লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২১]

সপ্ত জটিল সূত্র

একসময় ভগবান শ্রাবস্তীর মিগারমাতা (বিশাখা) প্রদত্ত পূর্বারাম বিহারে অবস্থান করছেন। তখন ভগবান সায়াহ্ন সময়ে নির্জনতা হতে উঠে বাহির দ্বারের প্রকোষ্ঠে উপবিষ্ঠ হন। অনন্তর কোশলরাজ প্রসেনজিৎ ভগবানের কাছে উপস্থিত হয়ে অভিবাদনপূর্বক একপাশে উপবেশন করলেন।

সে-সময় সাতজন জটিল, সাতজন নির্গ্রন্থ, সাতজন অচেলক, সাতজন একবস্ত্রধারী সন্ন্যাসী এবং সাতজন দীর্ঘ-চুল-নখ-লোমবিশিষ্ট পরিব্রাজক তাদের ব্যবহারযোগ্য বিবিধ দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে ভগবানের নিকটবর্তী হয়ে যাচ্ছেন। তখন কোশলরাজ প্রসেনজিৎ আসন হতে উঠে উত্তরীয় বস্ত্র একাংশ করলেন এবং দক্ষিণ জানু মাটিতে রেখে সাতজন জটিল, সাতজন নির্গ্রন্থ, সাতজন অচেলক, সাতজন একবস্ত্রধারী সন্ন্যাসী এবং সাতজন দীর্ঘ-চুল-নখ-লোমবিশিষ্ট পরিব্রাজকের উদ্দেশে অঞ্জলিবদ্ধ প্রণাম নিবেদন করলেন। আর তিনবার নিজের নাম প্রকাশ করলেন, ‘ভন্তে, আমি কোশলরাজ প্রসেনজিৎ, আমি কোশলরাজ প্রসেনজিৎ, আমি কোশলরাজ প্রসেনজিৎ।’

অনন্তর কোশলরাজ প্রসেনজিৎ সেই সাতজন জটিল, সাতজন নির্গ্রন্থ, সাতজন অচেলক, সাতজন একবস্ত্রধারী সন্ন্যাসী এবং সাতজন পরিব্রাজকের গমনের পর আবার ভগবানের কাছে উপস্থিত হলেন। উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একান্তে বসলেন। একান্তে উপবিষ্ট কোশলরাজ প্রসেনজিৎ ভগবানকে বললেন, ‘ভন্তে, পৃথিবীতে যেসব অর্হৎ বা অর্হত্ত্বমার্গলাভী আছেন, এরা সবাই তাঁদের মধ্যে অন্যতর।’

“হে মহারাজ, আপনার মতো গৃহী, কামভোগী, পুত্র-কন্যাসমন্বিত হয়ে বসবাসকারী, কাশিচন্দন-বিলাসী, মালা-গন্ধ-বিলেপনধারী ও স্বর্ণ-রৌপ্যগ্রাহীর পক্ষে জানা দুষ্কর যে, ‘এরা অর্হৎ বা এরা অর্হত্ত্বমার্গলাভী।’

হে মহারাজ, একসঙ্গে বসবাসের মাধ্যমে শীল সম্বন্ধে জানতে হবে। তাও আবার দীর্ঘকালের সংসর্গে জানতে হবে, ক্ষণিক সংসর্গে নয়; মনোযোগের মাধ্যমে জানতে হবে, অমনোযোগের মাধ্যমে নয়; প্রজ্ঞাবানের দ্বারা জানতে হবে, দুষ্প্রাজ্ঞের দ্বারা নয়। মহারাজ, আচার-ব্যবহারে শুদ্ধতা সম্বন্ধে জানতে হবে। তাও আবার দীর্ঘকালের আচার-ব্যবহারে জানতে হবে, ক্ষণিক আচার-ব্যবহারে নয়; মনোযোগের মাধ্যমে জানতে হবে, অমনোযোগের মাধ্যমে নয়; প্রজ্ঞাবানের দ্বারা জানতে হবে, দুষ্প্রাজ্ঞের দ্বারা নয়। মহারাজ, বিপদ-আপদে শক্তি সম্বন্ধে জানতে হবে। তাও আবার দীর্ঘকালের দ্বারা জানতে হবে, ক্ষণিককালে নয়; মনোযোগের মাধ্যমে জানতে হবে, অমনোযোগের মাধ্যমে নয়; প্রজ্ঞাবানের দ্বারা জানতে হবে, দুষ্প্রাজ্ঞের দ্বারা নয়। মহারাজ, কথোপকথনের মাধ্যমে প্রজ্ঞা সম্বন্ধে জানতে হবে। তাও আবার দীর্ঘকাল কথোপকথনের দ্বারা জানতে হবে, ক্ষণিককালে নয়; মনোযোগের মাধ্যমে জানতে হবে, অমনোযোগের মাধ্যমে নয়; প্রজ্ঞাবানের দ্বারা জানতে হবে, দুষ্প্রাজ্ঞের দ্বারা নয়।’

“ভন্তে, অতি মনোহর! অতি চমৎকার! ভগবানের এ ভাষণ সুভাষিত, ‘হে মহারাজ, আপনার মতো গৃহী, কামভোগী, পুত্র-কন্যাসমন্বিত হয়ে বসবাসকারী, কাশিচন্দন-বিলাসী, মালা-গন্ধ-বিলেপনধারী ও স্বর্ণ-রৌপ্যগ্রাহীর পক্ষে জানা দুষ্কর যে, ‘এরা অর্হৎ বা এরা অর্হত্ত্বমার্গলাভী।’

হে মহারাজ, একসঙ্গে বসবাসের মাধ্যমে শীল সম্বন্ধে জানতে হবে। তাও আবার দীর্ঘকালের সংসর্গে জানতে হবে, ক্ষণিক সংসর্গে নয়; মনোযোগের মাধ্যমে জানতে হবে, অমনোযোগের মাধ্যমে নয়; প্রজ্ঞাবানের দ্বারা জানতে হবে, দুষ্প্রাজ্ঞের দ্বারা নয়। মহারাজ, আচার-ব্যবহারে শুদ্ধতা সম্বন্ধে জানতে হবে। তাও আবার দীর্ঘকালের আচার-ব্যবহারে জানতে হবে, ক্ষণিক আচার-ব্যবহারে নয়; মনোযোগের মাধ্যমে জানতে হবে, অমনোযোগের মাধ্যমে নয়; প্রজ্ঞাবানের দ্বারা জানতে হবে, দুষ্প্রাজ্ঞের দ্বারা নয়। মহারাজ, বিপদ-আপদে শক্তি সম্বন্ধে জানতে হবে। তাও আবার দীর্ঘকালের দ্বারা জানতে হবে, ক্ষণিককালে নয়; মনোযোগের মাধ্যমে জানতে হবে, অমনোযোগের মাধ্যমে নয়; প্রজ্ঞাবানের দ্বারা জানতে হবে, দুষ্প্রাজ্ঞের দ্বারা নয়। মহারাজ, কথোপকথনের মাধ্যমে প্রজ্ঞা সম্বন্ধে জানতে হবে। তাও আবার দীর্ঘকাল কথোপকথনের দ্বারা জানতে হবে, ক্ষণিককালে নয়; মনোযোগের মাধ্যমে জানতে হবে, অমনোযোগের মাধ্যমে নয়; প্রজ্ঞাবানের দ্বারা জানতে হবে, দুষ্প্রাজ্ঞের দ্বারা নয়।’

‘ভন্তে, এই লোকেরা আমার গুপ্তচর, গোয়েন্দা; তারা জনপদ পরিদর্শন করে আগমন করছে। তাদের দ্বারা প্রথমে জনপদ পর্যবেক্ষিত হয়, তারপর আমি উপস্থিত হই। ভন্তে, তারা এখন দেহের ধূলি, কাদা পরিষ্কার করে সুস্নাত, সুবিলিপ্ত হবে, চুল-গোঁফ-দাড়ি মুণ্ডনকরে শ্বেতবস্ত্র পরিধানপূর্বক পঞ্চকামগুণে অলংকৃত ও লিপ্ত হয়ে বাস করবে।’

তখন ভগবান ইহার অর্থ জ্ঞাত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এই গাথাগুলো ভাষণ করলেন :

‘দেহবর্ণে ও শারীরিক অবয়বে মানুষকে ভালোরূপে জানা সম্ভব নয়, ক্ষণিক দর্শনে লোককে বিশ্বাস করতে নেই। সুসংযত ব্যক্তির ছদ্মবেশে অসংযত ব্যক্তিরা জগতে বিচরণ করে। তারা অন্তরে অশুদ্ধ হয়েও মাটির নির্মিত কর্ণাবরণ সদৃশ বা স্বর্ণাচ্ছাদিত লৌহমুদ্রার অনুরূপ পরিচ্ছদ পরিধানপূর্বক বাহ্যিকভাবে শোভনীয় হয়ে জগতে বিচরণ করে।’

ব্যাখ্যা [২]