অঙ্গুলিমালের জীবন পরিবর্তন (পূর্বে প্রমত্তে, শেষে মার্গে)
৩৪৭. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অনাথপিণ্ডিকের আরাম জেতবনে বিহার করিতেছেন।
সেই সময় রাজা পসেনদি কোশলের রাজ্যে নিষ্ঠুর, লোহিত-পাণি, হত্যা-প্রহত্যায় নিবিষ্ট, প্রাণী-ভূতদের প্রতি দয়াহীন অঙ্গুলিমাল নামক দস্যু ছিল। সে গ্রাম, নিগম, জনপদ ধ্বংস করিতে লাগিল। সে মানুষদিগকে বধ করিয়া অঙ্গুলির মালা ধারণ করিত। তখন ভগবান পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিধান করিয়া পাত্র-চীবর ধারণপূর্বক ভিক্ষান্ন সংগ্রহের জন্য শ্রাবস্তীতে প্রবেশ করিলেন। ভগবান শ্রাবস্তীতে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করিয়া, পিণ্ডাচরণ হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া, ভোজনের পর শয্যাসন শামলাইয়া, পাত্র-চীবর গ্রহণ করিয়া যেখানে চোর অঙ্গুলিমাল ছিল, তদভিমুখে দীর্ঘপথের যাত্রী হইলেন। তখন গো-পাল, পশুপাল, কৃষক ও পথিকগণ যেদিকে ডাকাত অঙ্গুলিমাল আছে সেদিকে দীর্ঘপথের যাত্রীরূপে ভগবানকে দেখিতে পাইল। তাহারা ভগবানকে বলিল, “শ্রমণ, ওপথে যাইবেন না। শ্রমণ, ওপথে অঙ্গুলিমাল নামক দস্যু আছে।… সে গ্রাম… ধ্বংস করিতেছে। সে মানুষদিগকে বধ করিয়া অঙ্গুলির মালা ধারণ করে। শ্রমণ, ওই পথে (যদি) বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশজন পর্যন্ত দলবদ্ধ হইয়া গমন করে; তাহারাও চোর অঙ্গুলিমালের হস্তে, হত হয়।”
এইরূপ উক্ত হইলেও ভগবান তূষ্ণীম্ভাবে চলিতে লাগিলেন।
দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বারও পূর্ববৎ বলা হইল।
৩৪৮. দস্যু অঙ্গুলিমাল ভগবানকে দূর হইতে আসিতে দেখিল, দেখিয়া তাহার এই মনে হইল, “ওহে, আশ্চর্যের বিষয়, অদ্ভুত ব্যাপার, এই পথে দশ পুরুষ… পঞ্চাশ পুরুষও দলবদ্ধ হইয়া চলে, তাহারাও আমার হাতে হত হয়; অথচ এই শ্রমণ একাকী, অদ্বিতীয় সাহসপূর্বক যেন আসিতেছেন। যদি আমি এই শ্রমণের জীবননাশ করি, তবে ভালো হয়।” তৎপর দস্যু অঙ্গুলিমাল ঢাল-তলোয়ার (অসিচর্ম) লইয়া, তীর-ধনু সংযোজিত করিয়া ভগবানের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হইল। তখন ভগবান এই প্রকার ঋদ্ধি অভিসংস্কার সংস্করণ (যোগবিভূতি) করিলেন যে, যাহাতে দস্যু অঙ্গুলিমাল সর্বশক্তিতে দৌড়াইয়াও স্বাভাবিক গতিতে গমনশীল ভগবানকে ধরিতে সমর্থ না হয়। তখন দস্যু অঙ্গুলিমালের এই মনে হইল, “ওহে, বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার, যে আমি পশ্চাদ্ধাবন করিয়া ধাবমান হস্তীকে ধরিয়াছি,… ধাবমান অশ্বকে,… ধাবমান রথকে,… ধাবমান মৃগকে ধরিয়াছি। অথচ এখন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গতিশীল এই শ্রমণকে সর্বশক্তিতে দৌড়াইয়াও আমি ধরিতে সমর্থ হইলাম না।” সে স্থিত অবস্থায় ভগবানকে বলিল, “স্থির হও, শ্রমণ, স্থির হও।”
“অঙ্গুলিমাল, আমি স্থির আছি, তুমি স্থির হও।”
তখন দস্যু অঙ্গুলিমালের এরূপ মনে হইল, “এই সকল শাক্যপুত্র শ্রমণগণ সত্যবাদী ও সত্যপ্রতিজ্ঞ। অথচ এই শ্রমণ গতিশীল অবস্থায় বলিতেছেন, ‘অঙ্গুলিমাল, আমি স্থির আছি, তুমি স্থির হও।’ ইহার তাৎপর্য এই শ্রমণকে জিজ্ঞাসা করিতে পারি কি?”
৩৪৯. তখন অঙ্গুলিমাল গাথা দ্বারা ভগবানকে বলিলেন :
“চলিছ শ্রমণ তবু বল আছি স্থির,
সুস্থির আমাকে কহ রহেছি অস্থির।
জিজ্ঞাসি তোমায় ইহা বল হে শ্রমণ!
তুমি স্থির, আমি হই অস্থির কেমন?” (১)
“নিখিল বিশ্বের প্রতি হে অঙ্গুলিমাল!
দণ্ড-ত্যজি স্থির আছি আমি সর্বকাল।
প্রাণীদের প্রতি হও তুমি অসংযত,
তাই তো অস্থির তুমি আমি সুসংযত।” (২)
“বহুকাল গত মম মহর্ষি-পূজিত,
মহাবনে সত্যবাদী আজি উপনীত।
ধর্মময় গাথা তব করিয়া শ্রবণ,
পাপ পরিহরি আমি যাপিব জীবন।” (৩)
এবে দস্যু অসি আর আয়ুধ যা ছিল,
প্রপাতে নালায় গর্তে নিক্ষেপ করিল।
সুগতের পাদপদ্মে করিয়া বন্দনা,
তাঁর কাছে প্রব্রজ্যার জানাল প্রার্থনা। (৪)
যিনি বুদ্ধ মহাঋষি করুণা নিধান,
দেবসহ এ লোকের শাস্তা সুমহান।
তিনি তাকে ‘এসো ভিক্ষু’ বলিল যখন,
ইহাতে হইল তাঁর ভিক্ষুত্ব অর্জন। (৫)
৩৫০. অতঃপর ভগবান অনুগামী শ্রমণরূপে আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমালসহ যেদিকে শ্রাবস্তী তদভিমুখে যাত্রা করিলেন। তিনি ক্রমশ চারিকায় (ধর্ম প্রচারার্থ) পরিক্রমা করিতে করিতে শ্রাবস্তীতে উপনীত হইলেন। তথায় শ্রাবস্তীতে ভগবান অনাথপিণ্ডিকের জেতবন বিহারে বাস করিতেছেন। সেই সময় রাজা পসেনদি কোশলের অন্তঃপুর-দ্বারে মহাজনমণ্ডলী সম্মিলিত হইয়া উচ্চশব্দ মহাশব্দ করিতেছিল, “দেব, আপনার রাজ্যে লোহিত-হস্ত, শিকারী, হত-প্রহতে নিবিষ্ট, প্রাণীদের প্রতি দয়াহীন অঙ্গুলিমাল নামক দস্যু আসিয়াছে; সে গ্রাম, নগর, জনপদ ধ্বংস করিতেছে। সে নরহত্যা করিয়া অঙ্গুলির মালা ধারণ করে। দেব, তাহাকে দমন করুন।”
তখন রাজা পসেনদি কোশল পাঁচশত অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া দিবা-দ্বিপ্রহরে শ্রাবস্তী হইতে বাহির হইলেন এবং যেখানে জেতবন আরাম ছিল সেই দিকে যাত্রা করিলেন। যে পর্যন্ত যানে যাইবার জায়গা ছিল, ততদূর যানে গিয়া যান হইতে অবতরণ করিয়া পদব্রজেই তিনি যেখানে ভগবান আছেন, সেখানে গেলেন। রাজা তথায় উপনীত হইয়া ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট রাজা পসেনদি কোশলকে ভগবান বলিলেন, “কেমন মহারাজ, আপনার উপর রাজা মাগধ সেনিয় বিম্বিসার, বৈশালীবাসী লিচ্ছবী কিংবা অপর কোনো বিরোধী রাজা কি কোপিত হইয়াছেন?”
“না, হে ভন্তে, আমার উপর রাজা মাগধ… কোপিত হন নাই। ভন্তে, আমার রাজ্যে… অঙ্গুলিমাল নামক… দস্যু আসিয়াছে, ভন্তে, তাহাকে আমি দমন করিব।”
“যদি মহারাজ, আপনি অঙ্গুলিমালকে কেশশ্মশ্রু মুণ্ডিত, কাষায় বস্ত্র পরিহিত, আগার হইতে অনাগারিক প্রব্রজিত, প্রাণিহিংসা-বিরত, অদত্তাদান-বিরত, মৃষাবাদ-বিরত, একাহারী, ব্রহ্মচারী, শীলবান কল্যাণধর্মী-রূপে দেখিতে পান, তবে তাহাকে কী করিবেন?”
“ভন্তে, আমরা তাঁহাকে অভিবাদন করিব, প্রত্যুত্থান করিব, আসন দ্বারা সম্মান করিব; চীবর, পিণ্ডপাত, শয়নাসন, গ্লান-প্রত্যয়, ভৈষজ্য পরিষ্কার (দ্রব্য) দ্বারা তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করিব; আর তাঁহার নিমিত্ত ধার্মিক রক্ষাবরণ-গুপ্তির সংবিধান করিব। কিন্তু ভন্তে, দুঃশীল পাপধর্মীর পক্ষে এরূপ শীল-সংযম কোথায় হইবে?”
সেই সময় আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল ভগবানের অদূরে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন ভগবান তাঁহার দক্ষিণ বাহু ধরিয়া রাজা পসেনদি কোশলকে বলিলেন, “মহারাজ, এই যে অঙ্গুলিমাল।”
তখন রাজা পসেনদির ভয় হইল, স্তব্ধতা হইল, শরীরে রোমঞ্চ হইল। তখন ভগবান… সন্ত্রস্থ রাজা পসেনদি কোশলকে বলিলেন, “ভয় করিবেন না, মহারাজ, ইহা হইতে আপনার কোনো ভয় নাই।” তখন রাজা পসেনদির যাহা ভয়… ছিল তাহা উপশম হইল।
তৎপর রাজা পসেনদি কোশল যেখানে আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল আছেন তথায় গেলেন। সেখানে গিয়া রাজা আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমালকে বলিলেন, “আর্য, আমাদের ভন্তে, অঙ্গুলিমাল?”
“হ্যাঁ, মহারাজ!”
“ভন্তে, আপনার পিতা কোনো গোত্রের, আর মাতা কোনো গোত্রের?”
“মহারাজ, আমার পিতা গার্গ, মাতা মৈত্রায়ণী।”
“ভন্তে, আর্য গার্গ-মৈত্রায়ণীপুত্র শাসনে অভিরমিত হউন, আমি আর্য গার্গ-মৈত্রায়ণীপুত্রের চীবর, পিণ্ডপাত, শয়নাসন, গ্লান-প্রত্যয়, ভৈষজ্য পরিষ্কার ব্যবস্থার উদ্যেগ করিব।”
৩৫১. সেই সময় আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল আরণ্যক, পাংশুকূলিক, ত্রৈচীবরিক ধূতাঙ্গ-ব্রতধারী ছিলেন। সুতরাং আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল রাজা পসেনদি কোশলকে বলিলেন, “যথেষ্ট, মহারাজ, আমার ত্রিচীবর পরিপূর্ণ আছে।”
তখন রাজা পসেনদি কোশল যেখানে ভগবান আছেন, সেখানে গেলেন। আর ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট… রাজা ভগবানকে বলিলেন, “বড়ই আশ্চর্য, ভন্তে, বড়ই অদ্ভুত, ভন্তে, ভন্তে, ভগবান অদান্তের এমন দমনকারী, অশান্তের শমনকারী, অপরিনির্বৃত্তদের নির্বাপনকারী। যাহাকে ভন্তে, আমরা দণ্ড দ্বারা ও অস্ত্র দ্বারা দমন করিতে সমর্থ হই নাই; ভন্তে, আপনি তাহাকে বিনাদণ্ডে বিনা-অস্ত্রে দমন করিলেন। বেশ, ভন্তে, এখন আমরা যাই। আমাদের বহুকৃত্য বহু করণীয়।”
“মহারাজ, আপনি যাহা উচিত মনে করেন তাহা করিতে পারেন।”
তখন রাজা পসেনদি কোশল আসন হইতে উঠিয়া ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া প্রস্থান করিলেন।
তৎপর একদিন আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিহিত হইয়া পাত্র-চীবর ধারণ করিয়া শ্রাবস্তীতে ভিক্ষার্থ প্রবেশ করিলেন। তিনি শ্রাবস্তীতে সপদান (ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে ক্রমান্বয়ে) ভিক্ষাচরণ করিবার সময় গর্ভ বিপর্যস্ত, গর্ভযন্ত্রণা কাতর এক স্ত্রীলোককে দেখিতে পাইলেন; দেখিয়া তাঁহার এই চিন্তা হইল, “অহো, প্রাণীগণ দুঃখ পাইতেছে! অহো, প্রাণীগণ যন্ত্রণা ভোগ করিতেছে!”
অতঃপর আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল শ্রাবস্তীতে পিণ্ডাচরণ সমাপ্ত করিয়া, ভিক্ষাচর্যা হইতে প্রত্যাবৃত হইয়া ভোজনের পর, যেখানে ভগবান ছিলেন, তথায় গেলেন এবং ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল ভগবানকে নিবেদন করিলেন, “ভন্তে, আমি পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিহিত হইয়া পাত্র-চীবর ধারণ করিয়া এই শ্রাবস্তীতে ভিক্ষাচর্যার্থ প্রবেশ করিয়াছিলাম। তথায় আমি… গর্ভ-বিপর্যস্ত, গর্ভযন্ত্রণা কাতর এক স্ত্রীলোককে দেখিতে পাইলাম।… ‘অহো, প্রাণীগণ দুঃখ পাইতেছে!… যন্ত্রণা ভোগ করিতেছে!’”
“অঙ্গুলিমাল, তাহা হইলে তুমি সেই স্ত্রীলোকের নিকট পুনরায় যাও, তথায় গিয়া তাহাকে বলো, ‘ভগিনী, যখন হইতে আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি, তখন হইতে স্বেচ্ছায় কোনো প্রাণিহিংসা করিয়াছি বলিয়া জানি না। সে সত্য দ্বারা তোমার স্বস্তি, হউক, তোমার গর্ভেরও মঙ্গল হউক।’”
“ভন্তে, উহা আমার সজ্ঞানে মিথ্যাভাষণ হইবে নহে কি? ভন্তে, আমাকর্তৃক সজ্ঞানে অনেক প্রাণীর জীবননাশ হইয়াছে।”
“তাহা হইলে, অঙ্গুলিমাল, যেখানে সেই স্ত্রীলোক আছে, সেখানে উপস্থিত হও, আর তাহাকে এরূপ বলো, ‘যখন হইতে ভগিনি, আমি আর্যগোত্রে জন্মগ্রহণ করিয়াছি তখন হইতে স্বেচ্ছায় কোনো প্রাণিহিংসা করিয়াছি বলিয়া আমি জানি না। সে সত্য দ্বারা… মঙ্গল হউক।’”
“হ্যাঁ, ভন্তে,” (বলিয়া) আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল ভগবানকে প্রতিশ্রুতি দিয়া যেখানে সে স্ত্রীলোক আছে, সেখানে উপস্থিত হইলেন… এবং তাহাকে বলিলেন :
“যে হতে ভগিনী, আমি আর্যগোত্রে লভিনু জনম,
সে হতে স্বেচ্ছায় কোনো প্রাণিবধ করিনি কখন;
এই সত্যে শুভ তব সুখী হোক গর্ভের নন্দন।”
তখন সেই স্ত্রীর ও তাহার গর্ভের স্বস্তি হইয়াছিল।
সেই সময় আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল একাকী, বিবেকযুক্ত, অপ্রমত্ত, উদ্যোগী ও সংযত জীবনযাপন করিয়া অচিরেই ‘যার জন্য কুলপুত্রগণ… প্রব্রজিত হয়, সেই অনুত্তর ব্রহ্মচর্যের অবসান-ফল (অর্হত্ত্ব) ইহ-জীবনেই স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎকার করিয়া, উপলব্ধি করিয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। তাঁহার জন্ম ক্ষয় হইয়াছে, ব্রহ্মচর্যবাস পরিপূর্ণ হইয়াছে, করণীয় কৃত হইয়াছে। এখন এই জীবনের নিমিত্ত অপর কর্তব্য নাই, তিনি ইহা জ্ঞাত হইলেন। আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল অর্হৎদের অন্যতর হইলেন।
৩৫২. তৎপর একদিন আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিধান ও পাত্র-চীবর ধারণপূর্বক ভিক্ষাচর্যার নিমিত্ত শ্রাবস্তীতে প্রবেশ করিলেন। সেই সময় অন্য কারণে নিক্ষিপ্ত ঢিল আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমালের দেহে নিপতিত হইল। অন্য কারণে নিক্ষিপ্ত দণ্ড কঙ্কর আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমালের দেহে নিপতিত হইল। তখন আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল বিদীর্ণ-শিরে বিগলিত শোণিত-ধারায় ভগ্ন-পাত্র ও ছিন্ন-সংঘাটিসহ যেখানে ভগবান ছিলেন সেখানে গেলেন। ভগবান দূর হইতেই আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমালকে আসিতে দেখিলেন, দেখিয়া আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমালকে বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, তুমি ধৈর্য ধারণ করো, ব্রাহ্মণ, তুমি সহিষ্ণুতা অবলম্বন করো। যে কর্মফলে, ব্রাহ্মণ, তোমাকে বহুবর্ষ, বহুশতবর্ষ, বহু সহস্রবর্ষ নরকে পঁচিতে হইত, ব্রাহ্মণ, সেই কর্মফল তুমি ইহ-জীবনেই ভোগ করিলে।”
যখন আয়ুষ্মান অঙ্গুলিমাল নিভৃতস্থানে ফলসমাপত্তি ধ্যান-লীন হইয়া বিমুক্তি-সুখ উপলব্ধি করিলেন, তখন এই উদান (আনন্দোচ্ছ্বাস) উচ্চারণ করিলেন :
“প্রমাদে থাকিয়া পূর্বে পরে হন অপ্রমত্ত যিনি,
মেঘমুক্ত চন্দ্রতুল্য লোক করে আলোকিত তিনি। (১)
যার কৃত পাপকর্ম কুশলেতে হয় দূরীকৃত,
মেঘমুক্ত চন্দ্রতুল্য বিশ্ব তিনি করে আলোকিত। (২)
হলেও তরুণ ভিক্ষু বুদ্ধধর্মে যিনি নিয়োজিত,
মেঘমুক্ত চন্দ্রতুল্য বিশ্ব তিনি করে প্রভাসিত। (৩)
“শত্রুরা শুনুক মম সদ্ধর্ম ভাষণ,
শত্রুরা হউক মম ধর্মে নিমগন।
শত্রুরা হউক লিপ্ত তাঁদের সেবায়,
যারা শান্ত সদ্ধর্মের প্রেরণা যোগায়। (৪)
ক্ষান্তিবাদী মৈত্রী-প্রশংসীর ধর্ম সনাতন,
শুনুন শত্রুরা মম কালে করুক পালন। (৫)
মোরে কিংবা অন্যকারে কভু কেহ হিংসা না করুন,
লভিয়া পরম শান্তি, ভীতাভীতে নির্বিঘ্নে রাখুন। (৬)
চালায় চালক যথা জল, ইষুকার শর সোজা করে,
বর্ধকীরা ঋজু করে কাঠ, তথা ধীর দমে আপনারে। (৭)
অঙ্কুশে কশায় দণ্ডে কেহ অদান্তকে করেন দমন,
অস্ত্র-দণ্ড বিনা অদান্ত আমায় দমিলেন ভগবান, (৮)
অহিংসক নাম মম হিংসুকের পূরব জীবনে,
সার্থক হইল আজি হিংসা আর নাহি কোনো জনে। (৯)
অঙ্গুলিমাল নামেতে পূর্বে ছিনু দস্যু সুবিখ্যাত,
বুদ্ধের শরণ লই যবে মহাস্রোতে নিমজ্জিত। (১০)
রক্তপাণি পূর্বে আমি বিখ্যাত অঙ্গুলিমাল,
শরণাগমনে দেখ সমুচ্ছিন্ন ভবজাল। (১১)
তাদৃশ দুর্গতিগামী বহুকর্ম করি সম্পাদন,
কর্মক্ষয়ী মার্গস্পর্শে করিতেছি অঋণী-ভোজন। ১২)
প্রমাদে নিমগ্ন থাকে দুর্মেধ অজ্ঞানী জন,
অপ্রমাদ রক্ষে ধীর শ্রেষ্ঠ ধনের মতন। (১৩)
হও না প্রমাদে রত করিও না কামরতি ভোগ,
অপ্রমত্ত ধ্যানশীল লভে নির্বাণ বিপুল সুখ। (১৪)
স্বাগত হয়েছে মম নহে দূরাগত,
মন্ত্রণা প্রব্রজ্যা লাভে অতীব সঙ্গত।
সুবিভক্ত বুদ্ধধর্মে শ্রেষ্ঠ যে নির্বাণ,
লভিনু তাহাতে আমি অপরোক্ষ জ্ঞান। (১৫)
স্বাগত হয়েছে মম নহে দূরাগত,
মন্ত্রণা প্রব্রজ্যা লাভে অতীব সঙ্গত।
ত্রিবিদ্যা অর্জিত মম হইল এখন,
বুদ্ধের শাসনে কৃত্য হল সমাপন।” (১৬)
অঙ্গুলিমাল সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ