লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৬]

দ্বিতীয় ইসিদত্ত সূত্র

এক সময় অনেক স্থবির ভিক্ষু মচ্ছিকাসন্ডে অবস্থান করছিলেন, আম্রবনে। অতঃপর চিত্ত গৃহপতি যেখানে স্থবির ভিক্ষুগণ ছিলেন সেখানে উপস্থিত হয়ে স্থবির ভিক্ষুগণকে অভিবাদন করে একপাশে উপবেশন করলেন। একপাশে উপবিষ্ট চিত্ত গৃহপতি স্থবির ভিক্ষুগণকে বললেন, “ভন্তে, স্থবিরগণ আগামীকালের জন্য আমার (গৃহে) ভোজনের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করুন।” স্থবির ভিক্ষুগণ নীরবে সম্মতি জানালেন। তখন চিত্ত গৃহপতি স্থবির ভিক্ষুগণের সম্মতি অবগত হয়ে আসন হতে উঠে স্থবির ভিক্ষুগণকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করে প্রস্থান করলেন। অতঃপর স্থবির ভিক্ষুগণ সেই রাত্রির অবসানে পূর্বাহ্ন সময়ে নিবস্তুন (অন্তর্বাস) পরিধান করে পাত্র-চীবর ধারণ করে যেখানে চিত্ত গৃহপতির আবাস (গৃহ) সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রজ্ঞাপ্ত আসনে উপবেশন করলেন।

তখন চিত্ত গৃহপতি যেখানে স্থবির ভিক্ষুগণ ছিলেন সেখানে উপস্থিত হয়ে স্থবির ভিক্ষুগণকে অভিবাদন করে একপাশে উপবেশন করলেন। একপাশে উপবিষ্ট চিত্ত গৃহপতি আয়ুষ্মান স্থবিরকে বললেন, “ভন্তে, স্থবির, জগতে নানাবিধ দৃষ্টি , (মিথ্যা ধারণা) উৎপন্ন হয়, যথা-লোক শাশ্বত , লোক অশাশ্বত , লোক অন্তবান , লোক অনন্তবান , যেই জীব সেই শরীর , জীব অন্য শরীর অন্য , মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব) থাকে , মৃত্যুর পর তথাগত থাকে না, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে, নাও থাকে এবং মৃত্যুর পর তথাগত থাকেও না, না থাকেও না । যা বাষট্টি প্রকার মিথ্যাদৃষ্টিরূপে ব্রহ্মজালে বর্ণিত হয়েছে। ভন্তে, এই দৃষ্টিগুলো কিসের বিদ্যমানে উৎপন্ন হয়? কিসের অবিদ্যমানে উৎপন্ন হয় না?” এরূপ উক্ত হলে আয়ুষ্মান স্থবির নীরব রইলেন।

দ্বিতীয়বারও চিত্ত গৃহপতি আয়ুষ্মান স্থবিরকে বললেন, ভন্তে স্থবির, জগতে নানাবিধ দৃষ্টি (মিথ্যা ধারণা) উৎপন্ন হয়, যথা-লোক শাশ্বত, লোক অশাশ্বত, লোক অন্তবান, লোক অনন্তবান, যেই জীব সেই শরীর, জীব অন্য শরীর অন্য, মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব) থাকে, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে না, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে, নাও থাকে, মৃত্যুর পর তথাগত থাকেও না, না থাকেও না; যা বাষট্টি প্রকার মিথ্যাদৃষ্টিরূপে ব্রহ্মজালে বর্ণিত হয়েছে। ভন্তে, এই দৃষ্টিগুলো কিসের বিদ্যমানে উৎপন্ন হয়? কিসের অবিদ্যমানে উৎপন্ন হয় না?” দ্বিতীয়বারও আয়ুষ্মান স্থবির নীরব রইলেন। তৃতীয়বারও চিত্ত গৃহপতি আয়ুষ্মান স্থবিরকে বললেন, “ভন্তে স্থবির, জগতে নানাবিধ দৃষ্টি (মিথ্যা ধারণা) উৎপন্ন হয়, যথা-লোক শাশ্বত, লোক অশাশ্বত, লোক অন্তবান, লোক অনন্তবান, যেই জীব সেই শরীর, জীব অন্য শরীর অন্য, মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব) থাকে, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে না, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে, নাও থাকে, মৃত্যুর পর তথাগত থাকেও না, না থাকেও না; যা বাষট্টি প্রকার মিথ্যাদৃষ্টিরূপে ব্রহ্মজালে বর্ণিত হয়েছে। ভন্তে, এই দৃষ্টিগুলো কিসের বিদ্যমানে উৎপন্ন হয়? কিসের অবিদ্যমানে উৎপন্ন হয় না?” তৃতীয়বারও আয়ুষ্মান স্থবির নীরব রইলেন।

সেই সময়ে সেই ভিক্ষুসংঘের মধ্যে আয়ুষ্মান ইসিদত্ত ছিলেন সর্বাপেক্ষা নবীন। তখন আয়ুষ্মান ইসিদত্ত আয়ুষ্মান স্থবিরকে বললেন, “ভন্তে, আমি কি চিত্ত গৃহপতির এই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করব?” “আবুসো ইসিদত্ত, তুমি চিত্ত গৃহপতির এই প্রশ্নের উত্তর প্রদান কর।” “হে গৃহপতি, আপনি নিশ্চয় এরূপেই জিজ্ঞেস করেছেন-ভন্তে স্থবির, জগতে নানাবিধ দৃষ্টি (মিথ্যা ধারণা) উৎপন্ন হয়, যথা-লোক শাশ্বত, লোক অশাশ্বত, লোক অন্তবান, লোক অনন্তবান, যেই জীব সেই শরীর, জীব অন্য শরীর অন্য, মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব) থাকে, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে না, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে, নাও থাকে, মৃত্যুর পর তথাগত থাকেও না, না থাকেও না; যা বাষট্টি প্রকার মিথ্যাদৃষ্টিরূপে ব্রহ্মজালে বর্ণিত হয়েছে। ভন্তে, এই দৃষ্টিগুলো কিসের বিদ্যমানে উৎপন্ন হয়? কিসের অবিদ্যমানে উৎপন্ন হয় না?” “হ্যাঁ, ভন্তে”।

“হে গৃহপতি, জগতে নানাবিধ দৃষ্টি (মিথ্যা ধারণা) উৎপন্ন হয়, যথা-লোক শাশ্বত, লোক অশাশ্বত, লোক অন্তবান, লোক অনন্তবান, যেই জীব সেই শরীর, জীব অন্য শরীর অন্য, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে না, মৃত্যুর পর তথাগত থাকে, নাও থাকে; মৃত্যুর পর তথাগত থাকেও না, না থাকেও না; যা বাষট্টি প্রকার মিথ্যাদৃষ্টিরূপে ব্রহ্মজালে বর্ণিত হয়েছে। হে গৃহপতি, সৎকায় দৃষ্টির বিদ্যমানে এই দৃষ্টিগুলো উৎপন্ন হয়। সৎকায় দৃষ্টির অবিদ্যমানে এই দৃষ্টিগুলো উৎপন্ন হয় না।”

“ভন্তে, কিরূপে লোক সৎকায় দৃষ্টির বশবর্তী হয়?” “হে গৃহপতি, অশ্রুতবান পৃথগ্‌জন, যে আর্যগণের দর্শন লাভ করেনি, আর্যধর্মে অকোবিদ , আর্যধর্মে অবিনীত, যে সৎপুরুষগণের দর্শন লাভ করেনি, সৎপুরুষধর্মে অকোবিদ, সৎপুরুষধর্মে অবিনীত, রূপকে আত্মদৃষ্টিতে দেখে, আত্মাকে রূপবান দেখে, আত্মায় রূপ দেখে কিংবা রূপে আত্মদর্শন করে। বেদনাকে আত্মদৃষ্টিতে দেখে, আত্মাকে বেদনাবান দেখে, আত্মায় বেদনা দেখে কিংবা বেদনায় আত্মদর্শন করে। সংজ্ঞাকে আত্মদৃষ্টিতে দেখে, আত্মাকে সংজ্ঞাবান দেখে, আত্মায় সংজ্ঞা দেখে কিংবা সংজ্ঞায় আত্মদর্শন করে। সংস্কারকে আত্মদৃষ্টিতে দেখে, আত্মাকে সংস্কারবান দেখে, আত্মায় সংস্কার দেখে কিংবা সংস্কারে আত্মদর্শন করে। বিজ্ঞানকে আত্মদৃষ্টিতে দেখে, আত্মাকে বিজ্ঞানবান দেখে, আত্মায় বিজ্ঞান দেখে কিংবা বিজ্ঞানে আত্মদর্শন করে। হে গৃহপতি, এইরূপেই লোক সৎকায়দৃষ্টির বশবর্তী হয়।”

“ভন্তে, কিরূপে লোক সৎকায়দৃষ্টির বশবর্তী হয় না?” “হে গৃহপতি, শ্রুতবান আর্যশ্রাবক, যিনি আর্যগণের দর্শন লাভ করেন, আর্যধর্মে কোবিদ, আর্যধর্মে সুবিনীত, যিনি সৎপুরুষগণের দর্শন লাভ করেন, সৎপুরুষ ধর্মে কোবিদ, সৎপুরুষধর্মে সুবিনীত, রূপে আত্মাকে দেখেন না, আত্মাকে রূপবান দেখেন না, আত্মায় রূপ দেখেন না কিংবা রূপে আত্মদর্শন করেন না। বেদনায় আত্মাকে দেখেন না, আত্মাকে বেদনাবান দেখেন না, আত্মায় বেদনা দেখেন না কিংবা বেদনায় আত্মদর্শন করেন না। সংজ্ঞায় আত্মাকে দেখেন না, আত্মাকে সংজ্ঞাবান দেখেন না, আত্মায় সংজ্ঞা দেখেন না কিংবা সংজ্ঞায় আত্মদর্শন করেন না। সংস্কারে আত্মাকে দেখেন না, আত্মাকে সংস্কারবান দেখেন না, আত্মায় সংস্কার দেখেন না কিংবা সংস্কারে আত্মদর্শন করেন না। বিজ্ঞানে আত্মাকে দেখেন না, আত্মাকে বিজ্ঞানবান দেখেন না, আত্মায় বিজ্ঞান দেখেন না, কিংবা বিজ্ঞানে আত্মদর্শন করেন না। হে গৃহপতি, এরূপেই লোক সৎকায় দৃষ্টির বশবর্তী হয় না।”

“ভন্তে, আর্য ইসিদত্ত কোথা হতে এসেছেন?” “গৃহপতি, আমি অবন্তী হতে এসেছি।” “ভন্তে, অবন্তীতে আমাদের অদৃষ্ট সহচর (বন্ধু) ইসিদত্ত নামক প্রব্রজিত কুলপুত্র আছেন কি?” আপনি তাঁকে দেখেছেন কি?” “হ্যাঁ, গৃহপতি”। “ভন্তে, সেই আয়ুষ্মান বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন? এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আয়ুষ্মান ইসিদত্ত নীরব রইলেন। “ভন্তে, আর্যই কি আমাদের ইসিদত্ত?” “হ্যাঁ, গৃহপতি”। “ভন্তে, আর্য ইসিদত্ত মচ্ছিকাসন্ডে রমণীয় আম্রবনে অভিরমিত হোন, আমি আর্য ইসিদত্তের চীবর, পিণ্ডপাত, শয়নাসন, গিলান-প্রত্যয়, ভৈষজ্য পরিস্কার (উপকরণ) ব্যবস্থার উদ্যোগ করব।”

“গৃহপতি, কল্যাণ বলেছেন।”

তখন চিত্ত গৃহপতি আয়ুষ্মান ইসিদত্তের ভাষিত বিষয় অভিনন্দন ও অনুমোদন করে স্থবির ভিক্ষুগণকে উত্তম (উৎকৃষ্ট) খাদ্য-ভোজ্য দ্বারা সহস্তে পরিতৃপ্ত করলেন, সন্তুষ্ট করলেন। তখন স্থবির ভিক্ষুগণ ভোজনের পর পাত্র হতে হস্ত উত্তোলন করে আসন হতে উঠে প্রস্থান করলেন। অতঃপর আয়ুষ্মান স্থবির আয়ুষ্মান ইসিদত্তকে বললেন, “সাধু, আবুসো ইসিদত্ত, তুমি এই প্রশ্নের প্রত্যুত্তর দিয়েছ। এই প্রশ্নের প্রত্যুত্তর আমার মনে উদিত হয়নি। আবুসো ইসিদত্ত, যখনই অন্যত্র এই প্রশ্ন উদিত হবে তখনই তুমি এভাবে প্রত্যুত্তর দিও।” তখন আয়ুষ্মান ইসিদত্ত শয়নাসন সামলিয়ে (গুছিয়ে) রেখে পাত্র-চীবর গ্রহণ করে মচ্ছিকাসন্ড হতে প্রস্থান করলেন। মচ্ছিকাসন্ড হতে এভাবে প্রস্থান করলেন যে, পুনঃ সেখানে ফিরে আসলেন না।

তৃতীয় সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [১]