লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৮]

গ্লান (রোগী) সূত্র

আমি এরূপ শুনেছি। একসময় ভগবান বৈশালীতে বেলুব গ্রামে অবস্থান করছিলেন। তথায় ভগবান ভিক্ষুগণকে আহ্বান করে বললেন, “হে ভিক্ষুগণ, তোমরা বৈশালীর চতুর্দিকে যথানুরূপ মিত্র, সখা ও বন্ধুরা মিলে বর্ষা উদ্‌যাপন কর। আমি এই বেলুব গ্রামেই বর্ষা উদ্‌যাপন করব।” “তথাস্তু' ভন্তে,” বলে সেই ভিক্ষুগণ ভগবানের সম্মতি লাভ করে বৈশালীর চতুর্দিকে যথানুরূপ মিত্র, সখা ও বন্ধুরা মিলে বর্ষা উদ্‌যাপন করলেন। ভগবানও সেই বেলুব গ্রামেই বর্ষা উদ্‌যাপন করলেন।

অনন্তর বর্ষা উদ্‌যাপনের পর ভগবানের কঠিন, তীব্র দুঃখ-বেদনাবর্ধক ও মরণ-ব্যাধি উৎপন্ন হলো। তখন ভগবান রোগের তীব্র যন্ত্রণা স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞাত হয়ে সহ্য করতে লাগলেন। অতঃপর ভগবানের মনে এরূপ চিন্তা উদয় হলো যে-“আমি আমার পরিচারকের সাথে বিনা মন্ত্রণায় এবং ভিক্ষু সংঘকে না জানিয়ে পরিনির্বাণ লাভ করব’ তা আমার পক্ষে যথাযথ ও উচিত হবে না। সুতরাং আমার এই ব্যাধি বীর্য পরাক্রমের দ্বারা বিতাড়িত করে আয়ু-সংস্কার অধিষ্ঠান করে অবস্থান করা উচিত।” অনন্তর ভগবান সেই ব্যাধি বীর্য পরাক্রমের বলে বিতাড়িত করে আয়ু-সংস্কার অধিষ্ঠান করলেন। (তখন ভগবানের ব্যাধি উপশম হলো)।

অতঃপর ভগবান আরোগ্য লাভ করে, রোগমুক্তির অনতিবিলম্বে চিকিৎসালয় হতে বের হয়ে বিহারের পেছনে ছায়াময় স্থানেপ্রজ্ঞাপ্ত আসনে উপবেশন করলেন। অনন্তর আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানের নিকট উপস্থিত হলেন। উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একান্তে উপবেশন করলেন। একান্তে উপবিষ্ট আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানকে এরূপ বললেন, ভন্তে, আমি ভগবানের সুখ-অবস্থান, রোগ নিরাময় ও সুস্থতা লক্ষ করেছি। তবুও ভন্তে, ভগবানের অসুস্থতা দেখেও আমার নিজের শরীর মাতালের ন্যায় উন্মত্ত, দিক-বিদিকও আমার নিকট পরিষ্কার নয় এমনকি ধর্মসমূহও আমার নিকট প্রতিভাত হয়নি। অধিকন্তু ভন্তে, শ্বাস গ্রহণের সময়ে পর্যন্ত আমার এরূপ মনে হয়েছিল যে, ‘ভগবান ভিক্ষুসংঘকে উপলক্ষ করে যতদিন পর্যন্ত কিছু না বলবেন, ততদিন পর্যন্ত ভগবান পরিনির্বাণ লাভ করবেন না।”

“হে আনন্দ, ভিক্ষুসংঘ আমার কাছে আর কী প্রত্যাশা করে? মৎ কর্তৃক অনন্তর-অবাহির ভাবেই ধর্ম দেশিত হয়েছে। তথাগতের ধর্মে কোনো আচার্যমুষ্টি নেই। আনন্দ, যার এরূপ চিন্তার উদয় হয়-‘আমি ভিক্ষু সংঘকে পরিচালনা করব’ কিংবা ‘ভিক্ষুসংঘ মমোদ্দেশিক হোক বা আমার নির্দেশ মেনে চলুক’; সে-ই ভিক্ষুসংঘকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে চাইলে বলুক। তথাগতের মনে এরূপ চিন্তার উদয় হয় না-‘আমি ভিক্ষুসংঘকে পরিচালনা করব’ কিংবা ‘ভিক্ষুসংঘ মমোদ্দেশিক হোক বা আমার নির্দেশ মেনে চলুক’। তাহলে আনন্দ, তথাগত ভিক্ষুসংঘকে উদ্দেশ করে কিছুমাত্র কিবা বলবেন! বর্তমানে আমি জীর্ণ, বৃদ্ধ, মহল্লক (পরিপক্ব), বয়স অর্ধগত এবং জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। আমার আশি বছর বয়স চলছে। জীর্ণ শকট যেমন অতিরিক্ত যত্নের মাধ্যমে ঠিকে থাকে মাত্র, ঠিক তদ্রুপ, আনন্দ, তথাগতের শরীরও অর্হত্ত্বফলের গুণে (সহায়তায়) ঠিকে আছে মাত্র।”

“আনন্দ, যেই সময়ে তথাগত সকল নিমিত্তে মনোযোগ না দিয়ে কোনো কোনো বেদনাসমূহের নিরোধে অনিমিত্ত চিত্ত-সমাধি লাভ করে অবস্থান করেন; সেই সময়ে তথাগতের কায়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয়। আনন্দ, তদ্ধেতু তোমরা আত্মদ্বীপ, আত্মশরণ, অনন্যশরণ এবং ধর্মদ্বীপ, ধর্মশরণ ও অনন্যশরণ হয়ে অবস্থান কর।”

হে আনন্দ, কীরূপে ভিক্ষু আত্মদ্বীপ, আত্মশরণ, অনন্যশরণ এবং ধর্মদ্বীপ, ধর্মশরণ ও অনন্যশরণ হয়ে অবস্থান করে? এক্ষেত্রে ভিক্ষু বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞানী ও স্মৃতিমান হয়ে এবং জগতে অভিধ্যা ও দৌর্মনস্য অপনোদন করে কায়ে কায়ানুদর্শী হয়ে অবস্থান করে। অনুরূপভাবে ভিক্ষু বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞানী ও স্মৃতিমান হয়ে এবং জগতে অভিধ্যা ও দৌর্মনস্য অপনোদন করে বেদনায় বেদনানুদর্শী, চিত্তে চিত্তানুদর্শী ও ধর্মে (মনোগোচর বিষয়ে) ধর্মানুদর্শী হয়ে অবস্থান করে। এরূপেই ভিক্ষু আত্মদ্বীপ, আত্মশরণ, অনন্যশরণ এবং ধর্মদ্বীপ, ধর্মশরণ ও অনন্যশরণ হয়ে অবস্থান করে। আনন্দ, আমার বর্তমানে কিংবা পরিনির্বাণের পর যেই ভিক্ষুগণ এভাবে আত্মদ্বীপ, আত্মশরণ, অনন্যশরণ এবং ধর্মদ্বীপ, ধর্মশরণ ও অনন্যশরণ হয়ে অবস্থান করবে, তারা আমার শাসনে শিক্ষাকামী ভিক্ষুগণের মধ্যে অগ্রতম হবে।” নবম সূত্র।

ব্যাখ্যা [১]