একসময় ভগবান বৈশালীতে অবস্থান করছিলেন মহাবনস্থ কূটাগারশালায়। সে সময় সাল্হ ও অভয় লিচ্ছবি ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে উপবেশন করলেন। একপাশে উপবিষ্ট সাল্হ লিচ্ছবি ভগবানকে এরূপ বললেন :
“ভন্তে, কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যারা দ্বিবিধ বিষয়ের দ্বারা ওঘ (স্রোত) উত্তীর্ণ প্রজ্ঞাপ্ত করেন, যথা : শীলবিশুদ্ধি ও তপস্যা পরিহার। এক্ষেত্রে ভগবান কী বলবেন?”
“হে সাল্হ, শীলবিশুদ্ধিকে আমি অন্যতর শ্রমণ্য অঙ্গ বলি। যেই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ তপস্যা পরিহারবাদী, তপস্যা পরিহারাচারী ও তপস্যা পরিহারাবদ্ধ হয়ে অবস্থান করে, তারা ওঘোত্তীর্ণ হতে অক্ষম হয়। আর যেই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ অপরিশুদ্ধ কায় সদাচারসম্পন্ন, অপরিশুদ্ধ বাচনিক সদাচারসম্পন্ন, অপরিশুদ্ধ মনো সদাচারসম্পন্ন ও অপরিশুদ্ধ জীবনধারী তারাও জ্ঞানদর্শন ও অনুত্তর সম্বোধি লাভ করতে অক্ষম।
সাল্হ, যেমন, পুুর্বষ নদী পারেচ্ছুক হয়ে ধারালো কুঠার নিয়ে বনে প্রবেশ করে। সে তথায় বৃহৎ, ঋজু, সতেজ ও অধিক উচ্চতাসম্পন্ন শালবৃক্ষ দর্শন করে। তখন সেই বৃক্ষের মূল ছেদন করে, মূল ছেদন করে অগ্রভাগ ছেদন করে; অগ্রভাগ ছেদন করে শাখাপত্রাদি সুবিশোধিত ও পরিষ্কার করে; শাখাপত্রাদি সুবিশোধিত ও পরিষ্কার করে কুঠার দ্বারা কিছু কিছু করে কেটে (ছেঁটে) নেয়; কুঠার দ্বারা কিছু কিছু করে কেটে ছেঁটে নেওয়ার পর ধারালো ছুরি দিয়ে আরও কিছু কিছু করে কেটে ছেঁটে নেয়; ধারালো ছুরি দিয়ে আরও কিছু কিছু করে কেটে ছেঁটে নেওয়ার পর লেখনী (কলম) দিয়ে লিখে; লেখনী দিয়ে লেখার পর পাষাণ গোলক (নরম পাথরের ঢেলা যা ধৌতকার্যে ব্যবহৃত হয়) দিয়ে ধৌত করে এবং পাষাণগোলক দিয়ে ধৌত করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
সাল্হ, তা তুমি কি মনে কর, সেই পুরুষ কি নদী পার হতে পারবে?” “না ভন্তে,” “তার কারণ কী?” “ভন্তে, সেই শালবৃক্ষ বাহ্যিকভাবে সুপরিকর্মকৃত কিন্তু ভিতরে অবিশুদ্ধ, তার প্রতি এরূপ প্রত্যাশিত যে, শালবৃক্ষ ডুবে যাবে ও পুরুষটি দুর্বিপাকে পড়বে।”
“সাল্হ, তদ্রূপ, যেই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ তপস্যা পরিহারবাদী, তপস্যা পরিহারাচারী ও তপস্যা পরিহারাবদ্ধ হয়ে অবস্থান করে, তারা ওঘোত্তীর্ণ হতে অক্ষম হয়। আর যেই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ অপরিশুদ্ধ কায় সদাচারসম্পন্ন, অপরিশুদ্ধ বাচনিক সদাচারসম্পন্ন, অপরিশুদ্ধ মনো সদাচারসম্পন্ন ও অপরিশুদ্ধ জীবনধারী, তারাও জ্ঞানদর্শন ও অনুত্তর সম্বোধি লাভ করতে অক্ষম।
সাল্হ, যেই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ তপস্যা অপরিহারবাদী, তপস্যা অপরিহারাচারী ও তপস্যা অপরিহারাবদ্ধ হয়ে অবস্থান করে, তারা ওঘোত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়। আর যেই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ পরিশুদ্ধ কায় সদাচারসম্পন্ন, পরিশুদ্ধ বাচনিক সদাচারসম্পন্ন, পরিশুদ্ধ মনো সদাচারসম্পন্ন ও পরিশুদ্ধ জীবনধারী, তারাও জ্ঞানদর্শন ও অনুত্তর সম্বোধি লাভ করতে সক্ষম হয়।
সাল্হ, যেমন, পুরুষ নদী পার হতে ইচ্ছুক হয়ে ধারালো কুঠার নিয়ে বনে প্রবেশ করে। সে তথায় বৃহৎ, ঋজু, সতেজ ও অধিক উচ্চতাসম্পন্ন শালবৃক্ষ দর্শন করে। তখন সেই বৃক্ষের মূল ছেদন করে, মূল ছেদন করে অগ্রভাগ ছেদন করে; অগ্রভাগ ছেদন করে শাখাপত্রাদি সুবিশোধিত ও পরিষ্কার করে; শাখাপত্রাদি সুবিশোধিত ও পরিষ্কার করে কুঠার দ্বারা কিছু কিছু করে ছেঁটে নেয়, কুঠার দ্বারা কিছু কিছু করে কেটে ছেঁটে নেওয়ার পর ধারালো ছুরি দিয়ে আরও কিছু কিছু করে ছেঁটে নেয়; ধারালো ছুরি দিয়ে আরও কিছু কিছু করে ছেঁটে নেওয়ার পর ধারালো বাটালি নিয়ে ভিতরে সুবিশোধিত ও পরিষ্কার করে; ভিতরে সুবিশোধিত ও পরিষ্কৃত করে লেখনী দিয়ে লিখে; লেখনী দিয়ে লেখার পর পাষাণ গোলক দিয়ে ধৌত করে; পাষাণ গোলক দিয়ে ধৌত করার পর নৌকা তৈরি করে; নৌকা তৈরি করার ক্ষেপণী (দাঁড়) বাঁধে এবং ক্ষেপণী বাঁধার পর নদীতে আনয়ন করে।
সাল্হ, তা তুমি কী মনে কর, সেই পুরুষ কি নদী পার হতে পারবে?” “হ্যাঁ ভন্তে,” “তার কারণ কী?” “ভন্তে, সেই শালবৃক্ষ বাহ্যিকভাবে সুপরিকর্মকৃত, ভিতরে সুবিশুদ্ধ ও ক্ষেপণী বাঁধা। তার প্রতি এরূপ প্রত্যাশিত যে, ‘নৌকাটি ডুবে না যাবে ও পুরুষটি নিরাপদে পরপারে গমন করতে পারবে।”
“সাল্হ, তদ্রূপ, যেই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ তপস্যা অপরিহারবাদী, তপস্যা অপরিহারাচারী ও তপস্যা অপরিহারাবদ্ধ হয়ে অবস্থান করে, তারা ওঘোত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়। আর যেই শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ পরিশুদ্ধ কায় সদাচারসম্পন্ন, পরিশুদ্ধ বাচনিক সদাচারসম্পন্ন, পরিশুদ্ধ মনো সদাচারসম্পন্ন ও পরিশুদ্ধ জীবনধারী তারাও জ্ঞানদর্শন ও অনুত্তর সম্বোধি লাভ করতে সক্ষম হয়। যেমন একজন যোদ্ধা বহু চমৎকার শর (বাণ) সম্বন্ধে জানে; অতঃপর সে তিনটি কারণে রাজার যোগ্য, রাজভোগ্য ও রাজার উপযুক্ত বলে পরিগণিত হয়। সেই ত্রিবিধ কারণ কী কী? দূরভেদক, অক্ষণভেদী ও বহুসংখ্যক বস্তু বা কায় বিদ্ধকারী।
সাল্হ, যেমন একজন যোদ্ধা দূরভেদক হয়; ঠিক এরূপে আর্যশ্রাবকও সম্যক সম্বোধিসম্পন্ন হয়। সম্যক সম্বোধিসম্পন্ন আর্যশ্রাবক অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, অভ্যন্তরীণ, বাহ্যিক, স্থূল, সূক্ষ্ম, হীন, প্রণীত ও দূরে বা নিকটে যে-সমস্ত রূপ আছে, সে সমস্ত রূপকে সে ‘এটি আমার নয়, এটি আমি নই ও এটি আমার আত্মা নয়’-এরূপে সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা যথাযথভাবে দর্শন করে। একইভাবে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, অভ্যন্তরীণ, বাহ্যিক, স্থূল, সূক্ষ্ম, হীন, প্রণীত ও দূরে বা নিকটে যে-সমস্ত বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান আছে, সে সমস্ত বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানকে সে ‘এটি আমার নয়, এটি আমি নই ও এটি আমার আত্মা নয়’-এরূপে সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা যথাযথভাবে দর্শন করে।
সাল্হ, যেমন একজন যোদ্ধা অক্ষণভেদী হয়; ঠিক এরূপে আর্যশ্রাবকও সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন হয়। সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন আর্যশ্রাবক ‘এটি দুঃখ’ তা যথার্থরূপে জানে, ‘এটি দুঃখ সমুদয়’ ‘এটি দুঃখ নিরোধ’ ও ‘এটি দুঃখ নিরোধের উপায়’ বলেও তা যথার্থরূপে জানে।
সাল্হ, যেমন একজন যোদ্ধা বহুসংখ্যক বস্তু বা কায় বিদ্ধকারী হয়; তদ্রূপভাবে আর্যশ্রাবকও সম্যক বিমুক্তিসম্পন্ন হয়। সম্যক বিমুক্তিসম্পন্ন আর্যশ্রাবক বৃহৎ অবিদ্যাস্কন্ধকে বিদ্ধ করে।” (ষষ্ঠ সূত্র)
ব্যাখ্যা [০]