(চার প্রকার পুরুষ)
৪১২. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় আয়ুষ্মান উদয়ন বারাণসীতে ক্ষেমীয় আম্রবনে অবস্থান করিতেছেন। সেই সময় ঘোটমুখ ব্রাহ্মণ কোনো কার্যোপলক্ষে বারাণসীতে উপস্থিত ছিলেন। তখন ঘোটমুখ ব্রাহ্মণ জঙ্ঘাবিহারার্থ চঙ্ক্রমণ ও বিচরণ করিতে করিতে যেখানে ক্ষেমীয় আম্রবন সেখানে পৌঁছিলেন। তখন আয়ুষ্মান উদয়ন খোলা স্থানে চঙ্ক্রমণ করিতেছেন।
তখন ঘোটমুখ ব্রাহ্মণ যেখানে আয়ুষ্মান উদয়ন আছেন, সেখানে গেলেন। তথায় গিয়া আয়ুষ্মান উদয়নের সাথে… সম্মোদন করিয়া তাঁহার পিছে পিছে চঙ্ক্রমণ করিতে করিতে বলিলেন, “ওহে শ্রমণ, আমার মনে হয় প্রকৃত ধার্মিক প্রব্রজ্যা (সন্ন্যাস) নাই। ভবাদৃশ (মহৎ) গণের কিংবা এখানে যে ধর্মস্বভাব আছে, তাহার অদর্শন-হেতু এ সম্বন্ধে আমার এই ধারণা জন্মিয়াছে।”
এই কথা উক্ত হইলে আয়ুষ্মান উদয়ন চঙ্ক্রমণ হইতে অবতরণ করিয়া বিহারে (পর্ণকুটিরে) প্রবেশ করিয়া প্রজ্ঞাপ্ত আসনে উপবেশন করিলেন। ঘোটমুখ ব্রাহ্মণও বিহারে প্রবিষ্ট হইয়া একপ্রান্তে দাঁড়াইলেন। একপ্রান্তে দণ্ডায়মান ঘোটমুখ ব্রাহ্মণকে আয়ুষ্মান উদয়ন বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, আসন বিদ্যমান, যদি ইচ্ছা হয় বসিতে পারেন।”
“প্রভু উদয়নের (আদেশের) অপেক্ষায়ই আমরা বসি নাই। আমার মত লোক পূর্বে নিমন্ত্রিত না হইয়া (স্বয়ং) কী প্রকারে আসনে বসা উচিত মনে করিতে পারেন?”
তখন ঘোটমুখ ব্রাহ্মণ নিচ এক আসন লইয়া একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট ঘোটমুখ ব্রাহ্মণ আয়ুষ্মান উদয়নকে বলিলেন, “অহো শ্রমণ, প্রকৃত ধার্মিক প্রব্রজ্যা নাই, আমার এ ধারণা; তাহাও ভবাদৃশদের কিংবা এখানে যে ধর্মস্বভাব আছে উহার অদর্শন-হেতু হইয়াছে।”
“ব্রাহ্মণ, আমার বাক্য যদি সমর্থনীয় হয় তবে আপনি সমর্থন করিবেন। আর যদি খণ্ডনীয় হয় তবে খণ্ডন করিবেন। আমার ভাষণের যে অর্থ না বুঝেন, তৎপরে আমাকে সে সম্বন্ধে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিবেন, ‘ভো উদয়ন, ইহা কী প্রকার, ইহার অর্থ কী?’ এইরূপ করিয়াই এই বিষয়ে আমাদের কথা-সংলাপ হইতে পারে।”
“মাননীয় উদয়নের সমর্থন যোগ্যকে আমি সমর্থন করিব, খণ্ডনীয়কে খণ্ডন করিব। মাননীয় উদয়নের যে কথা আমি বুঝিব না, তাহা আপনাকে পুনঃ জিজ্ঞাসা করিব, ‘হে উদয়ন, ইহা কী প্রকার, ইহার অর্থ কী?’ এই প্রকারে আমাদের এ সম্বন্ধে কথা-সংলাপ হউক।”
৪১৩. “ব্রাহ্মণ, লোকে চারি প্রকার পুদ্গল (পুরুষ) বিদ্যামান আছে। কোন চারি? ব্রাহ্মণ, (১) এখানে পুদ্গল আত্মন্তপ, আপনার সন্তাপজনক কর্মে লিপ্ত হয় (২) পরন্তপ…, (৩) আত্মন্তপ-পরন্তপ…, (৪) অনাত্মন্তপ-অপরন্তপ… সুখানুভবী ব্রহ্মভূত (বিশুদ্ধ) আত্মায় বিহার করেন। ব্রাহ্মণ, এই চারি পুদ্গলের মধ্যে কোন প্রকার পুদ্গল আপনার চিত্ত আরাধনা করে?”
“ভো উদয়ন,… এই যে অনাত্মন্তপ-অপরন্তপ… পুদ্গল তাঁহাকেই… আমার পছন্দ হয়।”
“ব্রাহ্মণ, সেই তিন প্রকার পুদ্গল আপনার কেন পছন্দ হয় না?”
“ভো উদয়ন, যিনি… ব্রহ্মভূত আত্মায় বিহার করেন, তিনি আমার চিত্ত আরাধনা করেন।”
৪১৪. “ব্রাহ্মণ, এখানে দ্বিবিধ পরিষদ আছে। কোন দ্বিবিধ? ব্রাহ্মণ, (১) এখানে কোন পরিষদ মণিকুণ্ডলের প্রতি সারক্ত-রক্ত (অত্যন্ত আসক্ত) হইয়া স্ত্রী-পুত্র অন্বেষণ করে, দাস-দাসী…, ক্ষেত্র-বাস্তু, স্বর্ণ-রৌপ্য অনুসন্ধান করে,। আর (২) ব্রাহ্মণ, কোনো পরিষদ মণিকু-লাদি বিষয়ের প্রতি সারক্ত-রক্ত না হইয়া স্ত্রী-পুত্র, দাস-দাসী, ক্ষেত্র-বাস্তু, স্বর্ণ-রৌপ্য ত্যাগ করিয়া আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হয়। ব্রাহ্মণ, এখানে যে পুদ্গল অনাত্মন্তপ-অপরন্তপ হয়, সেই… পুদ্গল ইহজীবনেই তৃষ্ণামুক্ত, নির্বাণ-প্রাপ্ত, শীতল-স্বভাব, সুখানুভবী, স্বয়ং ব্রহ্মভূত হইয়া বিহার করেন। ব্রাহ্মণ, এই দুইয়ের কোন পুদ্গলকে আপনি কোন পরিষদে অধিক দেখিতে পাইতেছেন? যে পরিষদ মণিকুণ্ডলের প্রতি অনুরাগরঞ্জিত হইয়া দারা-পুত্র, দাস-দাসী, ক্ষেত্র-বাস্তু, স্বর্ণ-রৌপ্য অন্বেষণ করে? অথবা যে পরিষদ মণিকুণ্ডলের প্রতি অনুরাগরঞ্জিত না হইয়া দারা-পুত্র… স্বর্ণ-রৌপ্য পরিত্যাগ করিয়া আগার হইতে অনাগারিক প্রব্রজিত হয়?”
“ভো উদয়ন, এখানে যে পুদ্গল…অনাত্মন্তপ-অপরন্তপ হন,… তাঁহাকে এই পরিষদে অধিক দেখিতে পাই যে পরিষদ… অনুরাগরক্ত না হইয়া… অনাগারিক প্রব্রজিত হইয়াছে।”
“ব্রাহ্মণ, এখনই আপনি ভাষণ করিলেন নহে কি? ‘আমার এরূপ মনে হয়-ওহে শ্রমণ, প্রকৃত ধার্মিক প্রব্রজ্যা নাই। এই সম্বন্ধে আমার এ ধারণা হইয়াছে, তাহাও ভবাদৃশগণেরও এখানে যে ধর্মস্বভাব আছে, তাহার অদর্শন-হেতু হইয়াছে?’”
“ভো উদয়ন, নিশ্চয় আমার জন্য ইহা অনুগ্রহণযুক্ত বাক্য বলা হইয়াছে। ধার্মিক প্রব্রজ্যা আছে, এ সম্বন্ধে আমার এই ধারণা জন্মিয়াছে। প্রভু উদয়ন, আমাকে এইরূপই ধারণা করুন। প্রভু উদয়ন কর্তৃক এই যে চারি পুদ্গল বিস্তৃতভাবে বিভক্ত না হইয়া সংক্ষেপে বর্ণিত হইয়াছে; সাধু, প্রভু উদয়ন, আমার প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করিয়া এই চারি পুদ্গলকে বিস্তৃতভাবে বিভাগ করুন।”
“তাহা হইলে ব্রাহ্মণ, শুনুন, সুন্দররূপে মনোযোগ দিন, বলিতেছি।”
“হ্যাঁ, ভো,” (বলিয়া) ঘোটমুখ ব্রাহ্মণ আয়ুষ্মান উদয়নকে উত্তর দিলেন।
৪১৫. আয়ুষ্মান উদয়ন ইহা বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, কোনো পুদ্গল আত্মন্তপ, আপনার সন্তাপকর কর্মে নিযুক্ত হয়? ব্রাহ্মণ, এখানে কোনো পুদ্গল অচেলক আচার বিহীন… হয়; এইরূপে অনেক প্রকার কায়িক আতাপন-পরিতাপন ব্যাপারে নিযুক্ত থাকিয়া অবস্থান করে। ব্রাহ্মণ, এই পুদ্গলকে আত্মন্তপ… বলা হয়।
৪১৬. ব্রাহ্মণ, কী প্রকার পুদ্গল পরন্তপ… হয়? এখানে কোন পুদ্গল ঔরম্ভিক (ভেড়াঘাতক)… হয়, অথবা অপর যত সব নির্দয়-নিষ্ঠুর কর্ম হইতে পারে উহাদের আচরণকারী হয়।…।
৪১৭. ব্রাহ্মণ, কোন প্রকার পুদ্গল আত্মন্তপ-পরন্তপ হয়? এখানে কোনো পুরুষ মূর্ধাভিষিক্ত ক্ষত্রিয় রাজা হন…, তাঁহার দাস-কর্মচারী অশ্রু মুখে রোদন করিতে করিতে কর্ম সম্পাদন করে…।
৪১৮, ৪১৯, ৪২০. ব্রাহ্মণ, কোন প্রকার পুদ্গল অনাত্মন্তপ-অপরন্তপ… হয়? ব্রাহ্মণ, এখানে লোকে তথাগত… চতুর্থ ধ্যান প্রাপ্ত হইয়া বিহার করেন। তিনি এই প্রকার চিত্তের একাগ্র ও পরিশুদ্ধ অবস্থায়… ইহার নিমিত্ত অপর কোনো কর্তব্য অবশেষ নাই, ইহা জানিতে পারেন। ব্রাহ্মণ, তাহাকেই বলা হয় অনাত্মন্তপ-অপরন্তপ পুদ্গল।”
৪২১. এইরূপ উক্ত হইলে ঘোটমুখ ব্রাহ্মণ আয়ুষ্মান উদয়নকে বলিলেন, “আশ্চর্য, ভো উদয়ন, আশ্চর্য ভো উদয়ন, যেমন অধঃমুখকে ঊর্ধ্বমুখ করে… সেইরূপেই প্রভু উদয়ন অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশ করিয়াছেন। এখানে আমি প্রভু উদয়নের ধর্মের ও সংঘের শরণ গ্রহণ করিতেছি। আজ হইতে প্রভু উদয়ন, যাবজ্জীবন আমাকে শরণাগত উপাসকরূপে ধারণা করুন।”
“ব্রাহ্মণ, আপনি আমার শরণ গ্রহণ করিবেন না, আপনি সেই ভগবানের শরণ গ্রহণ করুন, যাঁহার শরণ আমিও গ্রহণ করিয়াছি।”
“ভো উদয়ন, সেই অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ গৌতম এখন কোথায় অবস্থান করেন?… তবে নির্বৃত (নির্বাণপ্রাপ্ত) সেই মহামান্য গৌতমের, ধর্মের ও ভিক্ষুসংঘের শরণ গ্রহণ করিতেছি। আজ হইতে প্রভু উদয়ন, যাবজ্জীবন আমাকে শরণাগত উপাসকরূপে ধারণা করুন।”
“ভো উদয়ন, আমাকে অঙ্গরাজা দৈনিক নিত্য ভিক্ষা দিয়া থাকেন, তাহা হইতে আমি প্রভু উদয়নকে এক অংশ নিত্য-ভিক্ষা দান করিতেছি।”
“ব্রাহ্মণ, অঙ্গরাজা আপনাকে দৈনিক কত ভিক্ষা দেন?”
“ভো উদয়ন, পঞ্চশত কার্ষাপণ।”
“ব্রাহ্মণ, আমাদের স্বর্ণ-রৌপ্য গ্রহণ করা উচিত নহে।”
“যদি তাহা প্রভু উদয়নের গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে উদয়নের নিমিত্ত বিহার নির্মাণ করাইব।”
“যদি ব্রাহ্মণ, আমার নিমিত্ত বিহার নির্মাণ করাইতে ইচ্ছা করেন, তবে পাটলিপুত্রে সংঘের উদ্দেশ্যে উপস্থানশালা (সভাগৃহ) প্রস্তুত করিয়া দেন।”
“প্রভু উদয়নের এই কথায় আমি আরও অধিকমাত্রায় সন্তুষ্ট ও প্রসন্ন হইলাম যে প্রভু উদয়ন আমাকে সংঘে দান দিতে বলিতেছেন। সুতরাং প্রভু উদয়ন, এই নিত্য-ভিক্ষায় আর অপর নিত্য-ভিক্ষায় পাটলিপুত্রে সংঘের নিমিত্ত উপস্থানশালা নির্মাণ করাইব।”
তখন ঘোটমুখ ব্রাহ্মণ এই নিত্য-ভিক্ষা ও অপর নিত্য-ভিক্ষা দ্বারা পাটলিপুত্রে সংঘের উদ্দেশ্যে উপস্থানশালা নির্মাণ করাইলেন। তাহা এখনো ঘোটমুখী নামে কথিত হইয়া থাকে।
ঘোটমুখ সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ