লোড হচ্ছে

Monastic Law

PLI-TV-BU-VB-NP7 অতিরিক্ত চীবর গ্রহণ বিষয়ক শিক্ষাপদ

অনুবাদসমূহ [৬]

অতিরিক্ত চীবর গ্রহণ বিষয়ক শিক্ষাপদ

স্থান : শ্রাবস্তী

সে সময়ে বুদ্ধ ভগবান শ্রাবস্তীর নিকটে অনাথপিণ্ডিক কর্তৃক প্রদত্ত জেতবনারামে বাস করছিলেন। সে সময়ে ষড়বর্গীয় ভিক্ষুরা ছিন্ন চীবরধারী ভিক্ষুদের নিকট উপস্থিত হয়ে এরূপ বললেন, “বন্ধুগণ, ভগবান নির্দেশ দিয়েছেন যে, ত্রিচীবর চোরে চুরি করলে অথবা জোরপূর্বক কেউ কেড়ে নিলে, অগ্নিতে দগ্ধ হলে, জলোচ্ছ্বাসে ভাসায়ে নিয়ে গেলে, ইঁদুর, উইপোকা, কীট-পতঙ্গাদি দ্বারা নষ্ট, বিনষ্ট হয়ে ব্যবহারে অযোগ্য হলে, অজ্ঞাতি গৃহপতির বা গৃহপত্নীর নিকট চীবর যাচ্ঞা করতে পারে।’ বন্ধুগণ, আপনাদের চীবর তো নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে; আপনারা চীবর যাচ্ঞা করুন।”

তখন তারা এরূপ বললেন, “বন্ধুগণ, আমাদের এই চীবরগুলোই যথেষ্ট।”

ষড়বর্গীয় ভিক্ষুরা বললেন, “তাহলে আমরাই আয়ুষ্মানগণের জন্যে চীবর যাচ্ঞা করছি।”

“হ্যাঁ বন্ধুগণ, যাচ্ঞা করুন।”

তখন ষড়বর্গীয় ভিক্ষুরা গৃহপতিদের নিকট উপস্থিত হয়ে এরূপ বললেন, “হে উপাসকগণ, ছিন্ন চীবরধারী ভিক্ষুরা আগমন করেছেন; অতএব তাদের জন্যে চীবর দান করুন।” তারা এরূপ বলে একসঙ্গে বহু চীবর যাচ্ঞা করলেন।

সে সময়ে কোনো এক সভায় উপবিষ্ট জনৈক পুরুষ অন্য একজন পুরুষকে এরূপ বললেন, “হে আর্য, ছিন্ন চীবরধারী ভিক্ষুরা আগমন করেছেন; আমি তাদেরকে চীবর দান করেছি।”

সেই পুরুষ এরূপ বললেন, “আমিও তো চীবর দান করেছি।”

উক্ত সভায় উপস্থিত অন্য একজন বললেন, “আমিও তো তাদেরকে চীবর দান করেছি।”

অতঃপর সেই পুরুষরা এ বলে আন্দোলন, নিন্দা ও প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে লাগলেন, “কী করে শাক্যপুত্রীয় শ্রমণগণ মাত্রা না জেনে বহু চীবর যাচ্ঞা করছেন? মনে হয় যেন তারা চীবরের দোকান খুলবেন; চীবরের বাণিজ্য করবেন?” ভিক্ষুরা তাদের নিন্দা, আন্দোলন এবং প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুনলেন। যে সকল ভিক্ষু অল্পেচ্ছু, সন্তুষ্টিপরায়ণ, লজ্জাশীল, অনুসন্ধিৎসু ও শিক্ষাকামী তাঁরাও এটি জ্ঞাত হয়ে এ বলে আন্দোলন, নিন্দা ও প্রকাশ্যে বদনাম করতে লাগলেন, “এ কেমন লোভযুক্ত হীনাচরণ যে, ষড়বর্গীয় ভিক্ষুরা মাত্রা না জেনে বহুচীবর একসাথে যাচ্ঞা করবে?”

অতঃপর ষড়বর্গীয় ভিক্ষুগণকে অনেক প্রকারে তিরস্কার, ভর্ৎসনা করে ভগবানকে একথা জ্ঞাপন করলেন। অতঃপর ভগবান এই নিদানে, এই প্রকরণে সেই ষড়বর্গীয় ভিক্ষুদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভিক্ষুগণ, সত্যই কি তোমরা মাত্র না জেনে বহু চীবর যাচ্ঞা করেছ?

“হ্যাঁ ভগবান, তা সত্য বটে।”

ভগবান বুদ্ধ নিন্দা করে বললেন, “হে মোঘপুরুষগণ, এ কেমন লোভযুক্ত হীনাচরণ তোমাদের; কী করে তোমরা মাত্রা না জেনে একসঙ্গে বহু চীবর যাচ্ঞা করতে পারলে? হে মূর্খগণ, তোমাদের এ প্রকারের লোভযুক্ত হীনাচরণ কিছুতেই অপ্রসন্নদের প্রসন্নতা উৎপাদন বা প্রসন্নদের প্রসন্নতা বৃদ্ধির কারণ হবে না। অধিকন্তু এটি অপ্রসন্নদের অশ্রদ্ধা বৃদ্ধি এবং কোনো কোনো শ্রদ্ধাবানদের মনে অন্যথাভাব আনয়নের কারণ হবে।”

ভগবান এভাবে অনেক প্রকারে নিন্দা করে চপলতা, অবিনীতা, মহাতৃষ্ণা, অসন্তুষ্টিতা, সঙ্গপ্রিয়তা এবং অলসতার কুফল সম্পর্কে বর্ণনা করলেন। তিনি অনেক প্রকারে গাম্ভীর্যতা, সুবিনীতা, অল্পেচ্ছুতা, সন্তুষ্টিতা, সল্লেখ (তৃষ্ণাদির সংযমতা), ধুতাঙ্গব্রত, সংঘ-সেবাপ্রিয়তা, পুনর্জন্মক্ষয়ের জন্য বীর্যারম্ভের (উৎসাহশীলতার) সুফল সম্পর্কে বর্ণনা করে তদনুযায়ী এবং তদনুরূপ ধর্মদেশনা উত্থাপন করে ভিক্ষুগণকে সম্বোধন করে বললেন, “হে ভিক্ষুগণ, আমি দশবিধ প্রত্যয় ও অর্থবশে ভিক্ষুসংঘের জন্য শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপ্ত করব; যথা : ১. সংঘের সুষ্ঠুতা, ২. সংঘের শান্তিভাব বৃদ্ধির জন্যে, ৩. দুর্দম্য ভিক্ষুগণকে দমনের জন্যে, ৪. সদাচারী (শীলবান) ভিক্ষুদের শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানের জন্যে, ৫. বর্তমানে উৎপন্ন তৃষ্ণাসমূহ সংবরণের জন্যে, ৬. অনাগত জন্মের আসবসমূহের উৎপত্তিকে প্রতিঘাতের জন্যে, ৭. অপ্রসন্নের প্রসাদ উৎপন্নের জন্যে, ৮. প্রসন্নের প্রসাদ বৃদ্ধির জন্যে, ৯. সদ্ধর্মের স্থিতির জন্যে এবং ১০. বিনয়কে অনুগ্রহের জন্যে যা অত্যন্ত কল্যাণজনক। অতএব, হে ভিক্ষুগণ, আমি এই শিক্ষাপদ উদ্দেশ করছি :

যদি ছিন্ন চীবরধারী ভিক্ষুকে অজ্ঞাতি কোনো গৃহপতি কিংবা গৃহপত্নী বহু চীবর এনে বলে যে, “ভন্তে, আপনার যতটি চীবর প্রয়োজন হয়, ততটি চীবর এখান হতে ইচ্ছানুসারে গ্রহণ করুন।” তাহলে সেই ছিন্ন চীবরধারী ভিক্ষু তিনটি চীবরই ব্যবহারের অযোগ্য হলে; দুটি চীবর নিতে পারবে। দুটি ব্যবহারের অযোগ্য হলে; একটি চীবর নিতে পারবে। আর একটি ব্যবহারের অযোগ্য হলে মোটেও নিতে পারবে না। যদি এই নিয়ম লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত চীবর গ্রহণ করে, তাহলে সেই ভিক্ষুর ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ আপত্তি হবে।”

‘তঞ্চেতি’ অর্থে সেই ছিন্ন চীবরধারী ভিক্ষুকে বুঝায়।

‘অঞ্ঞাতকো’ (অজ্ঞাতি) বলতে মাতৃপক্ষ হতে সাত পুরুষ এবং পিতৃপক্ষ হতে সাত পুরুষ রক্তসম্পর্কের জ্ঞাতি ছাড়া অন্যদেরকে বুঝায়।

‘গহপতি’ অর্থে যে পুরুষ সাংসারিক জীবন-যাপন করে গৃহে বসবাস করে।

‘গহপতানী’ অর্থে যে স্ত্রীলোক সাংসারিক জীবন-যাপন করে গৃহে বসবাস করে।

‘বহূহি চীবরেহি’ বলতে বহু চীবর হতে।

‘অভিহট্ঠুং পবারেয্যাতি’ বলতে কোনো অজ্ঞাতি গৃহপতি বা গৃহপত্নী বহু চীবর এনে এরূপ বলে যে, ‘ভন্তে, আপনার ইচ্ছামত যতটি চীবর প্রয়োজন হয়, ততটি চীবর এখান হতে গ্রহণ করুন’ এরূপ বুঝায়।

‘সন্তরুত্তরপরমং তেন ভিক্খুনা ততো চীবরং সাদিতব্বন্তি’ বলতে ছিন্ন চীবরধারী ভিক্ষুর তিনটি চীবর নষ্ট হলে, দুটি গ্রহণ করতে পারবে, দুটি নষ্ট হলে একটি গ্রহণ করতে পারবে আর যদি একটি নষ্ট হয়, তাহলে মোটেও নিতে পারবে না।

‘ততো চে উত্তরি সাদিযেয্যাতি’ বলতে বর্ণিত নিয়ম লঙ্ঘন করে তার অধিক চীবর যাচ্ঞা করলে প্রয়োগে প্রয়োগে ‘দুক্কট’ আপত্তি হবে। যাচ্ঞা করার পর প্রতিলাভ (প্রাপ্তি হলে) করলে ‘নিস্সগ্গিয়’ অপরাধ হবে। তখন সেই চীবরটি সংঘ, গণ বা একজন ভিক্ষুর নিকট বিসর্জন করতে হবে।

হে ভিক্ষুগণ, এভাবেই সেই চীবরটি বিসর্জন করতে হবে। প্রথমে সংঘের নিকট উপস্থিত হয়ে উত্তরাসঙ্গ একাংশ করে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুদের পদে বন্দনাপূর্বক উৎকুটিকভাবে বসে অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে সেই ভিক্ষু কর্তৃক এভাবে বলাবে :

“ভন্তে, আমার এই চীবর অজ্ঞাতি গৃহপতীর নিকট উপস্থিত হয়ে বর্ণিত নিয়ম লঙ্ঘন করে তার অধিক যাচ্ঞা করে গ্রহণ করায় ‘নিস্সগ্গিয়’ অপরাধ প্রাপ্ত হয়েছে। সে কারণে আমি এই চীবরটি মাননীয় সংঘের নিকট বিসর্জন করছি।”

চীবর বিসর্জনের পর আপত্তি দেশনা করতে হবে। ভিক্ষুসংঘের অনুমতিক্রমে দক্ষ ও সমর্থ ভিক্ষু কর্তৃক আপত্তি প্রতিগ্রহণ করাতে হবে। এবং এরূপে বিসর্জিত চীবর আপত্তিমুক্ত ভিক্ষুকে দিতে হবে :

“মাননীয় সংঘ, আমার প্রস্তাব শ্রবণ করুন। এই চীবর অমুক নামীয় ভিক্ষুর ‘নিস্সগ্গিয়’ হওয়ায় সংঘের নিকট বিসর্জন করা হয়েছে। যদি সংঘ উচিত সময় মনে করেন, তাহলে মাননীয় সংঘ এই চীবরটি অমুক নামীয় ভিক্ষুকে পুনঃ প্রদান করতে পারেন।”

তখন আপত্তিপ্রাপ্ত ভিক্ষু কিছুসংখ্যক ভিক্ষুর কাছে গিয়ে উত্তরাসঙ্গ একাংশ করে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুদের পায়ে বন্দনা জ্ঞাপন করার পর উৎকুটিকভাবে বসে অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে এরূপে বলতে হবে :

“ভন্তে, আমার এই চীবরটি অজ্ঞাতি গৃহপতীর নিকট উপস্থিত হয়ে বর্ণিত নিয়ম লঙ্ঘন করে তার অতিরিক্ত চীবর যাচ্ঞা করে গ্রহণ করায় ‘নিস্সগ্গিয়’ প্রাপ্ত হয়েছে। এ হেতু আমি এই চীবরটি মাননীয় সংঘের নিকট বিসর্জন করছি।”

চীবর বিসর্জনের পর আপত্তি দেশনা করতে হবে। ভিক্ষুসংঘের অনুমতিক্রমে দক্ষ ও সমর্থ ভিক্ষু কর্তৃক আপত্তি প্রতিগ্রহণ করাতে হবে। এবং এরূপে বিসর্জিত চীবর আপত্তিমুক্ত ভিক্ষুকে দিতে হবে :

“মাননীয় সংঘ, আমার বক্তব্য শ্রবণ করুন। এই চীবর অমুক নামীয় ভিক্ষুর ‘নিস্সগ্গিয়’ হওয়ায় সংঘের নিকট বিসর্জন করা হয়েছে। যদি সংঘ উচিত সময় মনে করেন, তাহলে মাননীয় সংঘ এই চীবরটি অমুক নামীয় ভিক্ষুকে পুনঃ প্রদান করতে পারেন।”

অতঃপর আপত্তিপ্রাপ্ত ভিক্ষু একজন ভিক্ষুর কাছে গিয়ে উত্তরাসঙ্গ একাংশ করে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুদের পায়ে বন্দনা জ্ঞাপন করার পর উৎকুটিকভাবে বসে অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে এরূপে বলতে হবে :

“বন্ধু, আমার এই চীবরটি অজ্ঞাতি গৃহপতির নিকট উপস্থিত হয়ে বর্ণিত বিনয় লঙ্ঘন করে তার চেয়ে অধিক যাচ্ঞা করে গ্রহণ করায় ‘নিস্সগ্গিয়’ অপরাধ প্রাপ্ত হয়েছে। সেহেতু আমি এই চীবরটি আয়ুষ্মানের নিকট বিসর্জন করছি।”

বিসর্জন করার পর আপত্তি দেশনা করতে হবে। ভিক্ষুসংঘের অনুমতিক্রমে দক্ষ ও সমর্থ ভিক্ষু কর্তৃক আপত্তি প্রতিগ্রহণ করাতে হবে। এবং এরূপে বিসর্জিত চীবর আপত্তিমুক্ত ভিক্ষুকে দিতে হবে :

“আমি এই চীবরটি আয়ুষ্মানকে দিচ্ছি।”

অজ্ঞাতিকে অজ্ঞাতি ধারণায় অজ্ঞাতি হতে নিয়মের অধিক চীবর যাচ্ঞা করলে ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ আপত্তি হয়। অজ্ঞাতিকে অজ্ঞাতি কি না সন্দেহবশত অজ্ঞাতি হতে নিয়মের অধিক চীবর যাচ্ঞা করলে ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ আপত্তি হয়। অজ্ঞাতিকে জ্ঞাতি ধারণায় অজ্ঞাতি হতে নিয়মের অধিক চীবর যাচ্ঞা করে গ্রহণ করলে ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ অপরাধ হয়। জ্ঞাতিকে অজ্ঞাতি ধারণায় যাচ্ঞা করলে ‘দুক্কট’ আপত্তি হয়। জ্ঞাতিকে জ্ঞাতি কি না সন্দেহবশত ‘দুক্কট’ অপরাধ হয়। জ্ঞাতিকে জ্ঞাতি ধারণায় অনাপত্তি।

অনাপত্তি : চীবরবিহীন ভিক্ষু ‘অবশিষ্ট চীবর সংগ্রহ করব’ এই চেতনায় গমন করার সময়ে দায়কেরা বাদবাকি চীবর প্রদান করলে, ছিন্ন চীবরধারী ভিক্ষুর চীবর ব্যবহারের অযোগ্য-হেতু প্রদান না করে শ্রদ্ধাবশত দান দিলে, জ্ঞাতিদের নিকট যাচ্ঞা করলে আমন্ত্রিত ব্যক্তির নিকট যাচ্ঞা করলে, নিজের অর্থ দ্বারা নিলে, ভিক্ষু উন্মাদ হলে এবং আদিকর্মিকের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অপরাধ হয় না।

অতিরিক্ত চীবর গ্রহণ বিষয়ক শিক্ষাপদ সমাপ্ত

ব্যাখ্যা [০]