৩৮৩. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান পঞ্চশত ভিক্ষু সমন্বিত মহাভিক্ষুসংঘসহ বিদেহ প্রদেশে ধর্ম প্রচারার্থ বিচরণ করিতেছিলেন। সেই সময় (এক) জীর্ণ, বৃদ্ধ, মহল্লক (বয়স্ক) সময়গত, বয়ঃপ্রাপ্ত, জন্মেতে বিংশত্যধিক শত (১২০) বর্ষীয় ব্রহ্মায়ু নামক ব্রাহ্মণ মিথিলা সমীপে বাস করিতেন। (তিনি) পঞ্চম ইতিহাস, নিঘণ্টু (অভিধান), কেটুভা (কল্প), অক্ষর-প্রভেদ (শিক্ষা-নিরুক্ত) সহিত তিন বেদের পরাগূ, পদজ্ঞ (কবি), বৈয়াকরণ, লোকায়ত (শাস্ত্র) আর মহাপুরুষ-লক্ষণে (সামুদ্রিকে) পূর্ণ অধিকারী ছিলেন। ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ শুনিলেন, “শাক্যকুল প্রব্রজিত শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম পঞ্চশত ভিক্ষু সমন্ত্বিত মহাভিক্ষুসংঘসহ বিদেহদেশে ধর্ম প্রচারার্থ বিচরণ করিতেছেন। সেই মাননীয় গৌতমের এই প্রকার কল্যাণজনক কীর্তি-শব্দ বিস্তার হইয়াছে : সেই ভগবান অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণ-সম্পন্ন, সুগত, লোকবিদূ, অনুত্তর পুরুষদম্য-সারথী, দেব-মানবের শাস্তা, বুদ্ধ ও ভগবান। তিনি দেব, মার, ব্রহ্মাসহ এই লোক; শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, দেব-মনুষ্যসহ জনতাকে স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা প্রত্যক্ষ করিয়া প্রচার করিতেছেন। তিনি আদি-কল্যাণ, মধ্য-কল্যাণ, অন্তকল্যাণজনক ধর্ম উপদেশ করিতেছেন। তিনি অর্থ-ব্যঞ্জনযুক্ত সর্বাঙ্গ পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশ করিতেছেন, তথাবিধ অর্হতের দর্শন মঙ্গলজনক।”
৩৮৪. সেই সময় ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণের উত্তর নামক মানব (বিদ্যার্থী) অন্তেবাসী ছিল। (সেও) পঞ্চম ইতিহাস, নিঘণ্টু, কেটুভ, অক্ষর-প্রভেদসহ ত্রিবেদের পারগূ, পদজ্ঞ, বৈয়াকরণ লোকায়ত আর মহাপুরুষ-লক্ষণে পূর্ণ অধিকারী ছিল। তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ উত্তর-মানবকে আহ্বান করিলেন, “তাত উত্তর, এই শাক্যকুল প্রব্রজিত শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম… বিদেহে বিচরণ করিতেছেন। সেই মাননীয় গৌতমের এরূপ কল্যাণ কীর্তি-শব্দ বিস্তার হইয়াছে : ‘… ব্রহ্মচর্য প্রকাশ করিতেছেন। তথাবিধ অর্হতের দর্শন মঙ্গলজনক।’ এসো, বৎস উত্তর, শ্রমণ গৌতম যেখানে আছেন সে-স্থানে যাও। তথায় গিয়া শ্রমণ গৌতমকে অনুসন্ধান করো যে, ভগবান গৌতমের যথার্থ কীর্তি-শব্দ বিস্তার হইয়াছে কিংবা অযথার্থ? সেই গৌতম কি তাদৃশ কিংবা তাদৃশ নহে? তোমার দ্বারা আমরা সেই মাননীয় গৌতমকে জানিতে পারিব।”
“কী প্রকারে ভো, আমি সেই গৌতমকে জানিব যে মাননীয় গৌতমের কীর্তি-শব্দ যথার্থ বিস্তার হইয়াছে কিংবা অযথার্থ? সে গৌতম তাদৃশ কিংবা নহে?”
“বৎস উত্তর, আমাদের বেদ-মন্ত্রে বত্রিশ মহাপুরুষ-লক্ষণ আসিয়াছে যদ্বারা যুক্ত মহাপুরুষের দ্বিবিধ গতির অন্যতর গতি হইবে, যদি তিনি আগারে বাস করেন, তবে জনপদে স্থিরতা প্রাপ্ত, চতুরান্ত, (পর্যন্ত পৃথিবী) বিজয়ী, সপ্তরত্নের অধিকারী, ধার্মিক ধর্মরাজ চক্রবর্তী রাজা হন। তাঁহার এই সপ্তরত্ন থাকে-(১) চক্ররত্ন, (২) হস্তীরত্ন, (৩) অশ্বরত্ন, (৪) মণিরত্ন, (৫) স্ত্রীরত্ন, (৬) গৃহপতিরত্ন, আর (৭) সপ্তম পরিণায়করত্ন। তাঁহার পরসৈন্য-প্রমর্দক শূর, বীর সহস্রাধিক পুত্র জন্মিয়া থাকেন। তিনি সসাগরা এই পৃথিবীকে বিনাদণ্ডে বিনাঅস্ত্রে ন্যায়-ধর্মে বিজয় করিয়া অধিকার করেন। যদি তিনি আগার হইতে বাহির হইয়া অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হন, তবে আচ্ছাদন উন্মুক্ত অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বৎস উত্তর, আমি তোমার মন্ত্রের দাতা, আর তুমি মন্ত্রের প্রতিগ্রাহক।”
৩৮৫. “আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রভো” (বলিয়া) উত্তর মানব ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে প্রতিশ্রুতি দিল এবং আসন হইতে উঠিয়া ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া বিদেহ প্রদেশে যেখানে ভগবান আছেন তদভিমুখে যাত্রা করিল। সে ক্রমশ বিচরণ করিতে করিতে যেখানে ভগবান ছিলেন সে-স্থানে গেল। তথায় গিয়া ভগবানের সাথে… সম্মোদন করিয়া একপ্রান্তে বসিল। একপ্রান্তে উপবিষ্ট উত্তর মানব ভগবানের শরীরে বত্রিশ মহাপুরুষ-লক্ষণ অন্বেষণ করিতে লাগিল। উত্তর মানব ভগবানের শরীরে দুই চিহ্ন ব্যতীত বত্রিশ লক্ষণের অধিকাংশ দেখিতে পাইল। কোষাচ্ছাদিত বস্ত্রগুহ্য (চর্মাবৃত উপস্থ) ও প্রভূত জিহ্বত্ব এই দ্বিবিধ মহাপুরুষ-লক্ষণ সম্বন্ধে সে অনিশ্চিত ও সংশয়মুক্ত-নহে, সুপ্রসন্ন নহে। তখন ভগবানের চিন্তা হইল : ‘এই উত্তর মানব আমার শরীরে দুইটি ব্যতীত বত্রিশ মহাপুরুষ-লক্ষণের অধিকাংশ দেখিতে পাইল,… সুপ্রসন্ন নহে।’
তখন ভগবান এতাদৃশ ঋদ্ধি-প্রভাব (যোগবিভূতি) প্রকট করিলেন যাহাতে কেবল উত্তর মানব কোষ-রক্ষিত উপস্থ দেখিতে পায়। তখন ভগবান জিহ্বা বাহির করিয়া তদ্বারা উভয় কর্ণছিদ্র স্পর্শ করিলেন, পরিস্পর্শ করিলেন; উভয় নাসারন্ধ্র স্পর্শ… পরিস্পর্শ করিলেন; জিহ্বা দ্বারা ললাট মণ্ডলের সর্বত্র আচ্ছাদন করিলেন।
তখন উত্তর মানবের চিন্তা হইল : ‘শ্রমণ গৌতম বত্রিশ মহাপুরুষ-লক্ষণযুক্ত হন। যদি আমি শ্রমণ গৌতমের অনুগমন করি, তবে তাঁহার ঈর্যাপথও দেখিতে পাইব।’ তখন উত্তর মানব সাত মাস পর্যন্ত অপরিত্যাগিনী ছায়ার ন্যায় ভগবানের পিছে পিছে ভ্রমণ করিল।
৩৮৬. সাত মাসের পর উত্তর মানব বিদেহ প্রদেশে যে-স্থানে মিথিলা, সেই দিকে যাত্রা করিল। ক্রমশ ভ্রমণ করিতে করিতে যেখানে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ ছিলেন, তথায় উপনীত হইল। তথায় উপনীত হইয়া ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে বসিল। ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ একপ্রান্তে উপবিষ্ট মানবকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন, বৎস উত্তর, ভগবান গৌতমের কীর্তি-শব্দ সত্যানুসারে বিস্তৃত হইয়াছে, অন্যথা তো নহে? কেমন সে গৌতম তাদৃশ কি, অন্যথা তো নহে?”
“যথার্থই, ভো গুরুদেব, ভগবান গৌতমের কীর্তি-শব্দ সত্যানুসারে বিস্তৃত হইয়াছে, অন্যথা নহে। সেই মাননীয় গৌতম তদ্রূপই, অন্য প্রকার নহেন। সেই মাননীয় গৌতম বত্রিশ মহাপুরুষ-লক্ষণমণ্ডিত হন : (১) সেই মাননীয় গৌতম সুপ্রতিষ্ঠিত পাদ (একসঙ্গে সর্ব পদতল ভূমিতে পড়ে ও উঠে), ইহাও মহাপুরুষ গৌতমের মহাপুরুষ-লক্ষণ। (২) মাননীয় গৌতমের নিম্ন পদতলে সর্বাকারে পরিপূর্ণ নাভি-নেমিসহ সহস্র অর বিশিষ্ট চক্রচিহ্ন বিদ্যমান। (৩)… গৌতম আয়ত পার্ষ্ণি (বিস্তৃত পরিপূর্ণ গোড়ালির নিম্নভাগ) যুক্ত হন। (৪)… (ক্রমে সর্ব) দীর্ঘ অঙ্গুল…। (৫)… (সদ্যজাত শিশুর ন্যায়) মৃদু ও সদা তরুণ হস্ত-পাদ…। (৬)… জাল-হস্ত-পাদ (সম্প্রমাণ অঙ্গুলির রেখাসমূহ জাল সদৃশ)…। (৭)… উৎসঙ্খ পাদ (পায়ের গুল্ফ নরম ও উপরে প্রতিষ্ঠিত)…। (৮) এণী জঙ্ঘ (মৃগের ন্যায় সমবর্তুলাকার মাংসল জঙ্ঘা)…। (৯) সোজা দাঁড়াইয়া অবনত না হইয়া সেই মান্য গৌতম উভয় হস্ততল দ্বারা জানুদ্বয় স্পর্শ করেন, মর্দন করেন (আজানুলম্বিত বাহু)…। (১০) কোষাচ্ছাদিত বস্ত্র-গুহ্য (উপস্থ)…। (১১) সুবর্ণ বর্ণ কাঞ্চনসন্নিভ চর্ম…। (১২) সূক্ষ্ম ছবি (চর্ম) চর্মের মসৃণতা-হেতু দেহে ধূলি-ময়লা লিপ্ত হয় না…। (১৩) একৈক লোম, প্রতি লোমকূপে এক এক লোম জন্মিয়াছে…। (১৪) ঊর্ধ্বাগ্র লোমা, (তাঁহার অঞ্জন সদৃশ নীল, দক্ষিণাবর্তে কু-লিত লোমসমূহের অগ্রভাগ উপরদিকে উঠিয়াছে)…। (১৫) ব্রহ্মঋজু-গাত্র (দীর্ঘ অকুটিল শরীর…। (১৬) সপ্ত উৎসদ (স্ফীত…। (১৭) সিংহ পূর্বার্ধ কায় (বক্ষ আদি শরীরের উপরিভাগ সিংহের ন্যায়)…। (১৮) চিতান্তরাংস (উভয় কাঁধের পশ্চাতের মধ্যাংশ চিত বা মাংসপূর্ণ)…। (১৯) ন্যগ্রোধ পরিমণ্ডল হন,…যত দীর্ঘ শরীর তদনুসারে ব্যাম (প্রস্থ), যত ব্যাম তত দীর্ঘ (চারি হাত) শরীর)…। (২০) সমাবর্ত স্কন্ধ সমপরিমাণ স্কন্ধ…। (২১) রসগ্রাসাগ্রী (রসগ্রাহী) শিরা অগ্রণী।… (২২) সিংহহনু (সিংহের ন্যায় পূর্ণ হনুবিশিষ্ট)…। (২৩) চল্লিশ দন্ত,…। (২৪) সমদন্ত,…। (২৫) অবিবর দন্ত…। (২৬) সুশুভ্র দন্ত,…। (২৭) প্রভুত (বিস্তৃত) জিহ্বা…। (২৮) ব্রহ্মস্বর, করবীক (পক্ষীর ন্যায় মধুর) ভাষী…। (২৯) অভিনীল নেত্র (অতসী পুষ্পের ন্যায় গাঢ় নীলাভ চক্ষুবিশিষ্ট)…। (৩০) গো-পঞ্চম (গর্বর নেত্রলোমের ন্যায় চক্ষু লোম) যুক্ত…। (৩১) মাননীয় গৌতমের ভ্রূ-যুগলের মধ্যে কোমল শ্বেত কার্পাস-সন্নিভ ঊর্ণা (রোমাবর্ত) জন্মিয়াছে…। (৩২) উষ্ণীষ শীর্ষ (বদ্ধ উষ্ণীষের ন্যায় গোলাকার শীর্ষ) বিশিষ্ট মাননীয় গৌতম ইহাও মহাপুরুষ গৌতমের মহাপুরুষ-লক্ষণ। সেই মাননীয় গৌতম এই বত্রিশ প্রকার মহাপুরুষ-লক্ষণমণ্ডিত হন।
৩৮৭. সেই প্রভু গৌতম গমনের সময় প্রথমে দক্ষিণ পদেই অগ্রসর হন। তিনি অতি দূরের জন্য পাদ উত্তোলন করেন না, অতি সমীপে পাদ-নিক্ষেপ করেন না। তিনি অতি দ্রুত গমন করেন না, অতিধীরে গমন করেন না। জানু দ্বারা জানু ঘর্ষণ করিয়া চলেন না, গুল্ফ দ্বারা গুল্ফ ঘর্ষণ করিয়া গমন করেন না। গমনের সময় তিনি ঊরু উন্নত করেন না, ঊরু অবনত করেন না, ঊরু সন্নামন বা নিচের দিকে শক্ত করেন না, উক্ত বিনামন বা ইতস্তত সঞ্চালন করেন না। গমনের সময় প্রভু গৌতমের শুধু অধঃঅঙ্গ সঞ্চালিত হয়। তিনি কায়বলে বা বাহু সঞ্চালনাদি ঘর্মাক্ত কলেবরে গমন করেন না। অবলোকনের সময় প্রভু গৌতম গজেন্দ্র সদৃশ সর্বশরীর ঘুরাইয়া অবলোকন করেন। তিনি নক্ষত্র দেখার ন্যায় উপরদিকে উলেৱাকন করেন না, পতিত দ্রব্য অন্বেষণের ন্যায় নিম্নদিকে অবলোকন করেন না। নানাদিক দেখিতে দেখিতে গমন করেন না। যুগমাত্র (৪ হাত) সম্মুখে দেখিয়া থাকেন, তৎপরেও তাঁহার জ্ঞানদর্শন অনাবৃত থাকে।
তিনি গৃহে প্রবেশ করিবার সময় দেহ উন্নত করেন না, দেহ অবনত করেন না, দেহ সন্নমিত ও বিনমিত করেন না। তিনি আসনের অতিদূরে অত্যাসন্নে (দেহ) পরিবর্তন করেন না, হাতে ভারদিয়া আসনে বসেন না, আসনে দেহ নিক্ষেপ করেন না। তিনি গৃহাভ্যন্তরে উপবিষ্ট অবস্থায় হস্ত্তের অসংযমতা প্রদর্শন করেন না, জানুর উপর জানু রাখিয়া বসেন না, গুল্ফের উপর গুল্ফ রাখিয়া বসেন না, হনু বা চোয়াল জড়াইয়া ধরিয়া বসেন না। তিনি গৃহ মধ্যে উপবিষ্ট অবস্থায় ভীত হন না, কম্পিত হন না, বিচলিত হন না, সন্ত্রস্ত হন না। তিনি নির্ভীক, নিষ্কম্প, অচঞ্চল, সন্ত্রাসহীন, রোমাঞ্চরহিত ও বিবেকব্রতী হইয়াই গৃহমধ্যে উপবেশন করেন।
তিনি পাত্রে জল গ্রহণের সময় পাত্র উপরে তোলেন না, নিচে নামান না; পাত্র সন্নামন করেন না, বিনামন করেন না। তিনি পাত্রে অত্যধিক কিংবা অত্যল্প জল গ্রহণ করেন না। তিনি ‘কুলু কুলু’ শব্দ করিয়া পাত্র-ধৌত করেন না, পরিবর্তন করিয়া প্রথমে পাত্রের বহির্ভাগ ধৌত করেন না, পাত্র মাটিতে রাখিয়া হাতে ধৌত করেন না; হাত ধৌত করার সঙ্গে সঙ্গে পাত্র ধৌত হয়, পাত্র ধৌত করার সঙ্গে সঙ্গে হস্তদ্বয় বিধৌত হয়। তিনি অতিদূরে কিংবা অতি সমীপে ইতস্তত বিকীরণ করিয়া পাত্রের জল নিক্ষেপ করেন না।
তিনি অন্নগ্রহণের সময় পাত্র উন্নত করেন না, অবনত করেন না, সন্নমিত করেন না, বিনমিত করেন না। তিনি অতিবেশি কিংবা অত্যল্প ভাত গ্রহণ করেন না। সেই মাননীয় গৌতম ব্যঞ্জনও ব্যঞ্জন-মাত্রায় (ভাতের এক চতুর্থাংশ) আহার করেন। ব্যঞ্জন দ্বারা গ্রাসের (পরিমাণ) অতিক্রম করেন না।… মুখে গ্রাস চর্বণ করিতে করিতে দুই তিনবার পরিবর্তন করিয়া গলাধঃকরণ করেন। কোনো অন্ন-মজ্জা অভিন্ন অবস্থায় তাঁহার দেহে (উদরে) প্রবেশ করেন না। যখন কোনো অন্ন-মজ্জা তাঁহার মুখে অবশিষ্ট থাকে না তখন অপর গ্রাস মুখে আনয়ন করেন। প্রভু গৌতম রসানুভব করিতে করিতে খাদ্য আহার করেন, কিন্তু রস-তৃষ্ণাসক্ত হন না।
অষ্টাঙ্গযুক্ত আহারই প্রভু গৌতম আহরণ করিয়া থাকেন : ‘তাহা ক্রীড়ার জন্য নহে, মত্ততার জন্য নহে, মণ্ডন বা দেহ সৌষ্ঠবের জন্য নহে, বিভূষণের জন্য নহে; কেবল এই ভৌতিক দেহের স্থিতির নিমিত্ত, জীবন যাপনের নিমিত্ত, ক্ষুধা-যন্ত্রণা উপশমের নিমিত্ত, ব্রহ্মচর্যের সহায়তার নিমিত্ত; এই উপায়ে পুরাতন (ক্ষুধাজনিত) বেদনা নিবারণ করিব, (অমিত ভোজনজনিত) নূতন বেদনা উৎপন্ন হইতে দিব না; আমার নিরবদ্য জীবন-যাত্রা ও সুখ-বিহার হইবে।’
তিনি ভোজন শেষে পাত্রে জল গ্রহণের সময় পাত্র উন্নত করেন না, অবনত করেন না, সন্নমিত করেন না, বিনমিত করেন না। তিনি পাত্রে অত্যধিক বা অত্যল্প জল গ্রহণ করেন না। তিনি ‘কুলু কুলু’ শব্দে পাত্র ধৌত করেন না, পরিবর্তন করিয়া (উল্টাইয়া) পাত্র ধৌত করেন না, পাত্র মাটিতে রাখিয়া হস্ত ধৌত করেন না, হস্ত ধৌতের সময় পাত্র ধৌত হয়, পাত্র ধুইবার সময় হস্ত ধৌত হয়। তিনি পাত্রের জল ইতস্তত বিক্ষেপ না করিয়া অনতিদূরে, অনতি সমীপে ত্যাগ করেন। তিনি ভোজন শেষে পাত্র অনতিদূরে, অনতি আসন্নে ভূমিতে নিক্ষেপ করেন না, পাত্রের প্রতি নিরপেক্ষ হন না, আর দীর্ঘকাল উহার রক্ষায় তৎপর থাকেন না।
ভোজন শেষে তিনি কিছুক্ষণ (মুহুত্তং) মৌনভাবে বসিয়া থাকেন, আর অনুমোদনের সময় অতিক্রম করেন না, ভোজনের পর তিনি ভুক্তানুমোদন (উপদেশ) করেন। সেই ভোজনের নিন্দা করেন না, অন্য ভোজনের প্রত্যাশা রাখেন না, অধিকন্তু ধর্মীয় উপদেশ দ্বারা সেই পরিষদকে সন্দর্শন, সমাদাপন, সমুত্তেজন, সম্প্রহর্ষণ করেন। তিনি সেই পরিষদকে ধর্মোপদেশ দ্বারা… সম্প্রহৃষ্ট করিয়া আসন হইতে উঠিয়া প্রস্থান করেন।
তিনি অতিদ্রুত গমন করেন না, অতি ধীরে গমন করেন না এবং মুক্তি ইচ্ছায় (অর্থাৎ সম্মুখস্থকে পশ্চাতে রাখিবার ইচ্ছায়) গমন করেন না। প্রভু গৌতমের দেহে চীবর অতি উপরে উঠে না, অত্যন্ত নীচে ঝুলে না, শরীরে স্বেদ-সংলগ্ন থাকে না, দেহ হইতে অধিক অসংলগ্নও থাকে না। মাননীয় গৌতমের শরীর হইতে চীবর বায়ুতে অপসারিত করে না আর প্রভু গৌতমের শরীরে ধুলি-ময়লাও সংলগ্ন হয় না।
তিনি আশ্রমে উপনীত হইয়া সজ্জিত আসনে বসেন, বসিয়া পাদ ধৌত করেন। কিন্তু মাননীয় গৌতম (প্রস্তরাদিতে ঘর্ষণ দ্বারা) পাদ-শোভন ব্রতে তৎপর থাকেন না। তিনি পাদ প্রক্ষালন করিয়া দেহ সোজা বিন্যস্ত করেন এবং স্মৃতি সম্মুখে স্থাপনপূর্বক পদ্মাসনাবদ্ধ হইয়া উপবেশন করেন। তদবস্থায় তিনি আত্ম-পীড়নার্থ চিন্তা করেন না, পর-পীড়নার্থ চিন্তা করেন না, উভয়-পীড়নার্থ চিন্তা করেন না। মাননীয় গৌতম আত্ম-হিত, পর-হিত, উভয়-হিত, নিখিল বিশ্ব-হিতই চিন্তা করিয়া অবস্থান করেন।
আশ্রমে অবস্থানকালে তিনি পরিষদে ধর্মোপদেশ করেন, সেই পরিষদকে উৎসাদন করেন (উপরে তোলেন) না, অপসাদন করেন (নিচে ফেলেন) না; অধিকন্তু ধর্মীয় উপদেশ দ্বারা সেই পরিষদকে সন্দর্শিত, সমাদাপিত, সমুত্তেজিত, সম্প্রহর্ষিত করেন।
প্রভু গৌতমের কণ্ঠ হইতে অষ্টাঙ্গ-সমন্বিত ঘোষ উচ্চারিত হয় : (১) বিশ্লিষ্ট (বিমুক্ত), (২) বিজ্ঞেয়, (৩) মঞ্জু (মধুর), (৪) শ্রবণীয়, (৫) বিন্দু (সারযুক্ত), (৬) অবিসারী (অবিকীর্ণ), (৭) গম্ভীর এবং (৮) নিনাদী। মাননীয় গৌতম পরিষদের পরিমাণানুরূপ স্বরে উপদেশ প্রদান করেন, তাঁহার ধ্বনি পরিষদের বাহিরে যায় না। প্রভু গৌতম কর্তৃক ধর্মকথায় সন্দর্শিত… সেই শ্রোতাগণ ভগবানকে অবলোকন করিতে করিতে শ্রুত ধর্মভাব ত্যাগ না করিয়াই প্রস্থান করেন।
ওহে আচার্য, আমরা মাননীয় ভগবানকে গমন করিতে দেখিয়াছি, দাঁড়াইতে দেখিয়াছি, গৃহে প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি, গৃহের মধ্যে মৌনভাবে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখিয়াছি, ভোজন শেষে ভুক্তানুমোদন করিতে দেখিয়াছি, আরামে (আশ্রমে) যাইতে দেখিয়াছি, আরামের ভিতর তূষ্ণীম্ভাবে উপবিষ্ট দেখিয়াছি, আরামের মধ্যে পরিষদে ধর্মোপদেশ করিতে দেখিয়াছি। সেই ভগবান এতাদৃশ গুণসম্পন্ন, এতদপেক্ষা অধিকতর গুণী হন।
৩৮৮. এই প্রকারে উক্ত হইলে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ আসন হইতে উঠিয়া উত্তরীয় বস্ত্র একাংসে করিয়া যেদিকে ভগবান আছেন, সেদিকে যুক্তাঞ্জলি প্রণত হইয়া তিনবার উদান উচ্চারণ করিলেন :
“নমো তস্স ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধস্স।” (৩ বার)
“(সেই ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধকে নমস্কার)।”
“যদি কখনো, কোথাও সেই মহাপ্রভু গৌতমের সহিত সঙ্গ করিতে পারি, যদি কোনো কথা সংলাপ হয়, তবেই আমার জীবন ধন্য।”
৩৮৯. সেই সময় ভগবান বিদেহে ক্রমশ বিচরণ করিতে করিতে মিথিলায় পৌঁছিলেন, তথায় মিথিলাতে ভগবান মঘদেব আম্রবনে বিহার করিতেছেন। মৈথিলী ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ শুনিলেন, “শাক্যকুল প্রব্রজিত শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম বিদেহ প্রদেশে বিচরণ করিতে করিতে পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত মহান সংঘসহ মিথিলায় উপনীত হইয়াছেন এবং মিথিলায় মঘদেব আম্রবনে বিহার করিতেছেন। সেই সময় ভগবান গৌতমের এইরূপ কল্যাণ-কীর্তিশব্দ উৎপন্ন হইয়াছে : “সেই ভগবান অর্হৎ… তদ্রূপ অর্হতের দর্শন মঙ্গলজনক!”
তখন মৈথিলী ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ যে স্থানে ভগবান আছেন, সে-স্থানে গেলেন; গিয়া কেহ কেহ ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে বসিলেন… কেহ কেহ তূষ্ণীম্ভূত হইয়া একপ্রান্তে উপবেশন করিলেন।
৩৯০. ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ শুনিলেন, “শাক্যকুল প্রব্রজিত শাক্য-পুত্র শ্রমণ গৌতম… মিথিলায় উপনীত হইয়াছেন, এবং মঘদেব আম্রবনে অবস্থান করিতেছেন।” তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ বহু যুবক সঙ্গে লইয়া যেখানে মঘদেব আম্রবন সেখানে উপস্থিত হইলেন। তখন আম্রবনের অদূরে ব্রাহ্মণ ব্রহ্মায়ুর মনে হইল : “পূর্বে সংবাদ না দিয়া শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ উপস্থিত হওয়া আমার পক্ষে সমীচীন নহে।” তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ এক যুবককে ডাকিলেন, “এস, যুবক, যেখানে শ্রমণ গৌতম আছেন সেখানে যাও, গিয়া আমার বাক্যে শ্রমণ গৌতমকে নিরাময়, নিরাতঙ্ক, লঘুভাব (স্ফুর্তি) বল ও সুখ-বিহার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করো :‘ভো গৌতম, ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ প্রভু গৌতমের নিরাময়… জিজ্ঞাসা করিতেছেন।’ আর ইহাও বলিও, ‘ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ জীর্ণ, বৃদ্ধ, মহল্লক, অর্ধগত বয়স্ক, জন্মেতে একশবিশ বর্ষীয় হন, তিনি মাননীয় গৌতমের দর্শনেচ্ছা পোষণ করেন।’”
“হ্যাঁ, ভো,” (বলিয়া) সেই যুবক ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে উত্তর দিয়া যেখানে ভগবান আছেন সেখানে গেল, গিয়া ভগবানের সহিত সম্মোদন করিয়া… একপ্রান্তে দাঁড়াইয়া ভগবানকে বলিল, “ভো গৌতম, ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ মহাপ্রভু গৌতমের নিরাময়… জিজ্ঞাসা করিয়াছেন।… ভো গৌতম, ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ… একশবিশ বৎসরের বৃদ্ধ। তিনি… ত্রিবেদের পারগূ… মহাপুরুষ-লক্ষণ সম্বন্ধে পরিপূর্ণ জ্ঞানী হন। মিথিলায় যত ব্রাহ্মণ-গৃহপতি বাস করেন তাঁহাদের মধ্যে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ ভোগ, মন্ত্র (বেদ), আয়ু আর যশ… সকলদিকে অগ্রণী হন, তিনি প্রভু গৌতমকে দর্শন করিতে ইচ্ছুক।”
“মানবক, ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ আপাতত যাহা উচিত মনে করেন তাহা করিতে পারেন।”
তখন সে মানবক যেখানে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ ছিলেন, সেখানে গেল, গিয়া ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে বলিল, “ভো, শ্রমণ গৌতম অবকাশ দিয়াছেন, এখন আপনি যাহা উচিত করিতে পারেন।”
৩৯১. তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ যেস্থানে ভগবান আছেন, সে-স্থানে গেলেন। তথাকার (ব্রাহ্মণ-গৃহপতি) পরিষদ দূর হইতে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে আসিতে দেখিলেন। দেখিয়াই তাঁহার গমনের জন্য বিখ্যাত ও যশস্বীর উপযুক্ত অবকাশ করিলেন। তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ সেই পরিষদকে বলিলেন, “যথেষ্ট, মহাশয়গণ, আপনারা স্বীয় আসনে বসুন। আমি এখানে শ্রমণ গৌতমের সমীপে বসিব। তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ যেস্থানে ভগবান আছেন সে-স্থানে উপনীত হইলেন, গিয়া ভগবানের সাথে সম্মোদন করিয়া একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ ভগবানের দেহে বত্রিশ মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন।… দুইটি লক্ষণ সম্বন্ধে তিনি সংশয়াপন্ন হইলেন। তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ ভগবানকে গাথায় বলিলেন :
“শুনেছি শাস্ত্রের বাণী, যে মহা বত্রিশ আছে পুরুষ-লক্ষণ,
হে গৌতম, তবদেহে, উহাদের দুই চিহ্ন করিনি দর্শন। ১
নরোত্তম, তব জিহ্বা নহে হ্রস্ব? যাতে হয় প্রকটিত,
নারীসহ নর নাম, বস্ত্র-গুহ্য (উপস্থ) হয় তব কোষে আচ্ছাদিত? ২
হয় কি প্রশস্ত, জিহ্বা তব? যাতে মোরা করি জ্ঞানার্জন,
কিছু তা বাহির করে, ঋষিবর, করো কঙ্খা বিনোদন। ৩
ইহলোকে হিত আর পরলোকে সুখের দরুন,
যা কিছু প্রার্থিত এবে জিজ্ঞাসিব আদেশ করুন।” ৪
৩৯২. তখন ভগবানের এই চিন্তা হইল, “এই ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ আমার দেহে বত্রিশ মহাপুরুষ-লক্ষণ অন্বেষণ করিতেছেন,… জিহ্বা দ্বারা ললাট-মণ্ডল আচ্ছাদন করিলেন।” তৎপর ভগবান গাথাযোগে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে প্রত্যুত্তর দিলেন :
“যে বত্রিশ মহাপুরুষ-লক্ষণ করিছ শ্রবণ,
আছে সব মমদেহে সংশয় না করো, হে ব্রাহ্মণ, ১।
অভিজ্ঞেয় অভিজ্ঞাত ভাবিতব্য করেছি ভাবন,
ত্যাজ্য মম ত্যক্ত এবে বুদ্ধ আমি তাইত ব্রাহ্মণ, ২।
ঐহিক হিতের তরে পারত্রিক সুখের দরুন,
অবকাশ দিনু আমি প্রার্থিত যা’ জিজ্ঞাসা করুন।” ৩।
৩৯৩. সেই সময় ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণের এই চিন্তা হইল : “শ্রমণ গৌতম অবকাশ দিয়াছেন। ঐহিক কিংবা পারত্রিক হিত সম্বন্ধে আমি তাঁহাকে কি জিজ্ঞাসা করিতে পারি?” তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণের এই ধারণা জন্মিল : “ঐহিক হিত সম্বন্ধে আমি অভিজ্ঞ, অপরেও ঐহিক হিত সম্বন্ধে আমাকে জিজ্ঞাসা করে। সুতরাং শ্রমণ গৌতমকে আমি পারত্রিক হিত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলেই ভালো হয়।” তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ ভগবানকে গাথায় বলিলেন :
“ওহে, (১) কীরূপে ব্রাহ্মণ হয়? (২) বেদগূ কাহাকে কয়?
ওহে, (৩) ত্রৈবিদ্য কীরূপে হয়? (৪) শ্রোত্রিয় কাহাকে কয়? ১
ওহে, (৫) কীরূপে অর্হৎ হয়? (৬) কাহাকে কেবলী কয়?
ওহে, (৭) মুনিত্ব কিসেতে লভে? (৮) বুদ্ধ কাকে বলা হয়?” ২
৩৯৪. তখন ভগবান ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে গাথা দ্বারা (সেই আট প্রশ্নের) উত্তর দিলেন :
“পূর্বজন্ম পরিজ্ঞাত যিনি স্বর্গাপায় করেন দর্শন,
জন্মক্ষয়ে অর্হত্ত্ব লাভ মুনি হন অভিজ্ঞা-পূরণ। ১
সর্ব রাগাদি মুক্ত শুদ্ধচিত্ত ব্রাহ্মণের সুবিদিত,
জন্ম-মৃত্যু পরিত্যক্ত পূর্ণ-ব্রহ্মচারী কেবলী কথিত,
সর্বধর্ম পারগামী তাদিগুণী বুদ্ধনামে অভিহিত।” ২
এইরূপ উক্ত হইলে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ উত্তরীয় বস্ত্র একাংসে করিয়া ভগবানের পদে নতশিরে পতিত হইয়া, ভগবানের পাদপদ্ম মুখে চুম্বন করিতে লাগিলেন, হস্ত দ্বারা সম্বাহন করিতে লাগিলেন আর নাম শুনাইলেন :
“ভো গৌতম, আমি ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ, ভো গৌতম, আমি ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ।”
তখন সেই পরিষদ বিস্মিত ও আশ্চর্যান্বিত হইল : “ওহে, শ্রমণের মহর্ধিকতা (দিব্যশক্তি), মহানুভবতা অত্যন্ত আশ্চর্য, অত্যন্ত অদ্ভুত, যাহাতে এমন বিখ্যাত যশস্বী ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ এই প্রকারে পরম সম্মান প্রদর্শন করিতেছেন।”
তখন ভগবান ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে বলিলেন, “যথেষ্ট ব্রাহ্মণ, উঠুন, আপন আসনে বসুন, হ্যাঁ, আমার প্রতি আপনার চিত্ত সুপ্রসন্ন।”
তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ উঠিয়া স্বীয় আসনে বসিলেন।
৩৯৫. তখন ভগবান ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে আনুপূর্বিককথা (উপদেশ) বলিলেন; যেমন : দান-কথা, শীল-কথা, স্বর্গ-কথা, কাম-বাসনার দুষ্পরিণাম, অপকার, কলুষতা; নিষ্কামভাবের প্রশংসা প্রকাশ করিলেন। ভগবান যখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণকে ভব্যচিত্ত, মৃদুচিত্ত, অনাবৃতচিত্ত, আহ্লাদিত চিত্ত ও প্রসন্নচিত্ত দেখিলেন, তখন যাহা বুদ্ধগণের সমুৎকৃষ্ট ধর্মদেশনা সেই দুঃখ, সমুদয়, নিরোধ আর মার্গসত্য প্রকাশ করিলেন। ময়লারহিত শ্বেত-বস্ত্র যেমন উত্তমরূপে রং গ্রহণ করে, সেই প্রকারেই সেই আসনে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণের বিরজ, বীতমল ধর্ম-চক্ষু, যাহা কিছু সমুদয়ধর্মী (উৎপন্ন পদার্থ) আছে, সেই সমস্ত নিরোধধর্মী (বিনাশশীল), উৎপন্ন হইল।
তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ দৃষ্ট-ধর্ম, প্রাপ্ত-ধর্ম, বিদিত ধর্ম, পর্যাবগাঢ় (অনুশীলিত) ধর্ম, তীর্ণ বিচিকিৎস (সংশয়মুক্ত), ইহা কী প্রকার? এরূপ প্রশ্নরহিত, বৈশারদ্য-প্রাপ্ত (দক্ষ), শাস্তার শাসনে পর-প্রত্যয়মুক্ত (প্রত্যক্ষদর্শী) হইয়া ভগবানকে ইহা বলিলেন, “আশ্চর্য, ভো গৌতম, আশ্চর্য, ভো গৌতম, যেমন অধোমুখকে ঊর্ধ্বমুখী করিলেন… আজ হইতে আজীবন আমাকে শরণাগত উপাসকরূপে ধারণা করুন। প্রভু গৌতম, ভিক্ষুসংঘের সহিত আগামীকল্যের ভোজন আমার বাড়িতে গ্রহণ করুন।”
ভগবান মৌনভাবে স্বীকার করিলেন।
তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ ভগবানের স্বীকৃতি অবগত হইয়া আসন হইতে উঠিলেন এবং ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া প্রস্থান করিলেন।
তৎপর ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ নিজের গৃহে উত্তম খাদ্য-ভোজ্য প্রস্তুত করিয়া সেই রাত্রি অতিবাহিত হইলে ভগবানকে কাল নিবেদন করিলেন, “সময় হইয়াছে, ভো গৌতম, ভোজন প্রস্তুত।”
তখন ভগবান পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিধান করিয়া পাত্র-চীবর ধারণ করিয়া যেস্থানে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণের গৃহ আছে, সে-স্থানে গেলেন। তথায় গিয়া ভিক্ষুসংঘের সহিত সজ্জিত আসনে উপবেশন করিলেন। তখন ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ স্বহস্তে, উত্তম খাদ্য-ভোজ্য দ্বারা সপ্তাহকাল বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষুসংঘকে সন্তর্পিত (সন্তৃপ্ত) করিলেন, সংপ্রবারিত করিলেন।
ভগবান সেই সপ্তাহ গত হইলে বিদেহ প্রদেশে বিচরণার্থ প্রস্থান করিলেন। ভগবান চলিয়া যাইবার অচিরকাল পরে ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ কালক্রিয়া করিলেন।
তখন কয়েকজন ভিক্ষু যেখানে ভগবান আছেন সেখানে গেলেন, ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট সেই ভিক্ষুগণ ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ কালগত হইয়াছেন, তাঁহার কী গতি, কোনো অভিসম্পরায় (পরলোক লাভ) হইল?”
“ভিক্ষুগণ, ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন, ধর্মানুকূল আচরণকারী ছিলেন, ধর্মাধিগমে তিনি আমাকে পীড়িত করেন নাই। ভিক্ষুগণ, ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ পঞ্চ অধোভাগীয় সংযোজনের ক্ষয়-হেতু ঔপপাতিক (ব্রহ্মা) হইয়াছেন, তথায় (শুদ্ধাবাস ব্রহ্মলোকে) পরিনির্বাণ লাভ করিবেন। সেই লোক হইতে আর ইহলোকে প্রত্যাবর্তন করিবেন না।”
ভগবান ইহা বলিলেন। সেই ভিক্ষুগণ সন্তুষ্টচিত্তে ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করিলেন।
ব্রহ্মায়ু সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ