একসময় ভগবান রাজগৃহে কলন্দক-নিবাপে বেলুবনে অবস্থান করছিলেন। সেই সময়ে দীর্ঘাবু উপাসক অসুস্থ, দুঃখিত এবং ভীষণ রোগে পীড়িত ছিলেন। অতঃপর দীর্ঘাবু উপাসক তার পিতা গৃহপতি জ্যোতিককে ডেকে বললেন, “হে পিত, আপনি যেথায় ভগবান আছেন তথায় উপস্থিত হয়ে আমার কথা বলে ভগবানের পায়ে নতশিরে বন্দনা করে বলেন, ‘ভন্তে, দীর্ঘাবু উপাসক অসুস্থ, দুঃখিত এবং ভীষণ রোগের যন্ত্রণায় পীড়িত হয়েছে। সে ভগবানের পায়ে নতশিরে বন্দনা করছে।’ এরূপ বলার পর ভগবানকে বলবেন, ‘ভন্তে, তা উত্তম হয়, যদি ভগবান অনুকম্পাপূর্বক দীর্ঘাবু উপাসকের নিবাসে গমন করেন।’” “তাই হোক তাত!” বলে গৃহপতি জ্যোতিক দীর্ঘাবু উপাসককে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে বসলেন। একপাশে উপবিষ্ট গৃহপতি জ্যোতিক ভগবানকে এরূপ বললেন, “ভন্তে, দীর্ঘাবু উপাসক অসুস্থ, দুঃখিত এবং ভীষণ রোগের যন্ত্রণায় পীড়িত হয়েছে। সে ভগবানের পায়ে নতশিরে বন্দনা করছে। তিনি আরও এরূপ বললেন, ‘ভন্তে, তা উত্তম হয়, যদি ভগবান অনুকম্পাপূর্বক দীর্ঘাবু উপাসকের নিবাসে গমন করেন।’” তখন ভগবান মৌনভাবে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন।
অতঃপর ভগবান পরিধেয় বস্ত্র পরিধান করে ও পাত্র-চীবর সাথে নিয়ে দীর্ঘাবু উপাসকের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রজ্ঞাপ্ত আসনে উপবেশন করলেন। উপবেশনের পর ভগবান দীর্ঘাবু উপাসককে এরূপ বললেন :
“হে দীর্ঘাবু, তোমার রোগ উপশম হচ্ছে কি? আগের চেয়ে সুস্থ লাগছে কি? তোমার দুঃখবেদনা বৃদ্ধি না পেয়ে হ্রাস পাচ্ছে কি? তোমার ব্যাধি বৃদ্ধি না পেয়ে হ্রাস হওয়ার কোনো লক্ষণ কি দেখা যাচ্ছে?”
“ভন্তে, আমার রোগ আরোগ্য হচ্ছে না, আগের চেয়েও সুস্থ অনুভব করছি না, আমার রোগের যাতনা না কমে বাড়ছে আর হ্রাস পাওয়ার কোনো লক্ষণও নেই, বরঞ্চ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
“দীর্ঘাবু, তাহলে তোমার এরূপ শিক্ষা করা উচিত-‘আমি বুদ্ধের প্রতি এরূপে অবিচলিত শ্রদ্ধায় সমন্বিত হব-‘ইনি সেই ভগবান অর্হৎ, সম্যকসস্বুদ্ধ, বিদ্যা ও সুআচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ (লোকজ্ঞ), অনুত্তর পুরুষ দমনকারী সারথি এবং দেব-মানবের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবান।’ আমি ধর্মের প্রতিও অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হব-‘ভগবানের ধর্ম সুন্দররূপে ব্যাখ্যাত, স্বয়ং দর্শনযোগ্য, কালাকাল বিরহিত, এসে দেখার যোগ্য, নির্বাণপ্রাপক এবং বিজ্ঞজন কর্তৃক জ্ঞাতব্য।’ এবং সংঘের প্রতিও অগাধ শ্রদ্ধাগুণে সমৃদ্ধ হয়-‘ভগবানের শ্রাবকসংঘ সুপথে প্রতিপন্ন, ঋজুপথে প্রতিপন্ন, ন্যায়-পথে প্রতিপন্ন, সমীচীন-পথে প্রতিপন্ন, ভগবানের শ্রাবকসংঘ যুগ্ম হিসেবে চারি যুগ্ম এবং পুদ্গল হিসেবে অষ্ট আর্যপুদ্গলই চারি প্রত্যয় দান-আহুতি লাভের যোগ্য, আতিথেয়তা লাভের যোগ্য, দক্ষিণেয়্য (দক্ষিণার যোগ্য), অঞ্জলি (বন্দনা) করণীয় এবং জগতের অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র।’ আমি অখণ্ড, নিশ্চিদ্র, নিখুঁত, নিষ্কলঙ্ক, বিমুক্তিতে উপনীতকারী, বিজ্ঞজন কর্তৃক প্রশংসিত (অদূষিত) এবং সমাধি লাভের সহায়ক শীলে সমন্নাগত হব। দীর্ঘাবু, তোমার এরূপই শিক্ষা করা উচিত।”
“ভন্তে, ভগবান কর্তৃক যেই চারি স্রোতাপত্তি অঙ্গ দেশিত হয়েছে, সেই ধর্মসমূহ আমার নিকট বিদ্যমান এবং আমি সেই ধর্মসমূহ প্রত্যক্ষ (দর্শন) করি। ভন্তে, আমি বুদ্ধের প্রতি এরূপ অবিচল শ্রদ্ধাসম্পন্ন; যথা : ‘সেই ভগবান অর্হৎ, সম্যকসস্বুদ্ধ, বিদ্যা ও সুআচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ (লোকজ্ঞ), অনুত্তর পুরুষ দমনকারী সারথি এবং দেব-মানবের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবান।’ আমি ধর্মের প্রতিও এরূপ অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন-‘ভগবানের ধর্ম সুন্দররূপে ব্যাখ্যাত, স্বয়ং দর্শনযোগ্য, কালাকাল বিরহিত, এসে দেখার যোগ্য, নির্বাণপ্রাপক এবং বিজ্ঞজন কর্তৃক জ্ঞাতব্য।’ এবং সংঘের প্রতিও আমি এরূপ অবিচল শ্রদ্ধাসম্পন্ন-‘ভগবানের শ্রাবকসংঘ সুপথে প্রতিপন্ন, ঋজুপথে প্রতিপন্ন, ন্যায়-পথে প্রতিপন্ন, সমীচীন-পথে প্রতিপন্ন, ভগবানের শ্রাবকসংঘ যুগ্ম হিসেবে চারি যুগ্ম এবং পুদ্গল হিসেবে অষ্ট আর্যপুদ্গলই চারি প্রত্যয় দান-আহুতি লাভের যোগ্য, আতিথেয়তা লাভের যোগ্য, দক্ষিণেয়্য (দক্ষিণার যোগ্য), অঞ্জলি (বন্দনা) করণীয় এবং জগতের অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র।’ আমি অখণ্ড, নিশ্চিদ্র, নিখুঁত, নিষ্কলঙ্ক, বিমুক্তিতে উপনীতকারী, বিজ্ঞজন কর্তৃক প্রশংসিত (অদূষিত) এবং সমাধি লাভের সহায়ক শীলে সমন্নাগত।”
“দীর্ঘাবু, তাহলে তুমি এই চারি স্রোতাপত্তি অঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছয় বিদ্যাভাগীয় ধর্মসমূহ উত্তরোত্তর ভাবনা বা অনুশীলন কর। এক্ষেত্রে তুমি সমস্ত সংস্কারের প্রতি অনিত্যানুদর্শী হয়ে অবস্থান কর, অনিত্যতে দুঃখসংজ্ঞী হও এবং দুঃখে অনাত্মাসংজ্ঞী, প্রহানসংজ্ঞী, বিরাগসংজ্ঞী ও নিরোধসংজ্ঞী হয়ে অবস্থান কর। দীর্ঘাবু, তোমার এরূপই শিক্ষা করা উচিত।”
“ভন্তে, ভগবান কর্তৃক এই যে ছয় বিদ্যাভাগীয় ধর্মসমূহ দেশিত হয়েছে, সেই ধর্মসমূহ আমার নিকট বিদ্যমান। আমি সেই ধর্মসমূহও প্রত্যক্ষ করি। ভন্তে, আমি সকল সংস্কারে অনিত্যানুদর্শী হয়ে অবস্থান করি, অনিত্যতে দুঃখসংজ্ঞী এবং দুঃখে অনাত্মাসংজ্ঞী, প্রহানসংজ্ঞী, বিরাগসংজ্ঞী ও নিরোধসংজ্ঞী হয়ে অবস্থান করি। ভন্তে, আমার এরূপ চিত্ত উদয় হয়, অধিকন্তু আমার পিতা জ্যোতিক গৃহপতি আমার মৃত্যুর দরুন শোকগ্রস্ত না হোক।”
“তখন পিতা জ্যোতিক বললেন, ওহে তাত দীর্ঘাবু, তুমি এরূপ মানসিকতা পোষণ করো না। তাত দীর্ঘাবু, ভগবান যে উপদেশ দিলেন,তুমি তাতেই উত্তমরূপে মনোযোগ দাও।”
অতঃপর ভগবান দীর্ঘাবু উপাসককে এই উপদেশ প্রদান করে আসন হতে উঠে চলে গেলেন। এদিকে দীর্ঘাবু উপাসক ভগবান চলে যাওয়ার অনতিবিলম্বে মৃত্যুবরণ করলেন। অনন্তর বহুসংখ্যক ভিক্ষু ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে বসলেন। একপাশে উপবিষ্ট সেই ভিক্ষুগণ ভগবানকে এরূপ বললেন :
“ভন্তে, যে দীর্ঘাবু নামক উপাসক ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্ত উপদেশে উপদিষ্ট হয়েছিলেন, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। ভন্তে, তাঁর কোন গতি হয়েছে এবং কোন লোকে উৎপন্ন হয়েছেন?”
“হে ভিক্ষুগণ, দীর্ঘাবু উপাসক পণ্ডিত ছিল। সে ধর্মানুধর্মে জীবনযাপন করেছিল। সে আমাকে ধর্মাধিকরণের দ্বারা বিরক্ত করেনি। ভিক্ষুগণ, দীর্ঘাবু উপাসক পঞ্চ অধোভাগীয় সংযোজন পরিক্ষয় (পরিহার) করে উপপাতিকরূপে জন্মধারণ করেছে এবং অনাবর্তিতধর্মী সেই লোকে (শুদ্ধাবাস ব্রহ্মলোকে) পরিনির্বাণ প্রাপ্ত হবে।” তৃতীয় সূত্র।
ব্যাখ্যা [১]
English