আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
এক সময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের আরামে অবস্থান করিতেছিলেন। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, “হে ভিক্ষুগণ” “হ্যাঁ ভদন্ত” বলিয়া ভিক্ষুগণ ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন। ভগবান বলিলেন, আমি তোমাদের নিকট সেবিতব্য-অসেবিতব্য ধর্মপর্যায় দেশনা করিব। তোমরা উত্তমরূপে মনোযোগ-সহকারে শ্রবণ করো। আমি ভাষণ দিতেছি। ভিক্ষুগণ “হ্যাঁ ভদন্ত” বলিয়া প্রত্যুত্তর দিলেন। ভগবান বলিলেন :
হে ভিক্ষুগণ, আমি কায়-সমাচার (কায়িক শিষ্টাচার) সেবিতব্য (অনুসরণযোগ্য) ও অসেবিতব্য এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি এবং তাহাই পরস্পর কায়-সমাচার। এইভাবে আমি বলি দ্বিবিধ সেবিতব্য ও অসেবিতব্য বাক্-সমাচার, দ্বিবিধ মনো-সমাচার, দ্বিবিধ কুশলাধর্মে চিত্তোৎপাদ (চিত্তবৃত্তি) দ্বিবিধ সংজ্ঞা প্রতিলাভ, দ্বিবিধ দৃষ্টি প্রতিলাভ, দ্বিবিধ আত্মভাব প্রতিলাভ; যথা : সেবিতব্য ও অসেবিতব্য।
ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইলে আয়ুষ্মান সারিপুত্র ভগবানকে বলিলেন, ভদন্ত, ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্ত ভাষণের বিস্তারিত অর্থ যাহা পরিপূর্ণরূপে ব্যাখ্যাত হয় নাই, তাহা আমি এইরূপ জানি : ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে : ‘হে ভিক্ষুগণ, আমি কায়-সমাচার… পরস্পর কায়-সমাচার।’ কী হেতু ইহা উক্ত হইয়াছে? যেইরূপ কায়-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম অভিবর্ধিত হয় এবং কুশল হ্রাস প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ কায়-সমাচার সেবিতব্য নহে। যেরূপ কায়-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয় এবং কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় সেইরূপ কায়-সমাচার সেবিতব্য। ভদন্ত, কিরূপ কায়-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম বর্ধিত হয় এবং কুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয়? এখানে কেহ কেহ প্রাণঘাতী, রুদ্রপ্রকৃতি, লোহিতপাণি, হনন ও প্রহার কার্যে নিবিষ্ট, সকল জীবের প্রতি দয়াহীন হয়, তাহারা অদত্তগ্রাহী হয়, যাহা পরস্ব, পরবিত্ত-উপকরণ, গ্রামগত অথবা অরণ্যগত যে অদত্ত বস্তুর গ্রহণ চৌর্য বলিয়া অভিহিত হয়, উহার গ্রহীতা হয়। কামে মিথ্যাচারী (ব্যভিচারী) হয়, মাতৃরক্ষিতা, পিতৃরক্ষিতা, ভ্রাতৃরক্ষিতা, ভগিনীরক্ষিতা, সধবা, দণ্ডবারিতা, অথবা এমনকি মাল্যার্পণ দ্বারা বাগ্দত্তা, এইরূপ কোনো নারীতে ব্যভিচারে রত হয়। ভদন্ত, এইরূপ কায়-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম বর্ধিত হয় এবং কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়।
ভদন্ত, কিরূপ কায়-সমাচার অনুসরণ (পালন করিলে) অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় এবং কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়? ভদন্ত, এখানে কেহ কেহ প্রাণিহত্যা পরিত্যাগ করিয়া প্রাণিহত্যা হইতে প্রতিবিরত হন, নিহিতদণ্ড, নিহিতশস্ত্র, লজ্জী, দয়ালু, সর্বজীবের হিতানুকম্পী হইয়া বিহার করেন, অদত্তগ্রহণ পরিত্যাগ করিয়া অদত্তগ্রহণ হইতে প্রতিবিরত হন, যাহা পরস্ব পরবিত্ত-উপকরণ, গ্রামগত অথবা অরণ্যগত যাহার গ্রহণ চৌর্য বলিয়া অভিহিত হয় তাহার গ্রহীতা হন না, ব্যভিচার (কামে মিথ্যাচার) পরিত্যাগ করিয়া ব্যভিচার হইতে প্রতিবিরত হন, এবং মাতৃরক্ষিতা, পিতৃরক্ষিতা, ভ্রাতৃরক্ষিতা, ভগিনীরক্ষিতা, জ্ঞাতিরক্ষিতা, সধবা, দণ্ডবারিতা এমনকি মাল্যার্পণ দ্বারা বাগ্দত্তা এইরূপ নারীতে ব্যভিচারে রত হন না। ভদন্ত, এইরূপে… কুশলধর্ম বর্ধিত হয়।
হে ভিক্ষুগণ, “আমি কায়-সমাচার… পরস্পর কায়-সমাচার” এই কারণেই ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে।
ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে : “হে ভিক্ষুগণ, আমি বাক্-সমাচার… পরস্পর বাক্-সমাচার।” কী কারণে ইহা উক্ত হইয়াছে? যেইরূপ বাক্-সমাচার অনুসরণ (পালন) করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ বাক্-সমাচার সেবিতব্য নহে এবং যেরূপ বাক্-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়, সেইরূপ বাক্-সমাচার সেবিতব্য।
ভদন্ত, কিরূপ বাক্-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম-হ্রাস প্রাপ্ত হয়? এখানে কেহ কেহ মিথ্যাবাদী হয়, সভাগত, পরিষদগত, জ্ঞাতিমধ্যগত, পূগমধ্যগত (শ্রেণি বা দলমধ্যগত), রাজকুলমধ্যগত, সাক্ষীরূপে আনীত হইয়া “মহাশয়, যাহা জানো তাহা বলো” এইরূপে প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে সে না জানিয়া বলে, ‘জানি’ এবং জানে অথচ বলে, ‘জানি না’, দেখে নাই অথচ বলে, ‘দেখিয়াছি’ এবং দেখিয়াছে অথচ বলে, ‘দেখি নাই’, ইত্যাদিভাবে আত্ম-হেতু, পর-হেতু অথবা যৎ কিঞ্চিৎ লাভহেতু সজ্ঞানে মিথ্যাকথা বলে। সে পিশুনভাষী হয়, এখানে কিছু শুনিয়া সেখানে যাইয়া কথা বলে, ইহাদের মধ্যে ভেদ ঘটাইবার জন্য। সেখানে কিছু শুনিয়া ইহাদের বলে, ইহাদের মধ্যে ভেদ ঘটাইবার জন্য। এইভাবে সংহতের মধ্যে ভেত্তা (বিভেদকারী), ভিন্নদের মধ্যে ভেদ বিষয়ে উৎসাহদাতা, বর্গারাম, বর্গরত ও বর্গনন্দি হইয়া বর্গকরণী (ভেদকরণী) বাক্যের বক্তা হয়, সে পুরুষভাষী হয়, যে বাক্য অ-ক (বিরক্তিকর) কর্কশ, পরের নিকট কটু, পরের মর্মবিদ্ধকারী, ক্রোধোদ্দীপক, সমাধি প্রতিকুল, সেইরূপ বাক্যের বক্তা হয়, সম্প্রলাপী, অকালবাদী, অভূতবাদী, অনর্থবাদী, অধর্মবাদী, অবিনয়বাদী হয়, অনুপযুক্তকালে প্রণিধানযোগ্য বাক্যের বক্তা হয় যে বাক্য অশাস্ত্রীয়, অপ্রাসঙ্গিক ও অনর্থযুক্ত। ভদন্ত, এইরূপ বাক্-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম প্রবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয়।
ভদন্ত, কিরূপ বাক্-সমাচার অনুসরণ (পালন করিলে) অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম প্রবর্ধিত হয়? এখানে কেহ কেহ মিথ্যাভাষণ পরিত্যাগ করিয়া মিথ্যাভাষণ হইতে প্রতিবিরত হন, সভামধ্যগত, পরিষদ্গত, জ্ঞাতিমধ্যগত, পূগমধ্যগত, রাজকুলমধ্যাগত, সাক্ষীরূপে আনীত হইয়া “মহাশয় যাহা জানো তাহা বলো” এইরূপে প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে, তিনি যাহা জানেন না তাহা ‘আমি জানি না’ বলেন এবং জানিলে বলেন, ‘আমি জানিয়াছি’, না দেখিলে বলেন, ‘আমি দেখি নাই’ এবং দেখিলে বলেন, ‘আমি দেখিয়াছি’-এইভাবে আত্মহেতু, পরহেতু, যৎকিঞ্চিৎ লাভ-হেতু সজ্ঞানে মিথ্যাভাষী হন না। তিনি পিশুন বাক্য হইতে প্রতিবিরত হন, এখানে কিছু শুনিয়া তাহা সেখানে বলেন না। ইহাদের মধ্যে ভেদ ঘটাইবার জন্য সেখানে কিছু শুনিয়া তাহা এখানে বলেন না তাহাদের মধ্যে ভেদ ঘটাইবার জন্য, এইভাবে ভিন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে মিলনকারী, সংহতদের উৎসাহদাতা, সমগ্ররাম, সমগ্ররত, সমগ্রনন্দি হইয়া সমগ্রকরণী বাক্যের বক্তা হন। তিনি পুরুষবাক্য পরিত্যাগ করিয়া পুরুষবাক্য হইতে প্রতিবিরত হন। যে বাক্য নির্দোষ, কর্ণসুখকর (শ্রুতিমধুর), প্রীতিকর, হৃদয়গ্রাহী, পুরজনোচিত (ভদ্র), বহুজনকান্ত, বহুজনমনোজ্ঞ তদ্রূপ বাক্যের বক্তা হন। সম্প্রলাপ পরিত্যাগ করিয়া সম্প্রলাপ হইতে প্রতিবিরত হন, কালবাদী, ভূতবাদী, যথার্থবাদী, ধর্মবাদী, বিনয়বাদী হন, যথাকালে প্রণিধানযোগ্য বাক্যের বক্তা হন, যে বাক্য শাস্ত্রীয় প্রাসঙ্গিক ও অর্থযুক্ত। ভদন্ত, এইরূপ বাক্-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়।
“হে ভিক্ষুগণ, আমি বাক্-সমাচার… পরস্পর বাক্-সমাচার এই কারণে ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে।
“হে ভিক্ষুগণ, আমি মনো-সমাচার সেবিতব্য ও অসেবিতব্য এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি এবং তাহাই পরস্পর মনো-সমাচার,” এইভাবে ভগবান কর্তৃক উক্ত হইয়াছে। কী কারণে ইহা উক্ত হইয়াছে? ভদন্ত, যেরূপ মনো-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়… অসেবিতব্য যেরূপ মনো-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়… সেবিতব্য।
ভদন্ত, কিরূপ মনো-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয়? এখানে কেহ কেহ অভিধ্যালু (লোভী) হয়, যাহা পরস্ব, পরবিত্ত-উপকরণ, তাহাতে লোলুপ হয় : “অহো, অপর ব্যক্তির যাহা কিছু তাহা যদি আমার হইত!” ব্যাপন্নচিত্ত হয়, প্রদুষ্টমনে এই সংকল্প করে : এই সত্ত্বগণ হত হউক, বধ ও উচ্ছিন্ন হউক, বিনাশ-প্রাপ্ত হউক ও ভালো কিছু না হউক। ভদন্ত, এইরূপ মনো-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। কিরূপ মনো-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়? ভদন্ত, এখানে কেহ কেহ অনভিধ্যালু (নির্লোভ) হন, যাহা কিছু পরস্ব, পরবিত্ত-উপকরণ-‘অহো, যাহা কিছু পরস্ব পরবিত্ত-উপকরণ, যাহা কিছু পরস্ব তাহা আমার হউক’-এইরূপ ভাবিয়া তাহাতে লোলুপ হন না। অব্যাপন্নচিত্ত হন, অপ্রদুষ্ট মনে সংকল্প করেন-‘এই সত্ত্বগণ বৈরীহীন, বিঘ্নহীন ও সুখী হইয়া নিজেদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করুন।’ ভদন্ত, এইরূপ মনো-সমাচার অনুসরণ… কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়।
হে ভিক্ষুগণ, আমি মনো-সমাচার… পরস্পর মনো-সমাচার এই কারণেই ভগবান এইরূপ বলিয়াছেন।
ভগবান এইরূপ বলিয়াছেন : হে ভিক্ষুগণ, চিত্তোৎপাদ সেবিতব্য ও অসেবিতব্য এবং এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি এবং তাহাই পরস্পর চিত্তোৎপাদ। কী কারণে ইহা উক্ত হইয়াছে? ভদন্ত, যেরূপ চিত্তোৎপাদ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম-পরিবর্ধিত… কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়, সেরূপ চিত্তোৎপাদ সেবিতব্য।
ভদন্ত, কিরূপ চিত্তোৎপাদ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম-হ্রাসপ্রাপ্ত হয়? এখানে কেহ কেহ অভিধ্যালু হয়, অভিধ্যা-সহগত চিত্তে বিহার করে, ব্যাপাদবান হয়, ব্যাপাদ-সহগত চিত্তে বিহার করে, বিহিংসাপরায়ণ হয়, বিহিংসা-সহগত চিত্তে বিহার করে। ভদন্ত, এইরূপ চিত্তোৎপাদ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। কিরূপ চিত্তোৎপাদ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয় এবং কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়? এখানে কেহ কেহ অনভিধ্যালু হন, অনভিধ্যা-সহগত চিত্তে বিহার করেন। অব্যাপাদবান হন, অব্যাপাদ-সহগত চিত্তে বিহার করেন এবং অবিহিংসা পরায়ণ হন বা অবিহিংসা-সহগত চিত্তে বিহার করেন। ভদন্ত, এইরূপ চিত্তোৎপাদ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়।
“হে ভিক্ষুগণ, আমি চিত্তোৎপাদ… দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি এবং তাহা পরস্পর চিত্তোৎপাদ” এই কারণেই ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে।
“হে ভিক্ষুগণ, আমি সংজ্ঞা প্রতিলাভ সেবিতব্য ও অসেবিতব্য এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি এবং তাহা পরস্পর সংজ্ঞা প্রতিলাভ ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে। কী কারণে ইহা উক্ত হইয়াছে? ভদন্ত, যেরূপ সংজ্ঞা প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত… অসেবিতব্য সংজ্ঞা প্রতিলাভ। যেরূপ সংজ্ঞা প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়… সেবিতব্য সংজ্ঞা প্রতিলাভ। ভদন্ত, কিরূপ সংজ্ঞা প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়? এখানে কেহ কেহ অভিধ্যালু হয়, অভিধ্যা-সহগত সংজ্ঞায় বিহার করে, ব্যাপাদবান হয়, ব্যাপাদ-সহগত সংজ্ঞায় বিহার করে, বিহিংসাপরায়ণ হয়, বিহিংসা-সহগত সংজ্ঞায় বিহার করে-এইরূপ সংজ্ঞা প্রতিলাভ অনুসরণ… কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। ভদন্ত, সংজ্ঞা প্রতিলাভ অনুসরণ… কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। ভদন্ত, কিরূপ সংজ্ঞা প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়? ভদন্ত, এখানে কেহ কেহ অনভিধ্যালু হন, অনভিধ্যা-সহগত সংজ্ঞায় বিহার করেন… অব্যাপাদ… অবিহিংসা… কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়।
এই কারণেই ভগবান কর্তৃক উক্ত হইয়াছে “ভিক্ষুগণ, আমি সংজ্ঞা প্রতিলাভ… পরস্পর সংজ্ঞা প্রতিলাভ।”
“হে ভিক্ষুগণ, আমি দৃষ্টিপ্রতিলাভ সেবিতব্য ও অসেবিতব্য এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি এবং তাহা পরস্পর দৃষ্টিপ্রতিলাভ” ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে। কী কারণে এইরূপ উক্ত হইয়াছে… এইরূপ দৃষ্টি প্রতিলাভ সেবিতব্য। ভদন্ত, কিরূপ দৃষ্টি প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় এবং কুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয়? এখানে কেহ কেহ এইরূপ দৃষ্টি-সম্পন্ন (মিথ্যামতবাদী) : দান নাই, ইষ্ট (যজ্ঞে সমর্পিত) নাই, হোত্র নাই, সুকৃত-দুষ্কৃত কর্মের ফল ও বিপাক নাই, ইহলোক নাই, পরলোক নাই। মাতা নাই, পিতা নাই, ঔপপাতিক সত্ত্ব নাই, সম্যকগত, সম্যক প্রতিপন্ন এমন কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ নাই যিনি ইহলোক ও পরলোক স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎ করিয়া (উপলব্ধি করিয়া) প্রকাশ করিতে পারেন। ভদন্ত, এইরূপ দৃষ্টি প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয়। কিরূপ দৃষ্টি প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়? ভদন্ত এখানে কেহ কেহ এরূপ দৃষ্টিসম্পন্ন হন : দান আছে, ইষ্ট আছে, হোত্র আছে। সুকৃত-দুষ্কৃত কর্মের ফল ও বিপাক আছে, ইহলোক আছে, পরলোক আছে, মাতা আছে, পিতা আছে, ঔপপাতিক সত্ত্ব আছে, পৃথিবীতে সম্যক প্রতিপন্ন এমন শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যিনি ইহলোক ও পরলোক স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করিতে পারেন। এইরূপ দৃষ্টিপ্রতিলাভ… কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়। হে ভিক্ষুগণ, আমি… পরস্পর দৃষ্টিপ্রতিলাভ” বলিয়া ভগবান যাহা বলিয়াছেন তাহা এই কারণেই উক্ত হইয়াছে।
“হে ভিক্ষুগণ, আমি আত্মভাব (শরীর) প্রতিলাভ সেবিতব্য ও অসেবিতব্য এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি এবং তাহা পরস্পর আত্মভাব প্রতিলাভ।” ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে। কী কারণে ইহা উক্ত হইয়াছে? ভদন্ত, যেরূপ আত্মভাব প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে… অসেবিতব্য… সেবিতব্য। কিরূপ আত্মভাব প্রতিলাভ অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়? ভদন্ত, ক্ষতিকর আত্মভাব প্রতিলাভ উৎপাদনের জন্য এবং অপরিনিষ্ঠিতভাবে (অসম্পূর্ণতার) জন্য অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় ও কুশলভাব হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। কিরূপ আত্মভাব প্রতিলাভ অনুসরণ… কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়? ক্ষতিকর আত্মভাব প্রতিলাভ অনুৎপাদনের এবং পরিনিষ্ঠিত ভাবের (সম্পূর্ণত) জন্য অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়। এই কারণেই ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে : “হে ভিক্ষুগণ, আমি… পরস্পর আত্মভাব প্রতিলাভ।”
ভদন্ত, ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্ত ভাষণের বিস্তারিত অর্থ যাহা সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যাত হয় নাই তাহা আমি এইরূপ জানি। উত্তম, উত্তম, সারিপুত্র, তুমি মদীয় সংক্ষিপ্ত ভাষণের যাহা বিশ্লেষণ করা হয় নাই তাহার এইরূপ বিস্তারিত অর্থ এইরূপ জান।
“হে ভিক্ষুগণ, আমি কায়-সমাচার… পরস্পর কায়-সমাচার”-আমার দ্বারা ইহা উক্ত হইয়াছে। কী কারণে ইহা উক্ত হইয়াছে? সারিপুত্র, যেরূপ কায়-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত… কায়-সমাচার সেবিতব্য। সারিপুত্র, কিরূপ কায়-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় এবং কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়? সারিপুত্র, এখানে কেহ কেহ প্রাণঘাতী, রুদ্রপ্রকৃতি… কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। সারিপুত্র, কিরূপ কায়-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ও কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়? এখানে কেহ কেহ পরিত্যাগ করিয়া… কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়। হে ভিক্ষুগণ, আমি কায়-সমাচার… তাহা পরস্পর কায়-সমাচার” এই আমার দ্বারা ইহা উক্ত হইয়াছে এই কারণেই।
“হে ভিক্ষুগণ, আমি বাক্-সমাচার… তাহা পরস্পর” বাক্-সমাচার আমার দ্বারা উক্ত হইয়াছে। কী কারণে ইহা উক্ত হইয়াছে? সারিপুত্র, যেরূপ বাক্-সমাচার অনুসরণ করিলে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়… অসেবিতব্য… সেবিতব্য। কীরূপ বাক্-সমাচার অনুসরণ… তাহা পরস্পর আত্মভাব প্রতিলাভ, এই কারণেই আমার দ্বারা ইহা উক্ত হইয়াছে।
সারিপুত্র, আমার সংক্ষিপ্তভাবে ভাষণের বিস্তারিত অর্থ এইরূপ দ্রষ্টব্য।
সারিপুত্র, আমি চক্ষুবিজ্ঞেয় রূপ সেবিতব্য ও অসেবিতব্য, এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি, শ্রোতবিজ্ঞেয় শব্দ, ঘ্রাণবিজ্ঞেয় গন্ধ, জিহ্বাবিজ্ঞেয় রস, কায়বিজ্ঞেয় স্প্রষ্টব্য, মনোবিজ্ঞেয় ধর্ম, প্রত্যেকটি সেবিতব্য ও অসেবিতব্য-এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি।
এইরূপ উক্ত হইলে আয়ুষ্মান সারিপুত্র ভগবানকে এইরূপ বলিলেন, ভদন্ত, ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্ত ভাষণের বিস্তারিত অর্থ যাহা পূর্বে ব্যাখ্যাত হয় নাই তাহার বিস্তারিত অর্থ এইরূপ জানি।
“সারিপুত্র, আমি চক্ষুবিজ্ঞেয় রূপ… শ্রোত্রবিজ্ঞেয় শব্দ, ঘ্রাণবিজ্ঞেয় গন্ধ,… জিহ্বাবিজ্ঞেয় রস… কায়বিজ্ঞেয় স্প্রষ্টব্য… মনোবিজ্ঞেয় ধর্ম সেবিতব্য ও অসেবিতব্য এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি” যাহা ভগবান কর্তৃক এইরূপ উক্ত হইয়াছে তাহা এই কারণেই ভদন্ত।
ভগবান কর্তৃক পূর্বে ব্যাখ্যাত সংক্ষিপ্ত ভাষণের বিস্তারিত অর্থ-আমি এইরূপ জানি। উত্তম সারিপুত্র, উত্তম, তুমি আমার পূর্বে অব্যাখ্যাত সংক্ষিপ্ত ভাষণের বিস্তারিত অর্থ এইরূপ জান।
“সারিপুত্র, আমি চক্ষুবিজ্ঞেয় রূপ, সেবিতব্য ও অসেবিতব্য, এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি।” ইহা আমার দ্বারা উক্ত হইয়াছে। “কী কারণে ইহা উক্ত হইয়াছে? যেরূপ… মনোবিজ্ঞেয় কর্ম সেবিতব্য ও অসেবিতব্য, এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি” এইরূপে যাহা আমার দ্বারা উক্ত হইয়াছে তাহা এই কারণেই।
সারিপুত্র, আমার সংক্ষিপ্ত ভাষণের বিস্তারিত অর্থ এইরূপ দ্রষ্টব্য।
সারিপুত্র, আমি চীবর… ভিক্ষান্ন… বাসস্থান… গ্রাম, নিগম, নগর, জনপদ, পুদ্গল, ইহাদের প্রত্যেকটি সেবিতব্য ও অসেবিতব্য, এই দুই প্রকার বলিয়া প্রকাশ করি।
এইরূপ উক্ত হইলে আয়ুষ্মান সারিপুত্র ভগবানকে বলিলেন, ভদন্ত ভগবানের এই সংক্ষিপ্ত ভাষণের… জানি :
“সারিপুত্র, আমি… প্রকাশ করি,” এই কারণেই ভগবান কর্তৃক ইহা উক্ত হইয়াছে। ভিক্ষান্ন, বাসস্থান, গ্রাম, নিগম, নগর, জনপদ, পুদ্গল সম্পর্কেও এইরূপ।
সারিপুত্র, সকল ক্ষত্রিয়ের দীর্ঘদিন হিত ও সুখের জন্য আমার সংক্ষিপ্ত ভাষণের বিস্তারিত অর্থ জানিতে পারেন। ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক, শ্রমণ-ব্রাহ্মণম-ল, দেবমনুষ্য সম্পর্কে এইরূপ।
ভগবান এইরূপ বলিলেন। আয়ুষ্মান সারিপুত্র ভগবাণের ভাষণের আনন্দ প্রকাশ করিলেন।
সেবিতব্য-অসেবিতব্য সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৩]
English
Việt Ngữ