আমি এরূপ শুনেছি। এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অবস্থান করছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে (বিহারে)। তখন একজন ভিক্ষু যেখানে ভগবান ছিলেন সেখানে উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে উপবেশন করলেন। একপাশে উপবিষ্ট সেই ভিক্ষু ভগবানকে বললেন, “ভন্তে, অমুক বিহারে একজন অপরিচিত (অজ্ঞাতনামা) নবীন ভিক্ষু ব্যাধিগ্রস্ত, দুঃখিত ও তীব্র রোগযন্ত্রণায় অস্থির হয়েছেন। ভন্তে, ভগবান অনুকম্পাবশত যেখানে সেই ভিক্ষু আছেন সেখানে উপস্থিত হলে ভালো হয়।”
অতঃপর ভগবান নবীন (নব প্রব্রজিত) ও ব্যাধিগ্রস্ত এ কথা শ্রবণ করে এবং ভিক্ষুটি অপরিচিত তা জ্ঞাত হয়ে যেখানে সেই ভিক্ষু ছিলেন সেখানে উপস্থিত হলেন। সেই ভিক্ষু দূর হতে ভগবানকে আসতে দেখে মঞ্চ (শয্যা) হতে (ভগবানের প্রতি গারবতাবশত) গাত্রোত্থান করলেন। তখন ভগবান সেই ভিক্ষুকে বললেন, “হে ভিক্ষু, থাম, তুমি মঞ্চ হতে উঠো না। এখানে আসন প্রজ্ঞাপ্ত (প্রস্তুতকৃত) আছে, তথায় আমি উপবেশন করব।” ভগবান প্রজ্ঞাপ্ত আসনে উপবেশন করলেন। উপবিষ্ট ভগবান সেই ভিক্ষুকে বললেন, “হে ভিক্ষু, তুমি রোগযন্ত্রণা সহ্য করতে সক্ষম হচ্ছ কি? তোমার দেহ চালনা করতে পারছ্ কি? তোমার দুঃখ-বেদনা পরিক্ষীণ (অবসান) হচ্ছে নাকি বৃদ্ধি পাচ্ছে? (রোগ) বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে নাকি অবসানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে?” (ভিক্ষু বললেন) “ভন্তে, আমার রোগযন্ত্রণা সহ্য হচ্ছে না। আমি চারি ঈর্যাপথ প্রবর্তন করতে অক্ষম। আমার দুঃখ-বেদনা অতি প্রবল, বাড়ছে কিন্তু কমছে না। বৃদ্ধি ব্যতীত উপশমের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।”
“হে ভিক্ষু, তোমার কোনো কৌকৃত্য (অনুশোচনা) ও বিপ্রতিসার (অনুতাপ) নেই তো?”
“ভন্তে, আমার অনুশোচনা ও অনুতাপ অল্প নয় অধিক।”
“হে ভিক্ষু, তুমি আপন শীল হতে চ্যুত বলে নিন্দিত হও কি?”
“ভন্তে, আমি শীলচ্যুত বলে নিন্দিত হই না।”
“হে ভিক্ষু, যদি তুমি শীলচ্যুত বলে নিন্দিত না হও; তবে তোমার অনুশোচনাই বা কী, অনুতাপই বা কী?”
“ভন্তে, আমি কিন্তু এরূপে জ্ঞাত নই যে শীলবিশুদ্ধির জন্যই ভগবান কর্তৃক ধর্ম দেশিত।”
“হে ভিক্ষু, “শীলবিশুদ্ধির জন্যই ভগবান কর্তৃক ধর্ম দেশিত’ যদি তুমি এরূপে জ্ঞাত না হও (না জান), তবে আমাকর্তৃক কী উদ্দেশ্যে ধর্ম দেশিত বলে তুমি জান?”
“ভন্তে, ‘ভগবান কর্তৃক দেশিত ধর্ম রাগ (আসক্তি) বিরাগের (ক্ষয়ের) জন্য’, এরূপে আমি জানি।”
“সাধু, সাধু ভিক্ষু! রাগ বিরাগের জন্য আমাকর্তৃক ধর্ম দেশিত, তা তুমি উত্তমরূপে অবগত হয়েছ।”
“হে ভিক্ষু, সত্যিই (বাস্তবিকই) রাগ বিরাগের জন্যই আমাকর্তৃক ধর্ম দেশিত হয়।”
“হে ভিক্ষু, তুমি ইহা কী মনে কর, চক্ষু নিত্য নাকি অনিত্য?”
“অনিত্য, ভন্তে।”
“যা অনিত্য, তা দুঃখ নাকি সুখ?”
“দুঃখ, ভন্তে।”
“যা অনিত্য, দুঃখ ও পরিবর্তনশীল; ‘তা আমার, তা আমি, তা আমার আত্মা’ বলে দর্শন করা উচিত কি?”
“নিশ্চয়ই নয়, ভন্তে।”
শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায় ও মন সম্বন্ধেও এইরূপ।
“হে ভিক্ষু, শ্রুতবান আর্যশ্রাবক বিষয়টি এভাবে দর্শন করে চক্ষুতে নির্বেদ প্রাপ্ত হন, শ্রোত্রে নির্বেদ প্রাপ্ত হন, ঘ্রাণে নির্বেদপ্রাপ্ত হন, জিহ্বায় নির্বেদপ্রাপ্ত হন, কায়ে নির্বেদ প্রাপ্ত হন ও মনে নির্বেদ প্রাপ্ত হন। নির্বেদ প্রাপ্ত হয়ে বিরাগ হন, বিরাগ হতে বিমুক্ত হন, বিমুক্তিতে ‘বিমুক্ত হয়েছি’ বলে জ্ঞানের উদয় হয় এবং তিনি প্রকৃষ্টরূপে জানতে পারেন, আমার জন্মবীজ ক্ষীণ হয়েছে, ব্রহ্মচর্যব্রত উদ্যাপিত হয়েছে, করণীয় কার্য কৃত হয়েছে, এ জীবনে (আসবক্ষয়ের জন্য) আর অন্য কর্তব্য নাই।”
ভগবান ইহা বললেন, সেই ভিক্ষু সন্তুষ্ট মনে ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করলেন। এই সূত্র ব্যাখ্যাকালে (বিশ্লেষণকালে) সেই ভিক্ষুর বিরজ বীতমল (নির্মল) ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হলো, যা কিছু উৎপত্তি স্বভাববিশিষ্ট তৎসমুদয়ই নিরোধ স্বভাবসম্পন্ন।
প্রথম সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [১]
English