ব্রহ্মজাল সূত্র
১. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি, একসময় ভগবান পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত সুবৃহৎ ভিক্ষুসংঘের সহিত রাজগৃহ ও নালন্দার মধ্যবর্তী রাজপথের উপর দিয়া চলিতেছিলেন। পরিব্রাজক সুপ্রিয়ও ব্রহ্মদত্ত নামক তরুণ বয়স্ক শিষ্যের সহিত রাজগৃহ ও নালন্দার মধ্যবর্তী রাজপথের উপর দিয়া চলিতেছিলেন। ওই সময়ে পরিব্রাজক সুপ্রিয় নানা প্রকারে বুদ্ধের নিন্দা করিতেছিলেন, ধর্মের নিন্দা করিতেছিলেন, সংঘের নিন্দা করিতেছিলেন। কিন্তু সুপ্রিয়ের তরুণ শিষ্য ব্রহ্মদত্ত নানাপ্রকারে বুদ্ধের প্রশংসোক্তি করিতেছিলেন, ধর্মের প্রশংসোক্তি করিতেছিলেন, সংঘের প্রশংসোক্তি করিতেছিলেন। এইরূপে তাঁহারা আচার্য ও শিষ্য উভয়ে প্রত্যক্ষভাবে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধবাদী হইয়া ভগবান ও ভিক্ষুগণের পশ্চাদনুসরণ করিতেছিলেন।
২. তৎপরে ভগবান ভিক্ষুসংঘের সহিত অম্বলট্ঠিকা নাম উদ্যানে স্থিত রাজকীয় ভবনে রাত্রিবাস করিলেন। পরিব্রাজক সুপ্রিয়ও তাঁহার তরুণ শিষ্য ব্রহ্মদত্তের সহিত ওই স্থানে রাত্রি যাপন করিলেন। ওই স্থানেও পরিব্রাজক সুপ্রিয় নানাপ্রকারে বুদ্ধের নিন্দোক্তি করিলেন, ধর্মের নিন্দোক্তি করিলেন, সংঘের নিন্দোক্তি করিলেন। কিন্তু সুপ্রিয়ের তরুণ শিষ্য ব্রহ্মদত্ত নানাপ্রকারে বুদ্ধের প্রশংসোক্তি করিলেন, ধর্মের প্রশংসোক্তি করিলেন, সংঘের প্রশংসোক্তি করিলেন। এইরূপে তাঁহারা, আচার্য ও শিষ্য উভয়ে, প্রত্যক্ষভাবে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধবাদী হইলেন।
৩. অনন্তর বহুসংখ্যক ভিক্ষু প্রত্যুষে গাত্রোত্থানপূর্বক মণ্ডলমালে সম্মিলিত হইয়া উপবেশন করিলে তাঁহাদের মধ্যে কথোপকথন এইরূপ ধারা অবলম্বন করিল : “কী আশ্চর্য, আবুসো, কী অদ্ভুত যে জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের নিকট মনুষ্যগণের প্রবৃত্তি যে কতরূপ বিভিন্ন আকার ধারণ করিতে পারে তাহা সুপ্রতিবিদিত। এই পরিব্রাজক সুপ্রিয় অনেক প্রকারে বুদ্ধের নিন্দোক্তি করিতেছেন, ধর্মের নিন্দোক্তি করিতেছেন, সংঘের নিন্দোক্তি করিতেছেন, কিন্তু তাঁহার শিষ্য তরুণ ব্রহ্মদত্ত অনেক প্রকারে বুদ্ধের প্রশংসোক্তি করিতেছেন, ধর্মের প্রশংসোক্তি করিতেছেন, সংঘের প্রশংসোক্তি করিতেছেন। এইরূপে তাঁহারা, আচার্য ও শিষ্য উভয়ে, প্রত্যক্ষভাবে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধবাদী হইয়া ভগবান ও ভিক্ষুগণের পশ্চাদনুসরণ করিতেছেন।”
৪. অতঃপর ভগবান ভিক্ষুদিগের কথোপকথনের ধারা অবগত হইয়া মণ্ডলমালে গমন করিলেন এবং তথায় নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিলেন। তৎপরে তিনি ভিক্ষুদিগকে সম্বোধন করিলেন :
“এই স্থানে উপবিষ্ট হইয়া তোমরা কী কথায় নিযুক্ত, তোমাদের কী আলোচনা বাধাপ্রাপ্ত হইল?” এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া ভিক্ষুগণ তাঁহাকে সমস্ত বৃত্তান্ত বলিলেন।
৫. “ভিক্ষুগণ, অপরে যদি আমার, কিম্বা ধর্মের, কিম্বা সংঘের নিন্দা করে, তজ্জন্য তোমরা দ্বেষাবিষ্ট হইও না, ক্ষুব্ধ হইও না, কুপিত হইও না। অপরে আমার, কিম্বা ধর্মের, কিম্বা সংঘের নিন্দা করিলে, যদি তোমরা কুপিত হও, অথবা হৃদয়ে আঘাত অনুভব করো, তাহা হইলে উহা তোমাদেরই পথে অন্তরায় হইবে। ভিক্ষুগণ, অপরে আমার, কিম্বা ধর্মের, কিম্বা সংঘের নিন্দা করিলে, যদি তোমরা কুপিত অথবা অসন্তুষ্ট হও, তাহা হইলে পরের বাক্য সুভাষিত কিংবা দুর্ভাষিত তাহা বিচার করিতে সক্ষম হইবে কি?”
“না, ভন্তে।”
ভিক্ষুগণ, অপরে আমার, কিম্বা ধর্মের, কিম্বা সংঘের নিন্দা করিলে তোমরা এই বলিয়া অসত্যের অসত্যতা প্রতিপন্ন করিবে, “এই কারণে ইহা অসত্য, এই কারণে ইহা মিথ্যা, আমাদিগের মধ্যে ইহার অস্তিত্ব নাই, আমাদিগের মধ্যে ইহা অবিদ্যমান।”
৬. কিন্তু, ভিক্ষুগণ, অপরে আমার, কিম্বা ধর্মের, কিম্বা সংঘের প্রশংসা করিলেও তোমরা সেজন্য আনন্দ, সৌমনস্য কিম্বা উল্লাসের প্রশ্রয় দিও না। তোমরা সেরূপ করিলে উহা তোমাদেরই পথে অন্তরায় হইবে। অপরে আমার, অথবা ধর্মের, অথবা সংঘের প্রশংসা করিলে তোমরা সত্যের সত্যতা স্বীকার করিবে এবং বলিবে, “এই কারণে এরূপ হইয়াছে, এই কারণে ইহা সত্য, আমাদিগের মধ্যে ইহার অস্তিত্ব আছে, আমাদিগের মধ্যে ইহা বিদ্যমান।”
চূলশীল
৭. “সংসারাসক্ত সাধারণ মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তন করিবার সময় তুচ্ছ, স্বল্পমূল্য শীল সম্বন্ধেই বলিয়া থাকে। যে তুচ্ছ, স্বল্পমূল্য শীলসমূহ তৎকর্তৃক কথিত হয়, উহা কী কী?
৮. “প্রাণাতিপাত পরিহার করিয়া উহা হইতে বিরত হইয়া শ্রমণ গৌতম দণ্ড ও শস্ত্র পরিত্যাগ করিয়াছেন, তিনি বিনয় ও দয়াশীলতার সহিত সর্বপ্রাণীর প্রতি মৈত্রী ও করুণা প্রণোদিত হইয়া বিচরণ করেন।” সংসারাসক্ত সাধারণ মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
“অদত্তের গ্রহণ পরিহারপূর্বক শ্রমণ গৌতম অদত্তের গ্রহণ হইতে বিরত; যাহা দত্ত তাহা গ্রহণ করিয়া, দানের প্রতীক্ষা করিয়া সততা ও শুদ্ধচিত্তের সহিত তিনি বিচরণ করেন।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
“ইন্দ্রিয়পরায়ণতা পরিহারপূর্বক ব্রহ্মচারী শ্রমণ গৌতম পাপ হইতে দূরে অবস্থান করেন, তিনি ইতরসুলভ মৈথুন হইতে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
৯. “মৃষাবাদ পরিহারপূর্বক শ্রমণ গৌতম মিথ্যা ভাষণ হইতে বিরত; তিনি সত্যবাদী, তিনি সত্য হইতে কখনো ভ্রষ্ট হন না; তিনি দৃঢ়চিত্ত ও বিশ্বাসযোগ্য; তিনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
“পিশুনবাক্য পরিহারপূর্বক শ্রমণ গৌতম উহা হইতে বিরত। তিনি এই স্থানে যাহা শ্রবণ করেন, এই স্থানের লোকের বিরুদ্ধে কলহ উৎপাদনের অভিসন্ধিতে তাহা অন্যত্র প্রকাশ করেন না; অন্যত্র যাহা শ্রবণ করেন, ওই স্থানের লোকের বিরুদ্ধে কলহ উৎপাদনের অভিসন্ধিতে তাহা এই স্থানে প্রকাশ করেন না। এইরূপে তিনি যাহারা ভিন্ন তাহাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠাতা, যাহারা মিত্র তাহাদের মধ্যে মৈত্রীর উৎসাহদাতা, ঐক্যকারক, ঐক্যপ্রিয়, ঐক্যানন্দ, ঐক্যোৎপাদক বাক্যের কথনকারী।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
“পুরুষবাক্য পরিহারপূর্বক শ্রমণ গৌতম উহা হইতে প্রতিবিরত। যে বাক্য অনিন্দ্য, যাহা শ্রুতি-সুখকর, মনোজ্ঞ, হৃদয়গ্রাহী, শিষ্ট-মনুষ্যের প্রীতিপ্রদ ও মনোহর, তিনি ওইরূপ বাক্য বলিয়া থাকেন।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
“বৃথাপ্রলাপ পরিহারপূর্বক শ্রমণ গৌতম উহা হইতে বিরত। তিনি কালবাদী, ভূতবাদী, ধর্মবাদী, বিনয়বাদী; তিনি যথাকালে যুক্তিপূর্ণ, সুবিভক্ত, অর্থ-সংহতি মূল্যবান বাক্য বলিয়া থাকেন।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ উক্তি করিয়া থাকে।
১০. “শ্রমণ গৌতম বীজ ও উদ্ভিদের বিনাশ হইতে প্রতিবিরত। তিনি একাহারী, রাত্রি ও বিকাল ভোজনে প্রতিবিরত। তিনি নৃত্য-গীত-বাদ্য-সম্বলিত প্রদর্শনী গমনে বিরত। তিনি মাল্য, গন্ধ ও বিলেপনের ধারণ, মণ্ডন ও বিভূষণ হইতে বিরত। তিনি উচ্চ ও বৃহৎ শয্যার ব্যবহারে বিরত। তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্যের গ্রহণ হইতে বিরত। কুক্কুট ও শূকর গ্রহণে বিরত। তিনি হস্তী, গো, অশ্ব ও অশ্বী গ্রহণে বিরত। তিনি অপক্ব শস্যের গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি অপক্ব মাংসের গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি স্ত্রীলোক ও কুমারীর গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি ক্রীতদাসী ও ক্রীতদাসের গ্রহণে বিরত। তিনি মেষ ও ছাগের গ্রহণে বিরত। তিনি কর্ষিত ও অকর্ষিত ভূমির গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি দূত ও সংবাদবাহকের কর্ম হইতে বিরত। তিনি ক্রয় ও বিক্রয় হইতে বিরত। তিনি তুলা, কংস ও মান-সম্বন্ধিত প্রবঞ্চনা হইতে বিরত। তিনি উৎকোচ, বঞ্চনা ও শাঠ্যরূপ বক্রগতি হইতে বিরত। তিনি ছেদন, বধ, বন্ধন, দস্যুতা, লুণ্ঠন ও আক্রমণ হইতে বিরত। সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
চূলশীল সমাপ্ত।
মধ্যম শীল
১১. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও পঞ্চবীজ শ্রেণির ও তদুদ্ভূত উদ্ভিদসমূহের, যথা : মূলবীজ, খণ্ডবীজ, গ্রন্থিবীজ, অগ্রবীজ এবং বীজ-বীজ-এই সমুদয়ের বিনাশে রত থাকেন; কিন্তু শ্রমণ গৌতম এইরূপ বীজ ও উদ্ভিদের বিনাশের প্রতি বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
১২. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ সঞ্চিত দ্রব্যের উপভোগে রত থাকেন; যথা : সঞ্চিত অন্ন, পান, বস্ত্র, পান, শয্যা, গন্ধ এবং ব্যঞ্জন পাকোপকরণ; কিন্তু শ্রমণ গৌতম এই প্রকার সঞ্চিত দ্রব্যের উপভোগে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
১৩. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ প্রদর্শনী গমনে রত থাকেন; যথা : নৃত্য, গীত, বাদ্য, প্রেক্ষা, আখ্যান প্রাণিস্বর , কবির গান, দামামা বাদ্য, রঙ্গমঞ্চে প্রদর্শিত দৃশ্যপট, চণ্ডাল বাজীকরের কৌশল, হস্তী-যুদ্ধ, অশ্ব-যুদ্ধ, মহিষ-যুদ্ধ, বৃষভ-যুদ্ধ, অজ-যুদ্ধ, মেষ-যুদ্ধ, কুক্কুট-যুদ্ধ, বর্তক-যুদ্ধ , দণ্ড-যুদ্ধ, মুষ্টি-যুদ্ধ, মল্ল-যুদ্ধ, কৃত্রিম-যুদ্ধ, সেনাবিন্যাস, সৈন্যব্যূহ, বাহিনী পরিদর্শন-শ্রমণ গৌতম এইরূপ প্রদর্শনী গমন হইতে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
১৪. কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ দ্যূত ও অলস ক্রীড়ারূপ প্রমোদে আসক্ত হইয়া থাকেন; যথা : অষ্টপদ, দশপদ , আকাশ , পরিহার-পথ , সন্তিকা , খালিকা , ঘটিকা , শলাক-হস্ত , অক্ষ , পঙ্গচীর , বঙ্কক , মোক্ষচিকা , চিঙ্গুলিক , প্রত্রাঢ়ক , ক্রীড়ার্থ রথ ও ধনু, অক্ষরিকা , মনেষিকা , অক্ত বিকৃতির অনুকরণ ;” কিন্তু শ্রমণ গৌতম এইরূপ দ্যূত ও অলস ক্রীড়ারূপ প্রমাদে অনাসক্ত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
১৫. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ উচ্চ ও মহাশয়ন ব্যবহারে রত থাকেন; যথা : আসণ্ডি , পর্যঙ্ক, গোণক , চিত্তক , পটিকা , পটলিকা , তূলিকা , বিকতিকা , উদ্দলোমী , একান্তলোমী , কট্ঠিষ্য , কেষৌয়, কুত্তক , হস্তী, অশ্ব ও রথাস্তরণ, অজিনাস্তরণ, কদলী-মৃগ , চর্ম আস্তরণ, সচন্দ্রাতপ আস্তরণ, শির ও পাদদেশ রক্ষার নিমিত্ত লোহিত উপাধানযুক্ত পর্যঙ্ক; কিন্তু শ্রমণ গৌতম এই প্রকার উচ্চ ও মহাশয়ন ব্যবহারে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
১৬. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ মণ্ডণ ও বিভূষণাদিতে রত থাকেন; যথা : উৎসাদন , পরিমর্দন, স্নান, সংবাহন , দর্পণ, অঞ্জন, মাল্য, বিলেপন, মুখচূর্ণ, মুখবিলেপণ, কঙ্কণ, শিখাবন্ধ, দণ্ড, নাড়িক , খড়গ, ছদ্র, চিত্রিত পাদুকা, উষ্ণীষ, মণি, বাল-বীজনী, দীর্ঘ দশাবিশিষ্ট শুভ্র বস্ত্র; কিন্তু শ্রমণ গৌতম এবম্বিধ মণ্ডণ ও বিভূষণাদি হইতে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
১৭. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ হীন আলাপে রত থাকেন; যথা : রাজ-কথা, চোর-কথা, মহামাত্য-কথা, সেনা সম্বন্ধীয়-কথা, ভয়-কথা, যুদ্ধ-কথা, খাদ্য ও পানীয়-কথা, বস্ত্র-কথা, শয়ন-কথা, মাল্য-কথা, গন্ধ-কথা, জ্ঞাতি-কথা, যান-কথা, গ্রাম-কথা, নিগম-কথা, নগর-কথা, জনপদ-কথা, নারী-কথা, বীর-কথা, পথ-কথা, কুম্ভস্থান-কথা , পূর্বপুরুষ-কথা , নিরর্থক কথা পৃথিবী ও সমুদ্রের উৎপত্তি সম্বন্ধীয় মন্তব্য, অস্তিত্ব ও নাস্তিত্ব সম্বন্ধীয় কথা; কিন্তু শ্রমণ গৌতম এইরূপ হীন আলাপে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
১৮. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়া এইরূপ বিগ্রাহিক কথায় নিযুক্ত হন; যথা : “তুমি এই ধর্ম ও বিনয় অবগত নও, আমি অবগত আছি, তুমি কী প্রকারে এই ধর্ম ও বিনয় জানিবে? তুমি মিথ্যাদৃষ্টির অনুবর্তী হইয়াছ, আমি সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন-আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলিতেছি, তুমি অপ্রাসঙ্গিক বলিতেছ, পূর্বে কথনীয় তুমি পশ্চাতে বলিয়াছ, পশ্চাতে কথনীয় পূর্বে বলিয়াছ, তোমার বিচার ব্যর্থ হইয়াছে-তোমার আহ্বান গৃহীত হইয়াছে, তুমি নিগৃহীত হইয়াছ, স্বকীয় দৃষ্টি পরিশুদ্ধ হয়। যদি সক্ষম হও আপনাকে পাপ মুক্ত করো।” শ্রমণ গৌতম এবম্বিধ বিগ্রাহিক কথায় বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
১৯. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও রাজগণ, মহামাত্যগণ, ক্ষত্রিয়গণ, ব্রাহ্মণগণ এবং গৃহপতি কুমারগণ তাঁহাদিগকে “এই স্থানে যাও, সেই স্থানে যাও, ইহা লইয়া আইস, ইহা ওই স্থানে লইয়া যাও” এইরূপ দৌত্যকর্মে নিযুক্ত করিলে তাঁহারা উহাতে নিযুক্ত হন। শ্রমণ গৌতম এইরূপ দৌত্যকর্মে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
২০. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও কুহক হইয়া থাকেন, লপক হইয়া থাকেন, নৈমিত্তিক হইয়া থাকেন, নিষ্পেষিক হইয়া থাকেন, লাভোপরি লাভগৃধ্রু হইয়া থাকেন, শ্রমণ গৌতম এইরূপ কূহক ও লপন হইতে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
মধ্যম শীল সমাপ্ত।
মহাশীল
২১. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : সামুদ্রিক বিদ্যা, নিমিত্ত, উৎপাত , স্বপ্ন, লক্ষণ, মুষিকচ্ছিন্ন বস্ত্র , অগ্নিহোম, দর্বি-হোম , তুষ-হোম, কণ-হোম , তণ্ডুল-হোম, ঘৃত-হোম, তৈল-হোম, মুখ-হোম , রক্ত-হোম, অঙ্গবিদ্যা , বাস্তুবিদ্যা , ক্ষত্রবিদ্যা , শিববিদ্যা , ভূতবিদ্যা, ভূরিবিদ্যা , অহিবিদ্যা, বিষবিদ্যা, বৃশ্চিকবিদ্যা, মূষিকবিদ্যা, পক্ষীবিদ্যা, বায়সবিদ্যা, পক্বধ্যান , শর পরিত্রাণ, মৃগচক্র , শ্রমণ গৌতম এই প্রকার হীনবিদ্যায় বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
২২. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : মণিলক্ষণ, দণ্ডলক্ষণ, অসিলক্ষণ, শরলক্ষণ, ধনুলক্ষণ, আয়ুধলক্ষণ, স্ত্রীলক্ষণ, পুরুষলক্ষণ, কুমারলক্ষণ, কুমারীলক্ষণ, দাসলক্ষণ, দাসীলক্ষণ, হস্তীলক্ষণ, অশ্বলক্ষণ, মহিষলক্ষণ, বৃষলক্ষণ, গোলক্ষণ, অজলক্ষণ, মেষলক্ষণ, কক্কুটলক্ষণ, বর্তকলক্ষণ, গোধালক্ষণ, কর্ণিকালক্ষণ, কচ্ছপলক্ষণ, মৃগলক্ষণ-শ্রমণ গৌতম এইরূপ হীনবিদ্যায় বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
২৩. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : “রাজগণ যুদ্ধযাত্রা করিবেন, তাঁহারা পুনঃ প্রত্যাবর্তন করিবেন; অভ্যন্তর রাজগণ আক্রমণ করিবেন, বাহির রাজগণ পলায়ন করিবেন; বাহির রাজগণ আক্রমণ করিবেন, অভ্যন্তর রাজগণ পলায়ন করিবেন; অভ্যন্তর রাজগণের জয় হইবে, বাহির রাজগণের পরাজয় হইবে; বাহির রাজগণের জয় হইবে, অভ্যন্তর রাজগণের পরাজয় হইবে; এইরূপে এক পক্ষের জয় হইবে, অপর পক্ষের পরাজয় হইবে।” শ্রমণ গৌতম এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
২৪. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : “চন্দ্রগ্রহণ হইবে, সূর্যগ্রহণ হইবে, নক্ষত্রগ্রহণ হইবে। চন্দ্র-সূর্যের যথানির্দিষ্ট পথে গমন হইবে, চন্দ্রসূর্যের বিপথে গমন হইবে, নক্ষত্রদিগের যথানির্দিষ্ট পথে গমন হইবে, উহাদিগের বিপথে গমন হইবে। উল্কাপাত হইবে। দাবাগ্নি হইবে। ভূমিকম্প হইবে। বজ্রপাত হইবে। চন্দ্র-সূর্য নক্ষত্রের উদয়, অস্ত, মালিন্য অথবা ঔজ্জ্বল্য হইবে। চন্দ্রগ্রহণের এই ফল হইবে, সূর্যগ্রহণের এই ফল হইবে, চন্দ্রসূর্যের নির্দিষ্ট পথে গতি হইলে এই ফল হইবে, নির্দিষ্ট পথে গতি হইলে এই ফল হইবে, উহারা বিপথে গমন করিলে এই ফল হইবে। উল্কাপাতের এই ফল হইবে, দাবাগ্নির এই ফল হইবে, ভূমিকম্পের এই ফল হইবে, বজ্রপাতের এই ফল হইবে, চন্দ্র-সূর্য নক্ষত্রগণের উদয়, অস্ত, মালিন্য অথবা ঔজ্জ্বল্যের এই ফল হইবে।” শ্রমণ গৌতম এইরূপ হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
২৫. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : “সুবৃষ্টি হইবে, দুর্বৃষ্টি হইবে, সুভিক্ষ হইবে, দুর্ভিক্ষ হইবে, শান্তি হইবে, অশান্তি হইবে, রোগ হইবে, আরোগ্য হইবে, মুদ্রা, গণনা, সংখ্যান, কবিতা রচনা, লোকায়ত।” শ্রমণ গৌতম এইরূপ হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
২৬. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : আবাহন , বিবাহন , সংবদন , বিবদন , সংকিরণ , বিকিরণ , সৌভাগ্যকরণ, দুর্ভাগ্যকরণ, গর্ভপাতকরণ , জিহ্বার জড়তা সাধন, হনুর জড়তা সাধন, হস্তের ঊর্ধ্বক্ষেপ, বধিরতা সাধন, আদর্শ-প্রশ্ন , কুমারী-প্রশ্ন , দেব-প্রশ্ন , সূর্যোপাসনা, মহা ব্রহ্মোপাসনা, অভ্যুজ্জ্বলন , শ্রী-আহ্বান , শ্রমণ গৌতম এইরূপ হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
২৭. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : শান্তিকর্ম প্রণিধিকর্ম , ভূমিকর্ম , বর্ষকর্ম , বর্ষবর কর্ম , বাস্তুকর্ম , বস্তু পরিকিরণ , আচমন, স্নান, যজ্ঞ, বমন, বিরেচন, ঊর্ধ্ববিরেচন, অধোবিরেচন, শীর্ষ বিরেচন, কর্ণতৈল, নেত্র-অর্পণ, নাসিকা কর্ম অঞ্জন, অভিলেপন, শালাক্য , শল্যকর্ম , শিশু চিকিৎসা, মূল ও ভৈষজ্যের প্রয়োগ ওষুধের প্রতিমোক্ষ , শ্রমণ গৌতম এইরূপ হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত।” সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
ভিক্ষুগণ, ইহাই সেই ক্ষুদ্র ও গৌণ-শীল যাহার জন্য সংসারাসক্ত মনুষ্য তথাগতের প্রশংসা কীর্তনকালে এইরূপ বলিয়া থাকে।
মহাশীল সমাপ্ত।
শাশ্বতবাদ
২৮. “ভিক্ষুগণ, অন্য ধর্ম আছে, যাহা গম্ভীর দুর্দর্শ, দুরানুবোধ্য, শান্ত, প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত-বেদনীয়, যাহা তথাগত স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করেন, যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।”
“ভিক্ষুগণ, ওই ধর্ম কী কী?
২৯. “ভিক্ষুগণ, এমন শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা পূর্বান্তকল্পিক, পূর্বান্তানুদৃষ্টি, যাঁহারা অষ্টাদশ কারণে পূর্বান্ত সম্বন্ধে নানাবিধ মন্তব্য প্রকাশ করেন। ওই সকল সম্মানার্হ শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের সম্বন্ধে, কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ করিয়া থাকেন?
৩০. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শাশ্বতবাদী, তাঁহারা চতুর্বিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে শাশ্বত ঘোষণা করেন। ওই সকল সম্মানার্হ শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের সম্বন্ধে, কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ করিয়া থাকেন?
৩১. “ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ উৎসাহ, উদ্যোগ, অনুযোগ, অপ্রমাদ, সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধি প্রাপ্ত হন যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় তিনি অনেক পূর্বনিবাস স্মরণ করেন-এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ, অনেক শত, অনেক সহস্র অনেক লক্ষ জন্ম। “অমুক স্থানে আমার এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এইরূপ আহার ছিল আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম, এত বৎসর আমার আয়ু ছিল। সেখান হইতে চ্যুত হইয়া আমি অমুক স্থানে জন্মিয়াছিলাম। তথায় আমার এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এইরূপ আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখদুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম, এত বৎসর আমার আয়ু ছিল। সেই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে জন্মিয়াছি।” এইরূপ বহুবিধ পূর্বজন্মের আকার ও প্রকার তিনি স্মরণ করেন। তৎপরে তিনি বলিলেন, “আত্মা শাশ্বত, জগৎ শাশ্বত, অপরিণামী, কূটস্থ এবং অচল; যদিও তাহারা জন্ম হইতে জন্মান্তরে গমন করে, চ্যুত হয় এবং পুনর্বার উৎপন্ন হয়, তথাপি অস্তিত্ব শাশ্বত। কী হেতু? আমি উদ্যোগ, অনুযোগ, অপ্রমাদ, সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধি প্রাপ্ত হই যে ওইরূপ সমাধির অবস্থায় আমি অনেক পূর্বনিবাস স্মরণ করি-এক জন্ম… লক্ষ জন্ম। অমুক স্থানে আমার এই নাম… এই স্থানে আসিয়াছি। এইরূপ বহুবিধ পূর্বজন্মের আকার ও প্রকার আমি স্মরণ করি। এইজন্যই আমি জানি আত্মা ও জগৎ শাশ্বত, অপরিণামী, কূটস্থ এবং অচল; এবং যদিও তাহারা জন্ম হইতে জন্ম-জন্মান্তরে গমন করে, চ্যুত হয় এবং পুনর্বার উৎপন্ন হয়, তথাপি অস্তিত্ব শাশ্বত।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই প্রথম কারণ যাহার ভিত্তিতে, যাহাকে অবলম্বন করিয়া কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শাশ্বতবাদী হইয়া থাকেন, আত্মা ও জগৎকে শাশ্বত বলিয়া থাকেন।
৩২. [দ্বিতীয় কারণ যাহা উক্ত হইয়াছে তাহা সর্বতোভাবে একই প্রকার, মাত্র এই প্রভেদ যে পূর্বজন্মের অনুস্মৃতি লক্ষ জন্মও অতিক্রম করিয়া দশ-সংবর্ত-বিবর্ত কালব্যাপী হয়।]
৩৩. [তৃতীয় কারণ যাহা উক্ত হইয়াছে তাহা সর্বতোভাবে একই প্রকার, মাত্র এই প্রভেদ যে পূর্বজন্মের অনুস্মৃতি চত্বারিংশ সংবর্ত-বিবর্ত কালব্যাপী হয়।]
৩৪. “চতুর্থত ওই সকল সম্মানার্হ শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে, কীসের অবলম্বনে শাশ্বতবাদী হইয়া থাকেন, আত্মা ও জগৎকে শাশ্বত বলিয়া থাকেন?
ভিক্ষুগণ, এই ক্ষেত্রে কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ তার্কিক ও আলোচনাপ্রিয় হইয়া থাকেন। তিনি তর্ক-পর্যাহত বিচার প্রতিষ্ঠিত এইরূপ আত্মসিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন : “আত্মা ও জগৎ শাশ্বত, অপরিণামী, কূটস্থ এবং অচল, এবং যদিও তাহারা জন্ম হইতে জন্মান্তরে গমন করে, চ্যুত হয় এবং পুনর্বার উৎপন্ন হয়, তথাপি অস্তিত্ব শাশ্বত।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই চতুর্থ কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহাকে অবলম্বন করিয়া কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শাশ্বতবাদী হইয়া থাকেন, আত্মা ও জগৎকে শাশ্বত বলিয়া থাকেন।”
৩৫. “ভিক্ষুগণ, ইহারাই ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ যাঁহারা চতুর্বিধ কারণে শাশ্বতবাদী হইয়া থাকেন, আত্মা ও জগৎকে শাশ্বত বলিয়া থাকেন। ভিক্ষুগণ, শ্রমণ ও ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে যাঁহারাই শাশ্বতবাদী হইয়া আত্মা ও জগৎকে শাশ্বত বলিয়া থাকেন, তাঁহারা সকলেই এই চতুর্বিধ কারণে কিম্বা উহাদিগের মধ্যে এক কিম্বা অপর কারণে ওইরূপ বলিয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণ নহে।
৩৬. “ভিক্ষুগণ, ওই সম্বন্ধে তথাগত অবগত আছেন যে ওই সকল দৃষ্টিস্থান এইরূপে গৃহীত, এইরূপে বিচারিত হইয়া এই এই গতি প্রাপ্ত হইবে, ওই সকল আসক্ত মনুষ্য জন্মান্তরে এই এই দশায় উপনীত হইবে তথাগত উহা জানেন, উহাপেক্ষাও অনেক অধিক জানেন, কিন্তু ওই জ্ঞান তাঁহাকে স্ফীত করে না, উহা দ্বারা অস্পৃষ্ট হইয়া তিনি স্বীয় অন্তরে মুক্তি অনুভব করেন, বেদনাসমূহের উৎপত্তি, লয়, আস্বাদ, দৈন্য ও নিঃসরণ যথাযথরূপে বিদিত হইয়া, আসক্তি বর্জিত হইয়া তথাগত বিমুক্তরূপে অবস্থান করেন।
৩৭. “ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই ধর্ম যাহা গম্ভীর, দুর্দশ, দুরানুবোধ, শান্ত, প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত-বেদনীয়, যাহা তথাগত স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করেন, যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
প্রথম ভাণবার সমাপ্ত।
আভাস্বর
৩৮. “ভিক্ষুগণ কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন, যাঁহারা কোনো কোনো বিষয়ে শাশ্বতবাদী, কোনো কোনো বিষয়ে অশাশ্বতবাদী, যাঁহারা চতুর্বিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে আংশিকভাবে শাশ্বত ও আংশিকভাবে অশাশ্বত ঘোষণা করেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের উপর নির্ভর করিয়া কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ করিয়া থাকেন?
৩৯. “ভিক্ষুগণ, এমন সময় আসে যখন, আজই হউক কিম্বা কালই হউক, দীর্ঘকাল অতীত হইবার পর এই জগৎ লয়প্রাপ্ত হয়। ওইরূপ সময়ে জীবগণ বহুল পরিমাণে আভাস্বর জগতে পুনর্জন্ম লাভ করে। তাহারা তথায় মনোময় হইয়া থাকে, প্রীতি তাহাদের ভক্ষ্যস্বরূপ হয়, তাহারা স্বয়ংপ্রভ, অন্তরীক্ষচর এবং শুভস্থায়ী হইয়া সুদীর্ঘকাল অবস্থান করে।
৪০. “ভিক্ষুগণ, এমন সময় আসে যখন, আজই হউক কিম্বা কালই হউক, দীর্ঘকাল অতীত হইবার পর, এই জগতের বিবর্তন হয়। ওই সময় শূন্য ব্রহ্মবিমান প্রাদুর্ভূত হয়। কোনো সত্ত্ব আয়ুক্ষয় কিম্বা পুণ্যক্ষয়ের নিমিত্ত আভাস্বর জগৎ হইতে চ্যুত হইয়া শূন্য ব্রহ্মবিমানে পুনরায় উৎপন্ন হয়। সে তথায় মনোময় হইয়া থাকে, প্রীতি তাহার ভক্ষ্য হয়, সে স্বয়ংপ্রভ, অন্তরীক্ষচর এবং শুভস্থায়ী হইয়া দীর্ঘকাল অবস্থান করে।
৪১. “দীর্ঘকাল তথায় একাকী বাস করিয়া তাহার মনে উদ্বেগ, অসন্তুষ্টি ও ভয়ের উৎপত্তি হয়। “হায়, যদি অপর জীবগণও এইস্থানে আগমন করিত।” ওই সময়েই অন্য জীবগণও, আয়ুক্ষয় কিম্বা পুণ্যক্ষয়বশত আভাস্বর লোক হইতে চ্যুত হইয়া, তাহার সঙ্গীরূপে ব্রহ্মবিমানে উৎপন্ন হয়। তাহারাও তথায় মনোময় হইয়া থাকে, প্রীতি তাহাদের ভক্ষ্য হয়, তাহারা স্বয়ংপ্রভ, অন্তরীক্ষচর এবং শুভস্থায়ী হইয়া সুদীর্ঘকাল অবস্থান করে।
৪২. “ভিক্ষুগণ, তদনন্তর প্রথমোৎপন্ন সত্ত্ব এইরূপ চিন্তা করিলেন, “আমি ব্রহ্মা, মহাব্রহ্মা, অভিভূ, অনভিভূত, সর্বদর্শী সর্বশক্তিমান, ঈশ্বর, কর্তা, নির্মাতা, শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, ভূত ও ভক্ষ্যের শক্তিমান পিতা। এই জীবগণ আমা কর্তৃক সৃষ্ট। কী হেতু? পূর্বে আমি এইরূপ চিন্তা করিয়াছিলাম, “অহো, অন্য জীবগণও এইস্থানে আগমন করুক!” আমার এই প্রার্থনায় এই সকল সত্ত্ব এখানে আগমন করিয়াছে।” পশ্চাদুৎপন্ন সত্ত্বগণও এইরূপ চিন্তা করে, “ইনি ব্রহ্মা, মহাব্রহ্মা, অভিভূ, অনভিভূত, সর্বদর্শী, সর্বশক্তিমান, ঈশ্বর, কর্তা, নির্মাতা, শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, ভূত ও ভক্ষ্যের শক্তিমান পিতা। আমরা এই ব্রহ্ম কর্তৃক সৃষ্ট। কী হেতু? আমরা ইহাকেই প্রথমোৎপন্ন জীবরূপে দেখিয়াছি, আমরা ইহার পশ্চাতে উৎপন্ন।”
৪৩. “ভিক্ষুগণ, অতঃপর যিনি প্রথমে উৎপন্ন হইয়াছিলেন, তিনি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘায়ু, সৌন্দর্য ও পরাক্রমশালী। যাঁহারা পশ্চাতে উৎপন্ন হইয়াছিলেন তাঁহারা অপেক্ষাকৃত অল্পায়ু, অল্প সৌন্দর্য ও পরাক্রমশালী।
৪৪. তৎপরে, ভিক্ষুগণ, ইহা সম্ভব যে কোনো এক সত্ত্ব ওই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই লোকে আগমন করেন। এই লোকে আগমন করিয়া তিনি গৃহবাস পরিত্যাগ করিয়া অনাগারিত্ব অবলম্বন করেন। তৎপরে তিনি উৎসাহ, উদ্যোগ, অনুযোগ, অপ্রমাদ, সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধি প্রাপ্ত হন যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় তিনি উক্ত পূর্বনিবাস স্মরণ করেন, কিন্তু তৎপূর্ববর্তী জন্ম স্মরণ করিতে অক্ষম হন। তিনি এইরূপ বলিলেন, “সেই মহিমাময় ব্রহ্মা, মহাব্রহ্মা, অভিভূ, অনভিভূত, সর্বদর্শী, সর্বশক্তিমান, ঈশ্বর, কর্তা, নির্মাতা, শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, ভূত ও ভক্ষ্যের শক্তিমান পিতা-যাঁহা কর্তৃক আমরা সৃষ্ট হইয়াছি, তিনি নিত্য, ধ্রুব, শাশ্বত, অবিপরিণাম-ধর্ম, তিনি অনন্তকাল এরূপে অবস্থান করিবেন। কিন্তু সেই ব্রহ্মা কর্তৃক সৃষ্ট আমরা অনিত্য, অধ্রুব, অল্পায়ু, পরিবর্তনশীল হইয়া এই লোকে আগমন করিয়াছি।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই প্রথম ঘটনা সমাবেশ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কোনো কোনো বিষয়ে শাশ্বতবাদী কোনো কোনো বিষয়ে অশাশ্বতবাদী হইয়া আত্মা ও জগৎকে আংশিকভাবে শাশ্বত ও আংশিকভাবে অশাশ্বত ঘোষণা করেন।
৪৫. “দ্বিতীয় শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
“ভিক্ষুগণ, কতগুলি দেবতা আছেন যাঁহাদের নাম ক্রীড়া-প্রদোষিক। তাঁহারা দীর্ঘকাল ধরিয়া হাস্য-ক্রীড়া-রতি-ধর্মসম্পন্ন হইয়া বিহার করেন। ওই কারণে তাঁহাদের স্মৃতি বিলুপ্ত হয়, এবং ওই মোহের কারণে তাঁহারা সেই জন্ম হইতে চ্যুত হন।
৪৬. “এক্ষণে, ভিক্ষুগণ, ইহা সম্ভব যেকোনো সত্ত্ব ওই জন্ম হইতে চ্যুত হইয়া এই লোকে আগমন করেন। ইহলোকে আগমন করিয়া তিনি গৃহবাস পরিত্যাগপূর্বক অনাগারিত্ব অবলম্বন করেন। তৎপরে তিনি উৎসাহ, উদ্যোগ, অনুযোগ, অপ্রমাদ, সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্তসমাধি প্রাপ্ত হন যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় তিনি পূর্বোক্ত জন্ম অনুস্মরণ করেন, কিন্তু তৎপূর্ব জন্ম স্মরণ করিতে অক্ষম হন।
ক্রীড়া-প্রদোষিক
“তিনি এইরূপ বলিলেন, “যে-সকল দেবতা ক্রীড়া-প্রদোষিক নহেন, তাঁহারা দীর্ঘকাল হাস্য-ক্রীড়া-রতি-ধর্মসম্পন্ন হইয়া বিহার করেন না। উহার ফলে তাঁহাদের স্মৃতি বিমুগ্ধ হয় না এবং ওই অমোহের ফলে তাঁহারা সেই জন্ম হইতে চ্যুত হন না, তাঁহারা নিত্য, ধ্রুব, শাশ্বত, অবিপরিণাম ধর্ম, তাঁহারা অনন্তকাল ওই স্থানেই অবস্থান করিবেন। কিন্তু আমরা ক্রীড়া-প্রদোষিক হইয়া দীর্ঘকাল হাস্য-ক্রীড়া-রতি-ধর্মসম্পন্ন হইয়া বিচরণ করিয়াছিলাম, তাহার ফলে আমাদের স্মৃতি বিমুগ্ধ হইয়াছিল, ওই মোহের ফলে আমরা সেই জন্ম হইতে চ্যুত হইয়া অনিত্য, অধ্রুব, অল্পায়ু, পরিবর্তনশীলরূপে ইহলোকে আগমন করিয়াছি।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই দ্বিতীয় ঘটনা সমাবেশ যাহার ভিত্তিকে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ উক্তরূপ মতবাদী হইয়া উক্ত মত প্রকাশ করেন।
৪৭. “তৃতীয় শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
“ভিক্ষুগণ, কতকগুলি দেবতা আছেন যাঁহাদের নাম মনোপ্রদোষিক। দীর্ঘকাল পরস্পর পরস্পরের প্রতি অসূয়াপরবশ হইয়া তাঁহাদের চিত্ত পরস্পরের প্রতি প্রদুষ্ট হয়। এইরূপ প্রদুষ্ট-চিত্ত হইয়া তাঁহাদের দেহ ও মন ক্লান্ত হয়। ওই দেবগণ ওই দেহ হইতে চ্যুত হন।
৪৮. “এক্ষণে, ভিক্ষুগণ, ইহা সম্ভব যেকোনো এক সত্ত্ব ওই জন্ম হইতে চ্যুত হইয়া এই লোকে আগমন করেন। ইহলোকে আগমন করিয়া তিনি গৃহবাস পরিত্যাগপূর্বক অনাগারিত্ব অবলম্বন করেন। তৎপরে তিনি উৎসাহ, উদ্যোগ, অনুযোগ, অপ্রমাদ, সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধি প্রাপ্ত হন যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় তিনি পূর্বোক্ত জন্ম অনুস্মরণ করেন, কিন্তু তৎপূর্বের জন্ম স্মরণ করিতে অক্ষম হন।
তিনি এইরূপে বলিলেন, “যে-সকল দেবতা মনোপ্রদোষিক নহেন, তাঁহারা দীর্ঘকাল পরস্পর পরস্পরের প্রতি অসূয়াপরবশ হন না। ফলে তাঁহাদের চিত্ত পরস্পরের প্রতি প্রদুষ্ট হয় না, তাঁহাদের দেহ ও মন ক্লান্ত হয় না। তাঁহারা ওই দেহ হইতে চ্যুত হন না। তাঁহারা নিত্য, ধ্রুব, শাশ্বত, অবিপরিণাম-ধর্ম হইয়া অনন্তকাল ওই স্থানেই অবস্থান করেন। কিন্তু আমরা মনোপ্রদোষিক হইয়া পরস্পর পরস্পরের প্রতি অসূয়াপরবশ হইয়াছিলাম, আমাদের চিত্ত পরস্পরের প্রতি প্রদুষ্ট হইয়াছিল, আমাদের দেহ ও মন ক্লান্ত হইয়াছিল। আমরা ওই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অনিত্য, অধ্রুব, অল্পায়ু ও মৃত্যু পরায়ণ হইয়া ইহলোকে আগমন করিয়াছি।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই তৃতীয় ঘটনা সমাবেশ, যাহার ভিত্তিতে, যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ উক্তরূপ মতবাদী হইয়া উক্ত মত প্রকাশ করেন।
৪৯. “চতুর্থ শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে এরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
“ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ তার্কিক ও আলোচনাপ্রিয় হইয়া থাকেন। তিনি তর্কপর্যহিত বিচার প্রতিষ্ঠিত এইরূপ আত্মসিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন, “যাহা চক্ষু কিম্বা কর্ণ কিম্বা নাসিকা কিম্বা জিহ্বা কিম্বা কায় কথিত হয় তাহা অনিত্য, অধ্রুব, অশাশ্বত, বিপরিণামধর্ম আত্মা, কিন্তু যাহা চিত্ত কিম্বা মন কিম্বা বিজ্ঞান কথিত হয়, তাহা নিত্য, ধ্রুব শাশ্বত অবিপরিণাম-ধর্ম আত্মা, উহা অনন্তকাল ওইরূপই থাকিবে।”
মনোপ্রদোষিক
“ভিক্ষুগণ, ইহাই চতুর্থ ঘটনাসমাবেশ, যাহার ভিত্তিতে, যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ উক্তরূপ মতবাদী হইয়া উক্ত মত প্রকাশ করেন।
৫০. “ভিক্ষুগণ, ইঁহারাই ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, যাঁহারা কোনো কোনো বিষয়ে শাশ্বতবাদী, কোনো কোনো বিষয়ে অশাশ্বতবাদী, যাঁহারা চতুর্বিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে আংশিকভাবে শাশ্বত ও আংশিকভাবে অশাশ্বত ঘোষণা করেন। ভিক্ষুগণ, শ্রমণ ও ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে যাঁহারাই ওইরূপ মতবাদী, তাঁহারা সকলেই এই চতুর্বিধ কারণে কিম্বা উহাদের মধ্যে এক অথবা অপর কারণে ওইরূপ বলিয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।
৫১. “ভিক্ষুগণ, ওই সম্বন্ধে তথাগত অবগত আছেন যে ওই সকল দৃষ্টিস্থান এইরূপে গৃহীত, এইরূপে বিচারিত হইয়া এই এই গতি প্রাপ্ত হইবে, ওই সকলে আসক্ত মনুষ্য জন্মান্তরে এই এই দশায় উপনীত হইবে। তথাগত উহা জানেন, উহাপেক্ষাও অনেক অধিক জানেন, কিন্তু ওই জ্ঞান তাঁহাকে স্ফীত করে না, উহা দ্বারা অস্পৃষ্ট হইয়া তিনি স্বীয় অন্তরে মুক্তি অনুভব করেন, বেদনাসমূহের উৎপত্তি, লয়, আস্বাদ, দৈন্য ও নিঃসরণ যথাযথরূপে বিদিত হইয়া, আসক্তিবর্জিত হইয়া তথাগত বিমুক্তরূপে অবস্থান করেন।
৫২. “ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই ধর্ম যাহা, দুর্দশ, দুরানুবোধ, শান্ত, প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত-বেদনীয়, যাহা তথাগত স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করেন, যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
অন্তানন্তিক
৫৩. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ অন্তানন্তিকবাদী, তাঁহারা চতুর্বিধ কারণে জগৎকে সান্ত অথবা অনন্ত বলিয়া থাকেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিকে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
৫৪. “ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ উৎসাহ, উদ্যোগ, অনুযোগ, অপ্রমাদ, সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধিতে উপনীত হন যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় তিনি অন্তসংজ্ঞী হইয়া জগতে অবস্থান করেন। তিনি বলিলেন, “এই জগৎ সান্ত ও পরিচ্ছিন্ন। কী হেতু? যেহেতু আমি উৎসাহ, উদ্যোগ, অনুযোগ, অপ্রমাদ সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধি প্রাপ্ত হই, যাহাতে ওই সমাধির অবস্থায় আমি অন্তসংজ্ঞী হইয়া জগতে অবস্থান করি। এই কারণে আমি জানি এই জগৎ সান্ত ও পরিচ্ছিন্ন।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই প্রথম কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ অন্তানন্তিকবাদী হইয়া জগৎকে সান্ত অথবা অনন্ত বলিয়া থাকেন।
৫৫. “দ্বিতীয় শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
“ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ উৎসাহ, উদ্যোগ, অনুযোগ, অপ্রমাদ, সম্যকচিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধিতে উপনীত হন যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় তিনি অনন্তসংজ্ঞী হইয়া জগতে অবস্থান করেন। তিনি বলিলেন, “এই জগৎ অনন্ত ও অসীম। যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ বলিয়া থাকেন যে জগৎ সান্ত ও পরিচ্ছিন্ন, তাঁহারা ভ্রান্ত। কী হেতু? আমি উৎসাহ… সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধিতে উপনীত হই যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় আমি অনন্তসংজ্ঞী হইয়া জগতে অবস্থান করি। এই কারণে আমি জানি যে জগৎ অনন্ত ও অসীম।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই দ্বিতীয় কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ অন্তানন্তিকবাদী হইয়া জগৎকে সান্ত অথবা অনন্ত বলিয়া থাকেন।
৫৬. “তৃতীয় শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে উক্তরূপ মতবাদী হইয়া উক্ত মত প্রকাশ করেন? কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ উৎসাহ… সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধিতে উপনীত হন যে এরূপ সমাধির অবস্থায় তিনি জগতের ঊর্ধ্ব ও অধঃ সান্ত বলিয়া থাকেন, কিন্তু তির্যকভাবে উহাকে অনন্ত সংজ্ঞা দান করেন। তিনি এইরূপে বলিলেন, “এই জগৎ সান্ত এবং অনন্ত। যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ জগৎকে সান্ত ও পরিচ্ছিন্ন বলিয়া থাকেন তাঁহারা ভ্রান্ত; যাঁহারা জগৎকে অনন্ত ও অসম বলিয়া থাকেন, তাঁহারাও ভ্রান্ত। এই জগৎ একাধারে সান্ত এবং অনন্ত। কী হেতু? আমি উৎসাহ… সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধিতে উপনীত হই যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় জগতের ঊর্ধ্ব ও অধোভাগের অন্তসংজ্ঞা প্রাপ্ত হই, তির্যকভাবে অনন্ত সংজ্ঞা প্রাপ্ত হই। এই কারণেই আমি জানিতে পারি যে জগৎ একাধারে সান্ত এবং অনন্ত।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই তৃতীয় কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ অন্তানন্তিকবাদী হইয়া জগৎকে সান্ত অথবা অনন্ত আখ্যা দিয়া থাকেন।
৫৭. “চতুর্থ শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
“ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ তার্কিক ও আলোচনাপ্রিয় হইয়া থাকেন। তিনি তর্কপর্যাহত, বিচার প্রতিষ্ঠিত এইরূপ আত্মসিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন, “এই জগৎ সান্তও নহে, অনন্তও নহে। যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ জগৎকে সান্ত ও পরিচ্ছিন্ন বলিয়া থাকেন, তাঁহারা ভ্রান্ত; যাঁহারা জগৎ অনন্ত ও অসীম বলিয়া থাকেন তাঁহারাও ভ্রান্ত। যাঁহারা জগৎ একাধারে সান্ত ও অনন্ত বলিয়া থাকেন তাঁহারাও ভ্রান্ত। এই জগৎ সান্তও নহে, অনন্তও নহে।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই চতুর্থ কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ অন্তানন্তিকবাদী হইয়া জগৎকে সান্ত অথবা অনন্ত আখ্যা দিয়া থাকেন।
৫৮. “ভিক্ষুগণ, ইহারাই ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা অন্তানন্তিকবাদী হইয়া জগৎকে সান্ত অথবা অনন্ত বলিয়া থাকেন তাঁহারা সকলেই উক্ত চতুর্বিধ কারণে কিম্বা উহাদের মধ্যে এক অথবা অপর কারণে ওইরূপ বলিয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।
৫৯. “ভিক্ষুগণ, ওই সম্বন্ধে তথাগত অবগত আছেন যে ওই সকল দৃষ্টিস্থান এইরূপে গৃহীত, এইরূপে বিচারিত হইয়া এই এই গতি প্রাপ্ত হইবে, ওই সকলে আসক্ত মনুষ্য জন্মান্তরে এই এই দশায় উপনীত হইবে। তথাগত উহা জানেন, উহাপেক্ষাও অনেক অধিক জানেন, কিন্তু ওই জ্ঞান তাঁহাকে স্ফীত করে না; উহা দ্বারা অস্পৃষ্ট হইয়া তিনি স্বীয় অন্তরে মুক্তি অনুভব করেন, বেদনাসমূহের উৎপত্তি, লয়, আস্বাদ, দৈন্য ও নিঃসরণ যথাযথরূপে বিদিত হইয়া, আসক্তি বর্জিত হইয়া, হে ভিক্ষুগণ, তথাগত বিমুক্তরূপে অবস্থান করেন।
৬০“ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই ধর্ম যাহা গম্ভীর, দুর্দর্শ, দুরানুবোধ, শান্ত প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত-বেদনীয়, যাহা তথাগত স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করেন, যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
অমরা-বিক্ষেপিক
৬১. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা অমরা বিক্ষেপিক ; কোনো বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে তাঁহারা চতুর্বিধ কারণে দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লন, অমরার গতি অনুসরণ করেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিতে, কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ করিয়া থাকেন?
৬২. “প্রথমত, ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ কুশল কী তাহা যথারূপ জানেন না, অকুশল কী তাহাও যথারূপ জানেন না। তিনি এইরূপ চিন্তা করেন, “আমি কুশল কী তাহা যথারূপ জানি না, অকুশল কী তাহাও যথারূপ জানি না। এইরূপে কুশল ও অকুশলের স্বরূপ অজ্ঞাত হইয়া যদি আমি ইহা কুশল, ইহা অকুশল এইরূপ কহি, তাহা হইলে আমার বাক্য ছন্দ, রাগ, দোষ কিম্বা প্রতিঘ দুষ্ট হইতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে আমার বাক্য মিথ্যা হইতে পারে। যদি আমার বাক্য মিথ্যা হয়, তাহা হইলে উহা আমার পক্ষে ব্যাঘাত হইবে, এবং ওই ব্যাঘাত আমার অন্তরায় হইবে।” এইরূপে মিথ্যার ভয়ে, মিথ্যার ঘৃণায়, তিনি ইহা কুশল তাহাও বলেন না, ইহা অকুশল তাহাও বলেন না; প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লইয়া অমরার গতি অনুসরণপূর্বক তিনি বলিলেন, “ইহা আমার মত নয়, ওই মতও আমার নহে। কোনো বিভিন্ন মতও আমার নাই। ইহা নয় তাহাও আমি বলিতেছি না। ইহাও নয় উহাও নয় এরূপও আমি বলিতেছি না।”
ভিক্ষুগণ, ইহাই প্রথম কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ অমরা-বিক্ষেপিক হইয়া প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লইয়া অমরার গতি অনুসরণ করেন।
৬৩. “দ্বিতীয় শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে উক্তরূপ নীতির আশ্রয় লন?
“ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ কুশল কী… এবং সে ক্ষেত্রে উহা আমার উপাদান-স্বরূপ হইবে। যাহা আমার উপাদান হইবে, তাহা আমার পক্ষে ব্যাঘাত হইবে, এবং ওই ব্যাঘাত আমার অন্তরায় হইবে।” এইরূপে উপাদানের ভয়ে উপাদানের ঘৃণায় তিনি ইহা কুশল তাহাও বলেন না… এরূপও আমি বলিতেছি না।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই দ্বিতীয় কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ… অমরার গতি অনুসরণ করেন।
৬৪. “তৃতীয় শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে উক্তরূপ নীতির আশ্রয় লন?
“কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ কুশল কী… যথারূপ জানি না। এইরূপে কুশল ও অকুশলের স্বরূপ অজ্ঞাত হইয়া আমি ইহা কুশল, ইহা অকুশল এইরূপ বলিতে পারি। কিন্তু, এমন শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা পণ্ডিত, নিপুণ অভিজ্ঞ তার্কিক, কুশাগ্র বুদ্ধি, মনে হয় স্বীয় প্রজ্ঞা দ্বারা অপরের সিদ্ধান্তকে ছিন্ন ভিন্ন করণে সক্ষম-ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ আমাকে প্রশ্ন করিলে, আমার সহিত তর্কে প্রবৃত্ত হইলে এবং বাদানুবাদ করিলে, যদি আমি যথার্থ উত্তর দিতে সক্ষম না হই, তাহা হইলে উহা আমার পক্ষে ব্যাঘাত হইবে এবং ওই ব্যাঘাত আমার অন্তরায় হইবে। এইরূপে অনুযোগের ভয়ে, অনুযোগের ঘৃণায় তিনি ইহা কুশল তাহাও বলেন না, ইহা অকুশল তাহাও বলেন না; প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লইয়া অমরার গতি অনুসরণপূর্বক তিনি বলিলেন। “ইহা… বলিতেছি না।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই তৃতীয় কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ… অমরার গতি অনুসরণ করেন।
৬৫. “চতুর্থ শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে উক্তরূপ নীতির আশ্রয় লন?
“ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ মন্দবুদ্ধি, নির্বোধ। ওই মূঢ়তার জন্য প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে তিনি দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লইয়া অমরার গতি অনুসরণ করেন, “পরলোক আছে কি?” যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করো, তাহা হইলে আমি যদি মনে করি পরলোক আছে, তাহা হইলে আমি ওইরূপই বলিব, কিন্তু আমি সেরূপ বলিতেছি না। উহা এই প্রকার তাহা আমি মনে করি না, উহা যে অন্য প্রকার তাহাও মনে করি না। আমি ইহা অস্বীকার করি না। ইহাও নয় উহাও নয়, আমি এইরূপও কহি না। “পরলোক নাই কি?” যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করো,… (পূর্বের ন্যায়)। “পরলোক কি একাধারে আছে এবং নাই? পরলোক নাই এবং উহা যে নাই তাহাও নয়, এইরূপ কি? ঔপপাতিক সত্ত্ব আছে কি? উহা কি নাই? উহা কি একাধারে আছে এবং নাই? উহা নাই এবং উহা যে নাই তাহাও নয়, এইরূপ কি? সুকৃতি-দুষ্কৃতির ফল আছে কি? উহাদের ফল নাই কি? উহাদের ফল কি একাধারে আছে এবং নাই? উহাদের ফল নাই এবং ফল যে নাই তাহাও নয়, এইরূপ কি? মরণের পর কি তথাগতের অস্তিত্ব থাকে? মরণের পর কি তাঁহার অস্তিত্ব থাকে না? মরণের পর কি একাধারে তাঁহার অস্তিত্ব থাকে এবং থাকে না? মরণের পর তাঁহার অস্তিত্ব থাকে না এবং উহা যে থাকে না তাহাও নয়, এইরূপ কি? আমাকে এইরূপ জিজ্ঞাসা করিলে, মরণান্তে তথাগতের অস্তিত্ব থাকে না এবং উহা যে থাকে না তাহাও নয়, যদি আমি এইরূপ মনে করি, আমি এইরূপই ব্যক্ত করিব। কিন্তু আমি ওইরূপ বলিতেছি না। উহা এই প্রকার তাহা আমি মনে করি না, উহা যে অন্য প্রকার তাহাও মনে করি না। আমি ইহা অস্বীকার করি না। ইহাও নয় উহাও নয়, আমি এইরূপও কহি না।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই চতুর্থ কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লইয়া অমরার গতি অনুসরণ করেন।
৬৬. “ভিক্ষুগণ, ইঁহারাই সেই শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ যাঁহারা অমরা-বিক্ষেপিক, যাঁহারা কোনো বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে চতুর্বিধ কারণে দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লন এবং অমরার গতি অনুসরণ করেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ উক্ত চতুর্বিধ কারণে, কিম্বা উহাদের মধ্যে এক কিম্বা অপর কারণে ওইরূপ করিয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।
ভিক্ষুগণ, ওই সম্বন্ধে তথাগত অবগত আছেন যে ওই সকল দৃষ্টিস্থান এইরূপে গৃহীত, এইরূপে বিচারিত হইয়া এই এই গতি প্রাপ্ত হইবে, ওই সকলে আসক্ত মনুষ্য জন্মান্তরে এই এই দশায় উপনীত হইবে। তথাগত উহা জানেন, উহাপেক্ষাও অনেক অধিক জানেন, কিন্তু ওই জ্ঞান তাঁহাকে স্ফীত করে না, উহা দ্বারা অস্পৃষ্ট হইয়া তিনি স্বীয় অন্তরে মুক্তি অনুভব করেন, বেদনাসমূহের উৎপত্তি, লয়, আস্বাদ, দৈন্য ও নিঃসরণ যথাযথরূপে বিদিত হইয়া, আসক্তি বর্জিত হইয়া, হে ভিক্ষুগণ, তথাগত বিমুক্তরূপে অবস্থান করেন।
“ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই ধর্ম যাহা গম্ভীর, দুর্দশ, দুরানুবোধ, শান্ত, প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত-বেদনীয়, যাহা তথাগত স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করেন, যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
অধীত্য-সমুৎপন্নিক
৬৭. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা অকারণবাদী, যাঁহারা দ্বিবিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে অকারণসম্ভূত ঘোষণা করেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ করিয়া থাকেন?
৬৮. “ভিক্ষুগণ, অসংজ্ঞ-সত্ত্ব নামক কোনো কোনো দেবতা আছেন, সংজ্ঞা উৎপন্ন হইলেই ওই দেবগণ ওই দেহ হইতে চ্যুত হন। ভিক্ষুগণ, ইহা সম্ভব যে কোনো সত্ত্ব ওই দেহ হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করেন; তৎপরে তিনি গৃহবাস ত্যাগ করিয়া অনাগারিত্ব অবলম্বন করেন। পরে তিনি উৎসাহ, উদ্যোগ, অনুযোগ, সম্যক চিন্তার দ্বারা এরূপ চিত্ত-সমাধিতে উপনীত হন যে, ওইরূপ সমাধির অবস্থায় তিনি সংজ্ঞার উৎপত্তি অনুসরণ করেন, কিন্তু তৎপূর্ববস্থা স্মরণে অক্ষম হন। তিনি বলিলেন, “আত্মা ও জগৎ অকারণসম্ভূত। কী কারণে? আমি পূর্বে ছিলাম না, কিন্তু পূর্বে না থাকিয়াও এক্ষণে সত্ত্বতে পরিণত হইয়াছি।”
“ভিক্ষুগণ, ইহাই প্রথম কারণ যাহার ভিত্তিতে, যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ অকারণবাদী হইয়া আত্মা জগৎকে অকারণসম্ভূত ঘোষণা করেন।
৬৯. “দ্বিতীয় শ্রেণির শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ, কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে উক্তরূপ মতবাদী হইয়া উক্তরূপ ঘোষণা করেন?
“ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ তার্কিক ও আলোচনাপ্রিয় হইয়া থাকেন। তিনি তর্ক-পর্যাহত, বিচার প্রতিষ্ঠিত এইরূপ আত্মসিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন, “আত্মা ও জগৎ অকারণসম্ভূত।”
ভিক্ষুগণ, ইহাই দ্বিতীয় কারণ যাহার ভিত্তিতে যাহার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ উক্তরূপে মতবাদী হইয়া উক্তরূপ ঘোষণা করেন।
৭০. “ভিক্ষুগণ, ইঁহারাই ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা অকারণবাদী হইয়া দ্বিবিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে অকারণসম্ভূত ঘোষণা করেন। যাঁহারাই ওইরূপ মতবাদ পোষণ করিয়া ওইরূপ মত ঘোষণা করেন। তাঁহারা সকলেই এই দ্বিবিধ কারণে, কিম্বা উহাদের মধ্যে এক অথবা অপর কারণে, ওইরূপ করিয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে… যাহা তথাগত স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করেন, যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
৭১. “ভিক্ষুগণ, ইঁহারাই ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা পূর্বান্ত-কল্পিক, পূর্বান্তনুদৃষ্টি হইয়া, অষ্টাদশ কারণে পূর্বান্ত সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করেন। যাঁহারাই… ওইরূপ করেন তাঁহারা সকলেই এই অষ্টাদশ কারণে অথবা উহাদের এক বিস্ময় অপর কারণে উহা করিয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।
৭২. “ভিক্ষুগণ, ওই সম্বন্ধে তথাগত অবগত আছেন যে, ওই সকল দৃষ্টিস্থান এইরূপে গৃহীত, এইরূপে বিচারিত হইয়া এই এই গতি প্রাপ্ত হইবে, ওই সকলে আসক্ত মনুষ্য জন্মজন্মান্তরে এই এই দশায় উপনীত হইবে। তথাগত উহা জানেন, উহাপেক্ষাও অনেক অধিক জানেন, কিন্তু ওই জ্ঞান তাঁহাকে স্ফীত করে না, উহা দ্বারা অস্পৃষ্ট হইয়া তিনি স্বীয় অন্তরে মুক্তি অনুভব করেন, বেদনাসমূহের উৎপত্তি, লয়, আস্বাদ, দৈন্য ও নিঃসরণ যথাযথরূপে বিদিত হইয়া, আসক্তি বর্জিত হইয়া, হে ভিক্ষুগণ, তথাগত বিমুক্তরূপে অবস্থান করেন।
৭৩. “ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই ধর্ম যাহা গম্ভীর, দুর্দর্শ, দুরানুবোধ, শান্ত, প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত-বেদনীয়, যাহা তথাগত স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করেন, যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
অপরান্ত-কল্পিক
৭৪. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা অপরান্ত-কল্পিক, অপরান্তানুদৃষ্টি; তাঁহারা চতুর্চত্বারিংশ কারণে অপরান্ত সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
সংজ্ঞীবাদ
৭৫. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা মৃত্যুর পর আত্মার সচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে এই মত প্রকাশ করেন। তাঁহারা ষোড়শবিধ কারণে ওইরূপ মতের পোষক। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
৭৬. “মরণান্তে আত্মারূপী অরোগ এবং সচৈতন্য অবস্থায় বিদ্যমান থাকে”, এইরূপ তাঁহারা বলিলেন। “মরণান্তে আত্মা অরূপী, অরোগ এবং সচৈতন্য অবস্থায় থাকে”, এইরূপ বলিলেন। “আত্মা একাধারে রূপী ও অরূপী”… “উহা রূপীও নহে, অরূপীও নহে… “উহা সান্ত… উহা অনন্ত… উহা একাধারে সান্ত এবং অনন্ত… উহা সান্তও নহে, অনন্তও নহে… “উহা একাত্ম সংজ্ঞী… “উহা নানাত্ম সংজ্ঞী… “উহা পরিমিত সংজ্ঞা সম্পন্ন… “উহা অপরিমিত সংজ্ঞা সম্পন্ন… “উহা একান্ত সুখী “উহা একান্ত দুঃখী… “উহা একাধারে সুখী ও দুঃখী… “উহা সুখ-দুঃখহীন, অরোগ এবং সচৈতন্য অবস্থায় মরণান্তে বিদ্যমান থাকে” এইরূপ তাঁহারা বলিয়া থাকেন।
৭৭. “ভিক্ষুগণ, ইঁহারাই ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা মৃত্যুর পর আত্মার সচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে এই মত প্রকাশ করেন, যাঁহারা ষোড়শবিধ কারণে ওই মতের পোষক। ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ ওই মতের পরিপোষক, তাঁহারা সকলেই উক্ত ষোড়শবিধ কারণে, অথবা উহাদের এক কিম্বা অপর কারণে ওইরূপ মতবাদী হইয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে… যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
অসংজ্ঞীবাদ
৭৮. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা মৃত্যুর পর আত্মার অচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে এই মত প্রকাশ করেন। তাঁহারা অষ্টবিধ কারণে ওই মত পোষণ করিয়া থাকেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন।
৭৯. “মরণান্তে আত্মা রূপী, অরোগ এবং অচৈতন্য অবস্থায় বিদ্যমান থাকে”, এইরূপ তাঁহারা বলিলেন। “মরণান্তে আত্মা অরূপী… “আত্মা একাধারে রূপী ও অরূপী… “উহা রূপীও নহে, অরূপীও নহে… “উহা সান্ত… “উহা অনন্ত… উহা একাধারে সান্ত এবং অনন্ত… “উহা সান্তও নহে, অনন্তও নহে। মরণান্তে উহার অরোগ অচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে,” এইরূপ তাঁহারা বলিয়া থাকেন।
৮০. ভিক্ষুগণ, ইঁহারাই ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা মৃত্যুর পর আত্মার অচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে এই মত প্রকাশ করেন, যাঁহারা অষ্টবিধ কারণে ওই মতের পরিপোষক। ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ ওই মতের পরিপোষক, তাঁহারা সকলেই উক্ত অষ্টবিধ কারণে, অথবা উহাদের এক কিম্বা অপর কারণে ওইরূপ মতবাদী হইয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।… যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
নৈব-সংজ্ঞী-নৈব-অসংজ্ঞীবাদ
৮১. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব সচৈতন্যও নহে, অচৈতন্যও নহে, এই মত প্রকাশ করেন। তাঁহারা অষ্টবিধ কারণে ওইরূপ মতের পোষক। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
৮২. মরণান্তে আত্মা রূপী, অরোগ এবং নৈব-সংজ্ঞী নৈব-অসংজ্ঞীরূপে অবস্থান করে,” এইরূপ তাঁহারা বলিলেন। “মরণান্তে আত্মা অরূপী… “আত্মা একাধারে রূপী ও অরূপী… “উহা রূপীও নহে, অরূপীও নহে… “উহা শান্ত… “উহা অনন্ত… “উহা একাধারে শান্ত এবং অনন্ত… “উহা শান্তও নহে, অনন্তও নহে; মরণান্তে উহার অরোগ নৈব-সংজ্ঞী-নৈব-অসংজ্ঞী অস্তিত্ব থাকে”, এইরূপ তাঁহারা করিয়া থাকেন।
৮৩. “ভিক্ষুগণ, ইঁহারাই ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা মৃত্যুর পর আত্মার নৈব-সংজ্ঞী-নৈব-অসংজ্ঞী অস্তিত্ব থাকে এই মত প্রকাশ করেন, যাঁহারা অষ্টবিধ কারণে ওই মতের পোষক। ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ ওই মতের পোষক, তাঁহারা সকলেই উক্ত অষ্টবিধ কারণে, অথবা উহাদের এক কিম্বা অপর কারণে ওইরূপ মতবাদী হইয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।… যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
উচ্ছেদবাদী
৮৪. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা উচ্ছেদবাদী, যাঁহারা সপ্তবিধ কারণে সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
৮৫. “ভিক্ষুগণ, এস্থলে কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ এইরূপ মত, এইরূপ দৃষ্টি পোষণ করেন, “যেহেতু এই আত্মা রূপী, চতুর্মহাভূতিক, মাতা ও পিতা হইতে সম্ভূত, সেই হেতু দেহাবসানে ইহার উচ্ছেদ ও বিনাশ হয়, মরণের পর ইহার অস্তিত্ব থাকে না, উহা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।” এইরূপে কেহ কেহ সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
৮৬. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে। আমি তাহা অস্বীকার করি না; কিন্তু ওইরূপে এই আত্মার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না। অন্য এক আত্মা আছে যাহা দিব্য, রূপী, কামাবচর, কবলিঙ্কার আহারভোজী। আপনি উহাকে জানেন না, দেখেন না। আমি উহাকে জানি ও দেখি। যেহেতু ওই আত্মা দেহাবসানে উচ্ছেদ ও বিনাশ প্রাপ্ত হয়, মরণান্তে ইহার অস্তিত্ব থাকে না; সেই হেতু উহার সম্পূর্ণ ধ্বংস ঘটিয়া থাকে।” এইরূপে কেহ কেহ সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
৮৭. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে। আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু ওইরূপে এই আত্মার সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধন হয় না। অন্য এক আত্মা আছে যাহা দিব্য, রূপী, মনোময়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গযুক্ত এবং অহীনেন্দ্রিয়। আপনি উহাকে জানেন না, দেখেন না। আমি উহাকে জানি ও দেখি। যেহেতু ওই আত্মা দেহাবসানে উচ্ছেদ ও বিনাশ প্রাপ্ত হয়, মরণান্তে ইহার অস্তিত্ব থাকে না, সেই হেতু উহার সম্পূর্ণ ধ্বংস ঘটিয়া থাকে।” এইরূপে কেহ কেহ সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
৮৮. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে। আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু ওইরূপে এই আত্মার সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধন হয় না। অন্য এক আত্মা আছে যাহা রূপসংজ্ঞাকে সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘসংজ্ঞা বিনাশ করিয়া, নানাত্মসংজ্ঞায় উদাসীন হইয়া “আকাশ-অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত “আকাশ-অনন্ত-আয়তন” স্তরে গমন করে। আপনি উহাকে জানেন না, দেখেন না। আমি উহাকে জানি ও দেখি। যেহেতু ওই আত্মা দেহাবসানে উচ্ছেদ ও বিনাশ প্রাপ্ত হয়, মরণান্তে উহার অস্তিত্ব থাকে না, সেই হেতু উহার সম্পূর্ণ ধ্বংস ঘটিয়া থাকে।” এইরূপে কেহ কেহ সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
৮৯. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে। আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু ওইরূপে এই আত্মার সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধন হয় না। অন্য এক আত্মা আছে যাহা “আকাশ-অনন্ত-আয়তন” সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “বিজ্ঞান অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত “বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন” স্তরে গমন করে। আপনি উহাকে জানেন না, দেখেন না। আমি উহাকে জানি ও দেখি। যেহেতু ওই আত্মা দেহাবসানে উচ্ছেদ ও বিনাশ প্রাপ্ত হয়, মরণান্তে উহার অস্তিত্ব থাকে না, সেই হেতু উহার সম্পূর্ণ ধ্বংস ঘটিয়া থাকে।” এইরূপে কেহ কেহ সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
৯০. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে। আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু ওইরূপে এই আত্মার সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধন হয় না। অন্য এক আত্মা আছে যাহা “বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন” সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “কিছুই নাই” এই অনুভূতির সহিত “অকিঞ্চন-আয়তন” স্তরে গমন করে। আপনি উহাকে জানেন না, দেখেন না। আমি উহাকে জানি ও দেখি। যেহেতু ওই আত্মা দেহাবসানে উচ্ছেদ ও বিনাশ প্রাপ্ত হয়, মরণান্তে উহার অস্তিত্ব থাকে না, সেই হেতু উহার সম্পূর্ণ ধ্বংস ঘটিয়া থাকে।” এইরূপে কেহ কেহ সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
৯১. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে, আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু ওইরূপে এই আত্মার সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধন হয় না। অন্য এক আত্মা আছে যাহা “অকিঞ্চন-আয়তন” সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া শান্ত ও প্রণীত “নৈব-সংজ্ঞা-নৈব-অসংজ্ঞায়তন” স্তরে গমন করে। আপনি উহাকে জানেন না, দেখেন না। আমি উহাকে জানি ও দেখি। যেহেতু ওই আত্মা দেহাবসানে উচ্ছেদ ও বিনাশ প্রাপ্ত হয়, মরণান্তে উহার অস্তিত্ব থাকে না, সেই হেতু উহার সম্পূর্ণ ধ্বংস ঘটিয়া থাকে।” এইরূপে কেহ কেহ সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
৯২. “ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ যাঁহারা উচ্ছেদবাদী, যাঁহারা সপ্তবিধ কারণে সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন। যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত পোষণ করেন, তাঁহারা সকলেই উক্ত সপ্তবিধ কারণে, অথবা উহাদের এক কিম্বা অপর কারণে ওইরূপ মতবাদী হইয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।… যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
দৃষ্টধর্মে নির্বাণবাদী
৯৩. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণবাদী , যাঁহারা পঞ্চবিধ কারণে জীবের পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষণা করেন। ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ কীসের ভিত্তিতে কীসের উদ্দেশ্যে ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন?
৯৪. “ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ এইরূপ মতবাদী, এইরূপ দৃষ্টিসম্পন্ন “যেহেতু এই আত্মা পঞ্চকামগুণ-সমন্বিত হইয়া ইন্দ্রিয়সমূহের তৃপ্তিসাধন করে, সেই হেতু ইহা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ প্রাপ্ত হয়।” এইরূপে কেহ কেহ জীবের পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষণা করেন।
৯৫. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে, আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু এই আত্মা ওইরূপেই পরম দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ প্রাপ্ত হয় না। কী হেতু? কাম অনিত্য, দুঃখ, বিপরিণাম-ধর্ম। উহার পরিবর্তন ও অস্থায়ীত্ব-হেতু শোক, বিলাপ, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও অশান্তির উদ্ভব হয়। কিন্তু যখন ওই আত্মা কাম এবং অকুশলধর্ম হইতে বিরত হইয়া সবিতর্ক, সবিচার এবং বিবেকজ প্রীতিসুখ-মণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া বিরাজ করে, তখনোই উহা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ প্রাপ্ত হয়।” এইরূপে কেহ কেহ জীবের পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষণা করেন।
৯৬. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে, আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু ওইরূপেই এই আত্মা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম নির্বাণ প্রাপ্ত হয় না। কী হেতু? যেহেতু ওই অবস্থায় বিতর্ক এবং বিচার বর্তমান থাকে, সেই হেতু উহা স্থূল আখ্যাত হয়। কিন্তু যখন ওই আত্মা বিতর্ক ও বিচারের উপশমে অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদ, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী বিতর্কাতীত, বিচারাতীত, সমাধিজ প্রীতিসুখ-মণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিরাজ করে, তখনোই উহা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ প্রাপ্ত হয়।” এইরূপে কেহ কেহ জীবের পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষণা করেন।
৯৭. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে, আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু ওইরূপেই এই আত্মা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম নির্বাণ প্রাপ্ত হয় না। কী হেতু? যেহেতু ওই অবস্থায় চিত্তে প্রীতির অনুভূতি এবং উত্তেজনা বর্তমান থাকে, সেই হেতু উহা স্থূল আখ্যাত হয়। কিন্তু যখন ওই আত্মা প্রীতিতে বিরাগ উৎপাদন করিয়া উপেক্ষার ভাবে বিরাজ করে, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া কায়ে সুখ অনুভব করে-যে সুখ সম্বন্ধে আর্যগণ বলিয়া থাকেন, “উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী এবং এইরূপ তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিরাজ করে, তখনোই উহা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ প্রাপ্ত হয়।” এইরূপে কেহ কেহ জীবের পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষণা করেন।
৯৮. “অপর কোনো ব্যক্তি তাঁহাকে বলিলেন, “আপনার বর্ণিত আত্মা আছে, আমি তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু ওইরূপেই এই আত্মা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম নির্বাণ প্রাপ্ত হয় না। কী হেতু? যেহেতু ওই অবস্থায় চিত্ত সুখের অনুভূতিতে পরিপূর্ণ থাকে, সেই হেতু উহা স্থূল আখ্যাত হয়। কিন্তু যখন ওই আত্মা সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্য অস্তমিত করিয়া, দুঃখহীন, সুখহীন, উপেক্ষা ও স্মৃতি-পরিশুদ্ধ চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া বিরাজ করে, তখনোই উহা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ প্রাপ্ত হয়।” এইরূপে কেহ কেহ জীবের পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষণা করেন।
৯৯. “ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণবাদী, যাঁহারা পঞ্চবিধ কারণে জীবের পরম দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষণা করেন। যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত পোষণ করেন, তাঁহারা সকলেই উক্ত পঞ্চবিধ কারণে, অথবা উহাদের এক কিম্বা অপর কারণে ওইরূপ মতবাদী হইয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।… যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
১০০. “ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা অপরান্ত-কল্পিক, অপরান্তানুদৃষ্টি, যাঁহারা চতুর্চত্বারিংশ কারণে অপরান্ত সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করেন। যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ ওই মতের পরিপোষক, তাঁহারা সকলেই এই চতুর্চত্বারিংশ কারণেই কিম্বা উহাদের এক অথবা অপর কারণে ওইরূপ মতবাদী হইয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।… যাহা তথাগতের যথার্থ গুণের সম্যক কথনকারী বলিবেন।
১০১. “ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যাঁহারা পূর্বান্তকল্পিক, অপরান্ত-কল্পিক, একাধারে পূর্বান্ত ও অপরান্তকল্পিক, পূর্বান্তপরান্তানুদৃষ্টি, যাঁহারা দ্বি-ষষ্ঠী কারণে ওই সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করিয়া থাকেন।
১০২. যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ ওইরূপ মতবাদী হইয়া ওইরূপ মত প্রকাশ করেন, তাঁহারা সকলেই উক্ত দ্বি-ষষ্ঠী কারণে, কিংবা উহাদের এক অথবা অপর কারণে ওইরূপ মতবাদী হইয়া থাকেন, উহার বাহিরে অন্য কোনো কারণে নহে।
১০৩-১০৪. “ভিক্ষুগণ, ওই সম্বন্ধে তথাগত অবগত আছেন যে ওই সকল দৃষ্টিস্থান এইরূপে গৃহীত… বিমুক্তরূপে অবস্থান করেন।
“ভিক্ষুগণ, এই সকলই সেই ধর্ম যাহা… কথনকারী বলিবেন।
১০৫. “ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শাশ্বতবাদী হইয়া চতুর্বিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে শাশ্বত ঘোষণা করেন।
১০৬. যাঁহারা কোনো কোনো বিষয়ে শাশ্বতবাদী, কোনো কোনো বিষয়ে অশাশ্বতবাদী হইয়া চতুর্বিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে আংশিকরূপে শাশ্বত ও আংশিকরূপে অশাশ্বত ঘোষণা করেন।
১০৭. যাঁহারা অন্তানন্তিকবাদী হইয়া চতুর্বিধ কারণে জগৎকে সান্ত অথবা অনন্ত বলিয়া থাকেন।
১০৮. যাঁহারা অমরা বিক্ষেপিক হইয়া প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে চতুর্বিধ কারণে দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লইয়া অমরার গতি অনুসরণ করেন।
১০৯. যাঁহারা অকারণবাদী হইয়া দ্বিবিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে অকারণসম্ভূত ঘোষণা করেন।
১১০. যাঁহারা পূর্বান্তকল্পিক, পূর্বান্তনুদৃষ্টি হইয়া অষ্টাদশ কারণে পূর্বান্ত সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করেন।
১১১. যাঁহারা ষোড়শবিধ কারণে মৃত্যুর পর আত্মার অচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে এই মত পোষণ করেন।
১১২. যাঁহারা অষ্টবিধ কারণে মৃত্যুর পর আত্মার সচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে এই মত পোষণ করেন।
১১৩. যাঁহারা অষ্টবিধ কারণে মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব সচৈতন্যও নহে অচৈতন্যও নহে, এই মত পোষণ করেন।
১১৪. যাঁহারা উচ্ছেদবাদী হইয়া সপ্তবিধ কারণে সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
১১৫. যাঁহারা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণবাদী হইয়া পঞ্চবিধ কারণে জীবের পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষনা করেন।
১১৬. যাঁহারা অপরান্তকল্পিক, অপরান্তানুদৃষ্টি হইয়া চতুর্চত্বারিংশ কারণে অপরান্ত সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করেন।
১১৭. যাঁহারা পূর্বান্তকল্পিক, অপরান্তকল্পিক, একাধারে পূর্বান্ত ও অপারান্তকল্পিক, পূর্বান্তপরান্তানুদৃষ্টি, যাঁহারা দ্বি-ষষ্ঠী কারণে ওই সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করিয়া থাকেন : “তাঁহাদের ওই সকল দৃষ্টি অজ্ঞ, অদর্শী, তৃষ্ণাগত শ্রমণ ও ব্রাহ্মণের বেদনা মাত্র, চিত্তচাঞ্চল্য মাত্র।”
১১৮. “ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শাশ্বতবাদী হইয়া চতুর্বিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে শাশ্বত ঘোষণা করেন।
১১৯. যাঁহারা কোনো কোনো বিষয়ে শাশ্বতবাদী, কোনো কোনো বিষয়ে অশাশ্বতবাদী হইয়া চতুর্বিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে আংশিকরূপে শাশ্বত এবং আংশিকরূপে অশাশ্বত ঘোষণা করেন।
১২০. যাঁহারা অন্তানন্তিকবাদী হইয়া চতুর্বিধ কারণে জগৎকে সান্ত অথবা অনন্ত বলিয়া থাকেন।
১২১. যাঁহারা অমরা বিক্ষেপিক হইয়া প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইলে চতুর্বিধ কারণে দ্ব্যর্থসূচক বাক্যের আশ্রয় লইয়া অমরার গতি অনুসরণ করেন।
১২২. যাঁহারা অকারণবাদী হইয়া দ্বিবিধ কারণে আত্মা ও জগৎকে অকারণসম্ভূত ঘোষণা করেন।
১২৩. যাঁহারা পূর্বান্তকল্পিক, পূর্বান্তনুদৃষ্টি হইয়া অষ্টাদশ কারণে পূর্বান্ত সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করেন।
১২৪. যাঁহারা ষোড়শবিধ কারণে মৃত্যুর পর আত্মার সচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে এই মত পোষণ করেন।
১২৫. যাঁহারা অষ্টবিধ কারণে মৃত্যুর পর আত্মার অচৈতন্য অস্তিত্ব থাকে, এই মত পোষণ করেন।
১২৬. যাঁহারা অষ্টবিধ কারণে মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব সচৈতন্যও নহে, অচৈতন্যও নহে, এই মত পোষণ করেন।
১২৭. যাঁহারা উচ্ছেদবাদী হইয়া সপ্তবিধ কারণে সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ এবং বিভব ঘোষণা করেন।
১২৮. যাঁহারা পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণবাদী হইয়া পঞ্চবিধ কারণে জীবের পরম-দৃষ্ট-ধর্ম-নির্বাণ ঘোষণা করেন।
১২৯. যাঁহারা অপরান্তকল্পিক, অপরান্তানুদৃষ্টি হইয়া চতুর্চত্বারিংশ কারণে অপরান্ত সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করেন।
১৩০. যাঁহারা পূর্বান্তকল্পিক, অপরান্তকল্পিক, একাধারে পূর্বান্ত ও অপরান্তকল্পিক, পূর্বান্তপরান্তানুদৃষ্টি, যাঁহারা দ্বি-ষষ্ঠী কারণে ওই সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করিয়া থাকেন :
তাঁহাদের ওই সকল মত স্পর্শজনিত।
১৩১-১৪৪. “ভিক্ষুগণ, যাঁহারা ওই সকল মত পোষণ করেন, তাঁহারা যে স্পর্শ ব্যতীত ওইরূপ বেদনাসংযুক্ত হইবেন, তাহা হইতে পারে না।
“তাঁহারা সকলেই ষড় স্পর্শায়তনের সহিত স্পর্শে আনীত হইয়া ওইরূপ বেদনাসংযুক্ত হইয়া থাকেন। তাঁহাদের বেদনা হইতে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা হইতে উপাদান, উপাদান হইতে ভব, ভব হইতে জাতি, জাতি হইতে জরা, মরণ, শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য এবং নৈরাশ্যের উৎপত্তি হয়।
১৪৫. ভিক্ষুগণ, যখন ভিক্ষু ষড় স্পর্শায়তনের সমুদয়, অস্তগমন, আস্বাদ, দৈন্য এবং নিঃসরণ যথাযথরূপে জ্ঞাত হন, তখন তিনি তদূর্ধ্বে যাহা আছে তাহাও জানিতে পারেন।
১৪৬. “ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ পূর্বান্তকল্পিক অথবা অপরান্তকল্পিক, অথবা একাধারে পূর্বান্ত ও অপরান্তকল্পিক, অথবা পূর্বান্তপরান্তানুদৃষ্টি, যাহারা পূর্বান্ত ও অপরান্ত সম্বন্ধে অনেকবিধ মত প্রকাশ করেন, তাঁহারা সকলেই এই দ্বি-ষষ্ঠী প্রণালির জালে আবদ্ধ; ইহাতেই বদ্ধ হইয়া তাঁহারা ইতস্তত ভাসমান, উহাতেই ধৃত হইয়া তাঁহারা ইতস্তত উন্মুজ্জন-নিরত।
“ভিক্ষুগণ, যখন কোনো দক্ষ ধীবর অথবা ধীবর বালক ক্ষুদ্র জলাশয়ের উপর সূক্ষ্ম ছিদ্রবিশিষ্ট জাল নিক্ষেপ করে, তখন তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “এই দহে যে-সকল বৃহৎ মৎস্য আছে তাহারা সকলেই জালবদ্ধ হইয়াছে, এই জালে আবদ্ধ হইয়াই তাহারা ইতস্তত ভাসমান, উহাতেই ধৃত হইয়া তাহারা ইতস্তত উন্মুজ্জন-নিরত, সেইরূপই উক্ত শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণ এই দ্বি-ষষ্ঠী প্রণালির জালে আবদ্ধ, ইহাতেই বদ্ধ হইয়া তাঁহারা ইতস্তত ভাসমান, ইহাতেই ধৃত হইয়া তাঁহারা ইতস্তত উন্মুজ্জন-নিরত।
১৪৭. “ভিক্ষুগণ, তথাগতের ভবতৃষ্ণা উচ্ছিন্ন হইয়াছে, কিন্তু তাঁহার দেহ বর্তমান। যতদিন এই দেহ থাকিবে ততদিন দেব ও মনুষ্য তাঁহাকে দেখিতে পাইবে। দেহের বিলয়ে জীবনান্তে দেব ও মনুষ্য তাঁহাকে দেখিতে পাইবে না।
“ভিক্ষুগণ, আম্রগুচ্ছের বৃন্ত ছিন্ন হইলে বৃন্তসংলগ্ন সমুদয় আম্র যেরূপ বৃন্তের অনুগমন করে, সেইরূপই উচ্ছিন্ন-ভব-নেত্র তথাগতের দেহ রহিয়াছে। যতদিন এই দেহ থাকিবে, ততদিন দেব ও মনুষ্য তাঁহাকে দেখিতে পাইবে। দেহের বিলয়ে জীবনান্তে দেব ও মনুষ্য তাঁহাকে দেখিতে পাইবে না।”
১৪৮. এইরূপ কথিত হইলে, আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, আশ্চর্য, ভন্তে, অদ্ভুত! ভন্তে, এই ধর্মপর্যায়ের নাম কী?”
“আনন্দ, এই ধর্মপর্যায়কে তুমি অর্থজাল বলিতে পার, ধর্মজাল বলিতে পার, ব্রহ্মজাল বলিতে পার, দৃষ্টিজাল বলিতে পার, অনুত্তর সংগ্রাম-বিজয়ও বলিতে পার।”
১৪৯. ভগবান এইরূপ বলিলেন। ভিক্ষুগণ আনন্দিত মনে ভগবদ্বাক্যের অভিনন্দন করিলেন। এই সবিস্তার উপদেশ দানকালে এক সহস্র জগৎ কম্পিত হইল।
ব্রহ্মজাল সূত্র সমাপ্ত।
ব্রহ্মজাল সূত্র