লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [৩৬]

ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র

একসময় ভগবান বারাণসীর ঋষিপতনে মৃগদায়ে অবস্থান করছিলেন। তথায় তিনি পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের আহ্বান করে বললেন :

“হে ভিক্ষুগণ, দুইটির চরমে প্রব্রজিত ভিক্ষু-শ্রমণদের যাওয়া উচিত নয়। সেই দুইটা কী কী? প্রথমত, হীন গ্রাম্য ও সাধারণজন সেবিত অনার্য ও অনর্থকর কাম্যবস্তুতে অনুরক্ত হওয়া। আর দ্বিতীয়ত, অনার্য অনর্থকর আত্মক্লেশ-জনিত দুঃখবরণ। এই দুই অন্ত ত্যাগ করে তথাগত মধ্যমপথ অধিগত হয়েছেন। যাহা চক্ষু উৎপাদনকারী, জ্ঞান-উপশম ও অভিজ্ঞা উৎপাদনকারী এবং যাহা মানুষকে সম্বোধি বা নির্বাণের দিকে সংবর্তিত করে। বুদ্ধ তথাগত কর্তৃক অধিগত চক্ষু উৎপাদনকারী, জ্ঞান, উপশম ও অভিজ্ঞা উৎপাদনকারী এবং সম্বোধি ও নির্বাণের দিকে সংবর্তনকারী সেই মধ্যমপথ কি? ইহা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। যথা : সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সঙ্কল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক চেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। ভিক্ষুগণ, চক্ষু উৎপাদনকারী, জ্ঞান, উপশম ও অভিজ্ঞা উৎপাদনকারী এবং সম্বোধি ও নির্বাণের দিকে সংবর্তনকারী এই মধ্যম প্রতিপদা তথাগত বুদ্ধ অধিগত হয়েছেন।

ভিক্ষুগণ, জন্ম-দুঃখ, জরা-দুঃখ, অপ্রিয়সংযোগ দুঃখ, প্রিয়বিয়োগে দুঃখ, ইস্পিত বস্তুর অলাভজনিত দুঃখ ও সংক্ষেপে বলতে গেলে পঞ্চ উপাদানস্কন্ধরূপ দুঃখকেই বলে দুঃখ আর্যসত্য। ভিক্ষুগণ, ভব হতে ভবান্তরে পুনঃপুন উৎপাদিকা তৃষ্ণা যা আনন্দ ও লোভের সাথে আগমন করে এবং সেই সেই ভবে অভিনন্দনকারিনী, ইহাকে বলা হয় দুঃখ-সমুদয় আর্যসত্য। তা ত্রিবিধ-কামতৃষ্ণা, ভবতৃষ্ণা ও বিভবতৃষ্ণা। ভিক্ষুগণ, সেই তৃষ্ণার নিঃশেষে বিরাগ, নিরোধ, ত্যাগ, বিরাগ, নিক্ষেপ, মুক্তি ও অনালয়কে বলে দুঃখ-নিরোধ আর্যসত্য। ভিক্ষুগণ, সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সঙ্কল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক চেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। এই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই দুঃখনিরোধগামিনী প্রতিপদা বা দুঃখ-নিরোধের উপায় আর্যসত্য।

ভিক্ষুগণ, ‘ইহা দুঃখ আর্যসত্য’ এরূপ অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল। ভিক্ষুগণ, ‘সেই দুঃখ আর্যসত্য আমার পরিজ্ঞাত’ এরূপেও অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল। ভিক্ষুগণ, ‘সেই দুঃখ আর্যসত্য পরিজ্ঞাতব্য’ এরূপেও অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল।

ভিক্ষুগণ, ‘ইহা দুঃখ-সমুদয় বা দুঃখের কারণ আর্যসত্য’ এরূপ অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল। ভিক্ষুগণ, ‘সেই দুঃখ-সমুদয় আর্যসত্য পরিত্যাগ করা কর্তব্য’ এরূপেও অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল। ‘সেই দুঃখ-সমুদয় আর্যসত্য আমার প্রহীন হয়েছে’ এরূপ অশ্রুতপূর্ব বিষয়েও তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল।

ভিক্ষুগণ, ‘ইহা দুঃখ-নিরোধ আর্যসত্য’ এরূপ অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল। ভিক্ষুগণ, ‘সেই দুঃখ-নিরোধ আর্যসত্য লাভ করা উচিত’ এরূপেও অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল। ‘সেই দুঃখ-নিরোধ আর্যসত্য আমার লব্ধ হয়েছে’ এরূপ অশ্রুতপূর্ব বিষয়েও তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল।

ভিক্ষুগণ, ‘ইহা দুঃখ-নিরোধগামী প্রতিপদা বা উপায় আর্যসত্য’ এরূপ অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল। ভিক্ষুগণ, ‘সেই দুঃখ-নিরোধগামী উপায় আর্যসত্য অনুশীলন করা কর্তব্য’ এরূপেও অশ্রুতপূর্ব বিষয়ে তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল। ‘সেই দুঃখ-নিরোধ আর্যসত্য আমার ভাবিত’ এরূপ অশ্রুতপূর্ব বিষয়েও তথাগতের চক্ষু উৎপন্ন হয়েছিল, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও আলোক উৎপন্ন হয়েছিল।

ভিক্ষুগণ, এই চারি আর্যসত্যে ত্রিবিধ ক্রম অনুসারে দ্বাদশ প্রকার জ্ঞান-দর্শন যতদিন আমার পরিষ্কার হয়নি, ততদিন আমি মার, ব্রহ্মা, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ কিংবা দেব-মানবের মধ্যে অনুত্তর সম্যক সম্বোধি লাভ করেছি বলে প্রকাশ করিনি।

ভিক্ষুগণ, এই চারি আর্যসত্যে ত্রিবিধ ক্রম অনুসারে দ্বাদশ প্রকার জ্ঞান-দর্শন যখন আমার পরিষ্কার হয়েছিল, তখন হতে আমি মার, ব্রহ্মা, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ কিংবা দেবমানবের মধ্যে অনুত্তর সম্যক সম্বোধি লাভ করেছি বলে প্রকাশ করেছি।

আমার এরূপ জ্ঞান-দর্শন উৎপন্ন হয়েছিল, ‘আমার চিত্তবিমুক্তি প্রকুপিত হবার নয়। ইহাই আমার অন্তিম জন্ম। এই হতে আমাকে আর সংসারে জন্মগ্রহণ করতে হবে না’। ভগবান বুদ্ধ যখন এই উক্তি করলেন, তখন পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুগণ আনন্দিত হয়ে ভগবৎ বাক্য সাধুবাদের সাথে অনুমোদন করলেন।

এই ধর্মচক্র সূত্র প্রবর্তিত হলে আয়ুষ্মান কৌ-ণ্যের পাপরজঃমুক্ত ও কলুষবিহীন ধর্মচক্ষু (স্রোতাপত্তিমার্গফল) লাভ হয়েছিল, অর্থাৎ যা কিছু উদয়শীল তা-ই বিলয়ধর্মী। ভগবান বুদ্ধের দ্বারা ধর্মচক্র প্রবর্তিত হলে ভূমিবাসী দেবতারা এই সাধুবাদ ধ্বনি ঘোষণা করেছিলেন-‘ইহা ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক বারাণসী ঋষিপতন মৃগদায়ে অনুত্তর ধর্মচক্র প্রবর্তিত হয়েছিল যা শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, দেব, মার, ব্রহ্মা বা অন্য কারো দ্বারা অপ্রবর্তনীয়। ভূমিবাসী দেবগণের শব্দ শুনে চর্তুমহারাজিক দেবতারা সাধুবাদ-ধ্বনি ঘোষণা করলেন। এরূপে তাবতিংস, যাম, তুষিত, নির্মাণরতি, পরনির্মিতবশবর্তী দেবগণও সাধুবাদ-ধ্বনি ঘোষণা করেছিলেন। এইভাবে ব্রহ্মা পারিসজ্জা, ব্রহ্মা পুরোহিত, মহাব্রহ্মা, পরিত্তাভ, অপ্রমাণাভ, আভস্বর, পরিত্তশুভ, প্রমাণশুভ, শুভকিহ্ন, বেহপ্‌ফল, অবিহ, অতপ্প, সুদর্শ, সুদর্শী এবং অকনিষ্ঠবাসী দেবগণও সাধুবাদ-ধ্বনি ঘোষণা করেছিলেন।

এই প্রকারে সেই ধর্মচক্র প্রবর্তন-ক্ষণে সেই মুহূর্তে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত শব্দ ঘোষিত হয়েছিল। তখন এই দশ হাজার চক্রবাল কম্পিত ও প্রকম্পিত হয়েছিল। দিব্য আলোককেও অতিক্রম করে জগতে এক অপ্রমেয় এবং অত্যন্ত সুন্দর আলোকরশ্মি প্রাদুর্ভূত হয়েছিল।

অনন্তর ভগবান বুদ্ধ সুললিত কণ্ঠে প্রীতি জ্ঞাপন করলেন, “সত্যিই আয়ুষ্মান কৌণ্ডণ্য মার্গফলে (অঞ্‌ঞাসি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” তখন হতে আয়ুষ্মান কৌণ্ডণ্য “জ্ঞাত বা অর্হৎ কৌণ্ডণ্য” বলে পরিচিত হলেন। তৃতীয় সূত্র।

ব্যাখ্যা [১]