একসময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অবস্থান করছিলেন… ‘হে ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ কাম ও অকুশল ধর্মগুলো হতে মুক্ত হয়ে সবিতর্ক, সবিচার ও নির্জনতাজনিত প্রীতিসুখ-সমন্বিত প্রথম ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ কাম ও অকুশল ধর্মগুলো হতে মুক্ত হয়ে সবিতর্ক, সবিচার ও নির্জনতাজনিত প্রীতিসুখ-সমন্বিত প্রথম ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ বিতর্ক ও বিচার উপশমে অধ্যাত্ম সুখ এবং একাগ্র চিত্তে বিতর্ক-বিচারহীন সমাধিজনিত প্রীতিসুখ-সমন্বিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ বিতর্ক ও বিচার উপশমে… দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ প্রীতির বিরাগে উপেক্ষক হয়ে অবস্থান করে স্মৃতিমান, সম্প্রজ্ঞানী হয়ে কায়িক সুখ অনুভব করি। যাকে আর্যগণ ‘উপেক্ষক, স্মৃতিমান ও সুখবিহারী’ বলে প্রকাশ করে, সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ প্রীতির বিরাগে উপেক্ষক হয়ে অবস্থান করে স্মৃতিমান, সম্প্রজ্ঞানী হয়ে কায়িক সুখ অনুভব করে। যাকে আর্যগণ ‘উপেক্ষক, স্মৃতিমান ও সুখবিহারী’ বলে প্রকাশ করে, সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ সুখ, দুঃখ পরিত্যাগ করে পূর্বের সৌমনস্য, দৌর্মনস্য ধ্বংস করে সুখ-দুঃখহীন ‘উপেক্ষা স্মৃতি পরিশুদ্ধি’ নামক চতুর্থ ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ সুখ, দুঃখ পরিত্যাগ করে… চতুর্থ ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ সমস্ত রূপসংজ্ঞা অতিক্রম করে, প্রতিসংজ্ঞা ধ্বংস করে, নানাসংজ্ঞা ও অনন্ত আকাশের প্রতি মনোযোগী হয়ে আকাশ-অনন্তায়তন ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ সমস্ত রূপসংজ্ঞা অতিক্রম করে… আকাশ-অনন্তায়তন ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ সমস্ত আকাশ-অনন্তায়তন অতিক্রমপূর্বক অনন্ত বিজ্ঞানকে (ধ্যানের বিষয় করে) বিজ্ঞান-অনন্তায়তন ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ সমস্ত আকাশ-অনন্তায়তন অতিক্রমপূর্বক অনন্ত বিজ্ঞানকে (ধ্যানের বিষয় করে) বিজ্ঞান-অনন্তায়তন ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ সমস্ত বিজ্ঞান-অনন্তায়তন অতিক্রম করে ‘কিছুই নেই’ (এরূপ ধারণাকে ধ্যানের বিষয় করে) আকিঞ্চনায়তন ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ সমস্ত… আকিঞ্চনায়তন ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ সমস্ত আকিঞ্চনায়তন অতিক্রমপূর্বক নৈবসংজ্ঞা-নাসংসজ্ঞায়তন ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ… নৈবসংজ্ঞা-নাসংসজ্ঞায়তন ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতক্ষণ ইচ্ছা করি ততক্ষণ নৈবসংজ্ঞা-নাসংজ্ঞায়তন অতিক্রমপূর্বক সংজ্ঞাবেদয়িত-নিরোধ-সমাপত্তি ধ্যান লাভ করে অবস্থান করি। তেমনি কাশ্যপও যতক্ষণ ইচ্ছা করে ততক্ষণ… সংজ্ঞাবেদয়িত-নিরোধ-সমাপত্তি ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যেরূপ ইচ্ছা বহু প্রকারের ঋদ্ধি অনুভব করি; যথা : এক হয়ে বহুসংখ্যক হই, বহু হয়ে পুনঃ একজন হই; আবির্ভাব হই, তিরোভাব (অন্তর্ধান) হই; দেয়াল, প্রাকার বা প্রাচীর এবং পর্বতে আকাশের ন্যায় অসংলগ্নভাবে গমন করি; মাটিতেও জলের ন্যায় ভাসি ও ডুবি, মাটির ন্যায় জলে অনার্দ্রভাবে গমন করি; পক্ষীর ন্যায় আকাশে পর্যাঙ্কাবদ্ধ (বীরাসন) হয়ে ভ্রমণ করি; এরূপ মহাঋদ্ধিসম্পন্ন ও মহানুভবসম্পন্ন চন্দ্র-সূর্যকে হস্ত দ্বারা স্পর্শ ও পরিমর্দন করি এবং যতদূর ব্রহ্মলোক রয়েছে ততদূর আপনকায়ে বশীভূত করি। তেমনি কাশ্যপও যেরূপ ইচ্ছা বহু প্রকারের ঋদ্ধি অনুভব করে… যতদূর ব্রহ্মলোক রয়েছে ততদূর আপনকায়ে বশীভূত করে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যতদূর ইচ্ছা করি ততদূর অতিমানবীয় বিশুদ্ধ দিব্যকর্ণের মাধ্যমে দূরস্থ ও নিকটস্থ উভয় মানুষের শব্দ শুনি। তেমনি কাশ্যপও যতদূর ইচ্ছা করে ততদূর অতিমানবীয় দিব্যকর্ণের মাধ্যমে দূরস্থ ও নিকটস্থ উভয় মানুষের শব্দ শুনে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যেই পর্যন্ত ইচ্ছা করি অপর সত্ত্বদের চিত্তকে স্বীয় চিত্ত দ্বারা যথার্থরূপে জানি; যেমন : সরাগ চিত্তকে সরাগ চিত্ত বলে যথার্থভাবে জানি, বীতরাগ চিত্তকে বীতরাগ চিত্ত বলে যথার্থরূপে জানি, সদ্বেষ চিত্তকে… বীতদ্বেষ চিত্তকে… সমোহ চিত্তকে… বীতমোহ চিত্তকে… সংক্ষিপ্ত চিত্তকে… বিক্ষিপ্ত চিত্তকে… মহদ্গত চিত্তকে… অমহদ্গত চিত্তকে… সউত্তর চিত্তকে… অনুত্তর চিত্তকে… সমাহিত চিত্তকে… অসমাহিত চিত্তকে… বিমুক্ত চিত্তকে… অবিমুক্ত চিত্তকে অবিমুক্ত চিত্ত বলে যথার্থভাবে জানি। তেমনি কাশ্যপও যেই পর্যন্ত ইচ্ছা করে অপর সত্ত্বদের চিত্তকে স্বীয় চিত্ত দ্বারা যথার্থরূপে জানে; যেমন : সরাগ চিত্তকে সরাগ চিত্ত বলে যথার্থভাবে জানে… অবিমুক্ত চিত্তকে অবিমুক্ত চিত্ত বলে যথার্থভাবে জানে।’
‘ভিক্ষুগণ, আমি যেই পর্যন্ত ইচ্ছা করি সেই পর্যন্ত বহুপ্রকার পূর্বানিবাস জ্ঞান অনুসরণ করি; যেমন : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, দশ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশজন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, হাজার জন্ম, লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্ত কল্পে, অনেক বিবর্ত কল্পে এবং অনেক সংবর্ত-বিবর্ত কল্পে, ‘অমুক সময়ে আমার এরূপ নাম, এরূপ গোত্র, এরূপ বর্ণ, এরূপ আহার এবং সুখ-দুঃখ অনুভব আর এরূপ আয়ু ছিল। তথা হতে চ্যুত হয়ে অমুক স্থানে উৎপন্ন হয়েছি। সেখানেও আমার এরূপ নাম, এরূপ গোত্র, এরূপ বর্ণ, এরূপ আহার এবং সুখ-দুঃখ অনুভব আর এরূপ আয়ু ছিল। তথা হতে চ্যুত হয়ে এখানে উৎপন্ন হয়েছি।’ এরূপে আকার ও বর্ণনাসহ অনেক প্রকার পূর্বনিবাসঅনুস্মরণ করি। তেমনি মহাকাশ্যপও যেই পর্যন্ত ইচ্ছা করে সেই পর্যন্ত বহুপ্রকার পূর্বানিবাস জ্ঞান অনুসরণ করে; যেমন : এক জন্ম… এরূপে আকার ও বর্ণনাসহ অনেক প্রকার পূর্বনিবাসঅনুস্মরণ করে।’
“ভিক্ষুগণ, আমি যেই পর্যন্ত ইচ্ছা করি সেই পর্যন্ত মনুষ্যাতীত বিশুদ্ধ দিব্যচক্ষু দ্বারা সত্ত্বগণকে চ্যুত হতে, উৎপন্ন হতে, হীন-উত্তম, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগতি-দুর্গতিপ্রাপ্ত হতে দেখতে পাই। আর যথাকর্মভোগী সত্ত্বগণকে যথার্থরূপে জানি, ‘এই সত্ত্বগণ কায় দুশ্চরিত্রসম্পন্ন, বাক্ দুশ্চরিত্রসম্পন্ন, মন দুশ্চরিত্রসম্পন্ন, আর্যনিন্দুক, মিথ্যাদৃষ্টিক, মিথ্যাদৃষ্টিমূলক কর্ম সম্পাদনকারী। তারা কায়ভেদে মরণের পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হয়েছে। এই সত্ত্বগণ কায় সুচরিতসম্পন্ন, বাক্ সুচরিতসম্পন্ন, মন সুচরিতসম্পন্ন, আর্যগণের অনিন্দুক, সম্যক দৃষ্টি, সম্যক দৃষ্টিমূলক কর্ম সম্পাদনকারী। তারা কায়ভেদে মরণের পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয়েছে।’ এভাবে মনুষ্যাতীত বিশুদ্ধ দিব্যচক্ষু দ্বারা সত্ত্বগণকে চ্যুত হতে, উৎপন্ন হতে; হীন-উত্তম, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগতি-দুর্গতিপ্রাপ্ত হতে আমি দেখতে পাই এবং যথাকর্মভোগী সত্ত্বগণকে যথার্থরূপে জানি। তেমনি মহাকাশ্যপও যেই পর্যন্ত ইচ্ছা করে সেই পর্যন্ত মনুষ্যাতীত বিশুদ্ধ দিব্যচক্ষু দ্বারা দেখতে পায় সত্ত্বগণকে চ্যুত হতে… যথাকর্মভোগী সত্ত্বগণকে যথার্থরূপে জানে।”
‘হে ভিক্ষুগণ, আমি আসবগুলো ক্ষয়ে অনাসব চিত্তবিমুক্তি, প্রজ্ঞাবিমুক্তি এবং ইহজীবনে স্বয়ং অভিজ্ঞা প্রত্যক্ষ করে অবস্থান করি। ভিক্ষুগণ, কাশ্যপও আসবগুলো ক্ষয়ে অনাসব চিত্তবিমুক্তি, প্রজ্ঞাবিমুক্তি এবং ইহজীবনে স্বয়ং অভিজ্ঞা প্রত্যক্ষ করে অবস্থান করে।’ নবম সূত্র।
ব্যাখ্যা [০]