শ্রাবস্তী নিদান। একপাশে উপবিষ্ট গৃহপতি অনাথপিণ্ডিককে ভগবান এরূপ বললেন :
“গৃহপতি, যখন হতে আর্যশ্রাবকের পাঁচ প্রকার ভয়-বৈর উপশান্ত হয়, চারি স্রোতাপত্তি অঙ্গে সে বিভূষিত হয়, আর্যধারা প্রজ্ঞার দ্বারা সুদৃষ্ট ও সুপ্রতিবিদ্ধ হয়; তখন হতে সে যদি আকাঙ্ক্ষা করে তবে নিজকে নিজেই এরূপে প্রকাশ করতে পারে; যথা :‘আমার নরক, তির্যক, প্রেত ও অপায়-দুর্গতি-বিনিপাত গমন ক্ষীণ হয়েছে। আমি স্রোতাপন্ন, অবিনিপাতধর্মী ও নিয়ত সম্বোধিপরায়ণ।’
তার সেই পাঁচ প্রকার ভয়-বৈর কী কী যা তার উপশান্ত হয়? গৃহপতি, প্রাণী হত্যাকারী প্রাণিহত্যার দরুন ইহজীবনেই ভয়-বৈর বৃদ্ধি করে, মৃত্যুর পরও ভয়-বৈর বৃদ্ধি করে এবং মানসিকভাবেও দুঃখ-দৌর্মনস্য পায়। এরূপ প্রাণিহত্যা হতে বিরত ব্যক্তির সেই ভয়-বৈরতা (শত্রুতা) উপশান্ত হয়। গৃহপতি, অদত্তবস্তু গ্রহণকারী চুরির দরুন, মিথ্যাকামাচারী সেই মিথ্যাকামাচারের দরুন, মিথ্যাবাদী তার মিথ্যা কথনের দরুন এবং সুরা-মৈরেয় পানে প্রমত্ত জন সুরা-মদ পানের দরুন ইহজীবনেই ভয়-বৈর বৃদ্ধি করে, মৃত্যুর পরও ভয়-বৈর বৃদ্ধি করে এবং মানসিকভাবেও দুঃখ-দৌর্মনস্য পায়। এরূপ অদত্তবস্তু গ্রহণ, মিথ্যাকামাচার, মিথ্যা কথন এবং প্রমত্ততাদায়ক মদ্য পান হতে বিরত ব্যক্তির সেই ভয়-বৈর উপশান্ত হয়। এই পাঁচ প্রকার ভয়-বৈর আছে যা তার উপশান্ত হয়।
কোন চারি স্রোতাপত্তি অঙ্গে সে বিভূষিত হয়? এক্ষেত্রে গৃহপতি, আর্যশ্রাবক বুদ্ধের প্রতি এরূপে অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হয়; যথা : ‘ইনি সেই ভগবান, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যা-আচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অনুত্তর পুরুষ দমনকারী সারথি, দেব-মনুষ্যের শাস্তা ও বুদ্ধ ভগবান।’ সেই আর্যশ্রাবক ধর্মের প্রতিও এরূপে অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হয়; যথা : ‘ভগবানের ধর্ম সুব্যাখ্যাত, সন্দৃষ্টিক, কালাকাল বিরহিত, এসে দেখার যোগ্য, নির্বাণে উপনয়নকারী এবং বিজ্ঞজন কর্তৃক জ্ঞাতব্য।’ সেই আর্যশ্রাবকসংঘের প্রতিও এরূপে অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হয়; যথা : ‘ভগবানের শিষ্যমণ্ডলী সুপথে প্রতিপন্ন, ঋজুপথে প্রতিপন্ন, ন্যায় বা নির্বাণপথে প্রতিপন্ন, সমীচীন পথে প্রতিপন্ন, ভগবানের শ্রাবকসংঘ যুগ্ম হিসাবে চারি যুগ্ম এবং পুদ্গল হিসাবে অষ্ট আর্যপুদ্গলই চারি প্রত্যয় দান-আহুতি লাভের যোগ্য, আতিথেয়তা লাভের যোগ্য, দক্ষিণেয়্য, অঞ্জলি করণীয় এবং জগতের অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র’। এবং গৃহপতি, আর্যশ্রাবক আর্যগণের প্রশংসিত অখণ্ড, নিশ্চিদ্র, নিখুঁত, নিষ্কলঙ্ক, বিমুক্তিতে উপনীতকারী, বিজ্ঞ কর্তৃক প্রশংসিত, অদূষিত এবং সমাধি লাভে সহায়ক শীলসমূহে বিভূষিত হয়।
কীরূপে আর্যধারা তার প্রজ্ঞার দ্বারা সুদৃষ্ট ও সুপ্রতিবিদ্ধ হয়?এক্ষেত্রে গৃহপতি, আর্যশ্রাবক প্রতীত্যসমুৎপাদে উত্তমরূপে সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করে; যথা : ইহা থাকাতে এরূপ হয়েছে, এর উৎপত্তিতে ইহাও উৎপন্ন হয়েছে; ইহা না থাকলে এটা হয় না বা হতে পারে না, ইহার ধ্বংসে এটাও নিরুদ্ধ বা ধ্বংস হয়। যেমন : ‘অবিদ্যার কারণে সংস্কার, সংস্কারের কারণে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কারণে নাম-রূপ, নাম-রূপের কারণে ষড়ায়তন, ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শ, স্পর্শের কারণে বেদনা, বেদনার কারণে তৃষ্ণা, তৃষ্ণার কারণে উপাদান, উপাদানের কারণে ভব, ভবের কারণে জাতি (পুনর্জন্ম)-এর উৎপত্তি হয়, এই জাতি হতে জরা-মরণ-শোক-পরিদেবন-দুঃখ-দৌর্মনস্য-নৈরাশ্য প্রভৃতির উৎপত্তি হয়। এরূপে শুধুমাত্র দুঃখস্কন্ধেরই সমুদয় বা উৎপত্তি হয়। অবিদ্যার অশেষ বিরাগ ও নিরোধে সংস্কারের নিরোধ হয়, সংস্কার নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ হয়, বিজ্ঞানের নিরোধে নাম-রূপ নাম-রূপ নিরোধের কারণে ষড়ায়তনের নিরোধ হয়, ষড়ায়তন নিরোধের কারণে স্পর্শ নিরোধ হয়, স্পর্শ নিরোধের কারণে বেদনা নিরোধ হয়, বেদনা নিরোধের কারণে তৃষ্ণা নিরোধ হয়, তৃষ্ণা নিরোধের কারণে উপাদান নিরোধ হয়, উপাদানের নিরোধে ভব নিরোধ হয় এবং ভব নিরোধের কারণে জন্ম-জরা-মরণ-শোক-পরিদেবন-দুঃখ-দৌর্মনস্য-নৈরাশ্য প্রভৃতির নিরোধ হয়। এরূপে শুধুমাত্র দুঃখস্কন্ধেরই নিরোধ হয়। এই আর্যধারা (অরিযঞাযো) তার প্রজ্ঞার দ্বারা সুদৃষ্ট ও সুপ্রতিবিদ্ধ হয়। গৃহপতি, যখন হতে আর্যশ্রাবকের এই পাঁচ প্রকার ভয়-বৈর উপশান্ত হয়, এই চারি স্রোতাপত্তি অঙ্গে সে বিভূষিত হয় এবং এই আর্যধারা তার প্রজ্ঞার দ্বারা সুদৃষ্ট ও সুপ্রতিবিদ্ধ হয়; তখন হতে সে যদি আকাঙ্ক্ষা করে তবে নিজকে নিজেই এরূপে প্রকাশ করতে পারে; যথা : ‘আমার নরক, তির্যক, প্রেত ও অপায়-দুর্গতি-বিনিপাত গমন ক্ষীণ হয়েছে। আমি স্রোতাপন্ন, অবিনিপাতধর্মী ও নিয়ত সম্বোধিপরায়ণ।’” অষ্টম সূত্র।
ব্যাখ্যা [১]
English