একসময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অনাথপিণ্ডিক নির্মিত জেতবনারামে অবস্থান করছিলেন। সেই সময়ে কোশলরাজ প্রসেনজিত যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে অভিসন্ধি পূরণের পর প্রত্যাবর্তন করছিলেন। অনন্তর কোশলরাজ প্রসেনজিৎ জেতবন আরামের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। তথায় যতদূর বাহনের মাধ্যমে গমন করা সম্ভব হলো ততদূর পৌঁছে বাকি পথ হেঁটেই রাজা জেতবন আরামে উপস্থিত হলেন। সেসময় অনেক ভিক্ষু খোলা আকাশতলে চঙ্ক্রমণ করছিলেন। অতঃপর কোশলরাজ প্রসেনজিৎ সেই ভিক্ষুদের নিকট উপস্থিত হয়ে এরূপ বললেন:
“ভন্তে, ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ এখন কোথায় অবস্থান করছেন? ভন্তে, আমরা ভগবান তথাগতকে দর্শন করতে ইচ্ছা করছি।”
“হে মহারাজ, ওই যে আবৃত দরজা দেখা যাচ্ছে সেদিকে অল্পশব্দে গিয়ে বারান্দা পার হোন এবং সংকেতস্বরূপ কাশি দিয়ে দরজার কড়া নাড়-ন। তার পর ভগবানকে দরজা উম্মুক্ত করার জন্য প্রার্থনা জানান। ভগবান স্বয়ং দ্বার উন্মোচন করবেন।”
অতঃপর রাজা প্রসেনজিৎ সেই আবাসকক্ষের দিকে অল্পশব্দে উপস্থিত হলেন এবং বারান্দা পাড় হয়ে সংকেতস্বরূপ কাশি দিয়ে দরজার কড়া নাড়লেন। দরজা উন্মুক্ত হলে কোশলরাজ প্রসেনজিৎ তথাগতে প্রবেশ করত ভগবানের পাদদ্বয়ে নিজ মস্তক স্থাপনপূর্বক বন্দনা জ্ঞাপন করলেন। ভগবানের পাদ চুম্বন করে নিজ হস্ত দ্বারা পাদ সংবাহন করতে করতে নিজ নাম বলতে লাগলেন, “ভন্তে, আমি কোশলরাজ প্রসেনজিৎ, ভন্তে, আমি কোশলরাজ প্রসেনজিৎ।”
“মহারাজ, আপনি কোন কারণ দর্শন করে তথাগতের দেহকে এইরূপে সম্মান প্রদর্শন করছেন ও মৈত্রীপূর্ণ অভিবাদন করছেন?”
“ভন্তে, আমি তথাগতের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রকাশের জন্যই তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, তথাগত বহুজনের হিতার্থে ও সুখার্থে প্রতিপন্ন। তিনি বহুজনকে আর্যধারা যথা : কল্যাণ ধর্মে ও কুশলধর্মে প্রতিষ্ঠাপিত করেন। ভন্তে, এই যে তথাগত বহুজনকে আর্যধারা যথা : কল্যাণ ধর্মে ও কুশলধর্মে প্রতিষ্ঠাপিত করেন, আমি তা দর্শন করে তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, তথাগত শীলবান এবং বুদ্ধশীল, আর্যশীল ও কুশলশীলসম্পন্ন এবং কুশলশীলে সমন্নাগত। যেহেতু তথাগত শীলবান এবং বুদ্ধশীল, আর্যশীল ও কুশলশীলসম্পন্ন এবং কুশলশীলে সমন্নাগত; সেহেতু তা দর্শন করে আমি তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, তথাগত দীর্ঘকালব্যাপী আরণ্যিক এবং অরণ্যের বানপ্রস্থ, বিজন স্থানে (নির্জন) অবস্থান করেন; যেহেতু তথাগত দীর্ঘকালব্যাপী আরণ্যিক এবং অরণ্যের বানপ্রস্থ, বিজন স্থানে (নির্জন) অবস্থান করেন; সেহেতু তা দর্শন করে তথাগতের আমি দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, তথাগত চীবর, পিণ্ডপাত, শয্যাসন, ওষুধ প্রত্যয় ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথালাভে সন্তুষ্ট থাকেন। যেহেতু তথাগত চীবর, পিণ্ডপাত, শয্যাসন, ওষুধ প্রত্যয় ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথালাভে সন্তুষ্ট থাকেন। সেহেতু তা দর্শন করে তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, তথাগত আহ্বানযোগ্য, পূজার যোগ্য, দক্ষিণার যোগ্য, অঞ্জলিকরণের যোগ্য এবং জগতের মধ্যে অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র। যেহেতু তথাগত আহ্বানযোগ্য, পূজার যোগ্য, দক্ষিণার যোগ্য, অঞ্জলিকরণের যোগ্য এবং জগতের মধ্যে অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র। সেহেতু তা দর্শন করে তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, ভগবান যে-সমস্ত কথা গম্ভীর ও হৃদয় উন্মুক্তকরণে সহায়ক তদ্রূপ কথা; যথা : অল্পেচ্ছাকথা, সন্তুষ্টিকথা, প্রবিবেককথা, অসংসর্গকথা, বীর্যারম্ভকথা, শীলকথা, সমাধিকথা, প্রজ্ঞাকথা, বিমুক্তিকথা ও বিমুক্তিজ্ঞানদর্শন কথা এবম্বিধ কথায় তিনি যথেচ্ছালাভী, অকৃত্যলাভী ও অনায়াসলাভী হয়। যেহেতু তথাগত যে-সমস্ত কথা গম্ভীর ও হৃদয় উন্মুক্তকরণে সহায়ক তদ্রূপ কথা; যথা : অল্পেচ্ছাকথা, সন্তুষ্টিকথা, প্রবিবেককথা, অসংসর্গকথা, বীর্যারম্ভকথা, শীলকথা, সমাধিকথা, প্রজ্ঞাকথা, বিমুক্তিকথা ও বিমুক্তিজ্ঞানদর্শন কথা এবম্বিধ কথায় তিনি যথেচ্ছালাভী, অকৃত্যলাভী ও অনায়াসলাভী; সেহেতু তা দর্শন করে আমি তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, ভগবান দৃষ্টধর্মে সুখবিহারস্বরূপ অভিচৈতসিক চতুর্বিধ ধ্যানে যথেচ্ছালাভী, অকৃত্যলাভী ও অনায়াসলাভী হন। যেহেতু তথাগত দৃষ্টধর্মে সুখবিহারস্বরূপ অভিচৈতসিক চতুর্বিধ ধ্যানে যথেচ্ছালাভী, অকৃত্যলাভী ও অনায়াসলাভী হন; সেহেতু তা দর্শন করে আমি তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, ভগবান বহু প্রকারে বহুবিধ পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে পারেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, লক্ষ জন্ম, এমনকি বহু সংবর্ত কল্প, বহু বিবর্ত কল্প, বহু সংবর্ত-বিবর্ত কল্পে, অমুক জন্মে আমার এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার, এই ছিল সুখ-দুঃখ ভোগ, এই পরিমাণ আয়ু, সেখান হতে চ্যুত হয়ে এখানে জন্মগ্রহণ করেছি, এই প্রকারে আকার ও গতিসহ বহুবিধ পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে পারেন। যেহেতু তথাগত বহু প্রকারে বহুবিধ পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে পারেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, লক্ষ জন্ম, এমনকি বহু সংবর্ত কল্প, বহু বিবর্ত কল্প, বহু সংবর্ত-বিবর্ত কল্পে, অমুক জন্মে আমার এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার, এই ছিল সুখ-দুঃখ ভোগ, এই পরিমাণ আয়ু, সেখান হতে চ্যুত হয়ে এখানে জন্মগ্রহণ করেছি, এই প্রকারে আকার ও গতিসহ বহুবিধ পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে পারেন; সেহেতু তা দর্শন করে আমি তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, তথাগত বিশুদ্ধ ও লোকাতীত দিব্যচক্ষু দ্বারা যারা চ্যুত হচ্ছে, পুনরায় উৎপন্ন হচ্ছে, কর্মানুসারে গতিপ্রাপ্ত, হীনোৎকৃষ্ট, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগতি-দুর্গতি প্রাপ্ত অপর জীবগণকে দেখতে পান। তথাগত তাদের এরূপে জানতে পারেন যে এই সকল জীব কায়-বাক্য ও মনোদুশ্চরিত্র সমন্বিত, আর্যগণের নিন্দুক, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন ও মিথ্যাদৃষ্টিসম্ভূত কর্ম সম্পাদনের ফলে দেহান্তে (মৃত্যুর পরে) বিনিপাত নরকে উৎপন্ন হয়েছে। পক্ষান্তরে, এই সকল জীব কায়-বাক্য ও মনোসুচরিত্র সমন্বিত, আর্যগণের অনিন্দুক, সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন, সম্যক দৃষ্টিজাত কর্ম করার ফলে দেহান্তে সুগতি-স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয়েছে। যারা চ্যুত হয়ে পুনরায় উৎপন্ন হচ্ছে, স্ব-স্ব কর্মানুসারে গতিপ্রাপ্ত, হীনোৎকৃষ্ট, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগত-দুর্গত, তাদের বিশুদ্ধ লোকাতীত দিব্যচক্ষু দ্বারা তথাগত প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত হন। যেহেতু তথাগত বিশুদ্ধ ও লোকাতীত দিব্যচক্ষু দ্বারা যারা চ্যুত হচ্ছে, পুনরায় উৎপন্ন হচ্ছে, কর্মানুসারে গতিপ্রাপ্ত, হীনোৎকৃষ্ট, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগতি-দুর্গতি প্রাপ্ত অপর জীবগণকে দেখতে পান। তথাগত তাদের এরূপে জানতে পারেন যে এই সকল জীব কায়-বাক্য ও মনোদুশ্চরিত্র সমন্বিত, আর্যগণের নিন্দুক, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন ও মিথ্যাদৃষ্টিসম্ভূত কর্ম সম্পাদনের ফলে দেহান্তে (মৃত্যুর পরে) বিনিপাত নরকে উৎপন্ন হয়েছে। পক্ষান্তরে, এই সকল জীব কায়-বাক্য ও মনোসুচরিত্র সমন্বিত, আর্যগণের অনিন্দুক, সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন, সম্যক দৃষ্টিজাত কর্ম করার ফলে দেহান্তে সুগতি-স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয়েছে। যারা চ্যুত হয়ে পুনরায় উৎপন্ন হচ্ছে, স্ব-স্ব কর্মানুসারে গতিপ্রাপ্ত, হীনোৎকৃষ্ট, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগত-দুর্গত, তাদের বিশুদ্ধ লোকাতীত দিব্যচক্ষু দ্বারা তথাগত প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত হন। সেহেতু তা দর্শন করে আমি তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
পুনশ্চ, ভন্তে, তথাগত আসবক্ষয়ে অনাসব এবং ইহজীবনে স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা চিত্তবিমুক্তি ও প্রজ্ঞাবিমুক্তি প্রত্যক্ষ করে লাভ করে অবস্থান করেন। যেহেতু, তথাগত আসবক্ষয়ে অনাসব এবং ইহজীবনে স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা চিত্তবিমুক্তি ও প্রজ্ঞাবিমুক্তি প্রত্যক্ষ করে লাভ করে অবস্থান করেন; সেহেতু তা দর্শন করে আমি তথাগতের দেহকে এরূপে সম্মান প্রদর্শন করছি ও মৈত্রীময় অভিবাদন করছি।
ভন্তে, এখন আমরা ফিরে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাচ্ছি। আমাদের বহুকৃত্য, বহু করণীয়।”
“হে মহারাজ, যা বিহিত বলে মনে করেন তা করুন।”
অতঃপর কোশলরাজ প্রসেনজিৎ আসন হতে উঠে তথাগতকে অভিবাদন করে প্রদক্ষিণ করে প্রস্থান করলেন। দশম সূত্র।
মহাবর্গ সমাপ্ত।
তস্সুদ্দানং/সূত্রসূচি
সিংহনাদ, অধিবুত্তি, কায় পূর্বে ভাষিত,
মহাচুন্দ, কৃৎস্ন, কালী ত্রিবিধ হলো বিবৃত;
মহাপ্রশ্ন, কোশল এথায় দুয়ে দুয়ে ব্যক্ত,
দশে মিলে মহাবর্গ এবার হলো সমাপ্ত॥
ব্যাখ্যা [০]