একসময় ভগবান সাকেতের অঞ্জনবনের মৃগদায়ে অবস্থান করছিলেন। অতঃপর কুণ্ডলীয় পরিব্রাজক ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে ভগবানের সাথে সম্বোধন করলেন। সম্বোধনীয় কথা ও কুশল-বিনিময় করে একান্তে উপবেশন করলেন। একান্তে উপবিষ্ট কুণ্ডলীয় পরিব্রাজক ভগবানকে এরূপ বললেন :
“মাননীয় গৌতম, আমি আরাম (বাগান) আশ্রয়ী ও পরিষদসহ বিচরণকারী। মধ্যাহ্ন ভোজন ও প্রাতরাশের পর আমার এরূপ অভ্যাস আছে যে, আমি আরাম থেকে আরামে এবং উদ্যান থেকে উদ্যানে অনুচঙ্ক্রমণ ও বিচরণ করি। (সেরূপে বিচরণকালে) তথায় আমি দেখতে পাই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ একে অপরে মিথ্যাগল্পরূপ আনিশংস (সুফল) ও পরনিন্দারূপ আনিশংসবিষয়ক বাক্যালাপে রত আছেন। ‘প্রভু গৌতম, আপনি কোন আনিশংসে বা সুফল প্রাপ্ত হয়ে অবস্থান করেন?’ “হে কুণ্ডলীয়, তথাগত বিদ্যা-বিমুক্তিফলরূপ আনিশংস প্রাপ্ত হয়ে অবস্থান করেন।”
“মাননীয় গৌতম, কয়টি ধর্ম ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে বিদ্যা-বিমুক্তিফল পরিপূর্ণ হয়?” “কুণ্ডলীয়, সপ্ত বোজ্ঝাঙ্গ ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে বিদ্যা-বিমুক্তিফল পরিপূর্ণ হয়।” “কয়টি ধর্ম ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে সপ্ত বোজ্ঝাঙ্গ পরিপূর্ণ হয়?” “চারি স্মৃতিপ্রস্থান ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে সপ্ত বোজ্ঝাঙ্গ পরিপূর্ণ হয়।” “মাননীয় গৌতম, কয়টি ধর্ম ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে চারি স্মৃতিপ্রস্থান পরিপূর্ণ হয়?” “কুণ্ডলীয়, ত্রিবিধ সুচরিত ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে চারি স্মৃতিপ্রস্থান পরিপূর্ণ হয়।” “কয়টি ধর্ম ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে ত্রিবিধ সুচরিত পরিপূর্ণ হয়?” “ইন্দ্রিয়-সংবরণ (ইন্দ্রিয় দমন) ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে ত্রিবিধ সুচরিত পরিপূর্ণ হয়।”
“হে কুণ্ডলীয়, ইন্দ্রিয়-সংবরণ ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে কীরূপে ত্রিবিধ সুচরিত পরিপূর্ণ হয়? এক্ষেত্রে ভিক্ষু চক্ষু দ্বারা মনোজ্ঞ রূপ দর্শন করে আনন্দানুভব করে না, তাতে হৃষ্ট হয় না ও অনুরাগ (আসক্তি) উৎপন্ন করে না। তার কায় স্থিত হয়, চিত্ত স্থিত হয় এবং আধ্যাত্মিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুবিমুক্ত হয়। চক্ষু দ্বারা অমনোজ্ঞ রূপ দর্শন করেও বিরক্তি অনুভব করে না, তাতে চিত্ত অপ্রতিষ্ঠিত হয়, বিষণ্নমনা হয় না ও ব্যাপাদ উৎপন্ন করে না। তার কায় স্থিত হয়, চিত্ত স্থিত হয় এবং আধ্যাত্মিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুবিমুক্ত হয়।
পুনশ্চ, কুণ্ডলীয়, ভিক্ষু শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করে, ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ গ্রহণ করে, জিহ্বা দ্বারা রসাস্বাদন করে, কায় দ্বারা স্পর্শযোগ্য বস্তু বা বিষয় স্পর্শ করে এবং মন দ্বারা ধর্মানুভূত (বিষয়ানুভূত) করে আনন্দানুভব করে না, তাতে হৃষ্ট হয় না ও অনুরাগ (আসক্তি) উৎপন্ন করে না। তার কায় স্থিত হয়, চিত্ত স্থিত হয় এবং আধ্যাত্মিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুবিমুক্ত হয়। মন দ্বারা ধর্মানুভব করেও বিরক্তি অনুভব করে না, তাতে চিত্ত অপ্রতিষ্ঠিত হয়, বিষণ্নমনা হয় না ও ব্যাপাদ উৎপন্ন করে না। তার কায় স্থিত হয়, চিত্ত স্থিত হয় এবং আধ্যাত্মিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুবিমুক্ত হয়।
কুণ্ডলীয়, যেহেতু ভিক্ষুর চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করে মনোজ্ঞ ও অমনোজ্ঞ রূপের মধ্যে কায় স্থিত হয়, চিত্ত স্থিত হয় এবং আধ্যাত্মিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুবিমুক্ত হয়। অনুরূপভাবে শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করে, ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ গ্রহণ করে, জিহ্বা দ্বারা রসাস্বাদন করে, কায় দ্বারা স্পর্শযোগ্য বস্তু বা বিষয় স্পর্শ করে এবং মন দ্বারা ধর্মানুভূত (বিষয়ানুভূত) করে মনোজ্ঞ ও অমনোজ্ঞ ধর্মের (বিষয়ের) মধ্যে কায় স্থিত হয়, চিত্ত স্থিত হয় এবং আধ্যাত্মিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুবিমুক্ত হয়। এরূপেই ইন্দ্রিয়-সংবরণ ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে কীরূপে ত্রিবিধ সুচরিত পরিপূর্ণ হয়।
কুণ্ডলীয়, কীরূপে ত্রিবিধ সুচরিত ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে চারি স্মৃতিপ্রস্থান পরিপূর্ণ হয়? এক্ষেত্রে ভিক্ষু কায়-দুশ্চরিত ত্যাগ করে কায়-সুচরিত ভাবিত করে, বাচনিক-দুশ্চরিত ত্যাগ করে বাচনিক-সুচরিত ভাবিত করে এবং মানসিক-দুশ্চরিত ত্যাগ করে মানসিক-সুচরিত ভাবিত করে। এরূপেই ত্রিবিধ সুচরিত ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে চারি স্মৃতিপ্রস্থান পরিপূর্ণ হয়।
কুণ্ডলীয়, কীরূপে চারি স্মৃতিপ্রস্থান ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে সপ্ত বোজ্ঝাঙ্গ পরিপূর্ণ হয়? এক্ষেত্রে ভিক্ষু বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞানী ও স্মৃতিমান হয়ে এবং জগতে অভিধ্যা ও দৌর্মনস্য অপনোদন করে কায়ে কায়ানুদর্শী হয়ে অবস্থান করে। অনুরূপভাবে ভিক্ষু বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞানী ও স্মৃতিমান হয়ে এবং জগতে অভিধ্যা ও দৌর্মনস্য অপনোদন করে বেদনায় বেদনানুদর্শী, চিত্তে চিত্তানুদর্শী ও ধর্মে (মনোগোচর বিষয়ে) ধর্মানুদর্শী হয়ে অবস্থান করে। এরূপেই চারি স্মৃতিপ্রস্থান ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে সপ্ত বোজ্ঝাঙ্গ পরিপূর্ণ হয়।
কুণ্ডলীয়, কীরূপে সপ্ত বোজ্ঝাঙ্গ ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে বিদ্যা-বিমুক্তি পরিপূর্ণ হয়? এক্ষেত্রে ভিক্ষু বিবেক-নিশ্রিত, বিরাগ-নিশ্রিত, নিরোধ-নিশ্রিত ও বিসর্জন-পরিণামী স্মৃতি-সম্বোজ্ঝাঙ্গ ভাবিত করে। অনুরূপভাবে ভিক্ষু বিবেক-নিশ্রিত, বিরাগ-নিশ্রিত, নিরোধ-নিশ্রিত ও বিসর্জন-পরিণামী ধর্মবিচয়-সম্বোজ্ঝাঙ্গ, বীর্য-সম্বোজ্ঝাঙ্গ, প্রীতি-সম্বোজ্ঝাঙ্গ, প্রশ্রদ্ধি (প্রশান্তি)-সম্বোজ্ঝাঙ্গ, সমাধি-সম্বোজ্ঝাঙ্গ এবং উপেক্ষা-সম্বোজ্ঝাঙ্গ ভাবিত করে। এরূপেই সপ্ত বোজ্ঝাঙ্গ ভাবিত ও বহুলীকৃত হলে বিদ্যা-বিমুক্তি পরিপূর্ণ হয়।”
এরূপ উক্ত হলে কুণ্ডলীয় পরিব্রাজক ভগবানকে এরূপ বললেন, “মাননীয় গৌতম, অতি সুন্দর! অতি মনোরম!! মাননীয় গৌতম, যেমন, কেউ অধোমুখী পাত্রকে ঊর্ধ্বমুখী করে, আবৃতকে অনাবৃত করে, পথভ্রষ্টকে পথ বলে দেয় এবং অন্ধকারে তৈলপ্রদীপ ধারণ করে যাতে চক্ষুষ্মান ব্যক্তি রূপাদি দেখতে পায়; ঠিক সেরূপেই মাননীয় গৌতমের দ্বারা অনেক পর্যায়ে ধর্ম প্রকাশিত হলো। এখন হতে আমি মাননীয় গৌতমের শরণ গ্রহণ করছি, ধর্ম এবং ভিক্ষুসংঘের শরণও গ্রহণ করছি। হে প্রভু গৌতম, আজ হতে আমাকে আপনাদের আমরণ শরণাগত উপাসকরূপে ধারণ করুন।” ষষ্ঠ সূত্র।
ব্যাখ্যা [১]
English