লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৭]

সুন্দরিক সূত্র

একসময় ভগবান কোশলরাজ্যে সুন্দরিক নদীর তীরে অবস্থান করছেন। তখন সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণ সুন্দরিক নদীর তীরে অগ্নিহোম ও অগ্নিপূজা কর্ম সম্পাদন করছেন। অনন্তর সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণ অগ্নিহোম ও অগ্নিপূজা কর্ম সম্পাদন করে আসন হতে উঠে চারদিকে তাকালেন, ‘কে এই হব্যাবশেষ (পূজায় প্রদত্ত অবশিষ্ট বস্তু) ভোজন করবে?’ তখন তিনি অন্য একটি বৃক্ষমূলে উপবিষ্ট আপাদমস্তকাবৃত ভগবানকে দেখতে পেলেন। দেখে তিনি বামহস্তে হব্যাবশেষ এবং ডানহস্তে কমণ্ডলু (কমণ্ডলং) নিয়ে ভগবানের নিকট উপস্থিত হলেন। তখন ভগবান সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণের পায়ের শব্দ শুনে মস্তক উন্মুক্ত করলেন। অমনি সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণ ‘ইনি যে মুণ্ডিত মস্তক, ইনি যে মুণ্ডিত মস্তক’ বলে প্রত্যাবর্তনে উদ্যত হলেন। তখন তার মনে এরূপ চিন্তার উৎপন্ন হলো : ‘কোনো কোনো মুণ্ডিত মস্তকও তো ব্রাহ্মণ আছেন। এখনি আমি তাঁর নিকট জাতি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করব।’

এরপর সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণ ভগবানের নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার জাতি কী?’

(বুদ্ধ ব্রাহ্মণকে গাথায় বললেন) ‘হে ব্রাহ্মণ, জাতি সম্পর্কে প্রশ্ন করো না, শীলাদি গুণ ও আচরণ সম্বন্ধে প্রশ্ন করো। (সব) কাষ্ঠ হতে নিঃসন্দেহে অগ্নি উৎপন্ন হয়। নীচকুলে জন্ম নেয়া ব্যক্তিও পাপের প্রতি লজ্জাশীল হয়ে আজানীয় ধৃতিমান মুনি হয়ে থাকে।’

‘যে পরমার্থ সত্যে দান্ত, ইন্দ্রিয় দমনে উপনীত, বেদজ্ঞ এবং ব্রহ্মচর্যব্রতসম্পন্ন, তাকেই যজ্ঞোপনীত বস্তুর জন্য আহ্বান করা উচিত। যজ্ঞসম্পাদনকারীর আহ্বান করা উচিত। এভাবে সে যথাসময়ে দক্ষিণারযোগ্য ব্যক্তিকে পূজা করে।’

(ব্রাহ্মণ বললেন) ‘যেহেতু আমি সম্মুখে বেদজ্ঞ (বুদ্ধকে) দেখছি, তাই আমার এই যজ্ঞ এখন অবশ্যই সুবিসর্জিত, সুহুত (উত্তমরূপে অর্পিত)। আপনার মতো মহাপুরুষের অদর্শনে অন্য (অন্ধমূর্খ পৃথগ্‌জন) ব্যক্তি এই হব্যাবশেষ ভোজন করত।’

‘প্রভু গৌতম, এই পায়স পরিভোগ করুন, আপনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ।’

(বুদ্ধ ব্রাহ্মণকে বললেন) ‘হে ব্রাহ্মণ, গাথা পাঠ করে লব্ধদ্রব্য আমার পরিভোগ্য নয়। (অর্থ ও ধর্ম) দ্রষ্টাদের এটা ধর্ম নয়। গাথা পাঠ করে লব্ধদ্রব্য বুদ্ধগণ পরিত্যাগ করেন। হে ব্রাহ্মণ, ধর্মে স্মৃতিই তাঁদের জীবিকা বৃত্তি।’

‘ক্ষীণাসব, দুশ্চরিত্র-উপশান্ত ও সম্পূর্ণরূপে সিদ্ধ মহর্ষিকে অন্য কোনো অন্ন-পানীয় দিয়ে পূজা কর; তা পুণ্যাকাঙ্ক্ষীর ক্ষেত্র হয়।’

(ব্রাহ্মণ বললেন) ‘প্রভু গৌতম, তাহলে আমি এই হব্যাবশেষ কাকে দান দিই?’

(বুদ্ধ ব্রাহ্মণকে বললেন) ‘হে ব্রাহ্মণ, এ জগতে তথাগত ও তাঁর শ্রাবক ব্যতীত দেব, মার, ব্রহ্মা, শ্রমণ-ব্রাহ্মণসহ দেব-মনুষ্য ও জনতার মধ্যে এমন কাউকে দেখছি না, যে এই হব্যাবশেষ পরিভোগ করে উত্তমরূপে হজম করতে পারে। ব্রাহ্মণ, তাই তুমি এই হব্যাবশেষ তৃণহীন স্থানেফেলে দাও অথবা প্রাণীহীন জলে ভাসিয়ে দাও।’

অতঃপর সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণ সেই হব্যাবশেষ প্রাণীহীন জলে ভাসিয়ে দিলেন। আর তা জলে নিক্ষিপ্ত হওয়া মাত্রই চিট্‌চিট্‌ শব্দ আর বুদ্‌বুদ্‌ তুলতে লাগলো। জল ভেদ করে ধোঁয়া নির্গত হতে লাগলো। সারাদিন রৌদ্রে সন্তপ্ত লাঙ্গল ফলক যেমন জলে নিমজ্জিত করলে চিট্‌চিট্‌ শব্দ করে, বুদ্‌বুদ্‌ তুলে, জল ভেদ করে ধোঁয়া নির্গত হয়; ঠিক তেমনি সেই হব্যাবশেষ জলে নিক্ষিপ্ত হয়ে চিট্‌চিট্‌ শব্দ ও বুদ্‌বুদ্‌ তুলতে লাগলো। জল ভেদ করে ধোঁয়া নির্গত হতে লাগলো।

অনন্তর ব্রাহ্মণ সংবিগ্ন ও রোমাঞ্চিত হয়ে ভগবানের নিকট গিয়ে একপাশে দাঁড়ালেন। একপাশে স্থিত সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণকে ভগবান গাথায় বললেন :

‘হে ব্রাহ্মণ, কাষ্ঠ জ্বেলে শুদ্ধি লাভ হয় বলে মনে করো না। এটি বাহ্যিক মাত্র (আর্যধর্মের বাইরে)। যে ব্যক্তি বাইরে শুদ্ধি কামনা করে, তা দিয়ে তার শুদ্ধি হয় বলে পণ্ডিতগণ বলে না।’

‘ব্রাহ্মণ, আমি কাষ্ঠ জ্বালানো ত্যাগ করে মনেই জ্ঞানাগ্নি প্রজ্বলন করেছি। তদ্ধেতু আমি নিত্যাগ্নি , নিত্য সমাহিত চিত্তে, অর্হত্ত্বপ্রাপ্ত হয়ে ব্রহ্মচর্য পালন করছি।’

‘হে ব্রাহ্মণ, তোমার মান কাঁধের জোয়াল (খারিভারো) সদৃশ, ক্রোধ ধূমের মতো এবং মিথ্যা বাক্য ছাঁই সদৃশ। জিহ্বা যজ্ঞীয় হাতা (বা বড় চামচ), হৃদয় জ্যোতিস্থান; তাই সুদান্ত চিত্তই পুরুষের জ্যোতি।’

‘ধর্ম হচ্ছে সৎপুরুষের প্রশংসিত অনাবিল হ্রদ, শীল তার তীর্থঘাট; যেখানে বেদজ্ঞ ঋষিগণ স্নাত হয়ে অসিক্ত দেহে নির্বাণের পারে গমন করে।’

‘সত্য , ধর্ম ও সংযমই ব্রহ্মচর্য, মধ্যে আশ্রিত হয়ে ব্রহ্মপ্রাপ্তি হয় (শ্রেষ্ঠপ্রাপ্তি) হয়। সেই ন্যায়পরায়ণ ক্ষীণাসবগণের প্রতি তুমি বন্দনা নিবেদন করো। সে ব্যক্তিকেই আমি ধর্মানুসারী বলে বলে থাকি।’

এরূপ বললে সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণ ভগবানকে এরূপ বললেন, ‘প্রভু গৌতম, অতি সুন্দর… জানতে পারলেন। তখন আয়ুষ্মান সুন্দরিক ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণ অর্হৎগণের মধ্যে অন্যতম হলেন।’

ব্যাখ্যা [১]