স্থান : শ্রাবস্তী
সে সময়ে ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তী-সমীপে অনাথপিণ্ডিক কর্তৃক প্রদত্ত জেতবন বিহারে অবস্থান করছিলেন। সে সময়ে শাক্যপুত্র আয়ুষ্মান উপনন্দ ভ্রাতার সহবিহারী ভিক্ষুকে এরূপ বললেন, “আসুন, আবুসো, আমরা জনপদে বিচরণের নিমিত্তে প্রস্থান করি।”
“না ভন্তে, আমি যেতে পারব না, আমার চীবর জীর্ণ ও পুরাতন হয়েছে।”
“আসুন বন্ধু, আমি আপনাকে নতুন চীবর দিব” এরূপ বলে তাকে একখানা চীবর প্রদান করলেন।
তখন সেই ভিক্ষু শুনলেন যে, “ভগবান নাকি জনপদে বিচরণের (ধর্মপ্রচারের) জন্যে প্রস্থান করবেন।” অতঃপর সেই ভিক্ষুর মনে এরূপ চিন্তা উদয় হলো : “আমি কি জনপদে বিচরণের জন্যে ভগবানের সাথে প্রস্থান করব; নাকি আয়ুষ্মান উপনন্দের সঙ্গেই প্রস্থান করব?”
অনন্তর আয়ুষ্মান উপনন্দ সেই ভিক্ষুকে বললেন, “আসুন, বন্ধু, আমরা জনপদে বিচরণের নিমিত্তে প্রস্থান করি।”
তখন উক্ত ভিক্ষু বললেন, “না ভন্তে, আমি আপনার সঙ্গে জনপদে বিচরণের জন্যে প্রস্থান করব না; আমি ভগবানের সঙ্গে প্রস্থান করব।”
সেই ভিক্ষু কর্তৃক এরূপ বলা হলে, তখন আয়ুষ্মান উপনন্দ “হে বন্ধু, আমি যে আপনাকে চীবর দিয়েছি। কেন আমার সাথে জনপদে বিচরণের জন্যে যাবেন না?” এরূপ প্রকাশ করে ক্রোধান্বিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে প্রদত্ত চীবরখানা বলপূর্বক কেড়ে নিলেন।
অতঃপর সেই ভিক্ষু ভিক্ষুদেরকে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করলেন। যে সকল ভিক্ষু অল্পেচ্ছু, সন্তুষ্টিপরায়ণ, লজ্জাশীল, অনুসন্ধিৎসু ও শিক্ষাকামী তাঁরা এ ব্যাপারে জানতে পেরে এ বলে নিন্দা, আন্দোলন ও প্রকাশ্যে দুর্নাম প্রচার করতে লাগলেন, “এ কেমন হীনমন্যতা যে, কেন আয়ুষ্মান উপনন্দ জনৈক ভিক্ষুকে স্বয়ং নিজে চীবর প্রদান করে, ক্রোধান্বিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে সেই প্রদত্ত চীবরটি বলপূর্বক কেড়ে নিলেন?” তখন সেই ভিক্ষুরা আয়ুষ্মান উপনন্দকে অনেক প্রকারে তিরস্কার করে ভগবানকে এ বিষয়ে সবিস্তারে নিবেদন করলেন। ভগবান আয়ুষ্মান উপনন্দকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে উপনন্দ, এটি কি সত্য যে, তুমি নাকি জনৈক ভিক্ষুকে নিজেই চীবর দিয়ে কুপিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় জোরপূর্বক কেড়ে নিয়েছ?”
“হ্যাঁ ভগবান, তা সম্পূর্ণ সত্য বটে।”
তখন ভগবান তা নিতান্ত অন্যায় বলে প্রকাশ করে নিন্দা করে বললেন, “হে মূর্খ, এ কীরূপ হিংসাযুক্ত হীনাচরণ যে, তুমি নিজেই সেই ভিক্ষুকে চীবর দিয়ে রাগান্বিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় বলপূর্বক কেড়ে নিতে পারলে? তোমার এ প্রকারের দ্বেষযুক্ত আচরণ কিছুতেই অপ্রসন্নদের প্রসন্নতা উৎপাদন বা প্রসন্নদের প্রসন্নতা বৃদ্ধির কারণ হবে না। অধিকন্তু এটি অপ্রসন্নদের অশ্রদ্ধা বৃদ্ধি এবং কোনো কোনো শ্রদ্ধাবানদের মনে অন্যথাভাব আনয়নের সহায়ক হবে।”
ভগবান এরূপে বহুপ্রকারে তাকে নিন্দা করে চপলতা, অবিনীতা, মহাতৃষ্ণা, অসন্তুষ্টিতা, সঙ্গপ্রিয়তা এবং অলসতার কুফল সম্বন্ধে বর্ণনা করলেন। তিনি অনেক প্রকারে গাম্ভীর্যতা, সুবিনীতা, অল্পেচ্ছুতা, সন্তুষ্টিতা, সল্লেখ (তৃষ্ণাদির সংযমতা), ধুতাঙ্গব্রত, সংঘ-সেবাপ্রিয়তা, পুনর্জন্মক্ষয়ের জন্য বীর্যারম্ভের (উৎসাহশীলতার) সুফল সম্বন্ধে বর্ণনা করে, তদনুযায়ী এবং তদনুরূপ ধর্মদেশনা উত্থাপন করে ভিক্ষুগণকে সম্বোধন করে বললেন, “হে ভিক্ষুগণ, আমি দশবিধ প্রত্যয় ও অর্থবশে ভিক্ষুসংঘের জন্য শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপ্ত করব; যথা : ১. সংঘের সুষ্ঠুতা, ২. সংঘের শান্তিভাব বৃদ্ধির জন্যে, ৩. দুর্দম্য ভিক্ষুগণকে দমনের জন্যে, ৪. সদাচারী (শীলবান) ভিক্ষুদের শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানের জন্যে, ৫. বর্তমানে উৎপন্ন তৃষ্ণাসমূহ সংবরণের জন্যে, ৬. অনাগত জন্মের আসবসমূহের উৎপত্তিকে প্রতিঘাতের জন্যে, ৭. অপ্রসন্নের প্রসাদ উৎপন্নের জন্যে, ৮. প্রসন্নের প্রসাদ বৃদ্ধির জন্যে, ৯. সদ্ধর্মের স্থিতির জন্যে এবং ১০. বিনয়কে অনুগ্রহের জন্যে যা অত্যন্ত কল্যাণজনক। সেহেতু হে ভিক্ষুগণ, আমি এই শিক্ষাপদ উদ্দেশ করছি :
“যদি কোনো ভিক্ষু অপর কোনো ভিক্ষুকে নিজে চীবর প্রদান করে পরবর্তী সময়ে যেকোনো কারণে ক্রোধান্বিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় প্রদত্ত চীবরটি বলপূর্বক কেড়ে নিলে কিংবা অন্যের দ্বারা কেড়ে নেওয়ালে, সেই ভিক্ষু ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ অপরাধী হবে।”
‘যো পনাতি’ অর্থে যা যেরূপ,… অথবা মধ্যম ইত্যাদি ভিক্ষুকে বুঝায়।
‘ভিক্খূতি’ বলতে ভিক্ষান্নজীবী ভিক্ষু,… জ্ঞপ্তি চতুর্থ কর্মবাক্য দ্বারা উপসম্পদাপ্রাপ্ত ভিক্ষুকে বুঝায়। এস্থলে এই অর্থেই ভিক্ষু অভিপ্রেত।
‘ভিক্খুস্সাতি’ বলতে অন্য ভিক্ষুকে বুঝায়।
‘সামন্তি’ অর্থে স্বয়ং নিজে দেয়া বুঝায়।
‘চীবরং’ বলতে ছয় প্রকার চীবরের মধ্যে অন্যতর চীবর যা বিকপ্পনুপযোগীর মধ্যে অন্তিম।
‘কুপিতো অনত্তমনোতি’ বলতে অসন্তুষ্টিতা, দুঃখী-দুর্মনা বা মানসিক অবসাদ বুঝায়।
‘অচ্ছিন্দেয্যাতি’ বলতে ক্রোধান্বিত হয়ে স্বয়ং নিজে কেড়ে নিলে ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ অপরাধ হয়।
‘অচ্ছিন্দাপেয্যাতি’ বলতে কেড়ে নেয়ার জন্যে অন্যকে নির্দেশ দিলে ‘দুক্কট’ অপরাধ হয়। বহুচীবর একবার মাত্র নির্দেশ দিয়ে কেড়ে নিলে, ‘নিস্সগ্গিয়’ আপত্তি হয়। তখন সেই অপরাধপ্রাপ্ত চীবরটি সংঘ, গণ বা একজন ভিক্ষুর নিকট বিসর্জন করতে হবে।
হে ভিক্ষুগণ, এভাবেই সেই চীবরটি বিসর্জন করতে হবে। প্রথমে সংঘের নিকট উপস্থিত হয়ে উত্তরাসঙ্গ একাংশ করে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুদের পদে বন্দনাপূর্বক উৎকুটিকভাবে বসে অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে সেই ভিক্ষু কর্তৃক এভাবে বলাবে :
“ভন্তে, আমার এই ‘চীবরটি’ স্বয়ং অন্য ভিক্ষুকে দেয়ার পর পুনরায় কেড়ে নেয়ায় বিসর্জনযোগ্য হয়েছে। তাই আমি এটি সংঘের নিকট বিসর্জন করছি।”
সেই চীবর বিসর্জনের পর আপত্তি দেশনা করতে হবে। ভিক্ষুসংঘের অনুমতিক্রমে দক্ষ ও সমর্থ ভিক্ষু কর্তৃক আপত্তি প্রতিগ্রহণ করাতে হবে। এবং এরূপে বিসর্জিত চীবর আপত্তিমুক্ত ভিক্ষুকে দিতে হবে :
“মাননীয় সংঘ, আমার প্রস্তাব শ্রবণ করুন। এই চীবর অমুক নামীয় ভিক্ষুর ‘নিস্সগ্গিয়’ হওয়ায় সংঘের নিকট বিসর্জন করা হয়েছে। যদি সংঘ উচিত সময় মনে করেন, তাহলে মাননীয় সংঘ এই চীবরটি অমুক নামীয় ভিক্ষুকে পুনঃ প্রদান করতে পারেন।”
তখন আপরাধ প্রাপ্ত ভিক্ষু কিছুসংখ্যক ভিক্ষুর কাছে গিয়ে উত্তরাসঙ্গ একাংশ করে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুদের পায়ে বন্দনা জ্ঞাপন করার পর উৎকুটিকভাবে বসে অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে এরূপে বলতে হবে :
“ভন্তে, আমার এই ‘চীবরটি’ স্বয়ং অন্য ভিক্ষুকে দেয়ার পর পুনরায় কেড়ে নেয়ায় বিসর্জনযোগ্য হয়েছে। তাই আমি এটি সংঘের নিকট বিসর্জন করছি।”
সেই চীবর বিসর্জনের পর আপত্তি দেশনা করতে হবে। ভিক্ষুসংঘের অনুমতিক্রমে দক্ষ ও সমর্থ ভিক্ষু কর্তৃক আপত্তি প্রতিগ্রহণ করাতে হবে। এবং এরূপে বিসর্জিত চীবর আপত্তিমুক্ত ভিক্ষুকে দিতে হবে :
“মাননীয় সংঘ, আমার প্রস্তাব শ্রবণ করুন। এই চীবর অমুক নামীয় ভিক্ষুর ‘নিস্সগ্গিয়’ হওয়ায় সংঘের নিকট বিসর্জন করা হয়েছে। যদি সংঘ উচিত সময় মনে করেন, তাহলে মাননীয় সংঘ এই চীবরটি অমুক নামীয় ভিক্ষুকে পুনঃ প্রদান করতে পারেন।”
অতঃপর আপত্তিপ্রাপ্ত ভিক্ষু একজন ভিক্ষুর কাছে গিয়ে উত্তরাসঙ্গ একাংশ করে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুদের পায়ে বন্দনা জ্ঞাপন করার পর উৎকুটিকভাবে বসে অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে এভাবে বলতে হবে :
“বন্ধু, আমার এই ‘চীবরটি’ স্বয়ং অন্য ভিক্ষুকে দেয়ার পর পুনরায় কেড়ে নেয়ায় বিসর্জনযোগ্য হয়েছে। তাই আমি এটি সংঘের নিকট বিসর্জন করছি।” তদ্ধেতু আমি এই চীবরটি আয়ুষ্মানের নিকট বিসর্জন করছি।”
বিসর্জনের পর আপত্তি দেশনা করতে হবে। ভিক্ষুসংঘের অনুমতিক্রমে দক্ষ ও সমর্থ ভিক্ষু কর্তৃক আপত্তি প্রতিগ্রহণ করাতে হবে। এরূপে বিসর্জিত চীবর আপত্তিমুক্ত ভিক্ষুকে দিতে হবে :
“আমি এই চীবরটি আয়ুষ্মানকে দিচ্ছি।”
উপসম্পন্নকে উপসম্পন্ন ধারণায় চীবর দিয়ে কুপিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে কেড়ে নিলে বা অন্যের দ্বারা কেড়ে নেয়ালে, ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ অপরাধ হয়। উপসম্পন্নকে উপসম্পন্ন কি না সন্দেহবশত চীবর দিয়ে কুপিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে কেড়ে নিলে বা অন্যের দ্বারা কেড়ে নেয়ালে, ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ অপরাধ হয়। উপসম্পন্নকে অনুপসম্পন্ন ধারণায় চীরব দিয়ে কুপিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে কেড়ে নিলে বা অন্যের দ্বারা কেড়ে নেয়ালে, ‘নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয়’ অপরাধ হয়।
অন্য কোনো বস্তু দিয়ে ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়ে কেড়ে নিলে কিংবা অপরের দ্বারা কেড়ে নেয়ালে, ‘দুক্কট’ আপত্তি হয়। অনুপসম্পন্নকে চীবর বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়ে কেড়ে নিলে কিংবা অপরের দ্বারা কেড়ে নেয়ালে, ‘দুক্কট’ আপত্তি হয়। অনুপসম্পন্নকে উপসম্পন্ন ধারণায় ‘দুক্কট’ আপত্তি হয়। অনুপসম্পন্ন অনুপসম্পন্ন কি না সন্দেহ করলে ‘দুক্কট’ আপত্তি হয়। অনুপসম্পন্নকে অনুপসম্পন্ন ধারণা করলে ‘দুক্কট’ আপত্তি হয়।
অনাপত্তি : যদি কেউ নিজ হতেই দিয়ে ফেলে, তাকে বিশ্বাস করে গ্রহণ করলে ভিক্ষু যদি উন্মাদ হয় এবং আদিকর্মিকের বেলায় অনাপত্তি।
চীবর কেড়ে নেয়া সম্পর্কীত শিক্ষাপদ সমাপ্ত
ব্যাখ্যা [০]