লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৭]

অনুপদ সূত্র

আমি এইরূপ শুনিয়াছি।

এক সময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের আরামে অবস্থান করিতেছিলেন। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, “হে ভিক্ষুগণ”, ‘হ্যাঁ ভদন্ত,’ বলিয়া ভিক্ষুগণ প্রত্যুত্তর করিলেন। ভগবান এইরূপ বলিলেন, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র পণ্ডিত, মহাপ্রাজ্ঞ, বিবিধজ্ঞানসম্পন্ন আনন্দ প্রাজ্ঞ, জবন (প্রখর) প্রাজ্ঞ, তীক্ষ্ণ প্রাজ্ঞ, নিবের্ধিক (লক্ষ্যবেদী) প্রাজ্ঞ। ধর্ম বিষয়ে অবিচ্ছিন্ন বিদর্শন-ভাবনা করিয়া প্রজ্ঞা লাভ করিয়া, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র অর্ধমাস হইল অনুপদধর্মবিদর্শন দর্শন করিয়াছেন, অর্থাৎ অর্হত্ত্ব্ব লাভ করিয়াছেন। ইহা সারিপুত্রের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এখন সারিপুত্র যাবতীয় কাম ও অকুশলধর্ম হইতে বিচ্যুত হইয়া সবিতর্ক, সবিচার, বিবেকজ, প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যানস্তরে উপনীত হইয়া বিহার করে। প্রথম ধ্যানস্তরে যাহা কিছু বিতর্ক, বিচার, প্রীতি, সুখ, চিত্তের একাগ্রতা, স্পর্শ, বেদনা, সংজ্ঞা, চেতনাচিত্ত, ছন্দ, অধিমোক্ষ, বীর্য, স্মৃতি, উপেক্ষা, মনসিকার, তাহা (যোগাবচরের দ্বার) অবিচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থিত এবং জ্ঞানত সেইগুলি উৎপন্ন হয়, স্থায়ী হয় ও বিলীন হয়। তিনি এইরূপ জানেন : এই ধর্মগুলি যাহা পূর্বে ছিল না তাহা আমার মধ্যে আবির্ভূত হইয়া গোচরীভূত হয়। তিনি সেই সকল ধর্মে অনুপায়, অনপায়, অনিশ্রিত, অপ্রতিবদ্ধ, বিপ্রমুক্ত ও বিমর্যাদাকৃত চিত্তে (বন্ধনমুক্ত) বিহার করেন। তিনি পরবর্তী নিঃসরণ আছে বলিয়া জানেন। এবং জানার জন্য তিনি বহুলকারী হন।

পুনরায় হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র বিতর্ক বিচার উপশমে অধ্যাত্ম সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী, বিতর্কাতীত, বিচারাতীত, সমাধিজ প্রীতিসুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যানস্তরে উপনীত হইয়া তাহাতে বিহার করেন। দ্বিতীয় ধ্যানস্তরে যাহা কিছু অধ্যাত্ম সম্প্রসাদী, প্রীতি, সুখ, চিত্তের একাগ্রতা… বহুলকারী হন।

পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র প্রীতিতেও বিরাগী হইয়া উপেক্ষারভাবে অবস্থান, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া দেহের মধ্যে (নিরপেক্ষ) সুখ অনুভব করেন। আর্যগণ যেই ধ্যানস্তরে আরোহণ করিলে ‘ধ্যায়ী উপেক্ষাসম্পন্ন ও স্মৃতিমান হইয়া (প্রীতি নিরপেক্ষ) সুখবিহারী’ বলিয়া বর্ণনা করেন-সেই তৃতীয় ধ্যানস্তরে উপনীত হইয়া তাহাতে অবস্থান করেন। তৃতীয় ধ্যানস্তরে যাহা কিছু উপেক্ষা, সুখ, স্মৃতি, সম্প্রজ্ঞান, চিত্তের একাগ্রতা… বহুলকারী হন।

পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র (সর্বদৈহিক) সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করিয়া পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্য অস্তমিত করিয়া, না-দুঃখ-না-সুখ, উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যানস্তরে উপনীত হইয়া বিহার করেন। চতুর্থ ধ্যানস্তরে যাহা কিছু উপেক্ষা, না-দুঃখ-না-সুখদায়ক বেদনা, চিত্তের অনাভোগ (চিত্তের নিষ্ক্রিয়তা), স্মৃতি, পারিশুদ্ধি, চিত্তের একাগ্রতা… বহুলীকার হন।

পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র সর্বাংশে রূপসংজ্ঞা অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘসংজ্ঞা অস্তমিত করিয়া, নানাত্ব-সংজ্ঞা মনন না করিয়া, ‘আকাশ অনন্ত’-এইরূপ ভাবিয়া আকাশ-অনন্ত-আয়তন নামক সমাপত্তি (প্রথম অরূপধ্যানন্তর) লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন। আকাশ-অনন্ত-আয়তন সমাপত্তি স্তরে যাহা কিছু আকাশ-অনন্ত-আয়তন-সংজ্ঞা, চিত্তের একাগ্রতা… বহুলকারী হন।

পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র সর্বাংশে আকাশ-অনন্ত-আয়তন সমাপত্তি অতিক্রম করিয়া, ‘বিজ্ঞান অনন্ত’ এইরূপ ভাবিয়া বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন নামক সমাপত্তি (দ্বিতীয় অরূপধ্যানস্তর) লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন। বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন সমাপত্তি স্তরে যাহা কিছু বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন-সংজ্ঞা, চিত্তের একাগ্রতা… বহুলকারী হন।

পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র সর্বাংশে বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন সমাপত্তি অতিক্রম করিয়া, ‘কিছুই নাই’ এইরূপ ভাবিয়া আকিঞ্চন-আয়তন নামক সমাপত্তি (তৃতীয় অরূপধ্যানস্তর) লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন। আকিঞ্চন-আয়তন সমাপত্তিস্তরে যাহা কিছু আকিঞ্চন-আয়তন-সংজ্ঞা, চিত্তের একাগ্রতা… বহুলকারী হন।

পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র সর্বাংশে আকিঞ্চন-আয়তন সমাপত্তি অতিক্রম করিয়া নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন নামক সমাপত্তি (চতুর্থ অরূপধ্যানস্তর) লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন। তিনি সেই সমাপত্তি হইতে স্মৃতিমান হইয়া আরোহণ করেন। তিনি সেই সমাপত্তি হইতে স্মৃতিমান হইয়া আরোহণ করিয়া যাহা কিছু অতীত, নিরুদ্ধ, বিপরিণত তাহা সম্যকভাবে দর্শন করেন-এই সকল ধর্মে অনুপায়, অনপায়… বহুলকারী হন।

পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্র সর্বাংশে নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন সমাপত্তি অতিক্রম করিয়া সংজ্ঞাবেদয়িত নিরোধ নামক সমাপত্তি (পঞ্চম অরূপধ্যানস্তর) লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন। প্রজ্ঞার দ্বারা দর্শনহেতু আসব বিনষ্ট হয়। তিনি সেই সমাপত্তি হইতে স্মৃতিমান হইয়া আরোহণ করেন এবং তাহা হইতে আরোহণ করিয়া যাহা কিছু অতীত, নিরুদ্ধ… বহুলকারী হন।

হে ভিক্ষুগণ, কাহারো সম্পর্কে, সম্যকভাবে বলিতে গেলে বলা যায় আর্যের শীলে বশীপ্রাপ্ত, পারমীপ্রাপ্ত, আর্যের সমাধিতে বশীপ্রাপ্ত, পারমীপ্রাপ্ত, আর্যের সংজ্ঞা ও বিমুত্তিতে বশীপ্রাপ্ত, পারমীপ্রাপ্ত, তেমনি সারিপুত্র সম্পর্কেও সম্যকভাবে বলা যায় আর্যে, শীলে, সমাধিতে, প্রজ্ঞায় ও বিমুক্তিতে বশীপ্রাপ্ত, পারমীপ্রাপ্ত।

হে ভিক্ষুগণ, অন্য কিছু সম্পর্কে যেমন সম্যকভাবে বলা যায়-ভগবানের ঔরসজাত মুখ হইতে জাত পুত্র ধর্মজ, ধর্মনিমিত্ত, ধর্মদায়াদ, আমিষদায়াদ নহে, সারিপুত্র সম্পর্কেই এইরূপ বলা যায়-ভগবানের… আমিষদায়াদ নহে।

হে ভিক্ষুগণ, সারিপুত্রই তথাগত প্রবর্তিত ধর্মচক্রকে অনুপ্রবর্তন করিয়াছিলেন।

ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ প্রসন্নমনে ভগবানের ভাষণে আনন্দ প্রকাশ করিলেন।

অনুপদ সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৩]