখিতে পাইল যে আমি দীর্ঘ পথ-যাত্রী হইয়া বোধিদ্রুম ও গয়ার মধ্যবর্তী স্থানে উপনীত হইয়াছি। আমাকে দেখিয়া উপক কহিল, ‘বন্ধু, আপনার ইন্দ্রিয়-গ্রাম প্রসন্ন, দেহকান্তি, (চর্মরং) পরিশুদ্ধ ও পরিশোভিত হইয়াছে। আপনি কাহার উদ্দেশে প্রব্রজিত হইয়াছেন? কেই বা আপনার শাস্তা (গুরু)? কাঁহার ধর্মে আপনার রুচি?’ তদুত্তরে আমি উপক আজীবককে গাথাযোগে বলিলাম :
‘অভিভূত সর্বরিপু, পরিজ্ঞাত জ্ঞেয় সমুদয়,
নির্লিপ্ত লালসা পঙ্কে সর্বত্যাগী আমি মহাশয়।
তৃষ্ণাক্ষয়ে মুক্ত ভবে স্বীয় লোকুত্তর প্রতিভায়,
কাহাকে উদ্দেশি গুরু? শাস্তা কেবা আছে এ ধরায়?
আচার্য নাহিক মম সমকক্ষ নাহি বসুধায়,
সদেব-মানব মাঝে প্রতিপক্ষ না দেখি কোথায়।
অর্হৎ আমি যে বিশ্বে আমি হই শাস্তা অনুত্তর,
একাই সম্বুদ্ধ আমি শীতিভূত প্রশান্ত অন্তর।
অন্ধভূত বিশ্বমাঝে বাজাইয়া অমৃতের ভেরী,
ধর্ম-চক্র প্রবর্তিতে চলিলাম কাশীদের পুরী।’
‘বন্ধু, আপনি যেভাবে জ্ঞাপন করিতেছেন তাহাতে আপনি অনন্ত জিন হইবার যোগ্য।’
(তখন পুনরায় উত্তরে বলিলাম) :
‘মাদৃশ জনেরা হয় জিন, যাঁরা প্রাপ্ত তৃষ্ণাক্ষয়,
জিন আমি হে উপক, রিপুজয়ী দিনু পরিচয়।’
এরূপ উক্ত হইলে রাজকুমার, আজীবক উপক, ‘হইতেও পারে বন্ধু!’ বলিয়া শির সঞ্চালন করিয়া ভিন্ন পথে প্রস্থান করিল।
৩৪২. অতঃপর রাজকুমার, আমি ক্রমান্বয়ে পর্যটন করিতে করিতে বারাণসী সমীপে মৃগদাবে যেখানে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুগণ ছিল, তথায় উপনীত হই। পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুগণ দূর হইতে আমাকে দেখিল, দেখিয়া তাহারা পরস্পরের মধ্যে স্থির করিল (সণ্ঠপেসুং), ‘এই যে দ্রব্যবহুল, সাধনা-ভ্রষ্ট, বাহুল্যে-প্রবৃত্ত শ্রমণ গৌতম আসিতেছেন। তাঁহাকে অভিবাদন করা হইবে না, সম্মানার্থ গাত্রোত্থান করা হইবে না, আর অগ্রসর হইয়া তাঁহারা পাত্র-চীবরও গ্রহণ করা হইবে না। কেবল আসন সজ্জিত রাখা হইবে; যদি তিনি ইচ্ছা করেন, বসিতে পারেন।’
রাজকুমার, ক্রমে যতই আমি পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের সমীপবর্তী হইলাম, ততই তাহারা নিজেদের প্রতিজ্ঞায় স্থির থাকিতে অসমর্থ হইল। একজন আমার দিকে অগ্রসর হইয়া আমার পাত্র-চীবর গ্রহণ করিল, কেহ আসন সজ্জিত করিল, একজন পাদ ধৌত করিবার জল উপস্থিত করিল। তাহারা আমাকে বন্ধু ও স্বনামে সম্বোধন করিতে লাগিল। এইভাবে কথা বলিতে দেখিয়া আমি পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদিগকে বলিলাম, ‘ভিক্ষুগণ, তথাগতকে বন্ধু বলিয়া ও স্বনাম ধরিয়া সম্ভাষণ করিও না। ভিক্ষুগণ, তথাগত অর্হৎ সম্যক-সম্বুদ্ধ হইয়াছেন। তোমরা শ্রোতাবধান করো, অমৃত অধিগত হইয়াছে, আমি অনুশাসন করিতেছি, ধর্মোপদেশ দিতেছি। যেরূপ উপদিষ্ট হইবে তদনুরূপ আচরণ করিলে তোমরা অচিরেই যার জন্য কুলপুত্রগণ সম্যকভাবে আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হয়, সেই অনুত্তর ব্রহ্মচর্যাবসান (অর্হৎ ফল) দৃষ্টধর্মে (প্রত্যক্ষ-জীবনেই) স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া অধিগত হইয়া তাহাতে বিহার করিতে পারিবে। ইহা বিবৃত হইলে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুগণ আমাকে বলিল, ‘বন্ধু গৌতম, সেই দুষ্কর জীবন-যাপন, সেই কঠের সাধনা, সেই দুষ্কর তপশ্চর্যারত আপনি মনুষ্য হইতে উত্তরিতর সর্বোত্তম আর্য-জ্ঞান-দর্শন-বিশেষ অধিগত করিতে সমর্থ হন নাই, আর এখন দ্রব্যবহুল, সাধনা-ভ্রষ্ট এবং বাহুল্যে প্রবৃত্ত হইয়া মনুষ্যধর্মোত্তর, উত্তম আর্য-জ্ঞানদর্শন-বিশেষ অধিকার করিলেন?’
এই প্রকারে উক্ত হইলে, রাজকুমার, তখন আমি পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদিগকে বলিলাম, ‘ভিক্ষুগণ, তথাগত বাহুলিক নহে, সাধনাভ্রষ্ট নহে, বাহুল্যে প্রবৃত্তও নহে। ভিক্ষুগণ, তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ;… অধিগত হইয়া বিহার করিতে পারিবে।’
দ্বিতীয়বার… তৃতীয়বারও এইরূপ কথোপকথন হইল।
ইহা বিবৃত হইলে আমি পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদিগকে বলিলাম, ‘ভিক্ষুগণ, ইতিপূর্বে কি আমি কখনো তোমাদিগকে এই প্রকারে ইহা বলিয়াছি? স্মরণ হয় কি?’
‘নিশ্চয় না, ভন্তে,’
‘ভিক্ষুগণ, তথাগত অর্হৎ… বিহার করিতে পারিবে।’
রাজকুমার, এখন আমি পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদিগকে বিষয়টি বুঝাইতে সমর্থ হইলাম।
তাহাদের দুইজনকে আমি ধর্মোপদেশ দিতে থাকিলে অপর তিনজন ভিক্ষু ভিক্ষান্ন সংগ্রহে বাহির হয়। তিনজন বিচরণ করিয়া যাহা ভিক্ষান্ন আহরণ করে তদ্বারা ছয়জনেই দিন যাপন করি। যখন তিনজনকে উপদেশ দান করি তখন দুইজন ভিক্ষান্ন সংগ্রহে বিচরণ করে, দুইজন ভিক্ষু ভিক্ষা করিয়া যাহা আহরণ করে তদ্বারা ছয়জনেই দিন যাপন করি।
৩৪৩. অনন্তর পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষু আমাকর্তৃক এ প্রকারে উপদিষ্ট ও অনুশাসিত হইয়া অচিরেই যার জন্য কুলপুত্রগণ আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হয়, সেই অনুত্তর ব্রহ্মচর্যাবসান (অর্হৎ ফল) ইহ-জীবনে স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া, অধিগত হইয়া বিহার করিতে লাগিল।”
এইরূপ বিবৃত হইলে বোধি রাজকুমার ভগবানকে ইহা বলিলেন, “ভন্তে, তথাগতকে বিনায়ক লাভ করিয়া কত গৌণে ভিক্ষু, যার জন্য কুলপুত্রগণ সম্যকভাবে আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হন, সেই অনুত্তর ব্রহ্মচর্যের পর্যাবসান ইহ-জীবনেই সাক্ষাৎকার ও উপলব্ধি করিয়া বিহার করিতে পারেন?”
“তাহা হইলে, রাজকুমার, আপনাকেই এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিব, আপনার যাহা অভিমত তাহা যথাযথই প্রকাশ করিবেন।”
“রাজকুমার, হস্ত্যারোহণ অঙ্কুশধারণ শিল্পে আপনি দক্ষ কিনা?
“হ্যাঁ, ভন্তে, আমি… অঙ্কুশধারণে দক্ষ।”
“তবে রাজকুমার, যদি কোনো ব্যক্তি, ‘বোধি রাজকুমার হস্ত্যারোহী অঙ্কুশগ্রাহী শিল্প জানেন, তাঁহার নিকট আমি হস্ত্যারোহ অঙ্কুশগ্রাহ শিল্প শিক্ষা করিব’ মনে করিয়া আসে, আর সে শ্রদ্ধারহিত হয়, শ্রদ্ধাবানের দ্বারা যাহা লাভ করা সম্ভব, তাহা সে পাইবে না; সে হয় রোগ বহুল, যাহা নীরোগীর পক্ষে সম্ভব তাহা সে পাইবে না; সে হয় শঠ-মায়াবী… অশঠ-অমায়াবীর প্রাপ্য… সে পাইবে না; সে হয় অলস,… আরব্ধ বীর্যবানের প্রাপ্য… সে পাইবে না; সে হয় প্রজ্ঞাহীন,… প্রজ্ঞাবান যাহা শিক্ষা করিবে সে তাহা পারিবে না। তাহা কি মনে হয়, রাজকুমার, সে ব্যক্তি আপনার নিকট হস্ত্যারোহ অঙ্কুশগ্রাহ শিল্প শিক্ষা করিবে কি?”
“ভন্তে, একদোষযুক্ত ব্যক্তি আমার নিকট হস্ত্যারোহ অঙ্কুশগ্রাহ শিল্প শিক্ষা করিতে সমর্থ হইবে না, পাঁচ দোষযুক্তের কথাই বা কী?”
৩৪৪. “রাজকুমার, তাহা কী মনে করেন? যদি কোনো ব্যক্তি, ‘বোধি রাজকুমার হস্ত্যারোহ শিল্প জানেন… শিল্প শিক্ষা করিব,’ এই মানসে আসে, সে হয় শ্রদ্ধাবান, নীরোগী, অশঠ-অমায়াবী, নিরলস, প্রতিভাবান…। তবে সে ব্যক্তি আপনার নিকট হস্ত্যারোহ… শিল্প শিক্ষা করিতে সমর্থ হইবে কি?”
“ভন্তে, একগুণযুক্ত পুরুষও আমার নিকট… শিল্প শিক্ষা করিতে সক্ষম হইবে।”
“এই প্রকারই রাজকুমার, নির্বাণ সাধনার পাঁচ অঙ্গ আছে। সে পাঁচ কী? (১) ভিক্ষু শ্রদ্ধাবান হয়। তথাগতের বোধিকে (লোকোত্তর জ্ঞানকে) বিশ্বাস করে, ‘সেই ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ। অনুত্তর, পুরুষদম্য-সারথী। দেব-মনুষ্যদের শাস্তা, বুদ্ধ ও ভগবান হন।’ (২) নীরোগ, নিরাতঙ্ক হয়, ‘নাতিশীত, নাতিউষ্ণ, সমপরিপাকী, সাধনাক্ষম, মধ্যস্থ গ্রহণী (প্রকৃতি-কর্মজ তেজধাতু) বিশিষ্ট হয়।’ (৩) অশঠ-অমায়াবী হয়, ‘শাস্তা (গুরু) কিংবা বিজ্ঞ-সব্রহ্মচারীদের নিকট স্বীয় দোষগুণ যথাযথ প্রকাশ করে।’ (৪) অকুশল ধর্মের প্রহাণের নিমিত্ত, ‘কুশলধর্ম উৎপত্তির নিমিত্ত শক্তিমান দৃঢ় পরাক্রমী, কুশলধর্মে অনিক্ষিপ্ত ধুর (নিয়ত কুশলে তৎপর) ও আরব্ধবীর্য হইয়া বিহার করে।’ (৫) প্রজ্ঞাবান হয়, ‘আর্য (নির্বেদিক) প্রতিবিদ্ধ করিতে সমর্থ, সম্যক প্রকারে দুঃখ-ক্ষয়গামিনী উদয়-ব্যয় পরিচ্ছেদক বিদর্শন প্রজ্ঞায় সংযুক্ত হয়।’ রাজকুমার, সাধনোদ্যমের এই পঞ্চবিধ অঙ্গ।
৩৪৫. রাজকুমার, এই পঞ্চাঙ্গ সাধনোদ্যমযুক্ত ভিক্ষু তথাগতকে বিনায়ক (পরিচালক) রূপে লাভ করিলে যার জন্য কুলপুত্রগণ সম্যকরূপে আগার হইতে অনাগারিক প্রব্রজিত হয়, সেই অনুত্তর ব্রহ্মচর্য-পরিণাম (ফল) ইহ-জীবনেই সাত বৎসরের মধ্যে স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার এবং উপলব্ধি করিয়া বিহার করিতে পারে।
রাজকুমার, থাক সাত বৎসর, এই পঞ্চ প্রধানীয় (সাধনীয়) অঙ্গযুক্ত ভিক্ষু… ছয় বর্ষে, পাঁচ বর্ষে, তিন বর্ষে, দুই বর্ষে, এক বর্ষে, সাত মাসে, ছয় মাসে, পাঁচ মাসে, চার মাসে, তিন মাসে, দুই মাসে, এক মাসে, অর্ধ মাসে, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক রাত্রিদিনে।
থাক রাজকুমার, এক রাত্রিদিন, এই পঞ্চ প্রধানীয় অঙ্গযুক্ত ভিক্ষু তথাগতকে বিনায়ক লাভ করিয়া সন্ধ্যায় অনুশাসিত হইয়া প্রাতঃকালে বিশেষ অর্হত্ত্ব অধিগত হইবে। প্রাতঃকালে উপদিষ্ট হইয়া সন্ধ্যায় বিশেষ অধিগত হইবে।”
ইহা বিতৃত হইলে বোধি রাজকুমার ভগবানকে বলিলেন, “অহো বুদ্ধ, অহো ধর্ম, অহো ধর্মের স্বাখ্যাততা (উত্তম বর্ণনা), আশ্চর্য যে যাহা সন্ধ্যায় অনুশাসিত হইয়া প্রাতে বিশেষ অধিগত হইবে, প্রাতে অনুশাসিত হইয়া সন্ধ্যায় বিশেষ উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইবে।
৩৪৬. এইরূপে বলিলে সঞ্জিকাপুত্র মানবক বোধি রাজকুমারকে বলিলেন, “হে ভগবান বোধি, ইহা এরূপই, ‘অহো, বুদ্ধ, অহো ধর্ম, আর অহো ধর্মের উত্তম বর্ণনা!’ বলিতেছেন, অথচ সেই মাননীয় গৌতমের, ধর্ম ও ভিক্ষুসংঘের শরণ গ্রহণ করেন না।”
“সৌম্য সঞ্জিকাপুত্র, এরূপ বলিবেন না। সৌম্য সঞ্জিকাপুত্র, এরূপ বলিবেন না। সৌম্য সঞ্জিকাপুত্র, আমি আর্যার (মাতার) স্বমুখ হইতে ইহা শুনিয়াছি, স্বমুখ হইতে গ্রহণ করিয়াছি। সৌম্য সঞ্জিকাপুত্র, এক সময় ভগবান কৌশাম্বীর ঘোষিতারামে বিহার করিতেছেন। তখন আমার গর্ভবতী আর্যা যেখানে ভগবান ছিলেন তথায় উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট আমার আর্যা ভগবানকে নিবেদন করিলেন, ‘ভন্তে, আমার কুক্ষিগত যে কুমার কিংবা কুমারী আছে, সে ভগবান, ধর্ম এবং ভিক্ষুসংঘের শরণ গ্রহণ করিতেছে। আজ হইতে ভগবান জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাহাকে শরণাগত উপাসক কিংবা উপাসিকারূপে ধারণা করুন।’”
সৌম্য সঞ্জিকাপুত্র, এক সময় ভগবান এই ভর্গপ্রদেশেই সুংসুমার গিরীর ভেষকলা বনে মৃগদাবে বিহার করিতেছিলেন। তখন আমার ধাত্রী আমাকে অঙ্কে লইয়া যেখানে ভগবান ছিলেন সেখানে গিয়াছিল, গিয়া ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে দাঁড়াইল। একপ্রান্তে দাঁড়াইয়া আমার ধাত্রী ভগবানকে বলিল, ‘ভন্তে, এই বোধি রাজকুমার ভগবানের, ধর্মের ও ভিক্ষুসংঘের শরণ গ্রহণ করিতেছেন,…।’
সৌম্য সঞ্জিকাপুত্র, আমি এই তৃতীয়বারও ভগবানের, ধর্মের ও ভিক্ষুসংঘের শরণ গ্রহণ করিতেছি। ভগবান আজ হইতে আমাকে আপ্রাণকোটী শরণাগত উপাসকরূপে স্বীকার করুন।”
বোধি রাজকুমার সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ