লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৭]

বেলুদ্বার সূত্র

আমি এরূপ শুনেছি। একসময় ভগবান মহাভিক্ষুসংঘের সাথে কোশলরাজ্যে পর্যটন করতে করতে যেখানে কোশলদের বেলুদ্বার নামক ব্রাহ্মণ গ্রাম সেখানে পৌঁছালেন। বেলুদ্বারের ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ শুনলেন যে, শাক্যকুল হতে প্রব্রজিত শাক্যপুত্র মাননীয় শ্রমণ গৌতম মহাভিক্ষুসংঘের সাথে কোশলরাজ্যে পর্যটন করতে করতে বেলুদ্বারে উপস্থিত হয়েছেন। সেই ভগবান গৌতমের এরূপ কল্যাণ, যশ ও র্কীতিশব্দ প্রচার হয়েছে যে, ‘সেই ভগবান অর্হৎ, সম্যকসস্বুদ্ধ, বিদ্যা ও সু-আচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ (লোকজ্ঞ), অনুত্তর পুরুষ দমনকারী সারথি এবং দেব-মানবের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবান।’ তিনি এই জগৎ, সদেব, সমার, স্বব্রহ্মলোক, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, প্রজা (সত্ত্ব) ও দেব-মনুষ্যদের স্বয়ং অভিজ্ঞা সাক্ষাৎ করে প্রকাশ করেন। তিনি এমন ধর্মদেশনা করেন যা আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ, অন্তে কল্যাণ, স্বার্থক উপযুক্ত এবং কেবল পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশ করেন। সেরূপ অর্হতের দর্শন মঙ্গলজনক।

অতঃপর বেলুদ্বারের ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে কেউ কেউ ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে বসলেন। কেউ কেউ ভগবানের সঙ্গে প্রীতি-সম্ভাষণ করলেন এবং প্রীতি-সম্ভাষণপূর্বক কুশল-বিনিময় করে একপাশে বসলেন। কেউ কেউ ভগবানের দিকে অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে প্রণাম করে একপাশে বসলেন। আর কেউ কেউ ভগবানের নিকট নিজ নাম গোত্র উল্লেখ করে একপাশে বসলেন এবং কেউ কেউ নিরবে একপাশে বসলেন। একপাশে উপবিষ্ট সেই বেলুদ্বারের ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ ভগবানকে এরূপ বললেন, “মাননীয় গৌতম, আমরা এরূপ কামনা, ইচ্ছা ও অভিপ্রায় পোষণ করি; যথা : পুত্র-সন্তানের ভিড়ে বা ভারাক্রান্ত হয়ে শয়ন ও অবস্থান করতে পারি; কাশীচন্দন লাভ করতে পারি; মালা-সুগন্ধি দ্রব্য বিলেপন ও ব্যবহার করতে পারি; সোনা-রূপাদি লাভ করতে পারি এবং মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গ লোকে উৎপন্ন হতে পারি। মাননীয় গৌতম, আমাদের সেইরূপ ধর্মদেশনা করুন, যাতে আমাদের কামনা, ইচ্ছা ও অভিপ্রায় সফল হয়; যথা : পুত্র সন্তানের ভিড়ে বা ভারাক্রান্ত হয়ে শয়ন ও অবস্থান করতে পারি; কাশীচন্দন লাভ করতে পারি; মালা-সুগন্ধি দ্রব্য বিলেপন ও ব্যবহার করতে পারি; সোনা-রূপাদি লাভ করতে পারি এবং মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হতে পারি।”

“হে গৃহপতিগণ, আমি তোমাদের আত্ম-উপনায়িক ধর্মপর্যায় দেশনা করব। তা তোমরা উত্তমরূপে শ্রবণ ও মনোনিবেশ কর, আমি ভাষণ করব।”

“হ্যাঁ মাননীয় গৌতম,” বলে সেই বেলুদ্বারের ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন। তখন ভগবান এরূপ বললেন :

“গৃহপতিগণ, সেই আত্ম উপনায়িক ধর্মপর্যায় কীরূপ? এক্ষেত্রে আর্যশ্রাবক এরূপ বিবেচনা করে : ‘আমি প্রাণাকাঙ্ক্ষী, অমরণকামী (মরণেচ্ছাহীন), সুখকামী এবং দুঃখ পেতে পরামুখ।’ এই যে আমি প্রাণাকাঙ্ক্ষী, অমরণকামী, সুখকামী এবং দুঃখ পেতে পরামুখ, তবুও যদি কেউ আমাকে হত্যা করে তবে তা আমার প্রিয় এবং মনঃপূত হবে না। আমিও যদি কোনো এমন একজন ব্যক্তিকে হত্যা করি-যিনি প্রাণাকাঙ্ক্ষী, অমরণকামী, সুখকামী এবং দুঃখ পেতে পরাম্মুখ, তাহলে তা সেই ব্যক্তিটির প্রিয় ও মনঃপূত হবে না। যে বিষয় আমার নিকট অপ্রিয় ও অমনঃপূত, সেই বিষয় অপরেরও অপ্রিয় এবং অমনঃপূত, তাহলে আমার নিকট যেই বিষয় অপ্রিয় ও অমনঃপূত তা কীরূপে অন্যের উপর চাপিয়ে দেব।’ সে এরূপ চিন্তাপূর্বক নিজেকে প্রাণিহত্যা হতে বিরত রাখে এবং অপরকেও প্রাণিহত্যা হতে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়। আর প্রাণিহত্যা হতে বিরত হওয়ার সুফল ভাষণ করে। এরূপে সে কায়িক আচরণের দিক হতে ত্রিবিধ পর্যায়ে পরিশুদ্ধ (ত্রিকোটি পরিশুদ্ধ) হয়।

পুনশ্চ,গৃহপতিগণ, আর্যশ্রাবক এরূপ চিন্তা করে : ‘যে কেউ যদি আমার অদত্তবস্তু চুরি করে, তাহলে তা আমার প্রিয় ও মনোজ্ঞ হবে না। আমিও যদি অপরের অদত্তবস্তু চুরি করি, তাহলে অপরের নিকটও তা অপ্রিয় অমনোজ্ঞ হবে। যেই বিষয় আমার নিকট অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, অপরের নিকটও সেই বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। তাহলে আমার নিকট যে বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, তা কীরূপে অন্যের উপর চাপিয়ে দেব।’ সে এরূপ চিন্তাপূর্বক নিজেকে অদত্তবস্তু গ্রহণ হতে বিরত রাখে এবং অপরকেও অদত্তবস্তু গ্রহণ হতে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়। আর অদত্তবস্তু গ্রহণ করা হতে বিরত হওয়ার সুফল ভাষণ করে। এরূপে সে কায়িক আচরণের দিক হতে ত্রিবিধ পর্যায়ে পরিশুদ্ধ (ত্রিকোটি পরিশুদ্ধ) হয়।

পুনশ্চ, গৃহপতিগণ, আর্যশ্রাবক এরূপ চিন্তা করে : ‘যে কেউ যদি আমাকে মিথ্যাকামাচারে লিপ্ত করে, তাহলে তা আমার প্রিয় ও মনোজ্ঞ হবে না। আমিও যদি অপরকে মিথ্যাকামাচারে লিপ্ত করি, তাহলে অপরের নিকটও তা অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ হবে। যেই বিষয় আমার নিকট অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, অপরের নিকটও সেই বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। তাহলে আমার নিকট যে বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, তা কীরূপে অন্যের উপর চাপিয়ে দেব।’ সে এরূপ চিন্তাপূর্বক নিজেকে মিথ্যাকামাচার হতে বিরত রাখে এবং অপরকেও মিথ্যাকামাচার হতে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়। আর মিথ্যাকামাচার হতে বিরত হওয়ার সুফল ভাষণ করে। এরূপে সে কায়িক আচরণের দিক হতে ত্রিবিধ পর্যায়ে পরিশুদ্ধ (ত্রিকোটি পরিশুদ্ধ)হয়।

পুনশ্চ, গৃহপতিগণ, আর্যশ্রাবক এরূপ চিন্তা করে : ‘যে কেউ যদি আমাকে মিথ্যা বাক্য ভাষণ করায়, তাহলে তা আমার প্রিয় ও মনোজ্ঞ হবে না। আমিও যদি অপরকে মিথ্যা বাক্য ভাষণ করাই, তাহলে অপরের নিকটও তা অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ হবে। যেই বিষয় আমার নিকট অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, অপরের নিকটও সেই বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। তাহলে আমার নিকট যে বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, তা কীরূপে অন্যের উপর চাপিয়ে দেব।’ সে এরূপ চিন্তাপূর্বক নিজেকে মিথ্যা বাক্য বলা হতে বিরত রাখে এবং অপরকেও মিথ্যা বাক্য বলা হতে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়। আর মিথ্যা বাক্য বলা হতে বিরত হওয়ার সুফল ভাষণ করে। এরূপে সে কায়িক আচরণের দিক হতে ত্রিবিধ পর্যায়ে পরিশুদ্ধ (ত্রিকোটি পরিশুদ্ধ) হয়।

পুনশ্চ, গৃহপতিগণ, আর্যশ্রাবক এরূপ চিন্তা করে : ‘যে কেউ যদি আমাকে আমার বন্ধুদের সাথে বিভেদমূলক বাক্য দ্বারা ভেদ সৃষ্টি করে দেয়, তাহলে তা আমার প্রিয় ও মনোজ্ঞ হবে না। আমিও যদি অপরের বন্ধুদের সাথে বিভেদমূলক বাক্য দ্বারা ভেদ সৃষ্টি করি, তাহলে অপরের নিকটও তা অপ্রিয় অমনোজ্ঞ হবে। যেই বিষয় আমার নিকট অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, অপরের নিকটও সেই বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। তাহলে আমার নিকট যে বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, তা কীরূপে অন্যের উপর চাপিয়ে দেব।’ সে এরূপ চিন্তাপূর্বক নিজেকে বিভেদমূলক বাক্য বলা হতে বিরত রাখে এবং অপরকেও বিভেদমূলক বাক্য বলা হতে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়। আর বিভেদমূলক বাক্য বলা হতে বিরত হওয়ার সুফল ভাষণ করে। এরূপে সে কায়িক আচরণের দিক হতে ত্রিবিধ পর্যায়ে পরিশুদ্ধ (ত্রিকোটি পরিশুদ্ধ) হয়।

পুনশ্চ, গৃহপতিগণ, আর্যশ্রাবক এরূপ চিন্তা করে : ‘যে কেউ যদি আমাকে কর্কশ বাক্য ভাষণ করে, তাহলে তা আমার প্রিয় ও মনোজ্ঞ হবে না। আমিও যদি অপরকে কর্কশ বাক্য ভাষণ করি, তাহলে অপরের নিকটও তা অপ্রিয় অমনোজ্ঞ হবে। যেই বিষয় আমার নিকট অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, অপরের নিকটও সেই বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। তাহলে আমার নিকট যে বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, তা কীরূপে অন্যের উপর চাপিয়ে দেব।’ সে এরূপ চিন্তাপূর্বক নিজেকে কর্কশ বাক্য বলা হতে বিরত রাখে এবং অপরকেও কর্কশ বাক্য বলা হতে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়। আর কর্কশ বাক্য বলা হতে বিরত হওয়ার সুফল ভাষণ করে। এরূপে সে কায়িক আচরণের দিক হতে ত্রিবিধ পর্যায়ে পরিশুদ্ধ (ত্রিকোটি পরিশুদ্ধ) হয়।

পুনশ্চ, গৃহপতিগণ, আর্যশ্রাবক এরূপ চিন্তা করে : ‘যে কেউ যদি আমাকে সম্প্রলাপ বাক্য ভাষণ করে, তাহলে তা আমার প্রিয় ও মনোজ্ঞ হবে না। আমিও যদি অপরকে সম্প্রলাপ বাক্য ভাষণ করি, তাহলে অপরের নিকটও তা অপ্রিয় অমনোজ্ঞ হবে। যেই বিষয় আমার নিকট অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, অপরের নিকটও সেই বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। তাহলে আমার নিকট যে বিষয় অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, তা কীরূপে অন্যের উপর চাপিয়ে দিব।’ সে এরূপ চিন্তাপূর্বক নিজেকে সম্প্রলাপ বাক্য বলা হতে বিরত রাখে এবং অপরকেও সম্প্রলাপ বাক্য বলা হতে বিরত থাকতে উপদেশ দেয়। আর সম্প্রলাপ বাক্য বলা হতে বিরত হওয়ার সুফল ভাষণ করে। এরূপেই সে কায়িক আচরণের দিক হতে ত্রিবিধ পর্যায়ে পরিশুদ্ধ (ত্রিকোটি পরিশুদ্ধ) হয়।

সে বুদ্ধের প্রতি এরূপে অবিচলিত শ্রদ্ধায় গুণান্বিত হয়-‘সেই ভগবান অর্হৎ, সম্যকসস্বুদ্ধ, বিদ্যা ও সুআচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ (লোকজ্ঞ), অনুত্তর পুরুষ দমনকারী সারথি এবং দেব-মানবের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবান।’ ধর্মের প্রতিও সে অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হয়-‘ভগবানের ধর্ম সুন্দররূপে ব্যাখ্যাত, স্বয়ং দর্শনযোগ্য, কালাকাল বিরহিত, এসে দেখার যোগ্য, নির্বাণপ্রাপক এবং বিজ্ঞজন কর্তৃক জ্ঞাতব্য।’ এবং সে সংঘের প্রতিও অগাধ শ্রদ্ধাগুণে সমৃদ্ধ হয়-‘ভগবানের শ্রাবকসংঘ সুপথে প্রতিপন্ন, ঋজুপথে প্রতিপন্ন, ন্যায়-পথে প্রতিপন্ন, সমীচীন-পথে প্রতিপন্ন, ভগবানের শ্রাবকসংঘ যুগ্ম হিসেবে চারি যুগ্ম এবং পুদ্গল হিসেবে অষ্ট আর্যপুদ্গলই চারি প্রত্যয় দান-আহুতি লাভের যোগ্য, আতিথেয়তা লাভের যোগ্য, দক্ষিণেয়্য (দক্ষিণার যোগ্য), অঞ্জলি (বন্দনা) করণীয় এবং জগতের অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র।’ সে অখণ্ড, নিশ্চিদ্র, নিখুঁত, নিষ্কলঙ্ক, বিমুক্তিতে উপনীতকারী, বিজ্ঞজন কর্তৃক প্রশংসিত (অদূষিত) এবং সমাধি লাভের সহায়ক শীলে সমন্নাগত হয়।

গৃহপতিগণ, যেহেতু আর্যশ্রাবক এই সপ্তগুণে গুণান্বিত হয়ে এবং এই চারটি প্রত্যাশিত বিষয়ে সমন্নাগত হয়। তাই সে যদি আকাঙ্ক্ষা করে তবে নিজেকে নিজে এরূপ প্রকাশ করতে পারে যে, ‘আমার নিরয়, তির্যক, প্রেত ও অপায় দুর্গতি বিনিপাত ক্ষীণ হয়েছে। আমি স্রোতাপন্ন, অবিনিপাতধর্মী এবং নিয়ত সম্বোধিপরায়ণ।’”

এরূপ উক্ত হলে বেলুদ্বারের ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ ভগবানকে এরূপ বললেন, “আশ্চর্য! মাননীয় গৌতম, অদ্ভুত! মাননীয় গৌতম, যেমন কেউ অধোমুখীকে উন্মুখী করে, আবৃতকে অনাবৃত করে, বিমূঢ়কে পথ নির্দেশ করে, অথবা অন্ধকারে তৈলপ্রদীপ ধারণ করে যাতে চক্ষুষ্মান ব্যক্তি রূপসমূহ দেখতে পায়; ঠিক এরূপেই মহানুভব গৌতম কর্তৃক বহু পর্যায়ে ও বিবিধ যুক্তিতে ধর্ম প্রকাশিত হয়েছে। আমরা এই মহানুভব গৌতমের এবং তৎপ্রবর্তিত ধর্ম ও তৎপ্রতিষ্ঠিত ভিক্ষুসংঘের শরণাগত হচ্ছি। হে মহানুভব গৌতম, আজ হতে আমাদেরকে আমরণ শরণাগত উপাসকরূপে অবধারণ করুন।” সপ্তম সূত্র।

ব্যাখ্যা [১]