লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২০]

মারকন্যা সূত্র

অতঃপর পাপীরাজ মার ভগবানের সামনে এই হতাশাব্যঞ্জক গাথাগুলো ভাষণ করার পর সেই স্থান হতে প্রস্থান করে। আর ভগবানের অনতিদূরে ভূমির উপর পর্যাঙ্কে উপবেশন করল এবং নীরব, নিস্তব্ধ, নিরাশ, অধোমুখী, ভগ্নোৎসাহ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাষ্ঠ দ্বারা মাটি আঁচড় কাটছে। তখন তৃষ্ণা, অরতি ও রগা এই তিন মারকন্যা পাপীরাজ মারের নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে গাথায় বলল :

‘হে পিতঃ, কেন তুমি দুর্মনা হয়েছ? কোন ব্যক্তিকে নিয়ে অনুশোচনা করছ? আমরা বনচর হস্তির ন্যায় রাগপাশে বেঁধে নিয়ে আসবো, তখন সেই ব্যক্তি তোমার অনুগত হবে।’

(তখন মার বলল)

‘জগতে অর্হৎ সুগতকে রাগপাশে আবদ্ধ করে নিয়ে আসা অসম্ভব, কারণ তিনি মাররাজ্য অতিক্রম করেছেন, সে-কারণেই আমি অত্যধিকরূপে অনুশোচনা করছি।’

অতঃপর তৃষ্ণা, অরতি ও রগা নাম্নী মারকন্যা ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে ভগবানকে বলল, ‘হে শ্রমণ, আমরা আপনার পাদ পরিচর্যা করি।’ তখন ভগবান (মারকন্যাদের কথায়) মনোযোগ দিলেন না, যেহেতু তিনি অনতিক্রম্য উপদিক্ষয়ে বিমুক্ত।

তখন মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা একান্তে গিয়ে সম্মিলিতভাবে এরূপ চিন্তা করল, ‘পুরুষদের অভিপ্রায় নানা প্রকার। সেহেতু আমরা প্রত্যেকে একশত করে কুমারীর বেশ ধারণ করি।’ তখন তারা প্রত্যেকেই একশত করে কুমারীবেশ ধারণপূর্বক ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ‘শ্রমণ, আমরা আপনার পাদ পরিচর্যা করি।’ ভগবান তাতেও মনোযোগ দিলেন না, যেহেতু তিনি অনতিক্রম্য উপদিক্ষয়ে বিমুক্ত।

অনন্তর মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা একান্তে গিয়ে সম্মিলিতভাবে এরূপ চিন্তা করল, ‘পুরুষদের অভিপ্রায় বিবিধ প্রকার। সেহেতু আমরা প্রত্যেকে একশত করে অপ্রসূতি নারীর বেশ ধারণ করি।’ তখন তারা প্রত্যেকেই একশত করে অপ্রসূতি নারীর বেশ ধারণপূর্বক ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ‘শ্রমণ, আমরা আপনার পাদ পরিচর্যা করি।’ ভগবান তাতেও মনোযোগ দিলেন না, যেহেতু তিনি অনতিক্রম্য উপদিক্ষয়ে বিমুক্ত।

আবার তারা একান্তে গিয়ে সম্মিলিতভাবে এরূপ চিন্তা করল, ‘পুরুষদের অভিপ্রায় বিবিধ প্রকার। সেহেতু আমরা প্রত্যেকে একশত করে এক সন্তান প্রসূতি নারীর বেশ ধারণ করি।’ তখন মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা প্রত্যেকেই একশত করে এক সন্তান প্রসূতি নারীর বেশ ধারণপূর্বক ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ‘শ্রমণ, আমরা আপনার পাদ পরিচর্যা করি।’ ভগবান তাতেও মনোযোগ দিলেন না, যেহেতু তিনি অনতিক্রম্য উপদিক্ষয়ে বিমুক্ত।

অতঃপর তারা আবার একান্তে গিয়ে সম্মিলিতভাবে এরূপ চিন্তা করল, ‘পুরুষদের অভিপ্রায় বিবিধ প্রকার। সেহেতু আমরা প্রত্যেকে একশত করে দুই সন্তান প্রসূতি নারীর বেশ ধারণ করি।’ তখন মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা প্রত্যেকেই একশত করে দুই সন্তান প্রসূতি নারীর বেশ ধারণপূর্বক ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ‘শ্রমণ, আমরা আপনার পাদ পরিচর্যা করি।’ ভগবান তাতেও মনোযোগ দিলেন না, যেহেতু তিনি অনতিক্রম্য উপদিক্ষয়ে বিমুক্ত।

মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা আবার একান্তে গিয়ে সম্মিলিতভাবে এরূপ চিন্তা করল, ‘পুরুষদের অভিপ্রায় বিবিধ প্রকার। সেহেতু আমরা প্রত্যেকে একশত করে মধ্যবয়সী নারীর বেশ ধারণ করি।’ তখন তারা প্রত্যেকেই একশত করে মধবয়সী নারীর বেশ ধারণপূর্বক ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ‘শ্রমণ, আমরা আপনার পাদ পরিচর্যা করি।’ ভগবান তাতেও মনোযোগ দিলেন না, যেহেতু তিনি অনতিক্রম্য উপদিক্ষয়ে বিমুক্ত।

তারপর তারা আবার একান্তে গিয়ে সম্মিলিতভাবে এরূপ চিন্তা করল, ‘পুরুষদের অভিপ্রায় বিবিধ প্রকার। সেহেতু আমরা প্রত্যেকে একশত করে মহানারীর (বিশালকায়সম্পন্না নারী?) বেশ ধারণ করি।’ তখন মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা প্রত্যেকেই একশত করে মহানারীর বেশ ধারণপূর্বক ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ‘শ্রমণ, আমরা আপনার পাদ পরিচর্যা করি।’ ভগবান তাতেও মনোযোগ দিলেন না, যেহেতু তিনি অনতিক্রম্য উপদিক্ষয়ে বিমুক্ত। অনন্তর মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা একান্তে গিয়ে এরূপ বলল, আমাদের পিতা সত্যই বলেছেন :

‘জগতে অর্হৎ সুগতকে রাগপাশে আবদ্ধ করে নিয়ে আসা অসম্ভব, কারণ তিনি মাররাজ্য অতিক্রম করেছেন, সে-কারণেই আমি অত্যধিকরূপে অনুশোচনা করছি।’

‘যে অবীতরাগী শ্রমণ বা ব্রাহ্মণকে এই কৌশল প্রয়োগ করতাম, তার হৃদয় বিদীর্ণ হতো বা উষ্ণ রক্ত মুখ দিয়ে বের হতো অথবা উন্মাদগ্রস্ত কিংবা মতিভ্রম হতো। হরিদ্রবর্ণ ছেদিত নল যেমন শুষ্ক, বিশুষ্ক ও ম্লান হয়, তেমনিভাবে তিনিও শুষ্ক, বিশুষ্ক ও ম্লান হন।’

অতঃপর মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা ভগবানের কাছে উপস্থিত হয়ে একান্তে উপবেশন করল। একান্তে উপবিষ্টা মারকন্যা তৃষ্ণা ভগবানকে গাথায় বলল :

‘আপনি শোকাভিভূত হয়ে বনের মধ্যে ধ্যান করছেন কেন? সম্পত্তি হারিয়েছেন নাকি প্রার্থনা করছেন? আপনি গ্রামে কী পাপকর্ম করেছেন? কেন মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করেন না? নাকি কোনো জন আপনার সাথে সখ্যতা করে না?’

(তখন ভগবান বললেন)

‘আমি প্রিয়রূপা-মনোজ্ঞরূপ (ক্লেশ)-সৈন্য জয় করে অর্হত্ত্ব লাভ করেছি, একাকী ধ্যান করে অর্হত্ত্বসুখ উপলব্ধি করেছি; তাই আমি মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করি না, এবং কোনো জন আমার সাথে সখ্যতা করে না।’

অতঃপর মারকন্যা অরতি ভগবানকে গাথায় বলল :

‘কীরূপ বহুলবিহারী ভিক্ষু পঞ্চ স্রোত ও ছয় স্রোত উত্তীর্ণ হন? কীরূপ ধ্যানবহুল ভিক্ষুকে কামসংজ্ঞা স্পর্শ করতে না পেরে বিদূরিত হয়?’

(ভগবান বললেন)

‘প্রশ্রদ্ধিকায়সম্পন্ন, সুবিমুক্তচিত্ত, সংস্কারাতীত, স্মৃতিমান, গৃহত্যাগী ভিক্ষু চারি আর্যসত্যধর্ম জ্ঞাত হয়ে বিতর্কহীন চতুর্থ ধ্যান করে (দ্বেষে) কম্পিত হয় না, (আসক্তিতে) প্রবাহিত হয় না, (মোহ দ্বারা) অবসাদগ্রস্ত হয় না।

এরূপ বহুলবিহারী ভিক্ষুই পঞ্চ স্রোত ও ছয় স্রোত উত্তীর্ণ হয়? এরূপ ধ্যানবহুল ভিক্ষুকে কামসংজ্ঞা স্পর্শ করতে না পেরে বিদূরিত হয়?’

তারপর মারকন্যা রগা ভগবানের সামনে গাথায় বলল :

‘তৃষ্ণা অচ্ছিন্ন গণ-সংঘচারী বহু শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি অবশ্যই (ভব পার) উত্তীর্ণ হবে। এই গৃহত্যাগী শাস্তা বহুজনকে মৃত্যুরাজের হাত হতে ছিনিয়ে নিয়ে নির্বাণ পারে নিয়ে যাবেন।’

(ভগবান বললেন)

‘মহাবীর তথাগতগণই সদ্ধর্মের মাধ্যমে জনগণকে নির্বাণ পারে নিয়ে যান। ধর্মের দ্বারা নীয়মান বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি (তোমরা) এত ঈর্ষান্বিত কেন?’

তখন মারকন্যা তৃষ্ণা, অরতি ও রগা পাপীরাজ মারের নিকট উপস্থিত হলো। পাপীরাজ মার তাদের দূর থেকে আসতে দেখে গাথায় বলল :

‘হে মূর্খা, তোমরা কুমুদনল দিয়ে পর্বত কাটছ, নখ দিয়ে গিরি খনন করছ, দাঁত দিয়ে লোহা ভক্ষণ করছ। বৃহৎ পাথর মাথায় রেখে পাতালে আশ্রয় খুঁজছ, কাটাগাছের গোড়া দিয়ে বুকে প্রহারের ন্যায় গৌতম থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছ।’

‘তখন তৃষ্ণা, অরতি ও রগা অতিশয় সমুজ্জ্বলভাবে ফিরে এসেছিল। বাতাসে তুলা উড়ার ন্যায় শাস্তা সেখান হতে তাদের বিদূরিত করেছিলেন।’

তৃতীয় বর্গ সমাপ্ত।

স্মারক-গাথা :

বহুসংখ্যক, সমৃদ্ধি, গোধিক, সপ্তবর্ষ, মারকন্যা সূত্র,
শ্রেষ্ঠবুদ্ধ দ্বারা দেশিত মার-সংযুক্তের এই পঞ্চ সূত্র।

মার-সংযুক্ত সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [২]