লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৭]

দ্বিতীয় গিলান সূত্র

আমি এরূপ শুনেছি। এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অবস্থান করছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে (বিহারে)। তখন একজন ভিক্ষু যেখানে ভগবান ছিলেন সেখানে উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে উপবেশন করলেন। একপাশে উপবিষ্ট সেই ভিক্ষু ভগবানকে বললেন, “ভন্তে, অমুক বিহারে একজন অপরিচিত (অজ্ঞাতনামা) নবীন ভিক্ষু ব্যাধিগ্রস্ত, দুঃখিত ও তীব্র রোগযন্ত্রণায় অস্থির হয়েছেন। ভন্তে, ভগবান অনুকম্পাবশত যেখানে সেই ভিক্ষু আছেন সেখানে উপস্থিত হলে ভালো হয়।”

অতঃপর ভগবান নবীন (নবপ্রব্রজিত) ও ব্যাধিগ্রস্ত এ কথা শ্রবণ করে এবং ভিক্ষুটি অপরিচিত তা জ্ঞাত হয়ে যেখানে সেই ভিক্ষু ছিলেন সেখানে উপস্থিত হলেন। সেই ভিক্ষু দূর হতে ভগবানকে আসতে দেখে মঞ্চ (শয্যা) হতে (ভগবানের প্রতি গারবতাবশত) গাত্রোত্থান করলেন। তখন ভগবান সেই ভিক্ষুকে বললেন, “হে ভিক্ষু, থাম, তুমি মঞ্চ হতে উঠো না। এখানে আসন প্রজ্ঞাপ্ত (প্রস্তুতকৃত) আছে, তথায় আমি উপবেশন করব।” ভগবান প্রজ্ঞাপ্ত আসনে উপবেশন করলেন। উপবিষ্ট ভগবান সেই ভিক্ষুকে বললেন, “হে ভিক্ষু, তুমি রোগযন্ত্রণা সহ্য করতে সক্ষম হচ্ছ কি? তোমার দেহ চালনা করতে পারছ্‌ কি? তোমার দুঃখ-বেদনা পরিক্ষীণ (অবসান) হচ্ছে নাকি বৃদ্ধি পাচ্ছে? (রোগ) বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে নাকি অবসানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে?” (ভিক্ষু বললেন) “ভন্তে, আমার রোগযন্ত্রণা সহ্য হচ্ছে না। আমি চারি ঈর্যাপথ প্রবর্তন করতে অক্ষম। আমার দুঃখ-বেদনা অতি প্রবল, বাড়ছে বই কমছে না। বৃদ্ধি ব্যতীত উপশমের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।”

“হে ভিক্ষু, তোমার কোনো কৌকৃত্য (অনুশোচনা) ও বিপ্রতিসার (অনুতাপ) নেই তো?”

“ভন্তে, আমার অনুশোচনা ও অনুতাপ অল্প নয় অধিক।”

“হে ভিক্ষু, তুমি আপন শীল হতে চ্যুত বলে নিন্দিত হও কি?”

“ভন্তে, আমি শীলচ্যুত বলে নিন্দিত হই না।”

“হে ভিক্ষু, যদি তুমি শীলচ্যুত বলে নিন্দিত না হও; তবে তোমার অনুশোচনাই বা কী, অনুতাপই বা কি?”

“ভন্তে, আমি কিন্তু এরূপে জ্ঞাত নই যে শীলবিশুদ্ধির জন্যই ভগবান কর্তৃক ধর্ম দেশিত।”

“হে ভিক্ষু, “শীলবিশুদ্ধির জন্যই ভগবান কর্তৃক ধর্ম দেশিত’ যদি তুমি এরূপে জ্ঞাত না হও (না জান), তবে আমাকর্তৃক কী উদ্দেশ্যে ধর্ম দেশিত বলে তুমি জান?”

“ভন্তে, ভগবান কর্তৃক দেশিত ধর্ম অনুৎপাদ পরিনির্বাণের (তৃষ্ণাহীন পরিনির্বাণের) জন্য, আমি এরূপ জানি।”

“সাধু, সাধু হে ভিক্ষু! অনুৎপাদ পরিনির্বাণের জন্যই আমাকর্তৃক ধর্ম দেশিত। তা তুমি উত্তমরূপে অবগত হয়েছ। হে ভিক্ষু, সত্যিই (বাস্তবিকই) অনুৎপাদ পরিনির্বাণের জন্যই আমাকর্তৃক ধর্ম দেশিত।”

“হে ভিক্ষু, তুমি ইহা কী মনে কর, চক্ষু নিত্য নাকি অনিত্য?”

“অনিত্য, ভন্তে।”

“যা অনিত্য, তা দুঃখ নাকি সুখ?”

“দুঃখ, ভন্তে।”

“যা অনিত্য, দুঃখ ও পরিবর্তনশীল; ‘তা আমার, তা আমি, তা আমার আত্মা’ বলে দর্শন করা উচিত কি?”

“নিশ্চয়ই নয়, ভন্তে।”

রূপ, চক্ষু বিজ্ঞান, চক্ষু-সংস্পর্শ, চক্ষু-সংস্পর্শ হেতু উৎপন্ন সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা; শ্রোত্র, শব্দ, শ্রোত্র-বিজ্ঞান, শ্রোত্র-সংস্পর্শ, শ্রোত্র-সংস্পর্শ হেতু উৎপন্ন সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা; ঘ্রাণ, গন্ধ, ঘ্রাণ-বিজ্ঞান, ঘ্রাণ-সংস্পর্শ, ঘ্রাণ-সংস্পর্শ হেতু উৎপন্ন সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা; জিহ্বা, রস, জিহ্বা-বিজ্ঞান, জিহ্বা-সংস্পর্শ, জিহ্বা-সংস্পর্শ হেতু উৎপন্ন সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা; কায়, স্প্রষ্টব্য, কায়-বিজ্ঞান, কায়-সংস্পর্শ, কায়-সংস্পর্শ হেতু উৎপন্ন সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা; এবং মন, ধর্ম, মনোবিজ্ঞান, মনো-সংস্পর্শ, মনো-সংস্পর্শ হেতু উৎপন্ন সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা সম্বন্ধেও এইরূপ।

হে ভিক্ষু, শ্রুতবান আর্যশ্রাবক বিষয়টি এরূপে দর্শন করে চক্ষুর প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, রূপের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, চক্ষু-বিজ্ঞানের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, চক্ষু-সংস্পর্শের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, চক্ষু-সংস্পর্শ হেতু যে সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তাতেও নির্বেদ প্রাপ্ত হন। শ্রোত্রের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, শব্দের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, শ্রোত্র-বিজ্ঞানের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, শ্রোত্র-সংস্পর্শের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, শ্রোত্র-সংস্পর্শ হেতু যে সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তাতেও নির্বেদ প্রাপ্ত হন। ঘ্রাণের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, গন্ধের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, ঘ্রাণ-বিজ্ঞানের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, ঘ্রাণ-সংস্পর্শের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, ঘ্রাণ-সংস্পর্শ হেতু যে সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তাতেও নির্বেদ প্রাপ্ত হন, জিহ্বার প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, রসের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, জিহ্বা-বিজ্ঞানের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, জিহ্বা-সংস্পর্শের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, জিহ্বা-সংস্পর্শ হেতু যে সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তাতেও নির্বেদ প্রাপ্ত হন। কায়ের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, স্প্রষ্টব্যের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, কায়-বিজ্ঞানের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, কায়-সংস্পর্শের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, কায়-সংস্পর্শ হেতু যে সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তাতেও নির্বেদ প্রাপ্ত হন। মনের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, ধর্মের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, মনোবিজ্ঞানের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, মনো-সংস্পর্শের প্রতি নির্বেদ প্রাপ্ত হন, মনো-সংস্পর্শ হেতু যে সুখ বা দুঃখ বা অদুঃখ-অসুখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তাতেও নির্বেদ প্রাপ্ত হন, নির্বেদ হতে বিরাগ হন, বিরাগ হতে বিমুক্ত হন, বিমুক্তিতে ‘বিমুক্ত হয়েছি’ বলে জ্ঞানের সঞ্চার হয় এবং তিনি প্রকৃষ্টরূপে জানতে পারেন, ‘জন্মবীজ ক্ষীণ হয়েছে, ব্রহ্মচর্য ব্রত উদ্‌যাপিত হয়েছে, করণীয় কার্য কৃত হয়েছে এবং এ জীবনে (আসব ক্ষয়ের জন্য) আর অপর কর্তব্য নাই’।”

ভগবান ইহা বললেন, সেই ভিক্ষু সন্তুষ্ট মনে ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করলেন। এই সূত্র ব্যাখ্যাকালে সেই ভিক্ষুর চিত্ত অনাসক্ত (তৃষ্ণারহিত) হয়ে আসব হতে বিমুক্ত হলো।

দ্বিতীয় সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [১]