লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৮]

তিষ্য সূত্র

শ্রাবস্তীতে উৎপত্তি :

তখন ভগবানের পিসির পুত্র আয়ুষ্মান তিষ্য কতিপয় ভিক্ষুদের এরূপ বললেন, ‘আবুসো, আমার শরীর এখন নিয়ন্ত্রণহীন দুর্বল, দিকগুলোও আমার পরিষ্কাররূপে দৃষ্টিগোচর হয় না, ধর্মও আমার মনে আর স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় না, আলস্য-তন্দ্রা আমার চিত্তকে অধিকার করে থাকে, আমি অনভিরত হয়ে ব্রহ্মচর্য আচরণ করছি, ধর্মের প্রতি আমার বিচিকিৎসা উৎপন্ন হচ্ছে।’

অতঃপর কতিপয় ভিক্ষু যেখানে ভগবান আছেন সেখানে উপস্থিত হলেন। উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে বসলেন। একপাশে আসীন হয়ে সেই ভিক্ষুগণ ভগবানকে বললেন, “ভন্তে, ভগবানের পিসির পুত্র আয়ুষ্মান তিষ্য কতিপয় ভিক্ষুদের এরূপ বললেন, ‘আবুসো, আমার শরীর এখন নিয়ন্ত্রণহীন দুর্বল, দিকগুলোও আমার পরিষ্কাররূপে দৃষ্টিগোচর হয় না, ধর্মও আমার মনে আর স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় না, আলস্য-তন্দ্রা আমার চিত্তকে অধিকার করে থাকে, আমি অনভিরত হয়ে ব্রহ্মচর্য আচরণ করছি, ধর্মের প্রতি আমার বিচিকিৎসা উৎপন্ন হচ্ছে।’”

তখন ভগবান কোনো একজন ভিক্ষুকে আমন্ত্রণ করলেন, ‘হে ভিক্ষু, যাও তুমি গিয়ে আমার কথায় তিষ্য ভিক্ষুকে আসতে বল।’ ‘আচ্ছা ভন্তে’ বলে সেই ভিক্ষু ভগবানের কথায় সায় দিয়ে যেখানে আয়ুষ্মান তিষ্য আছেন সেখানে গেলেন। গিয়ে আয়ুষ্মান তিষ্যকে বললেন, ‘আবুসো তিষ্য, ভগবান আপনাকে ডাকছেন।’ ‘আচ্ছা আবুসো’ বলে আয়ুষ্মান তিষ্য সেই ভিক্ষুর কথায় সায় দিয়ে যেখানে ভগবান আছেন সেখানে গেলেন গিয়ে ভগবান অভিবাদনপূর্বক একপাশে বসলেন। একপাশে আসীন হয়ে আয়ুষ্মান তিষ্যকে ভগবান বললেন, “হে তিষ্য, সত্যিই কি তুমি কতিপয় ভিক্ষুকে এরূপ বলেছ, ‘আবুসো, আমার শরীর এখন নিয়ন্ত্রণহীন দুর্বল…. ধর্মের প্রতি আমার বিচিকিৎসা উৎপন্ন হচ্ছে?’” ‘হ্যাঁ ভন্তে।’ ‘হে তিষ্য, তুমি কী মনে কর, যে রূপের প্রতি অবিগতরাগ [রাগযুক্ত], অবিগতছন্দ, অবিগতপ্রেম, অবিগতপিপাসা, অবিগতপরিলাহ [জ্বালা, প্রদাহ], অবিগততৃষ্ণাসম্পন্ন; তার সেই রূপের পরিবর্তনশীলতা অন্যথাভাবের কারণে শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও উপায়াস উৎপন্ন হয় কি?’ ‘হ্যাঁ ভন্তে।’

‘সাধু সাধু তিষ্য; এটা ঠিক এরূপই হয় তিষ্য। যেমন যে রূপের প্রতি অবিগতরাগ…. বেদনার প্রতি…. সংজ্ঞার প্রতি…. সংস্কারের প্রতি অবিগতরাগ…. তাদের সেই সংস্কারের পরিবর্তনশীলতা অন্যথাভাবের কারণে শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও উপায়াস উৎপন্ন হয় কি?’ ‘হ্যাঁ ভন্তে।’

‘সাধু সাধু তিষ্য; এটা ঠিক এরূপই হয় তিষ্য। যেমন যে বিজ্ঞানের প্রতি অবিগতরাগ, অবিগতছন্দ, অবিগতপ্রেম, অবিগতপিপাসা, অবিগতপরিলাহ [জ্বালা, প্রদাহ], অবিগততৃষ্ণাসম্পন্ন; তার সেই বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীলতা অন্যথাভাবের কারণে শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও উপায়াস উৎপন্ন হয় কি?’ ‘হ্যাঁ ভন্তে।’

‘সাধু সাধু তিষ্য; এটা ঠিক এরূপই হয় তিষ্য। যেমন সেই বিজ্ঞানের প্রতি অবিগতরাগ-সম্পন্ন ব্যক্তি। হে তিষ্য, তুমি এটি কী মনে কর, যে বিজ্ঞানের প্রতি বিগতরাগ [রাগহীন], বিগতছন্দ, বিগতপ্রেম, বিগতপিপাসা, বিগতপরিলাহ, বিগততৃষ্ণা; তার সেই বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীলতা অন্যথাভাবের কারণে শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও উপায়াস উৎপন্ন হয় কি?’ ‘ভন্তে, এরূপ হয় না।’

‘সাধু সাধু তিষ্য; এটা ঠিক এরূপই হয় তিষ্য। যেমন সে রূপের প্রতি বিগতরাগ-সম্পন্ন…. বেদনার প্রতি…. সংজ্ঞার প্রতি…. সংস্কারের প্রতি…. বিজ্ঞানের প্রতি বিগতরাগ, বিগতছন্দ, বিগতপ্রেম, বিগতপিপাসা, বিগতপরিলাহ, বিগততৃষ্ণা; তার সেই বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীলতা অন্যথাভাবের কারণে শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও উপায়াস উৎপন্ন হয় কি?’ ‘ভন্তে, এরূপ হয় না।’

‘সাধু সাধু তিষ্য; এটা ঠিক এরূপই হয় তিষ্য। যেমন সেই বিজ্ঞানের প্রতি বিগতরাগ-সম্পন্ন ব্যক্তির। হে তিষ্য, তুমি এটি কী মনে কর, রূপ নিত্য নাকি অনিত্য?’ ‘অনিত্য ভন্তে।’ ‘বেদনা…. সংজ্ঞা…. সংস্কার…. বিজ্ঞান…. এভাবে দর্শন করে…. এ জীবনে [আসবক্ষয়ের নিমিত্তে] অন্য কোনো করণীয় নেই’ এভাবে তিনি সম্যকরূপে জানতে পারেন।”

‘হে তিষ্য, মনে কর, দুজন পুরুষ―[তন্মধ্যে] একজন পুরুষ হলো অমার্গদক্ষ, একজন পুরুষ হলো মার্গদক্ষ। যথা শীঘ্র সেই অমার্গদক্ষ পুরুষ অমুক মার্গদক্ষ পুরুষকে মার্গ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। সে এরূপ বলে : ‘ওহে পুরুষ, আসুন; এই হলো মার্গ। এর মাধ্যমে মুহূর্তে মধ্যে গমন করুন। সে সেই পথ দিয়ে অল্পক্ষণ গমন করে দেখবেন দ্বিধাবিভক্ত পথ। সেখানে সে বামপথকে ত্যাগ করে ডানপথকে গ্রহণ করবেন। তা দিয়ে সংক্ষিপ্ত সময় গমন করুন। তা দিয়ে সংক্ষিপ্ত সময় গমন করে দেখবেন ঘন অন্ধকারময় এক বন। তা দিয়ে সংক্ষিপ্ত সময় গমন করুন। সেই পথ দিয়ে অল্পক্ষণ গমন করে দেখবেন বিশাল আকারের নিচু এক জলাভূমি। এর মাধ্যমে অল্পক্ষণ গমন করুন। সে সেই পথ দিয়ে অল্পক্ষণ গমন করে দেখবেন গর্তবিশিষ্ট এক খাড়া উচু পাহাড়, তা দিয়ে অল্পক্ষণ গমন করুন। তা দিয়ে অল্পক্ষণ গিয়ে দেখবেন সমান ভূমিসম্পন্ন এক রমণীয় স্থান।’

“হে তিষ্য, আমাকর্তৃক উপমা প্রদত্ত হলো কৃত অর্থের মর্মার্থ প্রদর্শনের জন্য। এই হলো এখানে অর্থ―‘হে তিষ্য, ‘অমার্গদক্ষ পুরুষ’, এটি হলো পৃথগ্‌জনের অধিবচন বা নামান্তর। হে তিষ্য, ‘মার্গদক্ষ পুরুষ’, এটি হলো তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের অধিবচন বা নামান্তর। হে তিষ্য, ‘দ্বিধাবিভক্ত পথ’, এটি হলো বিচিকিৎসার অধিবচন বা নামান্তর। ‘বামপথ’, এটি হলো অষ্টাঙ্গিক মিথ্যামার্গের অধিবচন বা নামান্তর। যেমন : মিথ্যাদৃষ্টি, মিথ্যাসংকল্প, মিথ্যাবাক্য, মিথ্যাকর্ম, মিথ্যাআজীব, মিথ্যাপ্রচেষ্টা, মিথ্যাস্মৃতি ও মিথ্যাসমাধি। হে তিষ্য, ‘ডানপথ’, এটি হলো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অধিবচন। যেমন : সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক আজীব, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি। হে তিষ্য, ‘ঘন অন্ধকারময় এক বন’, এটি হলো অবিদ্যারই অধিবচন বা নামান্তর। হে তিষ্য, ‘বিশাল আকারের নিচু এক জলাভূমি’, এটি হলো কামগুণগুলোর অধিবচন বা নামান্তর। হে তিষ্য, ‘গর্তবিশিষ্ট এক খাড়া উঁচু পাহাড়’, এটি হলো ক্রোধ-উপায়াসের অধিবচন বা নামান্তর। হে তিষ্য, ‘সমান ভূমিসম্পন্ন এক রমণীয় স্থান’, এটি হলো নির্বাণেরই অধিবচন বা নামান্তর। হে তিষ্য, আমার উপদেশের দ্বারা, আমার অনুগ্রহের দ্বারা, আমার অনুশাসনের দ্বারা অভিরমিত হও! অভিরমিত হও!”

ভগবান এরূপ বললেন। আয়ুষ্মান তিষ্য সন্তুষ্ট মনে ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করলেন। [দ্বিতীয় সূত্র]

ব্যাখ্যা [১]