লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৫]

দেবদূত সূত্র

আমি এইরূপ শুনিয়াছি।

এক সময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের আরামে। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ,’ ‘হ্যাঁ ভদন্ত’ বলিয়া ভিক্ষুগণ ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন। ভগবান বলিলেন, যেমন, ভিক্ষুগণ, দ্বারবিশিষ্ট দুইটি গৃহ আছে। তথায় চক্ষুষ্মান পুরুষ উভয়ের মধ্যে অবস্থিত হইয়া দেখিতে পায় কিরূপে মনুষ্যগণ গৃহে প্রবেশ করিতেছে, গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতেছে, গৃহমধ্যে পাদচারণ ও চলাফেরা করিতেছে। ভিক্ষুগণ, ঠিক এইরূপে, আমি দিব্যচক্ষুতে, বিশুদ্ধ লোকাতীত দৃষ্টিতে দেখিতে পাই : সত্ত্বগণ চ্যুত হইতেছে, উৎপন্ন হইতেছে, স্ব স্ব কর্মানুসারে হীনোৎকৃষ্ট যোনি, সুবর্ণ, দুবর্ণ, সুগতি, দুর্গতি প্রাপ্ত হইতেছে, এই সকল সত্ত্ব কায়-সুচরিত, বাক্‌-সুচরিত, মনো-সুচরিত দ্বারা সমন্বিত হইয়া, আর্যদের নিন্দাকারী না হইয়া, সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন হইয়া ও সম্যক দৃষ্টি অনুযায়ী কর্মসম্পাদন করিয়া দেহাবসানে মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হন। এই সকল সত্ত্ব কায়-দুশ্চরিত, বাক্‌-দুশ্চরিত, মনো-দুশ্চরিত দ্বারা সমন্বিত হইয়া আর্যদের নিন্দাকারী, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন হইয়া ও মিথ্যাদৃষ্টি-হেতু কর্মসম্পাদন করিয়া দেহাবসানে মৃত্যুর পর প্রেতলোকে উৎপন্ন হয়। এই সকল সত্ত্ব কায়-দুশ্চরিত… মৃত্যুর পর তির্যক যোনিতে উৎপন্ন উৎপন্ন হয়। এই সকল সত্ত্ব কায়-দুশ্চরিত… অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে (নরকে) উৎপন্ন হয়। ভিক্ষুগণ, নিরয়পালগণ তাহাকে বাহুতে ধরিয়া যম রাজার নিকট উপস্থিত করিয়া বলিল, দেব, এই ব্যক্তি মাতাকে শ্রদ্ধা করে না, শ্রামণ্যকে শ্রদ্ধা করে না, ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা করে না, পরিবারের জ্যেষ্ঠদের সম্মান করে না, দেব, ইহাকে দণ্ড বিধান করুন।

তখন যমরাজা প্রথম দেবদূত সম্পর্কে সমনুযুক্ত, সমনুগ্রাহী এবং সমনুভাষী হইয়া বলিলেন, ওহে, তুমি কি প্রথম দেবদূতকে মনুষ্যলোকে আবির্ভূত হইতে দেখিয়াছ? সে এইরূপ বলিল, ‘ভদন্ত, আমি দেখি নাই।’ তখন, ভিক্ষুগণ, যমরাজা এইরূপ বলিলেন, ‘ওহে, তুমি মানুষের মধ্যে একটি শিশুকে তাহার মলমূত্রের মধ্যে শায়িত দেখিয়াছ?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি দেখিয়াছি।’ তখন যমরাজা এইরূপ বলিলেন, ওহে, যদিও তুমি বিজ্ঞ, স্মৃতিমান ও বৃদ্ধ, তোমার কি এই কথা মনে হয় নাই-‘আমিও জন্মের অধীন, আমি জন্ম অতিক্রম করি নাই, এখন আমি কায়-মনো-বাক্যে কল্যাণ সমপাদন করিব?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি সক্ষম হই নাই, আমি প্রমাদগ্রস্ত ছিলাম।’ তখন যমরাজা তাহাকে এইরূপ বলিলেন, ‘ওহে, প্রমাদগ্রস্ত হইয়া তুমি কায়-মনো-বাক্যে কল্যাণ সম্পাদন করো নাই, ওহে, নিশ্চয়ই তুমি প্রমত্ততানুযায়ী সেইরূপ কাজ করিয়াছ। এই পাপকর্ম তোমারই, উহা তোমার মাতা, পিতা, ভ্রাতা, ভগিনী, মিত্র-অমাত্য দ্বারা কৃত হয় নাই, জ্ঞাতি, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ ও দেবতাদের দ্বারাও কৃত হয় নাই, তোমার দ্বারাই এই পাপকর্ম কৃত হইয়াছে। তুমিই ইহার বিপাক (ফল) অনুভব করিবে।’

ভিক্ষুগণ, তখন যমরাজা প্রথম দেবদূত সম্পর্কে সমনুযুক্ত, সমনুগ্রাহী ও সমনুভাষী হইয়া দ্বিতীয় দেবদূত সম্পর্কে সমনুযুক্ত, সমনুগ্রাহী ও সমনুভাষী হইলেন : ‘ওহে, তুমি কি দ্বিতীয় দেবদূতকে মনুষ্যলোকে আবির্ভূত হইতে দেখো নাই?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি দেখি নাই।’ তখন যমরাজা বলিলেন, ‘ওহে, তুমি কি দেখো নাই যে মানুষের মধ্যে স্ত্রী বা পুরুষকে অশীতি বয়স্করূপে, নবতি বয়স্করূপে অথবা শতবর্ষিকরূপে জীর্ণ, শীর্ণ, কুঁজোদেহ, শিথিলকলেবর, যষ্টিহস্ত, গমনে কম্পমান, আতুর, গতযৌবন, খণ্ডদন্ত, পক্বকেশ, বিরলকেশ, স্খলিতশির, লোলচর্ম ও তিলকাহত গাত্ররূপে?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি দেখিয়াছি।’ তখন যমরাজা তাহাকে বলিলেন, “ওহে, যদিও তুমি বিজ্ঞ, স্মৃতিমান ও বয়স্ক, তোমার কি এই কথা মনে হয় নাই-আমিও জরাগ্রস্ত হইতে পারি, আমি জরার অতীত নহি, এখন আমি কায়-মনো-বাক্যে কল্যাণ সম্পাদন করিব?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি সক্ষম হই নাই, আমি প্রমাদগ্রস্ত ছিলাম।’ তখন যমরাজা তাহাকে বলিলেন, ওহে, প্রমাদগ্রস্ত হইয়া তুমি… বিপাক অনুভব করিবে।’

অতঃপর ভিক্ষুগণ, যমরাজা দ্বিতীয় দেবদূত সম্পর্কে… তৃতীয় দেবদূত সম্পর্কে… সমনুভাষী হইলেন-‘ওহে, তুমি কি তৃতীয় দেবদূতকে মনুষ্যলোকে আবির্ভূত হইতে দেখিয়াছ?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি দেখি নাই।’ তখন যমরাজা তাহাকে বলিলেন, ‘ওহে, তুমি কি দেখো নাই যে মানুষের মধ্যে স্ত্রী বা পুরুষকে যে ব্যাধিগ্রস্ত, দুঃখপ্রাপ্ত, উৎকট রোগগ্রস্ত হইয়াছে, স্বীয় মলমূত্রে পড়িয়া আছে, এমতাবস্থায় অপরে তাহাকে তুলিয়া উঠাইতেছে, অপরে তাহাকে শোয়াইয়া দিতেছে?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি দেখিয়াছি।’ তখন যমরাজা তাহাকে বলিলেন, ‘ওহে,… বিপাক অনুভব করিবে।’

অতঃপর ভিক্ষুগণ, যমরাজা তৃতীয় দেবদূত সম্পর্কে… চতুর্থ দেবদূত সম্পর্কে… ওহে, তুমি কি দেখো নাই রাজগণ দুষ্কৃতকারী চোরকে ধৃত করিয়া… শিরচ্ছেদ করিতেছেন?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, ‘আমি দেখিয়াছি।’

তখন যমরাজা তাহাকে বলিলেন, ‘যদিও তুমি বিজ্ঞ, স্মৃতিমান ও বয়স্ক, তোমার কি এই কথা মনে হয় নাই-যাহারা পাপকর্ম করে তাহারা হইজীবনেই বিবিধ শাস্তি ভোগ করে, পরবর্তী জীবনের কথা বলাই বাহুল্য, এখন আমি সক্ষম হই নাই… বিপাক অনুভব করিবে।’

অতঃপর ভিক্ষুগণ, যমরাজা চতুর্থ দেবদূত সম্পর্কে… হইয়া পঞ্চম দেবদূত সম্পর্কে… ‘ওহে, তুমি কি দেখো নাই যে মানুষের মধ্যে স্ত্রী বা পুরুষকে যাহার মৃতদেহ মাত্র একদিন, কী দুই দিন, কী তিন দিন হইল, স্ফীত, বিবর্ণ ও পুযযুক্ত হইয়াছে?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি দেখিয়াছি।’ তখন যমরাজা তাহাকে বলিলেন, ওহে, যদিও তুমি বিজ্ঞ… মনে হয় নাই ‘আমি মৃত্যুর অধীন, আমি মৃত্যুকে অতিক্রম করি নাই, এখন আমি… বিপাক অনুভব করিবে।’

ভিক্ষুগণ, তখন যমরাজা পঞ্চম দেবদূত সম্পর্কে সমনুযুক্ত, সমনুগ্রাহী ও সমনুভাষী হইয়া তূষ্ণীভাব ধারণ করিলেন।

ভিক্ষুগণ, তখন নিরয়পালগণ তাহার উপর পঞ্চবিধ শাস্তি… শতযোজন বিস্তৃত।

ভিক্ষুগণ, সেই মহানিরয়ের পূর্বদিকের ভিত্তি হইতে অর্চি (বহ্নিশিখা) উঠিয়া পশ্চিমদিকের ভিত্তিতে (প্রাচীরে) প্রতিহত হয়, পশ্চিমদিকের… উত্তরদিকের… দক্ষিণদিকের… অধ হইতে… উপর হইতে নীচে প্রতিহত হয়। সে তথায় দুঃখ, তীব্র, কটুক বেদনা অনুভব করে এবং যতদিন পাপকর্ম ক্ষয়প্রাপ্ত না হয় ততদিন তাহার মৃত্যু হয় না।

ভিক্ষুগণ, দীর্ঘকাল অন্তর কদাচিৎ কখন সময় হয় যখন মহানিরয়ের পূর্বদ্বার উন্মুক্ত হয়। সে তথায় শীঘ্র ও দ্রুত ধাবিত হয়, ধাবিত হইবার সময় তাহার বর্হিচর্ম ও অন্ত চর্ম দগ্ধ হয়, মাংস দগ্ধ হয়, স্নায়ু দগ্ধ হয়, অস্থিগুলি ধূমায়িত হয়-অতঃপর তাহার উত্তোলন হয়। যদিও সে বহু নরক যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছে, তথাপি দ্বার তাহার সম্মুখে বদ্ধ। সে তথায় দুঃখ, কটু তীব্র বেদনা অনুভব করে এবং যতদিন পাপকর্ম ক্ষয়প্রাপ্ত না হয় ততদিন তাহার মৃত্যু হয় না। পশ্চিমদ্বার, ও দক্ষিণদ্বার সম্পর্কেও এইরূপ।

ভিক্ষুগণ, দীর্ঘকাল পরে যখন কদাচিৎ কখন মহানিরয়ের পূর্বদ্বার উন্মুক্ত হয়, তখন সে দ্রুত ধাবিত হয়… সেই দরজায় নিষ্ক্রান্ত হয়।

ভিক্ষুগণ, সেই মহানিরয়ের ঠিক পার্শ্বে আছে মহাগূথনিরয়। সে তথায় পতিত হয়। সেই গূথনিরয়ে সূচিমুখ প্রাণী সকল তাহার বহির্চর্ম ছিন্ন করে, তারপর অভ্যন্তরীণ চর্ম, মাংস, স্নায়ু, অস্থি ছিন্ন করে, অস্থি ছিন্ন করিয়া অস্থিমজ্জা ভক্ষণ করে। সে তথায়… মৃত্যু হয় না।

ভিক্ষুগণ, গূথনিরয়ের পরে আছে মহাকুক্কুড়নিরয়। সে তথায় পতিত হয়। সে তথায় দুঃখ তীব্র কটুক… মৃত্যু হয় না।

ভিক্ষুগণ, কুক্কুড়নিরয়ের পরে আছে যোজন উচ্চ ষোড়শাঙ্গুলি প্রমাণ মহাসিম্বলিবন যাহা আদীপ্ত, সংপ্রজ্বলিত ও সজ্যোতির্ভূত। তাহারা তথায় তাহাকে উঠানামা করাইল। সেই ব্যক্তি তথায় তীব্র কটুক দুঃখ বেদনা ভোগ করে… মৃত্যু হয় না।

ভিক্ষুগণ, সেই সিম্বলিবনের পরে আছে মহাঅসিপত্রবন। সে তথায় প্রবেশ করে। বায়ুতাড়িত পত্রগুলি হস্ত ছিন্ন করে, পাদ ছিন্ন করে, হস্ত-পাদ ছিন্ন করে, কর্ণ ছিন্ন করে, নাসিকা ছিন্ন করে, কর্ণ-নাসিকা ছিন্ন করে। সে তথায় তীব্র… কটুক… মৃত্যু হয় না।

ভিক্ষুগণ, সেই অসিপত্রবনের পার্শ্বে আছে মহতী ক্ষারোদকা (লবণযুক্ত) নদী। সে তথায় পতিত হয়। সে তথায় অনুস্রোতে ভাসিয়া যায়, প্রতিস্রোতে ভাসিয়া যায়, অনুস্রোতে প্রতিস্রোতে ভাসিয়া যায়। সে তথায় তীব্র কটুক… মৃত্যু হয় না।

ভিক্ষুগণ, নিরয়পালগণ তাহাকে বড়শি দ্বারা তুলিয়া স্থলে রাখিয়া বলিল, ‘ওহে, তুমি কি ইচ্ছা করো?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি জুগুপ্‌সিত (ক্ষুধার্ত)।’ তখন নিরয়পালগণ তপ্ত লৌহ শংকু দ্বারা তাহার মুখ ব্যাদান করিয়া আদীপ্ত, প্রজ্বলিত ও সজ্যোতির্ভূত তপ্ত লৌহগুলিও প্রক্ষেপ করিল। তাহার ওষ্ঠ দগ্ধ হয়, মুখ দগ্ধ হয়, কণ্ঠ দগ্ধ হয়, বক্ষ দগ্ধ হয়, অন্ত্র দহন করিয়া তাহা অন্ত্রগুণ বা অন্ত্ররজ্জুগুলিকে ঠেলিয়া অধোভাগে চালিত করে। সে তথায় তীব্র… মৃত্যু হয় না।

ভিক্ষুগণ, তখন নিরয়পালগণ তাহাকে বলিল, ‘ওহে তুমি কি ইচ্ছা করো?’ সে বলিল, ‘ভদন্ত, আমি পিপাসিত।’ তখন নিরয়পালগণ লৌহ শংকু দ্বারা… তপ্ত তাম্রধাতু মুখে ঢালিতে থাকে… মৃত্যু হয় না।

ভিক্ষুগণ, তখন নিরয়পালগণ তাহাকে পুনরায় মহানিরয়ে নিক্ষেপ করে।

ভিক্ষুগণ, পূর্বকালে যমরাজার এরূপ মনে হইয়াছিল : যাহারা পৃথিবীতে পাপকর্ম করে, তাহারা এইরূপ বিবিধ শাস্তি ভোগ করে, অহো, আমি যদি মনুষ্য জন্মলাভ করিতে পারি, তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ পৃথিবীতে উৎপন্ন হন, সেই ভগবানের আমি পর্যুপাসনা করি, ভগবানও আমাকে ধর্মদেশনা করেন এবং তাহাতে আমি ভগবানের ধর্ম জানিতে পারি।

ভিক্ষুগণ, আমি যাহা বলিতেছি তাহা অন্য কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণের নিকট হইতে শুনিয়া বলিতেছি না, আমি স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া, দর্শন করিয়া, বিদিত হইয়া বলিতেছি।

ভগবান সুগত শাস্তা ইহা বিবৃত করিয়া বলিলেন :

‘দেবদূত প্রণোদিত মাণবক যদি প্রমাদে পতিত হয়,
হীন জন্ম লভি সেজন দীর্ঘকাল অনুতাপী হয়।
দেবদূত প্রণোদিত হেথা শান্ত সৎপুরুষগণ,
আর্য ধর্মে তারা প্রমাদগ্রস্ত হয় না কখন।
জন্ম-মৃত্যু সমুদয় উপাদানে যে জন ভয়দর্শী হয়,
উপাদান ছাড়ি মুক্তি লভে সে জন করি জন্মমৃত্যু সংক্ষয়।
ক্ষেম প্রাপ্ত সুখী তারা দৃষ্টধর্মে লভি নির্বাণ,
সর্ববৈরী ভয়াতীত তারা করে সর্বদুঃখ অবসান।’

দেবদূত সূত্র সমাপ্ত।

তৃতীয় শূন্যতা-বর্গ সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]