একসময় ভগবান অযোধ্যায় বস্তুবাস করছিলেন গঙ্গা নদীর তীরে। তখন ভগবান ভিক্ষুদেরকে ডাকলেন :
‘হে ভিক্ষুগণ, মনে কর, এই গঙ্গা নদী বিশাল এক ফেণপিণ্ড নিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তৎক্ষণাৎ তা একজন চোখের দৃষ্টিশক্তি-সম্পন্ন ব্যক্তি সেটি দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তার সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়, অসার বলে প্রতীয়মান হয়। হে ভিক্ষুগণ, তাহলে ফেণপিণ্ডে সার বলে কী থাকতে পারে? হে ভিক্ষুগণ, ঠিক এভাবেই যা কিছু রূপ আছে-অতীত-অনাগত-বর্তমান, আধ্যাত্মিক বা বাহ্যিক…. দূরে কিংবা সমীপের তা ভিক্ষু দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তা সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়, অসার বলে প্রতীয়মান হয়। হে ভিক্ষুগণ, তাহলে রূপে সার বলে কী থাকতে পারে?’
‘হে ভিক্ষুগণ, মনে কর, শরৎকালীন সময়ে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টিপাত হওয়ার সময় জলে জলবুদবুদ উৎপন্ন হয় এবং বিনাশ হয়। তৎমুহূর্তেই কোনো চক্ষুষ্মান পুরুষ সেটি দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তার সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়, অসার বলে প্রতীয়মান হয়। হে ভিক্ষুগণ, তাহলে জলবুদবুদে সার নামক কী থাকতে পারে? হে ভিক্ষুগণ, ঠিক এভাবেই যা কিছু বেদনা আছে-অতীত-অনাগত-বর্তমান, আধ্যাত্মিক বা বাহ্যিক…. দূরে কিংবা সমীপের তা ভিক্ষু দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তা সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়, অসার বলে প্রতীয়মান হয়। হে ভিক্ষুগণ, তাহলে বেদনায় সার নামক কী থাকতে পারে?’
‘হে ভিক্ষুগণ, মনে কর, গ্রীষ্মের শেষ মাসে স্থিত মধ্যাহ্নকালে মরীচিকা স্ফন্দিত হয়। তৎমুহূর্তেই কোনো চক্ষুষ্মান পুরুষ সেটি দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তার সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়…. হে ভিক্ষুগণ, তাহলে মরীচিকায় সার নামক কী থাকতে পারে? হে ভিক্ষুগণ, ঠিক এভাবেই যা কিছু সংজ্ঞা আছে…. ।’
‘হে ভিক্ষুগণ, মনে কর, একজন সারান্বেষণকারী, সারগবেষী, সারসন্ধানকারী ব্যক্তি বিচরণ করতে করতে ধারালো কুঠার নিয়ে বনে প্রবেশ করে। সে তথায় দর্শন করে বিশাল, সোজা, নতুন, ভিতরে অন্তসার শূন্য এক কলাগাছ। তৎমুহূর্তে সে তার মূল ছেদন করে, মূল ছেদন করে আগা ছেদন করে, আগা ছেদন করে বাকল ছিন্ন করে, সে তার বাকল ছিন্ন করে সারের আশেপাশের শক্ত কাঠও পেলো না, কোথায় তাতে সার। তৎমুহূর্তেই কোনো চক্ষুষ্মান পুরুষ সেটি দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তার সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়, অসার বলে প্রতীয়মান হয়। হে ভিক্ষুগণ, তাহলে কলাগাছে সার নামক কী থাকতে পারে? হে ভিক্ষুগণ, ঠিক এভাবেই যা কিছু সংস্কার আছে-অতীত-অনাগত-বর্তমান, আধ্যাত্মিক বা বাহ্যিক…. দূরে কিংবা সমীপের তা ভিক্ষু দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তা সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়, অসার বলে প্রতীয়মান হয়। হে ভিক্ষুগণ, তাহলে সংস্কারে সার নামক কী থাকতে পারে?’
‘হে ভিক্ষুগণ, মনে কর, জাদুকর কিংবা জাদুকর অন্তেবাসী চৌমহনীতে যাদু প্রদর্শন করে। তৎমুহূর্তেই কোনো চক্ষুষ্মান পুরুষ সেটি দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তার সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়, অসার বলে প্রতীয়মান হয়। হে ভিক্ষুগণ, তাহলে যাদুতে সার নামক কী থাকতে পারে? হে ভিক্ষুগণ, ঠিক এভাবেই যা কিছু বিজ্ঞান আছে-অতীত-অনাগত-বর্তমান, আধ্যাত্মিক বা বাহ্যিক…. দূরে কিংবা সমীপের তা ভিক্ষু দর্শন করে, চিন্তা করে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করে। তা সেই দর্শন হতে, চিন্তা হতে, মনোযোগের সাথে পরীক্ষা হতে এটি রিক্ত বা শূন্য বলে যদি প্রতীয়মান হয়, তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়, অসার বলে যদি প্রতীয়মান হয়। হে ভিক্ষুগণ, তাহলে বিজ্ঞানে সার নামক কী থাকতে পারে?’
“হে ভিক্ষুগণ, ঠিক এভাবে দর্শন করে শ্রুতবান আর্যশ্রাবক রূপের প্রতি নির্বেদপ্রাপ্ত হন, বেদনার প্রতি…. সংজ্ঞার প্রতি…. সংস্কারের প্রতি…. বিজ্ঞানের প্রতি নির্বেদপ্রাপ্ত হন। নির্বেদ হতে বিরাগ হন, বিরাগ হতে বিমুক্ত হন। বিমুক্ত হলে বিমুক্ত হয়েছি বলে জ্ঞান হয়…. এ জীবনে [আসবক্ষয়ের নিমিত্তে] অন্য কোনো করণীয় নেই’ এভাবে তিনি সম্যকরূপে জানতে পারেন।”
ভগবান এরূপ বললেন। সুগত এরূপ বলে অতঃপর ভগবান এরূপ বললেন :
‘ফেণপিণ্ড তুল্য রূপ, বেদনা বুদবুদ তুল্য,
মরীচিকা তুল্য সংজ্ঞা, সংস্কার কলাগাছ তুল্য,
জাদু (মায়া) তুল্য বিজ্ঞান, বলেছেন বুদ্ধ ভগবান।’
‘ঠিকঠাকভাবে করলে দর্শন, মনোযোগের সাথে হলে পরীক্ষিত
রিক্ত, তুচ্ছ বলে ধরা পড়ে, যিনি তাকে করেন দর্শন জ্ঞানত।’
‘এই কায়কে সর্বপ্রথম ভূরিপ্রজ্ঞায় হয়েছে দেশিত,
তিনটি ধর্মের দ্বারা প্রহান হয়, রূপকে দর্শন কর নিক্ষিপ্ত।’
‘আয়ু, উত্তাপ ও বিজ্ঞান, যখন আমার কায় হতে নির্গত হয়,
পরিত্যক্ত হলে তখন নিদ্রিতের মতো
অচেতন হয়ে পরের আহার্য হয়।’
‘এতাদৃশ এই অসার বস্তুর মায়াতে মূর্খজন আসক্ত হয়,
ঘাতক একে বলা হয়, সার এখানে নাই বিদ্যমান।’
‘এভাবে স্কন্ধগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে ভিক্ষু আরব্ধবীর্যগণ,
যদি দিবা-রাত্রি থাকেন স্মৃতিমান আর সম্প্রজ্ঞান।’
‘ত্যাগ করেন সর্বসংযোজন, আত্মশরণ করেন প্রতিলাভ,
অচ্যুতপদ [নির্বাণ] প্রার্থনা করে
প্রজ্বলিত মস্তকতুল্য করেন বিচরণ।’ [তৃতীয় সূত্র]
ব্যাখ্যা [১]
English