আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
১. একসময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে। অনন্তর ব্রাহ্মণ পিঙ্গলকৌৎস ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানের সহিত প্রীত্যালাপচ্ছলে কুশলপ্রশ্নাদি বিনিময় করিয়া সসম্ভ্রমে একান্তে উপবেশন করিলেন। একান্তে উপবিষ্ট হইয়া ব্রাহ্মণ পিঙ্গলকৌৎস ভগবানকে কহিলেন, ‘হে গৌতম, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ সংঘনায়ক, গণনায়ক, গণাচার্য, জ্ঞাত, যশস্বী, তীর্থংকর এবং বহুজনের দ্বারা সাধু বলিয়া স্বীকৃত, যেমন পূরণ কাশ্যপ, মস্করী গোশাল, অজিত কেশকম্বল, ককুদ কাত্যায়ন, সঞ্জয় বেলাস্থপুত্র, এবং নির্গ্রন্থ জ্ঞাতৃপুত্র-তাঁহারা কি সকলেই স্বীয় (স্বীয়) প্রামাণ্য বিষয়ের যৌক্তিকতা বিশেষভাবে জানেন এবং সকলেই জানেন না, কিংবা কেহ কেহ জানেন এবং কেহ কেহ জানেন না?’ ‘রেখে দিন, ব্রাহ্মণ, সে কথা থাক-তাঁহারা কি সকলেই স্বীয় (স্বীয়) প্রামাণ্য বিষয়ের যৌক্তিকতা বিশেষভাবে জানেন এবং সকলেই জানেন না, কিংবা কেহ কেহ জানেন এবং কেহ কেহ জানেন না? ব্রাহ্মণ, আমি আপনার নিকট ধর্ম প্রকাশ করিতেছি, আপনি তাহা শ্রবণ করুন, সুন্দররূপে মনোনিবেশ করুন, আমি তাহা বিবৃত করিতেছি।’ ‘তথাস্তু বলিয়া ব্রাহ্মণ পিঙ্গলকৌৎস প্রত্যুত্তরে ভগবানকে তাঁহার সম্মতি জানাইলেন। ভগবান কহিলেন :
২. যেমন, ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, ত্বক পরিহার করিয়া, ত্বকোদ্ভেদ পরিহার করিয়া, মাত্র শাখাপল্লব ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করিলে তাঁহাকে দেখিয়া চক্ষুষ্মান পুরুষ এ কথা বলিবেন : ‘এই ব্যক্তি সার জানিতে পারেন নাই, আঁশ জানিতে পারেন নাই, ত্বক জানিতে পারেন নাই, ত্বকোদ্ভেদ জানিতে পারেন নাই, শাখাপল্লব জানিতে পারেন নাই। সে জন্য তিনি সারার্থী, সারান্বেষী হইয়া সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, ত্বক পরিহার করিয়া, ত্বকোদ্ভেদ পরিহার করিয়া, মাত্র শাখাপল্লব ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া চলিয়াছেন। সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য তিনি উহার অর্থও অনুভব করিতে পারেন নাই।’
অথবা যেমন, ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, ত্বক পরিহার করিয়া, মাত্র ত্বকোদ্ভেদ ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করিলে তাঁহাকে দেখিয়া চক্ষুষ্মান পুরুষ এ কথা বলিবেন : ‘এই ব্যক্তি সার জানিতে পারেন নাই, আঁশ জানিতে পারেন নাই, ত্বক জানিতে পারেন নাই, ত্বকোদ্ভেদ জানিতে পারেন নাই, শাখাপল্লব জানিতে পারেন নাই। সে জন্য সারার্থী, সারান্বেষী হইয়া সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, ত্বক পরিহার করিয়া, মাত্র ত্বকোদ্ভেদ ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া চলিয়াছেন। সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য তিনি উহার অর্থও অনুভব করিতে পারেন নাই।’
অথবা যেমন, ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, মাত্র ত্বক ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করিলে তাঁহাকে দেখিয়া চক্ষুষ্মান পুরুষ এ কথা বলিবেন : ‘এই ব্যক্তি সার জানিতে পারেন নাই, আঁশ জানিতে পারেন নাই, ত্বক জানিতে পারেন নাই, ত্বকোদ্ভেদ জানিতে পারেন নাই, শাখাপল্লব জানিতে পারেন নাই। সে জন্য তিনি সারার্থী, সারান্বেষী হইয়া সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, মাত্র ত্বক ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া চলিয়াছেন। সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য তিনি উহার অর্থও অনুভব করিতে পারেন নাই।’
অথবা যেমন, ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, মাত্র আঁশ ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করিলে তাঁহাকে দেখিয়া চক্ষুষ্মান পুরুষ এ কথা বলিবেন : ‘এই ব্যক্তি সার জানিতে পারেন নাই, আঁশ জানিতে পারেন নাই, ত্বক জানিতে পারেন নাই, ত্বকোদ্ভেদ জানিতে পারেন নাই, শাখাপল্লব জানিতে পারেন নাই। সে জন্য তিনি সারার্থী, সারান্বেষী হইয়া সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, মাত্র আঁশ ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া চলিয়াছেন। সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য তিনি উহার অর্থও অনুভব করিতে পারেন নাই।’
অথবা যেমন, ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করিলে তাঁহাকে দেখিয়া চক্ষুষ্মান পুরুষ এ কথা বলিবেন : ‘এই ব্যক্তি সার জানিতে পারিয়াছেন, আঁশ জানিতে পারিয়াছেন, ত্বক জানিতে পারিয়াছেন, ত্বকোদ্ভেদ জানিতে পারিয়াছেন, শাখাপল্লব জানিতে পারিয়াছেন। সে জন্য তিনি সারার্থী, সারান্বেষী হইয়া সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া চলিয়াছেন। সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য তিনি উহার অর্থও অনুভব করিয়াছেন।’
তেমনভাবেই, ব্রাহ্মণ, কোনো কোনো ব্যক্তি এই ভাবিয়া শ্রদ্ধায় আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হন : ‘আমি জন্ম, জরা, মরণ, শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও নৈরাশ্যে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখগ্রস্ত হইয়াছি, এই সমগ্র দুঃখসমষ্টির সমাপ্তি অল্পই দৃষ্ট হয়।’ এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি উৎপাদন করেন। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আনন্দিত হন, কিন্তু উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন, অপরকে অবজ্ঞা করেন : ‘আমি লাভ, সৎকার ও খ্যাতির অধিকারী, এই অপর ভিক্ষুগণ অখ্যাতনামা ও অল্পশক্তিসম্পন্ন।’ লাভ, সৎকার ও খ্যাতি হইতে অপর যে-সকল ধর্ম (সম্পদ) উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের (লাভের) জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান না, প্রয়াস পান না, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন। যেমন, ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, ত্বক পরিহার করিয়া, ত্বকোদ্ভেদ পরিহার করিয়া, মাত্র শাখাপল্লব ছিঁড়িয়া লইয়া, উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করেন, এবং সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য উহার অর্থও অনুভব করিতে পারেন না, আমি তাঁহারই সহিত এই ব্যক্তি তুল্য বলিয়া বর্ণনা করি।
৩. ব্রাহ্মণ, কোনো কোনো ব্যক্তি এই ভাবিয়া শ্রদ্ধায় আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হন : ‘আমি জন্ম, জরা, মরণ, শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও নৈরাশ্যে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখগ্রস্ত হইয়াছি, এই সমগ্র দুঃখসমষ্টির সমাপ্তি অল্পই দৃষ্ট হয়।’ এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি উৎপাদন করেন। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আনন্দিত হন না, উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি হইতে অপর যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি শীলসম্পদ লাভ করেন। তিনি ওই শীলসম্পদে আনন্দিত হন, সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন। তিনি ওই শীলসম্পদ দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন, অপরকে অবজ্ঞা করেন : ‘আমি শীলবান ও কল্যাণধর্মী, এই অপর ভিক্ষুগণ দুঃশীল ও পাপধর্মী।’ শীলসম্পদ হইতে অপর যে-সকল (সম্পদ) উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য তিনি আকাঙ্ক্ষা জাগান না, প্রয়াস পান না, (তদ্বিষয়ে) তিনি অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন। যেমন ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, ত্বক পরিহার করিয়া, মাত্র ত্বকোদ্ভেদ ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করেন এবং সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য উহার অর্থও অনুভব করেন না, আমি তেমন পুরুষেরই সহিত এই ব্যক্তিকে তুল্য বলিয়া বর্ণনা করি।
৪. ব্রাহ্মণ, কোনো কোনো ব্যক্তি এই ভাবিয়া শ্রদ্ধায় আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হন : ‘আমি জন্ম, জরা, মরণ, শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও নৈরাশ্যে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখগ্রস্ত হইয়াছি, এই সমগ্র দুঃখসমষ্টির সমাপ্তি অল্পই দৃষ্ট হয়।’ এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি উৎপাদন করেন। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আনন্দিত হন না, উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি হইতে অপর যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি শীলসম্পদ লাভ করেন। তিনি ওই শীলসম্পদে আনন্দিত হন, কিন্তু সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই শীলসম্পদে আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি শীলসম্পদ হইতে যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি সমাধিসম্পদ লাভ করেন। তিনি ওই সমাধিসম্পদে আনন্দিত হন, সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন। তিনি ওই সমাধিসম্পদ দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন, অপরকে অবজ্ঞা করেন : ‘আমি সমাহিত ও একাগ্রচিত্ত, এই অপর ভিক্ষুগণ অসমাহিত ও বিভ্রান্তচিত্ত।’ তিনি সমাধিসম্পদ হইতে যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান না, প্রয়াস পান না, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন। যেমন ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, আঁশ পরিহার করিয়া, মাত্র ত্বক ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করেন এবং সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য উহার অর্থও অনুভব করেন না, আমি তেমন পুরুষেরই সহিত তুল্য বলিয়া এই ব্যক্তিকে বলি।
৫. ব্রাহ্মণ, কোনো কোনো ব্যক্তি এই ভাবিয়া শ্রদ্ধায় আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হন : ‘আমি জন্ম, জরা, মরণ, শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও নৈরাশ্যে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখগ্রস্ত হইয়াছি, এই সমগ্র দুঃখসমষ্টির সমাপ্তি অল্পই দৃষ্ট হয়।’ এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি উৎপাদন করেন। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আনন্দিত হন না, উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি হইতে যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি শীলসম্পদ লাভ করেন। তিনি ওই শীলসম্পদে আনন্দিত হন, কিন্তু উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই শীলসম্পদে আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি শীলসম্পদ হইতে যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি সমাধিসম্পদ লাভ করেন। তিনি ওই সমাধিসম্পদে আনন্দিত হন, কিন্তু সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই সমাধিসম্পদে আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি ওই সমাধিসম্পদ হইতে যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি জ্ঞানদর্শন লাভ করেন। তিনি ওই জ্ঞানদর্শন দ্বারা আনন্দিত হন, সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন। তিনি ওই জ্ঞানদর্শন দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন, অপরকে অবজ্ঞা করেন : ‘আমি (ধর্ম) জানিয়া ও দেখিয়া বিচরণ করি, এই অপর ভিক্ষুগণ না জানিয়া ও না দেখিয়া বিচরণ করেন।’ তিনি জ্ঞানদর্শন হইতে অপর যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান না, প্রয়াস পান না, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন। যেমন ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার পরিহার করিয়া, মাত্র আঁশ ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করেন এবং সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য উহার অর্থও অনুভব করেন না, আমি তেমন পুরুষেরই সহিত তুল্য বলিয়া এই ব্যক্তিকে বলি।
৬. ব্রাহ্মণ, কোনো কোনো ব্যক্তি এই ভাবিয়া শ্রদ্ধায় আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হন : ‘আমি জন্ম, জরা, মরণ, শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও নৈরাশ্যে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখে অবতীর্ণ হইয়াছি, দুঃখগ্রস্ত হইয়াছি, এই সমগ্র দুঃখসমষ্টির সমাপ্তি অল্পই দৃষ্ট হয়।’ এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি উৎপাদন করেন। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আনন্দিত হন না, উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই লাভ, সৎকার ও খ্যাতির দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি লাভ, সৎকার ও খ্যাতি হইতে অপর যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি শীলসম্পদ লাভ করেন। তিনি ওই শীলসম্পদে আনন্দিত হন, কিন্তু উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই শীলসম্পদ দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি শীলসম্পদ হইতে অপর যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি সমাধিসম্পদ লাভ করেন। তিনি ওই সমাধিসম্পদে আনন্দিত হন, কিন্তু উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই সমাধিসম্পদ দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি সমাধিসম্পদ হইতে অপর যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না। তিনি জ্ঞানদর্শন লাভ করেন। তিনি ওই জ্ঞানদর্শনে আনন্দিত হন, কিন্তু উহাতে তাঁহার সংকল্প পরিপূর্ণ হইয়াছে মনে করেন না। তিনি ওই জ্ঞানদর্শন দ্বারা আত্মপ্রশংসা করেন না, অপরকে অবজ্ঞা করেন না। তিনি জ্ঞানদর্শন হইতে অপর যে-সকল সম্পদ উচ্চতর ও যোগ্যতর উহাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আকাঙ্ক্ষা জাগান, প্রয়াস পান, (তদ্বিষয়ে) অলস-প্রকৃতি ও শিথিলকর্মী হন না।
৭. ব্রাহ্মণ, জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতার ধর্ম (সম্পদ) কী কী? ব্রাহ্মণ, কাম-সম্পর্ক হইতে বিবিক্ত হইয়া, সর্ব অকুশল পরিহার করিয়া ভিক্ষু সবিতর্ক, সবিচার, বিবেকজ প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। পুনশ্চ, ব্রাহ্মণ, বিতর্ক-বিচার-উপশমে ভিক্ষু অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদী ও চিত্তের একীভাব-আনয়নকারী, বিতর্কাতীত, বিচারাতীত সমাধিজ প্রীতিসুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। পুনশ্চ, ব্রাহ্মণ, প্রীতিতেও বীতরাগ হইয়া ভিক্ষু উপেক্ষার ভাবে অবস্থান করেন, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া স্বচিত্তে (প্রীতি-নিরপেক্ষ) সুখ অনুভব করেন, আর্যগণ যে ধ্যানস্তরে আরোহণ করিলে ‘ধ্যায়ী উপেক্ষা-সম্পন্ন ও স্মৃতিমান হইয়া (প্রীতি-নিরপেক্ষ) সুখে বিচরণ করেন’ বলিয়া বর্ণনা করেন, সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। পুনশ্চ, ব্রাহ্মণ, সর্বদৈহিক সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্য (মনের হর্ষ-বিষাদ) অস্তমিত করিয়া, না-দুঃখ-না-সুখ, উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। পুনশ্চ, ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু সর্বাংশে রূপসংজ্ঞা অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘ-সংজ্ঞা অস্তমিত করিয়া, নানাত্ব-সংজ্ঞা মনন না করিয়া ‘আকাশ-অনন্ত’ এই ভাবোদয়ে ‘আকাশায়তন’ নামক (প্রথম অরূপসমাপত্তি) লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। পুনশ্চ, ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু সর্বাংশে ‘আকাশায়তন’ অতিক্রম করিয়া ‘অনন্ত বিজ্ঞান’ এই ভাবোদয়ে ‘বিজ্ঞানায়তন’ নামক (দ্বিতীয় অরূপসমাপত্তি) লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। পুনশ্চ, ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু সর্বাংশে ‘বিজ্ঞানায়তন’ অতিক্রম করিয়া ‘কিছুই নাই’ এই ভাবোদয়ে ‘আকিঞ্চনায়তন’ নামক (তৃতীয় অরূপসমাপত্তি) লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। পুনশ্চ, ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু সর্বাংশে ‘আকিঞ্চনায়তন’ অতিক্রম করিয়া ‘নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন’ নামক (চতুর্থ অরূপসমাপত্তি) লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। পুনশ্চ, ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু সর্বাংশে ‘নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন’ অতিক্রম করিয়া ‘সংজ্ঞা-বেদয়িত-নিরোধ’ নামক (লোকোত্তর সম্পত্তি) লাভ করিয়া উহাতে বিচরণ করেন। ব্রাহ্মণ, ইহাও জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ। ব্রাহ্মণ, এই সমস্তই জ্ঞানদর্শন হইতে উচ্চতর ও যোগ্যতর সম্পদ।
যেমন, ব্রাহ্মণ, সারার্থী, সারান্বেষী পুরুষ সারান্বেষণে বিচরণ করিতে করিতে পুরোস্থিত বৃহৎ সারবান বৃক্ষের সার ছিঁড়িয়া লইয়া উহাকেই সার মনে করিয়া প্রস্থান করেন এবং সারের দ্বারা যাহা সারকৃত্য উহার অর্থও অনুভব করেন, আমি তেমন পুরুষেরই সহিত এই ব্যক্তি তুল্য বলিয়া বর্ণনা করি।
৮. অতএব, ব্রাহ্মণ, লাভ, সৎকার ও খ্যাতি এই ব্রহ্মচর্যের আশংসা (ঈপ্সিত লক্ষ্য) নহে, মাত্র শীলসম্পদ ইহার আশংসা নহে, মাত্র সমাধিসম্পদ ইহার আশংসা নহে, মাত্র জ্ঞানদর্শনও ইহার আশংসা নহে। ব্রাহ্মণ, যে চিত্তবিমুক্তি অচল-অটল তদর্থেই এই ব্রহ্মচর্য প্রকাশিত হইয়াছে। ইহাই এই ব্রহ্মচর্যের সার, ইহাই পরিসমাপ্তি।
৯. ইহা বিবৃত হইলে ব্রাহ্মণ পিঙ্গলকৌৎস ভগবানকে কহিলেন, ‘অতি সুন্দর, হে গৌতম, অতি মনোহর, হে গৌতম, যেমন কেহ উল্টানকে সোজা, আবৃতকে অনাবৃত করেন, বিমূঢ়কে পথ প্রদর্শন অথবা অন্ধকারে তৈলপ্রদীপ ধারণ করেন যাহাতে চক্ষুষ্মান ব্যক্তি রূপ (দৃশ্যবস্তু) দেখিতে পান, তেমনভাবেই মহানুভব গৌতম কর্তৃক বহু পর্যায়ে (বিবিধ যুক্তিতে) ধর্ম প্রকাশিত হইয়াছে। আমি ভগবান গৌতমের শরণাগত হইতেছি, ধর্মের শরণাগত হইতেছি, ভিক্ষুসংঘের শরণাগত হইতেছি, মহানুভব গৌতম। আজ হইতে আমরণ শরণাগত আমাকে উপাসকরূপে অবধারণ করুন।’
ক্ষুদ্র-সারোপম-সূত্র সমাপ্ত।
ঔপম্য-বর্গ তৃতীয় সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ