লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৭]

দ্বিতীয় রোগ সূত্র

এক সময় ভগবান বৈশালীতে অবস্থান করছিলেন-মহাবনে কূটাগারশালায়। অতঃপর ভগবান সন্ধ্যাকালে ধ্যান (ফল সমাপত্তি) হতে উঠে রোগীখানায় উপস্থিত হয়ে প্রজ্ঞাপ্ত আসনে উপবেশন করলেন। উপবিষ্ট ভগবান ভিক্ষুগণকে সম্বোধন করে বললেন, “হে ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু সর্বদা স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হবার জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী (ইচ্ছুক) হবে। ইহাই তোমাদের প্রতি আমাদের অনুশাসন।”

“হে ভিক্ষুগণ, কিভাবে ভিক্ষু স্মৃতিমান হন? হে ভিক্ষুগণ, এখানে (এই শাসনে) বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞাত, স্মৃতিমান ভিক্ষু লোকে (উপাদানস্কন্ধে) অভিধ্যা (লোভ), দৌর্মনস্য (দ্বেষ) দমিত করে কায়ে কায়ানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন। বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞাত, স্মৃতিমান ভিক্ষু লোকে (উপাদানস্কন্ধে) অভিধ্যা, দৌর্মনস্য দমিত করে বেদনায় বেদনানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন। বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞাত, স্মৃতিমান ভিক্ষু লোকে (উপাদানস্কন্ধে) অভিধ্যা, দৌর্মনস্য দমিত করে চিত্তে, চিত্তানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন। বীর্যবান, সম্প্রজ্ঞাত, স্মৃতিমান ভিক্ষু লোকে (উপাদানস্কন্ধে) অভিধ্যা, দৌর্মনস্য দমিত করে ধর্মে ধর্মানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন। হে ভিক্ষুগণ, এভাবে ভিক্ষু স্মৃতিমান হন।”

“হে ভিক্ষুগণ, কিভাবে ভিক্ষু সম্প্রজ্ঞাত হন? হে ভিক্ষুগণ, এখানে (এই শাসনে) ভিক্ষু অভিগমনে, প্রত্যাগমনে স্মৃতি সম্প্রজ্ঞান অনুশীলন করেন, অবলোকনে বিলোকনে স্মৃতি সম্প্রজ্ঞান অনুশীলন করেন, সঙ্কোচনে প্রসারণে স্মৃতিসম্প্রজ্ঞান অনুশীলন করেন, সঙ্ঘাটি-পাত্রচীবর ধারণে স্মৃতিসম্প্রজ্ঞান অনুশীলন করেন, ভোজনে, পানে, খাদনে, আস্বাদনে স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান অনুশীলন করেন, মল-মূত্রত্যাগে স্মৃতি সম্প্রজ্ঞান অনুশীলন করেন, গতিতে, স্থিতিতে, উপবেশনে, জাগরণে, ভাষণে, তুষ্ণীভাবে স্মৃতিসম্প্রজ্ঞান অনুশীলন করেন। এভাবেই হে ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু সম্প্রজ্ঞাত হন।

“হে ভিক্ষুগণ, এরূপ স্মৃতি সম্প্রজ্ঞান-সমন্বিত, অপ্রমত্ত, বীর্যবান ও সাধনা-তৎপর হয়ে অবস্থানকারী ভিক্ষুর যদি সুখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তিনি এভাবে তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, ‘আমার উৎপন্ন সুখ-বেদনা কারণ সম্ভূত, অকারণে নয়, কী কারণে? স্পর্শের কারণে। এই স্পর্শ অনিত্য, সংস্কৃত ও প্রতীত্য সমুৎপন্ন। অনিত্য, সংস্কৃত, প্রতীত্যসমুৎপন্ন স্পর্শ প্রত্যয়ে উৎপন্ন সুখ-বেদনা কিরূপে নিত্য হবে?’ তিনি স্পর্শ এবং সুখ-বেদনার প্রতি অনিত্যানুদর্শী, ব্যয়ানুদর্শী, বিরাগানুদর্শী, নিরোধানুদর্শী ও পরিবিসর্জনানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন। স্পর্শ এবং সুখ-বেদনার প্রতি অনিত্যানুদর্শী, ব্যয়ানুদর্শী, বিরাগানুদর্শী, নিরোধানুদর্শী ও পরিবিসর্জনানুদর্শী হয়ে অবস্থান করলে স্পর্শ এবং সুখ-বেদনার প্রতি যে রাগানুশয় তা পরিত্যক্ত হয়।”

“হে ভিক্ষুগণ, এরূপ স্মৃতি সম্প্রজ্ঞান-সমন্বিত, অপ্রমত্ত, বীর্যবান ও সাধনা-তৎপর হয়ে অবস্থানকারী ভিক্ষুর যদি দুঃখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তিনি এভাবে তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, ‘আমার উৎপন্ন দুঃখবেদনা কারণ সম্ভূত, অকারণে নয়। কী কারণে? স্পর্শের কারণে। এই স্পর্শ অনিত্য, সংস্কৃত ও প্রতীত্যসমুৎপন্ন। অনিত্য, সংস্কৃত ও প্রতীত্যসমুৎপন্ন স্পর্শ প্রত্যয়ে উৎপন্ন দুঃখ-বেদনা কিরূপে নিত্য হবে!’ তিনি স্পর্শ এবং দুঃখবেদনায় অনিত্যানুদর্শী, ব্যয়ানুদর্শী, বিরাগানুদর্শী, নিরোধানুদর্শী ও পরিবিসর্জনানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন। স্পর্শ এবং দুঃখ-বেদনার প্রতি অনিত্যানুদর্শী, ব্যয়ানুদর্শী, বিরাগানুদর্শী, নিরোধানুদর্শী ও পরিবিসর্জনানুদর্শী হয়ে অবস্থান করলে স্পর্শ এবং দুঃখবেদনার প্রতি যে প্রতিঘানুশয় তা পরিত্যক্ত হয়।”

“হে ভিক্ষুগণ, এরূপ স্মৃতিসম্প্রজ্ঞান-সমন্বিত, অপ্রমত্ত, বীর্যবান ও সাধনা-তৎপর হয়ে অবস্থানকারী ভিক্ষুর যদি অদুঃখ-অসুখ-বেদনা উৎপন্ন হয়, তিনি এভাবে তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, ‘আমার উৎপন্ন অদুঃখ-অসুখ-বেদনা কারণ-সম্ভূত, অকারণজাত নয়। কী কারণে উৎপন্ন? স্পর্শের কারণে। এই স্পর্শ অনিত্য, সংস্কৃত ও প্রতীত্যসমুৎপন্ন। অনিত্য, সংস্কৃত ও প্রতীত্যসমুৎপন্ন স্পর্শ প্রত্যয়ে উৎপন্ন অদুঃখ-অসুখ-বেদনা কিরূপে নিত্য হবে!’ তিনি স্পর্শে এবং অদুঃখ-অসুখ-বেদনার প্রতি অনিত্যানুদর্শী, ব্যয়ানুদর্শী, বিরাগানুদর্শী, নিরোধানুদর্শী ও পরিবিসর্জনানুদর্শী হয়ে অবস্থান করেন। স্পর্শে এবং অদুঃখ-অসুখ-বেদনার প্রতি অনিত্যানুদর্শী, ব্যয়ানুদর্শী, বিরাগানুদর্শী, নিরোধানুদর্শী ও পরিবিসর্জনানুদর্শী হয়ে অবস্থান করলে স্পর্শ এবং অদুঃখ-অসুখ-বেদনার প্রতি যে অবিদ্যানুশয় তা পরিত্যক্ত হয়।

তিনি যদি সুখ-বেদনা অনুভব করেন, তিনি একে (সেই বেদনাকে) অনিত্য বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন, (তৃষ্ণাদি দ্বারা) অসংলগ্ন, অনভিনন্দিত বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন। তিনি যদি দুঃখবেদনা অনুভব করেন, তিনি একে অনিত্য বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন, (তৃষ্ণাদি দ্বারা) অসংলগ্ন, অনভিনন্দিত বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন। তিনি যদি অদুঃখ-অসুখ-বেদনা অনুভব করেন, তিনি ইহাকে অনিত্য বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন, (তৃষ্ণাদি দ্বারা) অসংলগ্ন, অনভিনন্দিত বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন। তিনি যদি সুখ-বেদনা অনুভব করেন, তিনি সেই বেদনাকে বিসংযুক্ত (কামরাগাদি সংযোজন থেকে মুক্ত) হয়ে অনুভব করেন। যদি তিনি দুঃখবেদনা অনুভব করেন, তিনি সেই বেদনাকে বিসংযুক্ত হয়ে অনুভব করেন। তিনি যদি অদুঃখ-অসুখ-বেদনা অনুভব করেন, তিনি সেই বেদনাকে বিসংযুক্ত হয়ে অনুভব করেন। তিনি কায়ান্তিক (শরীর সীমাবদ্ধ) বেদনা অনুভব করে কায়ান্তিক বেদনা অনুভব করছি বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন। তিনি জীবনান্তিক বেদনা অনুভব করে জীবনান্তিক বেদনা অনুভব করছি বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন। তিনি প্রকৃষ্টরূপে জানেন যে, দেহভঙ্গে জীবনক্ষয়ের পর এখানেই অনভিনন্দিত সকল বেদনা শান্ত হয়ে যাবে এবং দেহই অবশিষ্ট থাকবে।”

“হে ভিক্ষুগণ, যেমন তৈল ও সলিতা অবলম্বনে তৈলপ্রদীপ জ্বলে, যদি তৈল ও সলিতা নিঃশেষ হয়, তাহলে সেই প্রদীপ অনাহারে (উপাদানহীন হয়ে) নির্বাপিত হয়; তেমনি ভিক্ষু কায়ান্তিক বেদনা অনুভব করে কায়ান্তিক বেদনা অনুভব করছি বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন। জীবনান্তিক বেদনা অনুভব করে জীবনান্তিক বেদনা অনুভব করছি বলে প্রকৃষ্টরূপে জানেন। তিনি প্রকৃষ্টরূপে জানেন যে, দেহভঙ্গে জীবনক্ষয়ের পর এখানেই অনভিনন্দিত সকল বেদনা শান্ত হয়ে যাবে এবং দেহই অবশিষ্ট থাকবে।”

অষ্টম সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [০]